ভুলে যাচ্ছেন কি অনেক কিছু, আলঝেইমার নয়তো
· Prothom Alo

রাজধানীর হাতিরঝিল এলাকার বাসিন্দা তিনি। বয়স ৭০–এর কোঠায়। ইদানীং হঠাৎ করে তাঁর কিছু আচরণে বেশ চিন্তিত মেয়েরা। সকালে নাশতার পর চা খেয়েছেন। কিন্তু ১৫ মিনিট পরই বলে উঠলেন, তাঁকে কেউ চা দেয়নি।
মেয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে হঠাৎই প্রশ্ন করলেন, ‘জামাই কোথায় চাকরি করে? অফিস কোথায়?’ মেয়ে অবাক হলেও স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলেন। কিন্তু আধঘণ্টা পর আবার সেই একই প্রশ্ন।
Visit betsport24.es for more information.
চিন্তিত মেয়ে এবার মাকে নিয়ে গেলেন স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞের কাছে। চিকিৎসক জানালেন, তাঁর মা আসলে আলঝেইমারে ভুগছেন। এই রোগের কারণে ধীরে ধীরে আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতি, চিন্তাশক্তি ও দৈনন্দিন কাজ করার স্বাভাবিক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। যেসব কারণে ডিমেনশিয়া হয়, অর্থাৎ স্মৃতিশক্তি কমে যায়, সেগুলোর মধ্যে আলঝেইমার অন্যতম। এ রোগ বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। নাম প্রকাশে রাজি হননি এই মা ও মেয়ে।
‘বেলা শেষে’র পাঁচ বছর পর মুক্তি পায় ‘বেলা শুরু’আলঝেইমার রোগের কথা আমরা কমবেশি সবাই জানি। সেই যে ‘বেলা শেষে’ সিনেমার কথা মনে আছে? যেখানে আরতির চরিত্রে অভিনয় করা স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত তাঁর স্বামী বিশ্বনাথের চরিত্রে অভিনয় করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে চিনতেন না। বিশ্বনাথের যত্ন, চেষ্টাতেও তাঁর স্মৃতি ফেরেনি। স্বামীকে আর তিনি চিনতে পারেননি। তিনি ছিলেন আলঝেইমারে আক্রান্ত। বাস্তব জীবনেও কিন্তু এমনটা ঘটে। তবে রোগের এই পর্যায় এক দিনে হয় না। একটু একটু করে শুরু হয়। তাই সতর্ক থাকাটা জরুরি। আবার শুধু বয়স্করাই নন, অল্প বয়সীরাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। বয়সের ভারে হোক বা কাজের চাপে, ভুলে যাওয়ার সমস্যা আজকাল আমাদের অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। ফলে সতর্কতা দরকার।
বিশ্ব আলঝেইমার দিবস আজবিবিসি, রয়টার্সের খবর বলছে, আলঝেইমার রোগের কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বংশগত প্রভাব, মাথায় আঘাত, হতাশা, উচ্চ রক্তচাপ, মেধার কম ব্যবহার ও কম কায়িক শ্রম করার সঙ্গে এই রোগের যোগ আছে। মস্তিষ্কের ‘টেম্পোরাল লোব’ নামক অংশে আমাদের স্মৃতি জমা থাকে। আলঝেইমারের কারণে এ অংশ ক্ষয় হয়ে যায়। তা ছাড়া এই রোগে মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড নামে একধরনের অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হয়, যা ব্যক্তিত্বকে পরিবর্তন করে দেয়।
আলঝেইমার দিবস প্রতিবছরের ২১ সেপ্টেম্বর পালন করা হয়। আলঝেইমার ও অন্যান্য কারণে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো; আক্রান্ত ও তাঁদের যত্নকারীদের প্রতি সহানুভূতি ও সমর্থন প্রকাশ করা এবং রোগের উপসর্গ, প্রতিরোধ ইত্যাদি বিষয়ে তথ্য দেওয়ার জন্যই এ দিবসের আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে আলঝেইমারস ডিজিজ ইন্টারন্যাশনাল দিবসটির অন্যতম বড় আয়োজক। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশে এই দিনে স্মরণসভা, আলোচনা সভা, র্যালি, সংবাদ প্রচার এবং অন্যান্য কার্যক্রম করা হয়। বাংলাদেশেও আলঝেইমার দিবস পালন করা হয়।
নিয়মিত ব্যায়াম আলঝেইমার প্রতিরোধে সাহায্য করেএবারের আলঝেইমার দিবসের প্রতিপাদ্য হলো ‘দ্য আর্লিয়ার ইউ নো, দ্য মোর ইউ ক্যান ডু: আ ডিমেনশিয়া ডায়াগনসিস ম্যাটারস’। অর্থাৎ ‘যত দ্রুত জানবেন, তত বেশি প্রতিরোধ করতে পারবেন। ডিমেনশিয়া রোগ শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।’
আলঝেইমার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা এই রোগের কিছু উপসর্গের কথা জানিয়েছেন। এসব উপসর্গ দেখলেই বুঝতে হবে, সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
উপসর্গ:
ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি হ্রাস, নাম বা পরিচিত জায়গা ভুলে যাওয়া।
কথাবার্তায় অসংলগ্নতা।
দৈনন্দিন কাজ করতে অক্ষমতা।
ব্যক্তিত্ব ও আচরণে পরিবর্তন।
নিকট অতীতের কথা ভুলে যাওয়া, তবে অনেক আগের কথা মনে থাকা।
একই প্রশ্ন বারবার করতে থাকা।
ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে অস্বীকার করা, বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তর্ক করা।
কথা বলার সময় সঠিক শব্দ খুঁজে না পাওয়া।
প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা।
ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, অতিরিক্ত অস্থিরতা, ঘুম কম হওয়া, হঠাৎ রেগে যাওয়া, ভুল দেখা বা শোনা।
চিকিৎসকেরা জানান, এ রোগ শনাক্তের জন্য সাধারণত প্রশ্ন-উত্তরভিত্তিক একটি পরীক্ষা করে থাকেন, যাকে বলে ‘মিনি মেন্টাল স্টেট এক্সামিনেশন’। বিশেষ কোনো কারণ আছে কি না, তা নির্ণয়ের জন্য থাইরয়েড হরমোন, রক্তে ভিটামিন বি১২-এর পরিমাণ ও মাথার এমআরআই করা যেতে পারে। পেট স্ক্যান নামে একটি পরীক্ষা আলঝেইমার রোগ নিখুঁতভাবে নির্ণয় করতে পারে।
তবে পরিস্থিতি ও ব্যক্তিত্বের ধরন অনুসারে এ উপসর্গ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো, জীবনের সব দায়িত্ব পালন শেষে চুপচাপ হয়ে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের দিকে মনোযোগ বাড়ানো। যেমন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এক গণমাধ্যমকর্মী তাঁর মায়ের আচরণের পরিবর্তন দেখে চমকে গিয়েছিলেন। ৭৫ বছর বয়সী মা খুবই গোছানো, পরিপাটি মানুষ। রান্নার হাতও দারুণ। কিন্তু ছেলে লক্ষ করলেন, মা কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর রান্না মুখে দেওয়া যাচ্ছে না। নিজের বাড়ির ঠিকানাও তাঁর মনে থাকছে না। ছেলের ছোটবেলার স্মৃতি থাকলেও গতকাল দুপুরে কী খেয়েছেন, বলতে পারছেন না। আজ কী বার, কত, তারিখ কিছুই বলতে পারেন না তিনি। তখনই ছেলের মনে পড়ল, দুই বছর আগের বাবার মৃত্যুর পর থেকে মা অনেকটা একা। সারা জীবন কর্মব্যস্ত মায়ের এখন অফিস নেই। সংসারে তেমন কাজও নেই। চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর এখন মাকে নিয়মিত আলঝেইমার রোগের ওষুধ খেতে হচ্ছে। মাকে সময় দিচ্ছেন ছেলে। আশায় আছেন, হয়তো তিনি আবার আগের মতো হবেন। এই ছেলে ও তাঁর মা–ও নাম প্রকাশে রাজি হননি।
বাঁশ দিবসে কী হয়, কেন এই দিবসবিবিসি, রয়টার্সের খবরে স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলঝেইমার রোগ আসলে কেবল ওষুধে সারানো সম্ভব নয়। স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ, মনোরোগবিশেষজ্ঞ, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট, পুষ্টিবিদ ও দক্ষ নার্সের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ দল এ ধরনের রোগীর চিকিৎসায় ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।
আসলে ব্যবহার কম হলে সব জিনিসেই মরিচা ধরে। মানুষের স্মৃতিশক্তিও এর ব্যতিক্রম নয়। আর মরিচা না ধরানোর দায়িত্বটা কিন্তু নিজেরই।
পড়াশোনা, সংসারের রান্না, খুঁটিনাটি কাজ, কর্মস্থলের ব্যস্ততায় মানুষের মস্তিষ্ক সজাগ থাকে। চাকরিতে অবসরের পর ধীরে ধীরে সংসার থেকেও যেন ছুটি হয়ে যায়। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো জীবনসায়াহ্নে এসে অনেকটাই কর্মহীন হয়ে পড়েন। তাই এই বয়সেও দরকার নিজেকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখা। ৭০ বছর পার করেও আইন, সাংবাদিকতা, গবেষণা, চিকিৎসা, সামাজিক কাজে যাঁরা ব্যস্ত থাকেন, তাঁদের মধ্যে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা কম থাকে। তাই যেকোনো বয়সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার উপায় নিজেই খুঁজে বের করতে হবে। যাতে সাদা চুল আর হাতে লাঠি নিয়েও মন খুলে গাইতে পারা যায়, ‘পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কি রে হায়।/ ও সেই চোখের দেখা, প্রাণের কথা, সে কি ভোলা যায়।’
তাই আলঝেইমার দিবসে সবার আগে নিজে সতর্ক হই। সেই সঙ্গে সতর্ক করি আশপাশের প্রিয়জনদের।
ওজোনস্তর রক্ষায় আমরা কতটা সফল