টাঙ্গাইলের সখীপুরে সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় ‘অদ্ভুত বৈপরীত্য’
· Prothom Alo
উপজেলার দুটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাস্তবে কোনো স্থাপনাই নেই, অথচ সেখানে চিকিৎসকের পদ আছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চিত্রে অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে। উপজেলার দুটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে বাস্তবে কোনো স্থাপনা নেই, অথচ সেখানে চিকিৎসকের পদ আছে। অন্যদিকে স্থাপনা থাকা চারটি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের তিনটিতেই চিকিৎসা কর্মকর্তা নিজ কর্মস্থলে নেই। কেউ প্রেষণে অন্য প্রতিষ্ঠানে আবার কেউ চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের জন্য থাকা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাসেবা পাওয়া যাচ্ছে না।
সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে ছয়টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এগুলো হলো সদর, বড়চওনা, বহেড়াতৈল, বাঘেরবাড়ী, যাদবপুর ও হাতীবান্ধা। এর মধ্যে সদর, বড়চওনা, বহেড়াতৈল ও বাঘেরবাড়ীতে স্থাপনা আছে। যাদবপুর ও হাতীবান্ধায় উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো স্থাপনাই নেই।
অন্যদিকে স্থাপনা থাকা চার কেন্দ্রের মধ্যে শুধু বাঘেরবাড়ীতে একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তিনিও সপ্তাহে মাত্র এক দিন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। বাকি সময় তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
সখীপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান সিকদার মো. ছবুর রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও ভবন নেই, অথচ চিকিৎসক আছেন; আবার কোথাও ভবন ও রোগী আছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই—এমন পরিস্থিতিতে গ্রামপর্যায়ের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
ভবন আছে, চিকিৎসক নেই
স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বড়চওনা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস প্রেষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ে কর্মরত। বহেড়াতৈল উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা মরিয়ম আক্তারও দুই বছরের বেশি সময় ধরে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেষণে আছেন।
রেহানা পারভীন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সখীপুরযাদবপুর ও হাতীবান্ধা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থাপনা না থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই দুটি কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে চিকিৎসকেরা সেখানে দায়িত্ব পালন না করে অন্যত্র প্রেষণে কাজ করছেন।সখীপুর সদর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রায় ১০ বছর ধরে কোনো চিকিৎসা কর্মকর্তা নেই। কাগজে-কলমে আয়েশা সিদ্দিকা নামের একজন চিকিৎসা কর্মকর্তা সেখানে কিছুদিন কর্মরত থাকলেও দুই বছর আগে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি নেন। কেন্দ্রটিতে সাইফুল আলম নামের একজন ফার্মাসিস্ট ছয় বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে রোগীর সংখ্যা কম থাকে।
বড়চওনা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে জরাজীর্ণ ভবন
বড়চওনা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবস্থা আরও নাজুক। গত বৃহস্পতিবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, জরাজীর্ণ একটি ভবনে চলছে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। টিনের চালে মরিচা ধরে অনেক জায়গায় ছিদ্র হয়ে গেছে। দরজা-জানালার অবস্থাও নাজুক। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। শৌচাগারও ব্যবহারের অনুপযোগী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ জমি দখল হয়ে গেছে। অবশিষ্ট জমিতে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। আবাসিক ভবনটিও দীর্ঘদিন ধরে বসবাসের অনুপযোগী।
বড়চওনা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা রায়হান ফকির প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিদিন ৮০ থেকে ১০০ জনের বেশি রোগী এই কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে তাঁর ও ফার্মাসিস্টের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রই নেই, আছে চিকিৎসকের পদ
উপজেলায় যাদবপুর ও হাতীবান্ধা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো স্থাপনা নেই। তবে দুটিতেই চিকিৎসা কর্মকর্তার পদ আছে।
এর মধ্যে যাদবপুরের চিকিৎসা কর্মকর্তা জান্নাত আরা জ্যোতি ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে প্রেষণে কর্মরত। একই কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা ইসমত জেরিন সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাতীবান্ধা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা কর্মকর্তা শামীমা আহমেদ এবং উপসহকারী কমিউনিটি চিকিৎসা কর্মকর্তা রাশিদা আক্তারও সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রেষণে কর্মরত।
এ বিষয়ে সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা রেহানা পারভীন প্রথম আলোকে বলেন, যাদবপুর ও হাতীবান্ধা উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে সেখানে কোনো স্থাপনা নেই। স্থাপনা না থাকলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওই দুটি কেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি করেছে। এ কারণে চিকিৎসকেরা সেখানে দায়িত্ব পালন না করে অন্যত্র প্রেষণে কাজ করছেন। অন্য উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর চিকিৎসা কর্মকর্তাদের সংযুক্তি বাতিল করে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরানোর জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে।