সরকারি সংস্থার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
· Prothom Alo

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণে ১০ শ্রমিকের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনাটি শুধুই কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলা ও তদারকি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার ফল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, শিল্প মন্ত্রণালয়ের গঠন করা ১১ সদস্যের তদন্ত কমিটি মালিকপক্ষের গাফিলতি খুঁজে পেলেও সরকারি সংস্থাগুলোর অবহেলা ও দায়বদ্ধতাকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি একতরফা তদন্তের মাধ্যমে মূল তদারককারীদের আড়াল করার অপচেষ্টা নয়?
‘দ্য শিপব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং রুলস-২০১১’ অনুযায়ী, কোনো জাহাজ কাটার বা ভাঙার আগে বিস্ফোরক অধিদপ্তর কর্তৃক ‘সেফ ফর ম্যান এন্ট্রি’ (শ্রমিক প্রবেশের জন্য নিরাপদ) এবং ‘গ্যাস ফ্রি ফর হট ওয়ার্ক’ (ভাঙার জন্য নিরাপদ)—এই দুটি বাধ্যতামূলক সনদ দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জাহাজের ৩ নম্বর ব্যালাস্ট ওয়াটার ট্যাংক পরিদর্শন ছাড়াই এ দুটি বিপজ্জনক ছাড়পত্র দিয়েছিলেন! দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তার এমন অজুহাত—‘তরলপূর্ণ ট্যাংক পরীক্ষা করা সম্ভব নয়’, এটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি ট্যাংক পরীক্ষা করাই না যায়, তবে কিসের ভিত্তিতে এবং কার স্বার্থে জাহাজটি ভাঙার চূড়ান্ত সনদ দেওয়া হলো?
Visit sportnewz.click for more information.
একইভাবে বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডও তাদের দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আইন অনুযায়ী, জাহাজ ক্ষতিকর ও বিষাক্ত বর্জ্যমুক্ত কি না এবং ইয়ার্ডে কর্মরত শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে এই বোর্ডের। অথচ তদন্তেই উঠে এসেছে ওই দিন নিহত শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত। সরকারি এই সংস্থাগুলো যদি সঠিক সময়ে তাদের তদারকি নিশ্চিত করত, তবে আজ ১০টি পরিবারকে এভাবে প্রিয়জন হারানোর শোক বইতে হতো না।
অন্যদিকে ইয়ার্ডমালিকের অপকর্ম ও নিরাপত্তার চরম ঘাটতিও প্রকাশ পেয়েছে তদন্তে। ছুটির দিনে কোনো সেফটি ম্যানেজার, ডাক্তার, অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি উদ্ধারকারী দল ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শ্রমিকদের নামানো হয়েছিল। ট্যাংকে ছিদ্র করার মতো বিপজ্জনক কাজের সময় শ্রমিকদের একটি প্রাথমিক গ্যাস মাস্ক পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। উপরন্তু দুর্ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরকে সময়মতো না জানিয়ে তথ্য গোপনের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান যথার্থই বলেছেন—দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা ও ইয়ার্ডমালিকের দায় নির্ধারণ না করা হলে যেকোনো তদন্ত প্রতিবেদন কেবল আরেকটি কাগজে পরিণত হবে। এসব অকালমৃত্যু নিছক অবহেলাজনিত দুর্ঘটনা নয়, বরং এগুলো একপ্রকার অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড।
জাহাজাভাঙা শিল্পের সাফল্য নিয়ে যতটা প্রচার হয়, এর প্রতিটি ধাপে অবহেলা, অনিয়ম ও কাগজের জালিয়াতির বিষয়টি ততটা প্রকাশ পায় না। এর সঙ্গে যুক্ত অনেকগুলো সরকারি কর্তৃপক্ষ। এ শিল্পের মালিকপক্ষের সঙ্গে এসব কর্তৃপক্ষের অসাধু কর্মকর্তাদের একধরনের স্বার্থগত সম্পর্ক গড়ে ওঠার অভিযোগও আছে। এই পুরো অব্যবস্থাপনার বলি হচ্ছেন গরিব শ্রমিকেরা। কিন্তু এসব প্রাণহানি থেকে যখন সরকারি কর্তৃপক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তা আরও বেশি শ্রমিকের মৃত্যুর আশঙ্কাই তৈরি করে।
তদন্ত প্রতিবেদন সাত-আট পৃষ্ঠায় দীর্ঘ করে তাতে সরকারি সংস্থার দায়কে কৌশলে আড়াল করার চেষ্টা বন্ধ করতে হবে। সীতাকুণ্ডের এই ট্র্যাজেডির নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হলে শুধু ইয়ার্ডমালিকের বিচারেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং যাচাই-বাছাই ছাড়া ভুয়া ছাড়পত্র প্রদানকারী বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শক এবং দায়িত্বে অবহেলাকারী শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় একের পর এক তদন্ত কমিটি গঠিত হবে, কাগজ জমা পড়বে, কিন্তু সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে শ্রমিকদের অকালমৃত্যুর মিছিল কখনোই থামবে না।