কিছু গল্প খবরের পাতায় শেষ হয় না
· Prothom Alo

একটি সংবাদপত্রের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের জীবনে আলো জ্বালানোর গল্প
Visit bettingx.bond for more information.
কোন কোন শিশুর কাছে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ মানে শুধু বই-খাতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে যাওয়া নয়, তার কাছে সেটি হতে পারে দারিদ্র্যের বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসার, সিঁড়ি, বড় হওয়ার স্বপ্ন। আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে একটি শিক্ষাবৃত্তি মানে শুধু পড়াশোনার খরচ জোগানো নয়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সাহস। আবার বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো একটি পরিবারের কাছে একটু খাবার কিংবা শীতের রাতে একটি কম্বল মানে শুধু সহায়তা নয়, কঠিন সময়ে কেউ পাশে আছে—এই বিশ্বাস। মানুষের জীবনে এমন ছোট ছোট আশার আলো জ্বালানোর মধ্য দিয়েই সংবাদপত্রের গণ্ডি পেরিয়ে এক ভিন্ন পরিচয় তৈরি করেছে প্রথম আলো।
প্রথম আলো মনে করে, সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি দেশ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও একটি সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই ভাবনা থেকেই প্রতিষ্ঠার শুরুতে অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, মাদকবিরোধী আন্দোলন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত হয় প্রথম আলো।
২০০৫ সালে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কারের অর্থ থেকে ৩৩ লাখ টাকা তিনটি তহবিলে বরাদ্দ করা হয়—অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তা, মাদকবিরোধী আন্দোলন ও নির্যাতিত সাংবাদিকদের সহযোগিতার জন্য। প্রথম আলোর কর্মীরাও নিজেদের বেতন থেকে অনুদান দিয়ে যুক্ত হন এই উদ্যোগে। এভাবেই শুরু হয়েছিল একটি সংবাদপত্রের মানবিক দায়বদ্ধতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যাত্রা। ২০০৯ সালের ২৩ মে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম আলো ট্রাস্ট। এরপর থেকে প্রথম আলোর সামাজিক উদ্যোগগুলো আরও সুসংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে ট্রাস্ট।
স্বপ্নের পাশে দাঁড়ানোর নাম
দারিদ্র্য কখনো কখনো মেধার চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অনেক শিক্ষার্থীর চোখে থাকে বড় হওয়ার স্বপ্ন, কিন্তু পরিবারের আর্থিক অপারগতা সেই স্বপ্নের পথ আটকে দেয়। অদম্য মেধাবী তহবিলের উদ্দেশ্য সেই বাধা কিছুটা হলেও সরিয়ে দেওয়া। ব্র্যাক ব্যাংক ও অন্যান্য দাতার সহযোগিতায় ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই তহবিল থেকে বৃত্তি পেয়েছেন ১ হাজার ৪৮৭ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংকের সহায়তায় ১ হাজার ১৫৩ জন এবং অন্যান্য দাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সহযোগিতায় ৩৩৪ জন। বর্তমানে বৃত্তি পাচ্ছেন ২৬৯ জন। ২০২৬ সাল পর্যন্ত এ তহবিল থেকে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে ৭ কোটি ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৫১১ টাকা।
এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটিই একটি করে সম্ভাবনার গল্প। কারও কাছে এটি উচ্চশিক্ষার সুযোগ, কারও কাছে পরিবারের দুশ্চিন্তা কিছুটা কমার স্বস্তি, আবার কারও কাছে নিজের স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস।
একইভাবে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করছে অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি। ২০১২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই শিক্ষাবৃত্তির দায়িত্ব ২০১৭ সালে আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি নেওয়ার পর এর নতুন নাম হয় ‘অদ্বিতীয়া’। ২০২৬ সাল পর্যন্ত মোট ১৪৩ জন শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০১ জন আইডিএলসির সহযোগিতায় বৃত্তি পেয়েছেন। শুরু থেকে এ পর্যন্ত ২ কোটি ৪৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা অদ্বিতীয়া শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়েছে। একটি মেয়ের শিক্ষার সুযোগ তৈরি হওয়া মানে শুধু একজন শিক্ষার্থীর এগিয়ে যাওয়া নয়, একটি পরিবারের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে যাওয়া।
দুর্গম পথেও জ্বলে শিক্ষার আলো
শহর থেকে অনেক দূরে, নদীঘেরা চর কিংবা প্রত্যন্ত জনপদে বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য শিক্ষার সুযোগ সব সময় সহজ নয়। সেই শিশুদের কাছেই শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে কাজ করছে আলোর পাঠশালা। ২০০৯ সালে কুড়িগ্রামের প্রথম আলো চরে আলোর পাঠশালা প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে প্রথম আলোর এই উদ্যোগের শুরু। বর্তমানে দেশের আটটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে রয়েছে আলোর পাঠশালা। এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে দেড় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। দীর্ঘ এই যাত্রায় ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষার সুযোগ পেয়েছে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বঞ্চিত মানুষের জীবনে সম্ভাবনার নতুন দরজাও খুলে দিচ্ছে এই উদ্যোগ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেই শিশুটি বড় হয়ে রাখাল বা মাঝি হওয়া ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারতোনা, সেই অঞ্চলের কোন ছেলে হয়তো আইন প্রয়োগকারী ও নিরাপত্তা সংস্থায় কাজ করছে, কেউ দেশের বাইরে কাজ করে পরিবারের হাল ধরেছে। কিশোরী বয়সে পা দেওয়ার আগেই যেই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই মেয়েটি এখন উচ্চশিক্ষা শেষ করার পথে। স্বপ্ন বুনছে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। আলোর পাঠশালার একেকটা ছেলেমেয়ে নিজ নিজ এলাকার আদর্শ হয়ে উঠেছেন।
দুর্যোগের দিনে একটু আশ্রয়, একটু ভরসা
প্রকৃতির রুদ্ররূপে যখন মানুষের ঘরবাড়ি ভেসে যায়, খাবার ফুরিয়ে আসে, কিংবা শীতের রাতে শরীর ঢাকার মতো কাপড়টুকুও থাকে না, তখন সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় প্রথম আলো ট্রাস্টের ত্রাণ তহবিল।
২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই তহবিলের মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩টি পরিবারকে দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি ৭৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩২৯ টাকার খাদ্যসহায়তা। শীতের কষ্ট লাঘবে ১ লাখ ১২ হাজার ৮৮২টি পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ২ কোটি ৪১ লাখ ৭৬ হাজার ৪৫১ টাকার শীতবস্ত্র।
একটি পরিবারের কাছে এই সহায়তার অর্থ কতটা, তা হয়তো পরিসংখ্যানে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়। দুর্যোগের পর যখন ঘরে খাবার থাকে না, তখন খাদ্যসহায়তা শুধু ক্ষুধা মেটায় না, স্বস্তিও দেয়। শীতের রাতে একটি কম্বল শুধু শরীর গরম রাখে না, ওই অসহায় মানুষের মনে জাগায় সহমর্মিতার অনুভূতি। একেকটি সহায়তার পেছনে তাই রয়েছে একেকটি পরিবারের কঠিন সময় পার করার গল্প।
বিপর্যয় পেরিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন
২০১৩ সালের রানা প্লাজা দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছিল বহু মানুষের জীবন, অসংখ্য পরিবারকে ঠেলে দিয়েছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে পাশে দাঁড়াতে গঠিত হয় মেরিল-প্রথম আলো সাভার সহায়তা তহবিল। এ তহবিল থেকে এ পর্যন্ত ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে উদ্ধারকাজ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসনে। পাশাপাশি ৫০ লাখ টাকার আমানত থেকে প্রতিবছর ২০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সন্তানকে দেওয়া হচ্ছে শিক্ষাবৃত্তি। অর্থাৎ দুর্ঘটনার তাৎক্ষণিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার পথও সচল রাখার চেষ্টা চলছে।
অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তা ও পুনর্বাসন, মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে ২০০০ সাল থেকে চলমান আন্দোলন এবং সাদত স্মৃতি পল্লীর মতো উদ্যোগও প্রথম আলো ট্রাস্টের মানবিক কাজের অংশ। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য একটাই—মানুষকে বিপর্যয়, বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার মধ্য থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া।
এই গল্প সবার
প্রথম আলো ট্রাস্টের প্রতিটি উদ্যোগের পেছনে রয়েছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা। কোনো পাঠকের ছোট্ট অনুদান, কোনো শুভানুধ্যায়ীর আন্তরিকতা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল অংশীদারত্ব—সব মিলিয়েই এগিয়ে চলেছে এই পথচলা। ব্র্যাক ব্যাংক, আইডিএলসি ফাইন্যান্স পিএলসি, অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ও দাতাদের প্রতি তাই কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া এত মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো না।
প্রথম আলো ট্রাস্ট একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর শক্তি মানুষের আস্থা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা। যারা পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্টের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।
প্রথম আলোর ২৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ফিরে তাকালে দেখা যায়, সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিনের খবরের বাইরেও লেখা হয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবনের গল্প। কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের গল্প, কোনো মেয়ের আত্মনির্ভর হওয়ার গল্প, কোনো পরিবারের দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠার গল্প।
এসব গল্পের সবগুলো হয়তো সংবাদপত্রের পাতায় ছাপা হয় না। কিন্তু মানুষের জীবনে সেগুলোর প্রভাব থেকে যায় বহুদিন। প্রথম আলো তাই শুধু সংবাদ প্রকাশের প্রতিষ্ঠান নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোরও একটি নিরন্তর প্রয়াস। আর প্রথম আলো ট্রাস্ট সেই প্রয়াসকে এগিয়ে নিচ্ছে প্রতিদিন, বছরজুড়ে— আলো হাতে, মানুষের পাশে।