ভাদ্র-আশ্বিনে কেন এত গরম, গবেষণা কী বলছে
· Prothom Alo

ভাদ্র শেষের দুপুর। গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার দক্ষিণ গোবিন্দী গ্রামের একদল নারীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আলোচনার বিষয়, তাঁদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন; কিন্তু কথায় কথায় উঠে এল গরমের প্রসঙ্গ। সামিনা বেগম, বিলকিস খাতুন ও শেফালী বেগমদের কথা—এমন গরম তাঁরা আগে দেখেননি।
বিলকিস খাতুনের স্বামী আগের দিন খেতে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেদিন কাজে যেতে পারেননি। সামিনা বেগম বললেন, ‘হামারাই দুটা বকরি। ১২ হাজার টাকা দিয়্যা কিনছিনু। চ্যার–পাঁচ দিন আগে মর্যা গ্যাছে। পাতাল পায়খানা হচ্ছিল।’
Visit amunra-online.pl for more information.
আরেক নারী শেফালি বেগমের ভাষায়, ‘হামার কি মনে হয় জানেন? এডা দুই ঋতুর দেশ হয়্যা গ্যাছে। যখন শীত হচ্ছে যে এত শীত, কাজ করার মতো উপায় নাই। আবার যখন গরম হচ্ছে, তখন পাথারোত (মাঠে) গেলে স্ট্রোক কর্যা মরার মতো হচ্ছে।’
গরমে মানুষ অসুস্থ হয়। প্রাণিসম্পদও তাপের চাপে পড়ে। তবে গ্রামের কৃষকেরা যে শুধু গরমের কারণেই অসুস্থ হচ্ছেন কিংবা ছাগল, হাঁস–মুরগি অসুস্থ হচ্ছে বা মারা যাচ্ছে, তা নিশ্চিত করার কোনো চিকিৎসা বা পরীক্ষার তথ্য গ্রামবাসীর হাতে নেই। এগুলো তাঁদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক ধারণা। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন তাঁরা নিজেদের জীবনেই টের পাচ্ছেন।
তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও দূষণের সম্মিলিত চাপে বাড়ছে অস্বস্তি। বদলাচ্ছে জীবনযাপনের ধরন, বাড়ছে স্বাস্থ্য ও জীবিকার ঝুঁকিও। ঢাকাসহ দেশের বড় নগরগুলোর ৪৪ বছরের (১৯৮১ থেকে ২০২৫) তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে আবহাওয়া অধিদপ্তরের করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। দেখা গেছে, বর্ষা এবং বর্ষা–পরবর্তীকালে প্রতিটি নগরীর তাপমাত্রা বাড়ছে। অসহনীয় হয়ে উঠছে জীবনযাপন।
মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক, জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরসেপ্টেম্বরে টানা ৪ বছর তাপপ্রবাহ
বাংলা পঞ্জিকায় শরৎ এলেও আবহাওয়ার হিসাবে এটি মৌসুমি বায়ুর বিদায়ের পর্ব। শুধু গাইবান্ধা নয়, দেশের বড় অংশেই এখন ভ্যাপসা গরম। গত মঙ্গলবার আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ঢাকাসহ দেশের ২৫ জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যায়। পরদিনও তাপপ্রবাহ ছিল পাঁচ জেলায়।
সেপ্টেম্বরের তাপপ্রবাহ নতুন নয়; তবে ২০২৩ থেকে ২০২৬—টানা চার বছর দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা সেপ্টেম্বরে তাপপ্রবাহের সীমা ছুঁয়েছে। ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরে তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর সিলেটে ছিল ৩৮ ডিগ্রি, ঢাকায় ৩৭ ডিগ্রি। টানা চার বছর ধরে এ মাসে তাপপ্রবাহের নজির গত ২০ বছরে নেই।
বর্ষা ও বর্ষা–পরবর্তী সময়ে বাড়ছে তাপ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৮১ থেকে ২০২৫ সালের গবেষণায় দেশের আট নগরের তাপমাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া গেছে। নগরগুলো হলো ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম।
গবেষণার সবচেয়ে অভিন্ন ফল পাওয়া গেছে বর্ষাকালে। এ সময় সাত নগরেই দিন ও রাতের তাপমাত্রা বেড়েছে। বর্ষা-পরবর্তী সময়েও অধিকাংশ নগরে উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রবণতা রয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধি। এর অর্থ, দিনের গরমের পর রাতে নগরগুলোর স্বাভাবিকভাবে শীতল হওয়ার সুযোগও কমছে।
বর্ষাকালে দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বেশি প্রবণতা পাওয়া গেছে রাজশাহীতে। সেখানে প্রতি দশকে দিনের তাপমাত্রা ০.৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। রাজশাহীতে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং বর্ষা–পরবর্তী এই চার ঋতুর মধ্যে এটিই তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রবণতা।
এরপর বর্ষায় দিনের তাপমাত্রা প্রতি দশকে সিলেটে ০.৪৫, খুলনায় ০.৩৮, বরিশালে ০.৩৭, রংপুরে ০.৩৪, ঢাকায় ০.৩৩ এবং ময়মনসিংহে ০.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে। এসব প্রবণতা পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। চট্টগ্রামে বর্ষাকালের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রতি দশকে ০.১৫ ডিগ্রি বেড়েছে।
বর্ষাকালে আট নগরেই রাতের তাপমাত্রা বেড়েছে। চট্টগ্রামে প্রতি দশকে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ০.২৯, সিলেট ও বরিশালে ০.২৮, রাজশাহীতে ০.২৩, ঢাকায় ০.১৬ এবং ময়মনসিংহে ০.০২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে।
