পদ্মাপাড়ের বটতলায় প্রতিদিন ভোরে টাটকা মাছের হাট

· Prothom Alo

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারদিকে আবছা অন্ধকার। তখন থেকেই শুরু হয় রাতভর পদ্মা নদীতে মাছ ধরা জেলেদের তীরে ফেরার অপেক্ষা। পাড়ের বটগাছের নিচে জড়ো হন মাছের ক্রেতা–বিক্রেতারা। একেকটি নৌকা পাড়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় মাছ নামানো, দাম হাঁকা, দর-কষাকষির ব্যস্ততা। মুহূর্তেই জমে ওঠে নদীর পাড়ের ছোট্ট হাট।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সাহাপুর গ্রামের নগরপাড়া এলাকায় পদ্মা নদীর পাড়ের বটতলায় প্রতিদিন বসে এই মাছের হাট। ভোর থেকে সকাল আটটা–নয়টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। স্থানীয় লোকজনের কাছে এটি শুধু মাছের বাজার নয়, ভোরের পদ্মাপাড়ের প্রতিদিনের এক চেনা দৃশ্য। এখানে পদ্মার পিউলি, বেলে, বোয়াল, আইড়, চিতল, পুঁটি, পাঙাশ, রুই ও কাতলাসহ ছোট-বড় নানা মাছ পাওয়া যায়।

Visit biznow.biz for more information.

প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে মাছের হাট বসে বলে জানান স্থানীয় মাছ বিক্রেতা মো. ওয়াজ আলী। তিনি বলেন, রাজশাহী শহরের পাশাপাশি পবা ও পুঠিয়া উপজেলা থেকেও মানুষ মাছ কিনতে আসেন।

বিক্রির জন্য পাত্রে রাখা হয়েছে কয়েক জাতের মাছ। শুক্রবার সকালে চারঘাট উপজেলার সাহাপুর নগরপাড়া বটতলা এলাকায়

এক সকালে মাছের হাট

শুক্রবার সকাল পৌনে ছয়টার দিকে নগরপাড়া বটতলায় গিয়ে দেখা যায়, মাছ বিক্রেতা ও ক্রেতাদের ভিড়। নদীতীরে কোনো নৌকা ভিড়লেই মাছ কেনার জন্য সবাই এগিয়ে যাচ্ছেন। জেলেরা কখনো সরাসরি ক্রেতার কাছে মাছ বিক্রি করেন। আবার অনেক সময় পাড়ে অপেক্ষায় থাকা মাছ ব্যবসায়ীদের কাছে মাছ তুলে দেন। সকালে হাঁটতে এসে অনেকেই টাটকা মাছ কিনে ফিরছেন বাড়িতে।

মাছ বিক্রির দৃশ্যও বেশ বৈচিত্র্যময়। কেউ কর্কশিটের বাক্সে মাছ সাজিয়ে বসেছেন, কেউ ব্যবহার করছেন বাড়ির পাতিল বা বাটি। কারও সামনে পলিথিন। কেউ দাঁড়িপাল্লায় মেপে মাছ বিক্রি করছেন, আবার কেউ পাত্র বা ঢাকনাসহ মাছের দাম ঠিক করছেন।

মাছ বিক্রেতা মো. নাজমুল শাহ বলেন, তাঁরা জেলেদের কাছ থেকেই মাছ কিনে বিক্রি করেন। এখানে কেজি ও ‘ঠিকায়’—দুইভাবেই মাছ বিক্রি হয়। মাছের ধরন অনুযায়ী দামেরও পার্থক্য রয়েছে। কোনো মাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি, আবার কোনো মাছ বিক্রি হয় ৭০০, ৮০০ কিংবা ১ হাজার টাকা কেজিতে। বড় মাছ হলে দাম আরও বেশি।

নদী থেকে আনা মাছ পাত্রে ঢালা হচ্ছে। শুক্রবার সকালে চারঘাট উপজেলার সাহাপুর নগরপাড়া বটতলা এলাকায়

মাছ কমেছে, বেড়েছে দাম

জেলে মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ফজরের আজানের সময় তাঁরা নদীতে যান। মাছ ধরার পর হাটে ফিরতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। ১৫–১৬ বছর ধরে মাছ ধরার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে পিউলি মাছ ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এখন এর দাম ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা। বেলে মাছও বিক্রি হয় ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা কেজিতে। মাছের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু মাছ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ছোটবেলা থেকেই মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত আবদুল্লাহ আল আউয়াল। তিনি বলেন, একসময় পদ্মায় রুই, বাগাড়, পাঙাশ, ইলিশ, বেলে ও কাতলাসহ বিভিন্ন মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এখন কম পাওয়া যায়। তবু জীবিকার টানে নদীতে নামতে হয়। মাছ কিনে এনে বিক্রি করে কোনো দিন তাঁর এক হাজার টাকা লাভ হয়। কোনো দিন ১০০, ২০০ কিংবা ৫০০ টাকা লাভ হয়। আবার কোনো কোনো দিন লোকসানও গুনতে হয়।

পদ্মায় মাছের পরিমাণ অনেকটাই নির্ভর করে পানির ওঠানামার ওপর—এমনটাই বললেন জেলে মো. আজাদ। তাঁর ভাষ্য, কখনো পানি কমার সময় বেশি মাছ পাওয়া যায়, আবার কখনো পানি বাড়লেও মাছ বাড়ে। মাছ ধরার জন্য কখনো কখনো দীর্ঘ সময় নদীতেই থাকতে হয় তাঁদের।

এক মাছ বিক্রেতা ক্রেতাদের মাছ দেখাচ্ছেন। শুক্রবার সকালে চারঘাট উপজেলার সাহাপুর নগরপাড়া বটতলা এলাকায়

আজাদ বলেন, সকাল ১০টা বা ১১টার দিকে নৌকা নিয়ে নদীতে যাওয়ার পর অনেক সময় রাত কাটে সেখানেই। পরদিন সকালে জাল তুলে মাছ নিয়ে হাটে ফেরেন তাঁরা। জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল ব্যবহার করেন। বড় মাছ ধরার সময় পাঙাশ, বাগাড় ও আইড়ের মতো মাছও জালে ওঠে।

এই হাটের অন্যতম আকর্ষণ জেলেদের কাছ থেকে সরাসরি মাছ কেনার সুযোগ। বাজারে আসা ক্রেতা মো. কামরুজ্জামান বলেন, জেলেরা নদী থেকে মাছ ধরে সরাসরি এখানে নিয়ে আসেন। তাই মাছ টাটকা থাকে। নদীর মাছ প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠায় এর স্বাদও ভালো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী মাহমুদ বাদশা শুক্রবার ভোরে এই হাটে এসেছিলেন পিউলি মাছ কিনতে। তবে ওই মাছ বেশি না পাওয়ায় তিনি মিশ্র ধরনের নদীর মাছ কেনেন। কেনা মাছ দেখিয়ে তিনি বলেন, বিক্রেতা প্রথমে ৮০০ টাকা দাম চেয়েছিলেন। দর-কষাকষির পর ৫০০ টাকায় কিনেছেন।

বিভিন্ন জাতের পোনামাছও বিক্রি হয়। শুক্রবার সকালে চারঘাট উপজেলার সাহাপুর নগরপাড়া বটতলা এলাকায়

পোনামাছও বিক্রি হয়

শুধু খাওয়ার মাছ নয়, এই হাটে পুকুরে চাষের জন্য নদীর মাছের পোনাও বিক্রি হয়। মাছ ব্যবসায়ী মো. বাবু আলীর ভাষ্য, জেলেরা ছোট ছোট আইড়, কাতলা, বোয়াল, চিতল ও রুইয়ের পোনা নিয়ে আসেন। পরে সেগুলো এক জায়গায় করে পুকুরমালিকদের কাছে বিক্রি করা হয়। প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর ধরে এই এলাকায় নদীর মাছের পোনা বিক্রি হচ্ছে।

জেলে নাদের আলীর কথায়, ‘আমাদের জীবন অনেক কষ্টের। মাছ কম পাই। কিন্তু মাছ ধরা একটা নেশা।’

সকাল আটটার পর ধীরে ধীরে কমতে থাকে হাটের কোলাহল। ক্রেতাদের হাতে মাছভর্তি ব্যাগ। বিক্রি শেষ করে কেউ বাড়ির পথে হাঁটছেন, জেলেরা একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের বিশ্রামের সময় খুব বেশি নয়। কিছুক্ষণ পরই আবার তাঁদের ফিরতে হবে পদ্মায়।

Read full story at source