‘আব্বা, আপনার বেতন আমার লাগবে না, শুধু আপনি হলেই হতো আমার’
· Prothom Alo

‘আব্বা, আপনার বেতন আমার লাগবে না, শুধু আপনি হলেই হতো আমার’—বাবা গ্রাম পুলিশ প্রধান জামশেদ আলীকে হারিয়ে ছেলে মো. নুরুজ্জামান (রনি) ফেসবুকে কথাগুলো লিখেছেন। ঢাকায় গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে যোগ দিতে গিয়ে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জামশেদ আলী। ছেলের আক্ষেপ, বাবার বেতন বৃদ্ধির স্বপ্ন পূরণ হলেও সেই বেতন তিনি আর কখনো তুলতে পারবেন না।
জামশেদ আলী রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ প্রধান (দফাদার)। গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে যোগ দিতে ঢাকায় গিয়ে গতকাল শনিবার সকালে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। ছেলে নুরুজ্জামান স্থানীয় একটি বাজারে মুঠোফোন মেরামতের কাজ করেন।
Visit truewildslot.com for more information.
পরিবার ও গ্রাম পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে রাজধানীর জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশস্থলের প্রবেশমুখে হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন জামশেদ আলী। সেখানে দায়িত্বে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ সদস্য কবি সাগর বলেন, ‘মহাসমাবেশে যোগদান করতে আমরা বদরগঞ্জ উপজেলার ৮৪ জন গ্রাম পুলিশ সদস্য দুটি বাসে করে ঢাকায় গিয়েছিলাম। জামশেদ আলী আমার সঙ্গেই ছিল। জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশস্থলে প্রবেশের সময় আমি ছিলাম সামনে। ভিড়ে কিছুটা পেছনে পড়ে যান জামশেদ আলী। হঠাৎ কেউ একজন বলেন, বাইরে একজন মাটিতে পড়ে আছে। দ্রুত বের হয়ে দেখি, জামশেদ আলী সমাবেশস্থলে প্রবেশের মুখ থেকে ১৫-২০ গজ দূরে পড়ে আছেন। তখন জ্ঞান ছিল না। সেখান থেকে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।’
আজ রোববার সকাল ১০টার দিকে জানাজা শেষে বদরগঞ্জ উপজেলার কাঁচাবাড়ি সরকারপাড়া গ্রামের কবরস্থানে জামশেদ আলীকে দাফন করা হয়। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্য মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
মো. নুরুজ্জামান, মারা যাওয়া গ্রাম পুলিশ প্রধান জামশেদ আলীর ছেলে, বদরগঞ্জ, রংপুরপ্রিয় আব্বা, ...আজকে তো আপনার বেতন বাড়ল, সেই বেতন আর আপনি নিতে পারলেন না। আব্বা, আপনার বেতন আমার লাগবে না, শুধু আপনি হলেই হতো আমার। আব্বা, আপনি কেন আমাকে এতিম করে গেলেন?‘চোখ-কান খোলা রেখো বাবা’
জামশেদ আলীর ছেলে নুরুজ্জামান আজ রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকায় গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার আগে বাবা বলেছিলেন, এলাকায় চুরি-ছিনতাই বেড়েছে। তিনি ঢাকা থেকে না ফেরা পর্যন্ত গ্রামটা যেন পাহারা দিয়ে রাখি।’
গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে অন্য গ্রাম পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বদরগঞ্জ থেকে বাসে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন জামশেদ আলী। রাত পৌনে দুইটার দিকে বাসে থাকার সময়ও ছেলে নুরুজ্জামানকে ফোন করেন তিনি। ফোনে ছেলেকে বলেন, ‘বাবা, ঘুমাইছ? গ্রামে চোখ-কান খোলা রেখো বাবা।’ বাবার সঙ্গে ছেলের সেটিই ছিল শেষ কথা।
জামশেদ আলী ১৯৯৭ সালে গ্রাম পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। অন্তত ১৫ বছর ধরে গ্রাম পুলিশ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বিনয়ী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে এলাকায় তাঁর পরিচিতি ছিল। কিন্তু স্বল্প বেতনে সংসার চালাতে তাঁকে হিমশিম খেতে হতো। স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরসা ছিলেন তিনি।
জামশেদ আলীছেলে নুরুজ্জামান বলেন, প্রতিদিন রাতে তাঁর বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় থাকতেন বাবা। তিনি বাড়ি ফিরলে দুজন একসঙ্গে খেতে বসতেন। খাওয়ার সময় বাবা বলতেন, ‘বাবা, আমাদের বেতন বাড়বে, তখন আর কোনো সমস্যা হবে না।’
গ্রাম পুলিশ সদস্যদের মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। গ্রাম পুলিশ সদস্যদের বেতন সাড়ে সাত হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫০০ টাকা আর গ্রাম পুলিশ প্রধানের বেতন ৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কিন্তু বেতন বাড়ানোর ঘোষণা শোনার যে স্বপ্ন নিয়ে জামশেদ আলী মহাসমাবেশে যোগ দিতে গিয়েছিলেন, সেই ঘোষণা নিজের কানে শুনে যেতে পারেননি তিনি। তাঁর মৃত্যুতে পরিবারে চলছে মাতম। ছেলে নুরুজ্জামান ফেসবুকে লিখেছেন, ‘প্রিয় আব্বা, ...আজকে তো আপনার বেতন বাড়ল, সেই বেতন আর আপনি নিতে পারলেন না। আব্বা, আপনার বেতন আমার লাগবে না, শুধু আপনি হলেই হতো আমার। আব্বা, আপনি কেন আমাকে এতিম করে গেলেন?’
জামশেদ আলীর মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পরিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক তিন লাখ টাকা অনুদান দিয়েছেন। শনিবার রাতে রংপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী, বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুসা নাসের চৌধুরী, বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকারসহ স্থানীয় বিএনপি নেতারা অনুদানের টাকা পরিবারের সদস্যদের হাতে তুলে দেন।
নুরুজ্জামান রনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আমার বাবার মৃত্যুর পর তাৎক্ষণিক তিন লাখ টাকা অনুদান পাঠিয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। বাবার স্বল্প বেতনে অতিকষ্টে সংসার চলত। আমি চাই, বাবার চাকরিটা যেন আমাকে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী যেন আমাদের পরিবারের প্রতি নজর রাখেন।’