মিষ্টিকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের বৃহত্তর পরিচয়কে দেখার চেষ্টা
· Prothom Alo

চমচম, সন্দেশ ও রসমালাইয়ের স্বাদে টাঙ্গাইলকে নতুন করে দেখার আয়োজন হয়েছিল সুইট ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এ। মিষ্টির সঙ্গে তাঁত, হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যও তুলে ধরেছে উৎসবটি।
Visit biznow.biz for more information.
‘চিনির দানায় লেখা ঐতিহ্যের গল্প’—এই স্লোগানে ৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিন দিনের সুইট ফেস্টিভ্যাল ২০২৬। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসব নিছক মিষ্টির প্রদর্শনী ছিল না; টাঙ্গাইলের স্থানীয় ঐতিহ্য ও পণ্যের একটি সামগ্রিক পরিচয় তুলে ধরারও চেষ্টা ছিল এতে।
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির পাশাপাশি উৎসবে ছিল তাঁতের শাড়ি, মধুপুরের হস্তশিল্প, আনারস, বাঁশের তৈরি গৃহসামগ্রীসহ জেলার বারো উপজেলার নানা স্থানীয় পণ্য।
মিষ্টির ঘ্রাণে ফিরে দেখা শেকড়
টাঙ্গাইলের মিষ্টির ইতিহাস শুধু স্বাদের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কারিগরি দক্ষতা, পারিবারিক উত্তরাধিকার এবং স্থানীয় অর্থনীতির গল্প। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিষ্টির কারিগরেরা নিজেদের কৌশল, উপকরণ ও স্বাদের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন।
উৎসব ঘুরে মনে হয়েছে, একেকটি মিষ্টির দোকান যেন একেকটি পরিবারের গল্প। কোথাও পুরোনো রেসিপি, কোথাও কারিগরের দক্ষতা, আবার কোথাও নতুন প্রজন্মের সেই ঐতিহ্যকে ব্যবসার মাধ্যমে ধরে রাখার চেষ্টা।
চমচম পেয়েছে ভৌগলিক নির্দেশক পণ্যের মর্যাদাটাঙ্গাইলের মিষ্টির কথা উঠলেই আসে চমচমের কথা। আর চমচম মানেই পোড়াবাড়ি, লৌহজং নদী ও দীর্ঘদিনের স্থানীয় ঐতিহ্য। পোড়াবাড়ির চমচম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের মর্যাদাও পেয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে জামুর্কির সন্দেশও।
উৎসবে উপস্থিত ছিল মির্জাপুরের কালিদাস মিষ্টান্ন ভান্ডার। পাশাপাশি ছিল টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকার পরিচিত ও নতুন উদ্যোগের মিষ্টি। ঘাটাইলের সিদ্দিক সুইটমিটসের ছানার মিষ্টিও ছিল এ তালিকায়।
টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের ডিসট্রিক্ট ট্রেজারার দ্বীপ ভৌমিক জানান, উৎসবে ছিল জয়কালীর চমচম, ভূঞাপুরের মালাই চপ, জুলহাসের মিষ্টি, সিয়ামের ক্ষীরশা, গোপালের কাঁচাগোল্লা, ঘাটাইলের জীবনের মিষ্টি, বাসাইলের বিলপাড়ার মিষ্টি, কালিহাতীর ইন্দুটির দই, সনাতনের হাঁড়িভাঙা, ফণীন্দ্রের ক্ষীরমোহন, গোপালের টকমিষ্টি দই, গৌরের পানতোয়া, মা মিষ্টান্ন ভান্ডারের দই মিষ্টি, সখীপুরের মালাইকারি এবং ধনবাড়ীর সূর্যকান্তের রসমালাই।
