লোকালয়ে ভালুকের উপদ্রব ঠেকানোর জাপানি উপায়

· Prothom Alo

জাপানে ভালুকের আক্রমণের ঘটনা স্মরণকালের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ভালুকের হামলায় ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আর ২২০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। অথচ আগের বছরের একই সময়ে নিহত মানুষের সংখ্যা ছিল ৩ জন ও আহত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮২ জন। শরৎকালে ভালুকদের খাবার খোঁজার তৎপরতা অনেক বেড়ে যায়। তাই পরিস্থিতি নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।

Visit orlando-books.blog for more information.

মানুষের লোকালয়ে ভালুক চলে আসার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর লাখ লাখ তরুণ চাকরির খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যেতে শুরু করায় গ্রামীণ জনবসতি ছোট হতে থাকে। জাপানের হোনশু দ্বীপের ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক লিয়াম অ্যাডকক। তিনি জানান, অতীতে বসতি ও বনের মধ্যে ফসলি জমিগুলো ছিল, সেগুলো ভালুকের জন্য দেয়াল হিসেবে কাজ করত। এখন সেসব জমি না থাকায় শহর ও বনের মধ্যকার সীমানা ভালুকদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

এ ছাড়া বন্য প্রাণী শিকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি ও শিকারির সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণে জাপানে ভালুকের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশটির হোক্কাইদো বাদামি ভালুক ও এশীয় কালো ভালুক প্রজাতির মোট সংখ্যা ৫৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়।

দুই সপ্তাহে ১৪ বার চুরি, জাপানে পলাতক ভালুক খুঁজছে পুলিশ

আবাসিক এলাকা থেকে ভালুক দূর করতে প্রায় আতশবাজি ফোটানো হয়। তাতে কাজ না হলে পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ বা সেনাবাহিনী ডাকা হয়। বিশেষ করে দিনের বেলায় চারপাশে মানুষ থাকলে নিরাপত্তার স্বার্থে এসব ভালুককে মেরে ফেলা ছাড়া উপায় থাকে না। তবে বিজ্ঞানী লিয়াম অ্যাডকক মনে করেন, প্রযুক্তি ও অহিংস উপায়েও মানুষ ও ভালুকের সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব।

জাপানের গুনমা, তোয়ামা ও ইশিকাওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর পাশের বনে গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত এই ক্যামেরাগুলো ভালুক চিহ্নিত করার সঙ্গে সঙ্গেই স্থানীয় কর্মকর্তাদের বার্তা পাঠায়। হোকুরিকু ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি ও হোকুৎসু সংস্থার তৈরি করা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষ আগেভাগেই স্থানীয়দের সতর্ক করছে ও ভালুককে বনের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছে।

হোক্কাইদোর শিনতোৎসুকাওয়া শহরে কেডিডিআই স্মার্টড্রোন একটি বিশেষ ড্রোন পোর্ট তৈরি করেছে। লোকালয়ে ভালুক দেখার ১০ মিনিটের মধ্যে ড্রোন উড়িয়ে উদ্ধারকারী দল না আসা পর্যন্ত প্রাণীটিকে নজরে রাখা হয়। এভাবে হিংস্র উপায় না নিয়ে প্রযুক্তির মাধ্যমে ভালুক তাড়ানোকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা এই এআই ও ড্রোন প্রযুক্তি ভালুক চিহ্নিত করতে ও এদের দূরে রাখতে দারুণ কার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানায় ২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রে ড্রোন সফলভাবে ভালুককে লোকালয় থেকে বনে ফিরিয়ে দিয়েছে।

ভালুক কি আসলেই শীতনিদ্রায় যায়

নিজের জমি বা খামার থেকে ভালুক তাড়াতে ড্রোন বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বেশ ব্যয়বহুল। এই সমস্যার সমাধানে বাজারে আনা হয়েছে ৪ হাজার ডলার মূল্যের সৌরশক্তিচালিত রোবট ‘মনস্টার উলফ’। এটি বিলুপ্ত জাপানি নেকড়ের ডাক অনুকরণ করে ভালুককে ভয় দেখিয়ে ফসল রক্ষা করে। রোবটটি বিপণনকারী সংস্থা ‘উলফ কামুই কোং’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোটোহিরো মিয়াসাকা। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে শহরাঞ্চলে ভালুকের উপদ্রব বাড়ায় এর বিক্রি দ্বিগুণ হয়েছে। এমনকি ভ্রমণকারী ও ক্যাম্পিংপ্রেমীদের জন্য ২০২৬ সালের শেষের দিকে ‘মনস্টার উলফ মিনি’ নামের একটি বহনযোগ্য ছোট সংস্করণ পরীক্ষা করে দেখা হবে।

১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৩১টি ভালুক দেখার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে

তবে প্রকৌশলী ড্যানিয়েল কোকার মতে, এই রোবট বা ড্রোনগুলোর উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক বেশি। আর এগুলো দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া সহজ নয়। জাপানে বিভিন্ন স্থানে ভালুক দেখার প্রচুর ডেটা ছিল, তবে সেগুলো পিডিএফ, খবর বা স্থানীয় মানচিত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে ঝুঁকি বোঝা কঠিন ছিল। এ সমস্যা মেটাতে তিনি ‘কুমাম্যাপ’ নামে একটি অ্যাপ চালু করেন। এটা সারা দেশের ভালুক–সংক্রান্ত তথ্য একত্র করে মানচিত্রে দেখায়। আগস্টের শুরু পর্যন্ত প্রায় ৬০ লাখ মানুষ অ্যাপটি ব্যবহার করেছেন। এতে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৩১টি ভালুক দেখার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ফলে মানুষ বাইরে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে পারছে।

প্রযুক্তির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী অহিংস পদ্ধতিও দারুণ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পিকিও ওয়াইল্ডলাইফ রিসার্চ সেন্টারের লিয়াম অ্যাডকক জানান, তারা ফিনল্যান্ডের ‘কারেলিয়ান বেয়ার ডগ’ জাতের কুকুর ব্যবহার করে ভালুক তাড়াচ্ছেন। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুরগুলো ভালুকের কোনো ক্ষতি না করে ঘেউ ঘেউ করে এবং তাড়া করে লোকালয় থেকে দূরে পাঠিয়ে দেয়। যে শহরগুলোতে এই কুকুরগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে ভালুকের আক্রমণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

সূত্র: সিএনএনসুপারশপে ঢুকে পড়ল একটি কালো ভালুক, তারপর যা হলো

Read full story at source