বর্ষার পরেও অধিকাংশ নগর উষ্ণ বর্ষা–পরবর্তী সময়ে দিনের তাপমাত্রা সিলেটে প্রতি দশকে ০.৩৬, রংপুরে ০.২৬, খুলনায় ০.২৬, রাজশাহীতে ০.২২ এবং বরিশালে ০.১৯ ডিগ্রি, ঢাকায় ০.১৪, চট্টগ্রামে দশকে ০.১২ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে। ময়মনসিংহে এ বৃদ্ধি খুব তাৎপর্যপূর্ণ নয়। কোনো পরিবর্তন না থাকার প্রবণতাও তাৎপর্যপূর্ণ নয়।
বর্ষার পর রাতের তাপমাত্রা বৃদ্ধির চিত্র আরও স্পষ্ট। তাপমাত্রা সিলেটে প্রতি দশকে ০.৪০, রংপুরে ০.৩৬, ঢাকায় ০.২৯, চট্টগ্রামে ০.২৮ , খুলনায় ০.২৪ এবং বরিশালে ০.২১, রাজশাহীতে ০.১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়েজিয়ান মেট্রোলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এসব তথ্য–উপাত্ত সংগ্রহ করেছে যৌথভাবে। এগুলো মূল্যায়ন করেছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দিনে গরম পড়বে এটা স্বাভাবিক; কিন্তু রাতে ধারাবাহিকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধির অর্থ হলো উষ্ণায়ন দীর্ঘস্থায়ী হওয়া, নগর তাপদ্বীপ সৃষ্টির হুমকি, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি। এই প্রবণতা বিদ্যুতের চাহিদা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা আদ্র৴তা রাজধানীর বিজয় সরণির পদচারী–সেতুর কাছে ভ্যানে ডাব বিক্রি করেন হজরত আলী। গত বুধবার দুপুরে দেখা গেল, তাঁর ভ্যানে রাখা ডাবের দুই–তৃতীয়াংশ শেষ। ১৭০ টাকা ও ১৮০ টাকায় দুই ধরনের ডাব বিক্রি করছেন। তিনি জানান, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডাবের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে। এবার এপ্রিল–মে মাসে তিনি সর্বোচ্চ ১৫০ টাকায় ডাব বিক্রি করেছেন। এ মাসে ডাব ২০০ টাকাতেও বিক্রি করেছেন। এর কারণ চাহিদা। তাঁর কথা, ‘ডাবের চাহিদা ব্যাপক। এহন মালের জন্য আগে থাইক্যা অর্ডার দেওন লাগে, তাও পাওয়া যায় না। গরম যে হারে বাড়তেছে, মানুষ দামের দিকে ত্যাকাইতেছে না।’ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১৯৯১–২০২১ সালের তথ্য নিয়ে ২০২৪ সালে প্লস ওয়ান সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৬ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রার দিনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ সময়ের গরমকে আরও কষ্টকর করে আর্দ্রতা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, সকাল ও সন্ধ্যায় আপেক্ষিক আর্দ্রতা ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ হওয়া স্বাভাবিক। বেলা বাড়লে তা কমে; কিন্তু প্রায় এক দশক ধরে বর্ষা শেষের সময়ে ঢাকায় আগস্ট–সেপ্টেম্বরে দুপুর ১২টার দিকেও আর্দ্রতা ৬৫ শতাংশের বেশি থাকছে। এ মাসে গড়ে ৬৫–এর বেশি থাকছে। উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে এতটা আর্দ্রতা যুক্ত হলে ঘাম সহজে শুকায় না; ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে গরম বেশি অনুভূত হয়।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলা হয়, ১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লেও ‘অনুভূত তাপমাত্রা’ বেড়েছে ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি। এতে আর্দ্রতারও ভূমিকা আছে। বর্ষা–পরবর্তী সময়ে তাপবৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদার একটি সংযোগ রয়েছে। এপ্রিল ও মে মাসে গরমকালে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকা স্বাভাবিক। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১০ আগস্ট। এর পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ১৯৬ মেগাওয়াট। গত ১০ বছরের চাহিদা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসে চার বছর, মে মাসে এক বছর বিদ্যুতের একবার সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল। আর পাঁচ বছর ছিল জুলাই থেকে অক্টোবর মাস। অর্থাৎ গরমের পর বর্ষা বা বর্ষা–পরবর্তী সময়ে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে।
দূষণ বাড়াচ্ছে গরম
গরম বাড়াতে দূষণের ভূমিকা আছে। তবে সব দূষক একইভাবে কাজ করে না; চলতি তাপপ্রবাহকে শুধু দূষণের ফলও বলা যাবে না। কম বৃষ্টি, মেঘের স্বল্পতা, রোদ ও আর্দ্রতা এর তাৎক্ষণিক আবহাওয়াগত কারণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবদুস সালাম প্রথম আলোকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ালে কার্বন ডাই–অক্সাইড, কালো কার্বন ও নাইট্রোজেন অক্সাইডসহ নানা দূষক বের হয়। কার্বন ডাই–অক্সাইড দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রধান চালক। কালো কার্বন সূর্যের আলো শোষণ করে বাতাস ও ভূপৃষ্ঠ উষ্ণ করে। এতে গরম দীর্ঘস্থায়ী হয়, বাংলাদেশে বর্ষার পরও দীর্ঘ সময় গরম বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোর ২০১৩–১৮ সালের তথ্য নিয়ে ২০২৩ সালের গবেষণায় দেখা যায়, তাপমাত্রা, বাতাস, আর্দ্রতা, সৌর বিকিরণ ও বৃষ্টি দূষিত কণার ওঠা–নামায় বড় ভূমিকা রাখে। বৃষ্টি কমলে কণা ধুয়ে নামার সুযোগ কমে; বাতাস কমলে দূষণ আটকে থাকে। চলতি বছরের আগস্ট মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে। চলতি মাসেও কম বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে।