প্রমাণ ছাড়াই হত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ

· Prothom Alo

এ সপ্তাহের শুরুতে সুপ্রভা তাসনিম বিডিনিউজে একটি খবর পড়লেন, যেখানে বলা হয়েছে, তাঁর বাবার বিরুদ্ধে ‘হত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার’ অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন কোনো মামলার কথা সুপ্রভা আগে কখনো শোনেননি।

Visit sport-tr.bet for more information.

সুপ্রভার বাবা বিখ্যাত অভিনেতা ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে আছেন।

একের পর এক হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, অথবা এসব মামলায় তাঁকে ‘গ্রেপ্তার দেখানো’ হয়েছিল।

মামলাগুলোর বেশির ভাগই ছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে। এ ধরনের অসংখ্য মামলার মতোই প্রতিটি মামলার পেছনে বাস্তবে একজন মানুষের মৃত্যুর ঘটনা ছিল।

কিন্তু আসামি করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের কয়েক ডজন, কখনো কখনো শত শত নেতা-কর্মীকে।

অপরাধের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ ছিল না; শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই তাঁদের আসামি করা হয়েছিল।

সুপ্রভা বাড্ডার কোনো মামলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল: যে আদালত জবাবদিহি করতে বাধ্য ননব্যারিস্টার রাজ্জাকের স্মৃতিকথা: ’৭১ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

ওই মামলায় তাঁর বাবাকে গ্রেপ্তার দেখানোও হয়নি। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু এজাহারেই নয়, অভিযোগপত্রেও তাঁর বাবার নাম রয়েছে।

অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই বাড্ডায় নিহত প্রাইভেটকারচালক ইমদাদুল হককে হত্যায় ‘প্ররোচনা’ দিয়েছিলেন আসাদুজ্জামান নূর।

তদন্ত কর্মকর্তা অনলাইন সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘অভিযোগপত্র আদালতে জমা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে তাদের আসামি করা হয়েছে।

আর যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি তাদের অব্যাহতির সুপারিশ করা পেয়েছে। এরপরের বিষয় আদালত দেখবেন।’

কিন্তু ২৭ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে এমন কোনো প্রমাণ নেই, যার ভিত্তিতে নূরকে আসামি করা যায়।

এখানে রাজনীতিই যে নির্ধারক ভূমিকা রেখেছে, সেই সিদ্ধান্তে না পৌঁছে উপায় নেই। মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্যদের নাম প্রথমে এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল বলে পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিচ্ছে।

তাঁরা দলের কোন অবস্থানে ছিলেন, সেটিই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে; অপরাধের সঙ্গে তাঁদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আছে কি না, তা গুরুত্ব পাচ্ছে না।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি (প্রথম পর্ব)বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি (পর্ব-২)

অভিযোগপত্রে নূরের বিরুদ্ধে একমাত্র অভিযোগ হিসেবে বলা হয়, ‘তাঁর অনুসারীরা অত্র মামলার ঘটনার দিনে কোটা সংস্কার ছাত্রদের মিছিলে আক্রমন করে অত্র মামলার অপরাধ ঘটায়।’

কিন্তু ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগপত্রে যে ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে কারা নূরের অনুসারী ছিলেন, তা বলা হয়নি।

নূর ঢাকার সংসদ সদস্য ছিলেন না। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নীলফামারী থেকে। রাজধানী থেকে সে জেলায় গাড়িতে যেতে প্রায় সাত ঘণ্টা লাগে।

অভিযোগপত্রে যে অর্থে তাঁর ‘অনুসারীদের’ কথা বলা হয়েছে, সে অর্থে তাঁর অনুসারীরা থাকলে তাঁদের নীলফামারীতেই থাকার কথা।

অন্যদিকে বাড্ডার মামলার অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর অধিকাংশই বাড্ডা অথবা ঢাকার আশপাশের ওয়ার্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

উল্লেখ্য, নূরের নির্বাচনী এলাকা নীলফামারীতে আন্দোলন চলাকালে কেউ নিহত হননি।

এ ছাড়া, নূর কীভাবে কাউকে হত্যায় ‘প্ররোচনা’ দিয়েছেন, সে বিষয়েও অভিযোগপত্রে কোনো ব্যাখ্যা নেই।

অভিযোগপত্রে যে অর্থে তাঁর ‘অনুসারীদের’ কথা বলা হয়েছে, সে অর্থে তাঁর অনুসারীরা থাকলে তাঁদের নীলফামারীতেই থাকার কথা। অন্যদিকে বাড্ডার মামলার অভিযোগপত্রে নাম থাকা ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মীর অধিকাংশই বাড্ডা অথবা ঢাকার আশপাশের ওয়ার্ডগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ধরে নেওয়া যাক, ঘটনাস্থলে তাঁর কোনো অনুসারী উপস্থিত ছিলেন।

তারপরও নূরের বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ টিকিয়ে রাখতে হলে পুলিশের এমন প্রমাণ দেখাতে হবে, যাতে বোঝা যায় তিনি অপরাধটি সংঘটনে উসকানি দিয়েছেন, অন্য কোনোভাবে সহায়তা করেছেন অথবা ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন।

অভিযোগপত্রে এ ধরনের প্রমাণের সামান্য ইঙ্গিতও নেই। এতে ছয়টি ভিডিওর উল্লেখ রয়েছে।

