কোন ধরনের মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়

· Prothom Alo

একসঙ্গে সন্ধ্যায় সমুদ্রের পাড়ে আড্ডা দিতে গেলে, ক্যাম্পিং করতে গেলে কিংবা নতুন কোনো পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে গেলে একটি বিষয় প্রায়ই চোখে পড়ে। একই জায়গায় বসে থাকা সবার মধ্যে কাউকে হয়তো মশা বেশ কয়েকবার কামড়াচ্ছে, অথচ পাশের মানুষটির গায়ে মশা যেন বসছেই না।

এমন বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—মশারা কেন নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায়?

Visit forestarrow.help for more information.

কোন রক্তের গ্রুপ মশার বেশি পছন্দ
সমাজে একটি প্রচলিত কথা আছে—যাদের রক্ত মিষ্টি মশা নাকি তাঁদের বেশি কামড়ায়। তবে ‘মিষ্টি রক্ত’ বলে মশার কাছে মানুষের রক্ত বেশি আকর্ষণীয় হওয়ার বৈজ্ঞানিক কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

তবে রক্তের গ্রুপের সঙ্গে মশার আকর্ষণের কিছুটা সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশা ‘এ’ গ্রুপের তুলনায় ‘ও’ গ্রুপের মানুষের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হতে পারে। ‘বি’ গ্রুপের মানুষের ক্ষেত্রে আকর্ষণ মাঝামাঝি পর্যায়ে থাকতে পারে। তবে রক্তের গ্রুপই মশার মানুষ বেছে নেওয়ার একমাত্র কারণ নয়। মশার প্রজাতিভেদে তাদের পছন্দ ও আচরণও ভিন্ন হতে পারে।

একটি গবেষণায় এডিস অ্যালবোপিকটাস মশার ‘ও’ ও ‘এ’ গ্রুপের মানুষের প্রতি আকর্ষণের প্রবণতা তুলনা করা হয়েছিল। সেখানে ‘ও’ গ্রুপের মানুষের প্রতি মশার আকর্ষণ ‘এ’ গ্রুপের তুলনায় প্রায় এক দশমিক আট গুণ বেশি ছিল। তবে এই ফলাফলকে সব প্রজাতির মশার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য মনে করার সুযোগ নেই।

মশারা যেভাবে মানুষকে খুঁজে নেয়
মশা দূর থেকেই মানুষের নিশ্বাসে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড শনাক্ত করতে পারে। মানুষ শ্বাস ছাড়ার সময় যে কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়, তা মশাকে সম্ভাব্য পোষকের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়।

যাঁরা তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন, তাঁদের প্রতি মশার আকর্ষণও বেশি হতে পারে। এ কারণেই গর্ভবতী নারী ও অপেক্ষাকৃত বড় দেহের মানুষের প্রতি কিছু প্রজাতির মশার আকর্ষণ বেশি দেখা যেতে পারে।

তবে শুধু কার্বন ডাই-অক্সাইড নয়, মানুষকে খুঁজে বের করার সময় মশা শরীরের গন্ধ, তাপ, আর্দ্রতা এবং ত্বক থেকে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিক সংকেতও ব্যবহার করে। অর্থাৎ মশার কাছে একজন মানুষ কতটা আকর্ষণীয় হবে, তা একাধিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
মানুষের ত্বক ও ঘাম থেকে নির্গত ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া এবং বিভিন্ন উদ্বায়ী রাসায়নিকও মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। যাঁরা বেশি ঘামেন, তাঁদের শরীর থেকে এসব রাসায়নিকের পরিমাণ ও গন্ধের ধরন ভিন্ন হতে পারে। একইভাবে শরীরের তাপমাত্রাও মশার কাছে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।

ত্বকের স্বাভাবিক ব্যাকটেরিয়াগুলোও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষের ত্বকে থাকা অণুজীব ঘাম ও ত্বকের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে নানা ধরনের গন্ধ তৈরি করে। এসব গন্ধের পার্থক্যের কারণেও একজন মানুষ অন্যজনের তুলনায় মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারেন।

শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের সময় শরীরের বিপাকক্রিয়া বেড়ে যায়। এতে শরীরের তাপমাত্রা ও ঘামের পরিমাণ বাড়তে পারে এবং কিছু রাসায়নিক সংকেতও বেশি নির্গত হয়। ফলে ব্যায়াম বা বেশি শারীরিক কর্মকাণ্ডের পর কিছু মানুষের প্রতি মশার আকর্ষণ বাড়তে পারে।

মশা কেন মানুষের রক্ত খায়
সবাই জানি, মশা মানুষের রক্ত খায়। তবে শুধু মানুষ নয়, বিভিন্ন প্রাণীর রক্তও মশার খাদ্যের অংশ হতে পারে। সন্ধ্যা হলেই কানের কাছে ভনভন শব্দ তুলে মশারা আমাদের বিরক্ত করে। সেই বিরক্তি থেকে বাঁচতেই প্রতিদিন মশারি টাঙানো কিংবা মশা তাড়ানোর নানা ব্যবস্থা করতে হয়।

তবে একটি প্রচলিত ধারণা আছে, মশা বেঁচে থাকার জন্য মানুষের রক্ত পান করে। বিষয়টি পুরোপুরি ঠিক নয়।
সাধারণত স্ত্রী মশা ডিম উৎপাদনের জন্য রক্ত পান করে। রক্তে থাকা প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান ডিমের বিকাশে প্রয়োজন হয়। তবে স্ত্রী মশারাও শুধু রক্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। তারাও ফুলের মধু ও উদ্ভিদের রস থেকে শক্তি সংগ্রহ করে। অন্যদিকে পুরুষ মশা সাধারণত রক্ত পান করে না; তারা প্রধানত ফুলের মধু ও উদ্ভিদের রস খেয়ে বেঁচে থাকে।

স্ত্রী মশার মুখের সামনে সুচের মতো একটি অঙ্গ থাকে, যাকে প্রোবোসিস বা শুঁড় বলা হয়। এর সাহায্যে তারা ত্বক ভেদ করে রক্ত শোষণ করে।

তবে সব মশার খাদ্যাভ্যাস এক নয়। প্রজাতিভেদে তাদের পছন্দের পোষকও আলাদা হতে পারে। যেমন ইউরানোটি–নিয়া স্যাফিরিনা প্রজাতির স্ত্রী মশা প্রধানত কেঁচো ও জোঁকের মতো অ্যানেলিডের রক্ত খাওয়ার জন্য পরিচিত। ফলে মানুষের রক্তের ওপর নির্ভরশীল মশার মতো তাদের আচরণ নয়।

ট্রান্সহিউম্যানিজম: মানুষ কি নিজেকেই নতুন করে তৈরি করতে যাচ্ছে

পানির অভাবেও কি মশার রক্তপানের প্রবণতা বাড়ে
মশার রক্তপানের সঙ্গে শুধু প্রজননের সম্পর্ক নেই, কিছু পরিস্থিতিতে তাদের শরীরের পানির ভারসাম্যের সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শ না পাওয়া বা শুষ্ক পরিবেশে থাকা কিছু মশার ক্ষেত্রে রক্তপানের প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে। রক্তে থাকা তরল তাদের শরীরের পানির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে এইডিজ ইজিপ্টাই ও কিউলেক্স পাইপিয়েন্সের মতো প্রজাতির ওপর পরিচালিত গবেষণায় পানিশূন্যতার সঙ্গে রক্তপানের প্রবণতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

তবে এটিকে সব প্রজাতির মশার ক্ষেত্রে একই নিয়ম হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। মশার খাদ্যাভ্যাস, পোষক নির্বাচন ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা প্রজাতিভেদে ভিন্ন। অর্থাৎ মশা কেন একজন মানুষকে অন্যজনের তুলনায় বেশি কামড়ায়, এর একক কোনো উত্তর নেই। রক্তের গ্রুপ, নিশ্বাস থেকে বের হওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইড, শরীরের তাপমাত্রা, ঘাম, ত্বকের গন্ধ, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং মশার নিজস্ব প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই আকর্ষণের পার্থক্য।

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাব

Read full story at source