বাসাইলের ময়না মিষ্টান্ন ভান্ডারের রাজভোগও ছিল আলাদা আকর্ষণ। কেজি হিসেবে বিক্রি হওয়া এ মিষ্টির জন্য আগে থেকে অর্ডার দিতে হয় বলে জানানো হয়েছে।
এমন কিছু মিষ্টি আছে, যেগুলো শুধু খাবার নয়, একটি অঞ্চলের স্বাদের পরিচয় হয়ে ওঠে। টাঙ্গাইলের উৎসব সেই স্থানীয় স্বাদের বৈচিত্র্যকে এক জায়গায় দেখার সুযোগ করে দিয়েছে।
এক উৎসবে পুরো টাঙ্গাইল
এভাবেই সাজানো হয়েছে স্টলগুলোউৎসবটির উল্লেখযোগ্য দিক ছিল পণ্যের বৈচিত্র্য। ২৩টি স্টলে তুলে ধরা হয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পণ্য। সদর, মির্জাপুর, ঘাটাইল, গোপালপুর, মধুপুর, ভূঞাপুর, কালিহাতী, দেলদুয়ার, বাসাইল, নাগরপুর, সখীপুর ও ধনবাড়ী—১২টি উপজেলার প্রত্যেকেই নিজেদের পরিচিতি নিয়ে অংশ নিয়েছে।
উৎসবে ছিল শতাধিক ধরনের মিষ্টি। স্টলগুলোর নকশায়ও ছিল স্থানীয় পরিচয়ের ছাপ। সংশ্লিষ্ট উপজেলার পরিচিত জমিদারবাড়ির আদলে সাজানো হয়েছিল প্রতিটি স্টল।
ফলে মিষ্টির পাশাপাশি দর্শনার্থীরা টাঙ্গাইলের বিভিন্ন উপজেলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থানীয় পণ্যের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন
টাঙ্গাইলের পরিচয়ের সঙ্গে মিষ্টির পাশাপাশি অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাঁতের শাড়ি।
দেড় থেকে আড়াই শ বছর আগে ধামরাই থেকে টাঙ্গাইলে এসে বসতি গড়েন বসাক সম্প্রদায়ের তাঁতিরা। তাঁদের হাত ধরে টাঙ্গাইল শাড়ির বয়নশিল্পের বিকাশ ঘটে। বর্তমানে টাঙ্গাইল শাড়ি ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্যের মর্যাদা পেয়েছে।
পাতরাইলসহ জেলার আরও ২১ গ্রামে এ শাড়ির বয়নচর্চা ছড়িয়ে রয়েছে। উৎসবেও ছিল টাঙ্গাইল শাড়ির একাধিক স্টল।
মিষ্টির উৎসবে শাড়ির উপস্থিতি তাই জেলার বৃহত্তর পরিচয় তুলে ধরার দিক থেকে যুক্তিসঙ্গত। তবে প্রদর্শিত শাড়ির সবই টাঙ্গাইল শাড়ির বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় যথাযথভাবে বহন করছে কি না, সে বিষয়ে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
মিষ্টির বাইরে স্থানীয় পণ্য
দেলদুয়ারের বাঁশের পণ্যের স্টলটিও ছিল নজরকাড়া। বাঁশের তৈরি বিভিন্ন গৃহসামগ্রী দেখিয়েছে, স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করে কীভাবে প্রয়োজনীয় ও নান্দনিক পণ্য তৈরি করা যায়।
ছিল মধুপুরের হস্তশিল্প এবং টাঙ্গাইলের আনারসও। এসব পণ্যের উপস্থিতি জেলার অর্থনীতি ও স্থানীয় উৎপাদনের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে।
তবে এখানেই উৎসবের একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসে—এটি কি মূলত মিষ্টির উৎসব, নাকি টাঙ্গাইলের স্থানীয় পণ্যের উৎসব?
‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ হওয়ার স্বপ্ন
জেলা প্রশাসক শরীফা হকের বক্তব্যে আয়োজনটির তিনটি লক্ষ্য স্পষ্ট হয়েছে। প্রথমত, ‘ব্র্যান্ড টাঙ্গাইল’ হিসেবে জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও অন্যান্য পণ্যকে বৃহত্তর পরিসরে পরিচিত করা। দ্বিতীয়ত, ঐতিহ্যকে ধারণ করে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। তৃতীয়ত, স্থানীয় পণ্যের প্রসারের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা।
এসব লক্ষ্যের সঙ্গে উৎসবের কাঠামোরও মিল রয়েছে।
একদিকে পুরোনো মিষ্টির রেসিপি, অন্যদিকে নতুন উদ্যোক্তার উদ্যোগ। একদিকে ঐতিহ্যবাহী তাঁত, অন্যদিকে আধুনিক বাজারের জন্য তৈরি পণ্য। এই সমন্বয় স্থানীয় ঐতিহ্যকে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে গবেষণাও জরুরি
জেলা প্রশাসনের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। একটি জেলার পরিচিত পণ্য, জিআই পণ্য ও স্থানীয় ঐতিহ্যকে একই আয়োজনে সামনে আনার মাধ্যমে বৃহত্তর পরিসরে জেলার পরিচিতি তৈরি করা সম্ভব। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানীয় ঐতিহ্যকে পরিচিত করার ক্ষেত্রেও এমন আয়োজন কার্যকর হতে পারে।
তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের আয়োজনকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে প্রয়োজন গবেষণা ও তথ্য যাচাই।
প্রথমত, আয়োজনটির মূল পরিচয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। যদি এটি ‘সুইট ফেস্টিভ্যাল’ হয়, তাহলে মিষ্টিই হওয়া উচিত এর কেন্দ্র। অন্যান্য স্থানীয় পণ্য থাকতে পারে জেলার পরিপূরক পরিচয় হিসেবে, তবে সেগুলোর উপস্থিতি যেন মূল আয়োজনের চরিত্রকে ছাপিয়ে না যায়।
দ্বিতীয়ত, ‘চিনির দানায় লেখা ঐতিহ্যের গল্প’ স্লোগানটিও পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, মিষ্টির গল্প শুধু চিনির নয়। দুধ, ছানা, কারিগরি, রেসিপি, সময় ও স্থানীয় উপকরণ—সব মিলেই একটি মিষ্টির নিজস্ব পরিচয় তৈরি হয়। ফলে মিষ্টির ঐতিহ্যকে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরতে স্লোগানে সেই বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হতে পারে।
টাঙ্গাইল শাড়ির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। টাঙ্গাইল শাড়ির স্টলে টাঙ্গাইল শাড়ির পাশাপাশি অন্য ধরনের শাড়ির উপস্থিতি থাকলে আয়োজনটির ঐতিহ্যভিত্তিক পরিচয় কিছুটা দুর্বল হয়। কোনটি টাঙ্গাইল শাড়ি এবং কোনটি নয়, সেই পার্থক্যও দর্শনার্থীদের কাছে স্পষ্ট থাকা জরুরি।
টাঙ্গাইল উৎসব হয়ে ওঠার সম্ভাবনা
আয়োজনে আছে সম্ভাবনা, প্রয়োজন যথাযথ ব্র্যান্ডিংসুইট ফেস্টিভ্যাল ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হয়তো এখানেই যে এটি একটি জেলাকে তার স্থানীয় পণ্যের মধ্য দিয়ে নতুন করে দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
চমচম, সন্দেশ, রসমালাই কিংবা রাজভোগের স্বাদ যেমন টাঙ্গাইলের খাদ্যের ঐতিহ্যের কথা বলে, তেমনি তাঁতের শাড়ি, বাঁশের পণ্য, হস্তশিল্প ও আনারস বলে জেলার কারুশিল্প ও কৃষির গল্প।
তবে ভবিষ্যতে যদি মিষ্টিকে উৎসবের কেন্দ্রীয় পরিচয় হিসেবে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, প্রতিটি পণ্যের পরিচয় ও ইতিহাস গবেষণাভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা যায় এবং প্রদর্শিত পণ্যের ক্ষেত্রে আরও কঠোর মানদণ্ড রাখা হয়, তাহলে আয়োজনটি আরও স্বতন্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
তখন এটি শুধু সুইট ফেস্টিভ্যাল থাকবে না; টাঙ্গাইলের নিজস্ব স্বাদ, কারুশিল্প ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
এমন একটি উদ্যোগ নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, গবেষণা এবং আরও নিখুঁত পরিকল্পনা। তাহলেই ভবিষ্যতের আয়োজন সত্যিকার অর্থেই হয়ে উঠতে পারে—টাঙ্গাইলের উৎসব।
ছবি: হাল ফ্যাশন