এর মধ্যে আছে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন; আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বক্তব্য; আর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের বক্তৃতা।

এসব ভিডিওর কোনোটিই নূরের দেওয়া বক্তব্যের নয়। কোনো ভিডিওতে তাঁকে দেখা যায়নি, তাঁর নামও উল্লেখ করা হয়নি।

অভিযোগপত্রে যেসব সংবাদপত্রের প্রতিবেদন বা কাটিংয়ের উল্লেখ রয়েছে, সেগুলোর সঙ্গেও নূরের কোনো সম্পর্ক নেই।

অভিযোগপত্রে উল্লেখিত অন্য কোনো প্রমাণেও তাঁকে ঘটনাস্থলের সঙ্গে, সেখানে উপস্থিত বলে দাবি করা ব্যক্তিদের সঙ্গে, গুলিবর্ষণের সঙ্গে কিংবা ওই দিন ঘটে যাওয়া অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে জানিয়েছেন, মূল এজাহারে নাম থাকা ৬৭ জনের বিরুদ্ধে ‘প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ধরনের প্রমাণ’ না পাওয়ায় তাঁদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু নূরকে কেন ওই ৬৭ জনের দলে রাখা হলো না, তা বোঝা কঠিন। বিশেষ করে, তদন্ত কর্মকর্তা যাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাড্ডা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বাড্ডার ৩৭ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের দুজন আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর।

এ কথা বলার উদ্দেশ্য এ–ই নয় যে ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু বিষয়টি বিস্ময়কর যে নীলফামারীর একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ ছাড়াই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, অথচ বাড্ডার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সদস্যদের বিরুদ্ধে তা দেওয়া হয়নি।

এই নিবন্ধে আসাদুজ্জামান নূরের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না থাকার যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, একই অবস্থা অপরাধে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত অন্য ১৫ জনের অনেকের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য বলে মনে হয়।

জুলাই আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত অসংখ্য মামলা হয়েছে।

আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, অভিযোগপত্রে ওই দিন বাড্ডার কোনো ভিডিও বা সিসিটিভি ফুটেজের উল্লেখ নেই, যা থেকে যাচাই করা যেত যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করা ২৯ জন আওয়ামী লীগ কর্মী সত্যিই সেখানে ছিলেন কি না।

এ ছাড়া নিহত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হয়নি, কোনো ব্যালিস্টিক প্রমাণ (আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক প্রমাণ) সংগ্রহ করা হয়নি, কোনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি।

এমনকি তাঁকে প্রথমে যে এ এম জেড হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সেখানকার কোনো নথিও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়নি।

হত্যা মামলায় একের পর এক অভিযোগপত্র দেওয়া হচ্ছে। এটি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের জবাবদিহির ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার গভীরভাবে স্বেচ্ছাচারী পদ্ধতির নতুন একটি ধাপ।

এত দিন এই জবাবদিহির প্রক্রিয়া মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।

এতে সন্দেহ নেই যে আওয়ামী লীগের কিছু রাজনীতিক ও কর্মীর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড কিংবা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

কিন্তু তাঁদের সঙ্গে দলের আরও অনেক বেশিসংখ্যক অনুসারী ও সমর্থককে একইভাবে বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে, যাঁদের বিরুদ্ধে আটক রাখা তো দূরের কথা, বিচার করার মতো অর্থবহ কোনো প্রমাণই নেই।

সাংবাদিকদের বিচার, আইসিটির ভূমিকা ও কিছু প্রশ্নতৌফিক-ই-ইলাহীর মামলায় আইসিটির আটকসংক্রান্ত বিধি প্রশ্নের মুখোমুখি

বর্তমানে বিএনপি সরকারের সমর্থনপুষ্ট অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও রাজনীতিকীকৃত একটি বিচারব্যবস্থা সবাইকে একই পাল্লায় মাপছে।

যাঁদের গ্রেপ্তার করা, এমনকি বিচার করারও কোনো ভিত্তি ছিল না, তাঁদের মুক্তি দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে এ ব্যবস্থা।

মনে হচ্ছে, এই অভিযোগপত্রের উদ্দেশ্য আওয়ামী লীগের অভিযুক্ত রাজনীতিক ও কর্মীদের আরও দীর্ঘ সময় কারাগারে আটকে রাখা।

বিচার শেষ হওয়ার অপেক্ষায় তাঁদের কারাবন্দী থাকতে হবে। অথচ বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হতে সম্ভবত বহু বছর লেগে যাবে। এ সময়ে তাঁদের জামিন পাওয়ারও কোনো আশা নেই।

এই ‘ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বা ‘অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার’ প্রক্রিয়ার এমন পদ্ধতিগত ও সংঘবদ্ধ ব্যর্থতা সংশোধন করা না হলে তা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে কেবল একটি কলঙ্ক হয়েই থাকবে না; যারা ক্ষমতায় থেকে এই পরিস্থিতি ঘটতে দিচ্ছে, একদিন এই ব্যর্থতার পরিণতি প্রায় নিশ্চিতভাবেই তাদের দিকেই ফিরে আসবে।

  • ডেভিড বার্গম্যান সাংবাদিক

ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david. bergman.77377

ইংরেজি থেকে অনূদিত

* মতামত লেখকের নিজস্ব।

Read full story at source