সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ ভিয়েতনাম: পর্ব–১
· Prothom Alo

ভ্রমণ নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে পারে। সাধ্যের মধ্যে এশিয়ার কিছু ভ্রমণ গন্তব্য অনন্য অভিজ্ঞতা দিতে পারে। পাহাড়, সমুদ্র আর ঐতিহাসিক নিদর্শনের অপূর্ব সমন্বয় ভিয়েতনাম। নিরাপদ ও সুন্দর এই দেশ অনেক জনপ্রিয় দর্শনীয় স্থান দ্বারা সমৃদ্ধ। ফ্যাক্টরি পরিদর্শন, করপোরেট প্রশিক্ষণ ও বৈশ্বিক টেক্সটাইল সরবরাহ শৃঙ্খলের বাজার যাচাইয়ের অংশ হিসেবে আমি ভিয়েতনাম সফর করি ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। সফরটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও ভিয়েতনামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার এক অপূর্ব সমন্বয়।
ভিয়েতনাম সম্পর্কে কিছু তথ্য
Visit turconews.click for more information.
ভিয়েতনাম দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার একটি দ্রুত উন্নয়নশীল ও ঐতিহাসিক দিক থেকে সমৃদ্ধ দেশ। এর সরকারি নাম ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। রাজধানী হ্যানয় ও বৃহত্তম শহর হো চি মিন সিটি (সাবেক সায়গন)। মুদ্রা হলো ভিয়েতনামি ডং।
ভিয়েতনামে পূর্বপুরুষদের পূজা অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। প্রতিটি বাড়ি ও দোকানে পূর্বপুরুষদের স্মরণে ছোট বেদি থাকে।
অর্থনীতি ও সংস্কৃতি
ভিয়েতনামের অর্থনীতি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদন ও প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে ইলেকট্রনিকস, পোশাক, কফি ও চাল অন্যতম। এখানকার সংস্কৃতি কনফুসীয়বাদ, বৌদ্ধধর্ম ও ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের মিশ্রণে গঠিত।
বহু জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান
ভিয়েতনামে সরকারিভাবে ৫৪টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠী স্বীকৃত।
• কিন বা ভিয়েত: এরা দেশের মূল জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৬ শতাংশ এবং মূলত সমতল ভূমি ও শহর অঞ্চলে বাস করে।
• পার্বত্য উপজাতি: বাকি ১৪ শতাংশ মানুষ হমং, তাই, থাই, দাও ও চ্যামের মতো বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তারা উত্তর ভিয়েতনামের সাপা ও মধ্য পার্বত্য অঞ্চলে বসবাস করে। প্রতিটি গোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, পোশাকের নকশা, ঘর তৈরির শৈলী ও অনন্য উৎসব রয়েছে।
ধর্ম ও দর্শনের ত্রিমুখী মিলন
ভিয়েতনামের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতি মূলত ‘তাম জিয়াও’ বা ত্রিমুখী দর্শন দ্বারা পরিচালিত, যা তিনটি প্রধান ধারাকে একত্র করেছে।
• কনফুসীয়বাদ: যা পরিবার, সমাজ ও গুরুজনদের প্রতি ভক্তি ও শৃঙ্খলা শেখায়।
• বৌদ্ধধর্ম: যা মানুষের আধ্যাত্মিক শান্তি ও দয়ার চর্চা করার ওপর জোর দেয়।
• তাওবাদ: যা প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার শিক্ষা দেয়।
এ ছাড়া ভিয়েতনামে পূর্বপুরুষদের পূজা অত্যন্ত পবিত্র বলে বিবেচিত হয়। প্রতিটি বাড়ি ও দোকানে পূর্বপুরুষদের স্মরণে ছোট বেদি থাকে।
পোশাকের বৈচিত্র্য
আও জাই: ভিয়েতনামের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘আও জাই’ দেশটির সংস্কৃতির এক উল্লেখযোগ্য প্রতীক। এটি একটি লম্বা সিল্কের টিউনিক বা কুর্তা, যা ঢিলেঢালা প্যান্টের ওপর পরা হয়। ঐতিহাসিকভাবে নারী-পুরুষ এটি পরলেও বর্তমানে মূলত নারীরাই এটি বেশি পরিধান করে। বিয়ে, উৎসব (যেমন: তেত) এবং স্কুল ইউনিফর্ম হিসেবে এর ব্যবহার ভিয়েতনামি সংস্কৃতির পরিশীলিত রূপকে তুলে ধরে। এ ছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের নারীরা হাতে বোনা ও প্রাকৃতিক রঙে রাঙানো বাহারি পোশাক পরেন, যা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
হাং ইয়েনকে ভিয়েতনামের ‘লংগান ফলের রাজধানী’ বলা হয়। এখানকার লংগান ফল (কাঠলিচুর মতো একধরনের ফল) অত্যন্ত সুমিষ্ট, সুগন্ধযুক্ত, পাতলা চামড়া ও ঘন শাঁসের জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকালে এই ফল ভিয়েতনামের রাজপরিবারের রাজাদের উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। তাই একে ‘রাজকীয় ফল’ বলা হয়।
লোকশিল্প ও পরিবেশনা
• ওয়াটার পাপেট্রি: লোহিত নদীর অববাহিকায় এক হাজার বছর আগে উদ্ভূত এই পুতুলনাচ ভিয়েতনামের এক অনন্য লোকশিল্প। ধানখেতের জমে থাকা পানিতে কৃষকেরা এটি পরিবেশন করতেন।
• ঐতিহ্যবাহী সংগীত: ভিয়েতনামের রাজকীয় সংগীত ‘নহা নক’ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় লোকসংগীত ‘কাই লুওং’ ইউনেসকো কর্তৃক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
রন্ধনশৈলী বা খাবার–সংস্কৃতি: ভিয়েতনামের খাবার তার তাজা উপাদান, ভেষজ পাতার ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকর গুণের জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। ভৌগোলিক ভিন্নতার কারণে খাবারের স্বাদেও বৈচিত্র্য দেখা যায়:
• উত্তর ভিয়েতনাম (হ্যানয়): এখানকার খাবার তুলনামূলকভাবে হালকা এবং নোনতা স্বাদের হয়। বিখ্যাত ‘ফো’ (নুডল স্যুপ) এবং ‘বুন চা’ এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
• মধ্য ভিয়েতনাম (হুয়ে ও দানাং): রাজকীয় ইতিহাসের প্রভাবে এখানকার খাবার বেশ মসলাদার, ঝাল ও নান্দনিকভাবে পরিবেশন করা হয়।
• দক্ষিণ ভিয়েতনাম (হো চি মিন সিটি): কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের কাছাকাছি হওয়ায় এখানকার খাবারে মিষ্টি ও নারকেলের দুধের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
উৎসবের আমেজ
তেত: ভিয়েতনামের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলো ‘তেত নগুয়েন দান’ বা সংক্ষেপে ‘তেত’, যা তাদের চান্দ্র নববর্ষ। এই সময়ে পুরো দেশ রঙিন আলো, পিচ ব্লসম (গোলাপি ফুল) এবং ঐতিহ্যবাহী চালের কেক ‘বান চুং’ দিয়ে সেজে ওঠে। এটি মূলত পরিবার ও আত্মীয়দের সঙ্গে পুনর্মিলনের উৎসব।
গন্তব্য ভিয়েতনামের হাং ইয়েন শহর। ভিয়েতনামের হাং ইয়েন শহরটি মূলত তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, প্রাচীন ঐতিহ্য এবং একটি বিশেষ সুস্বাদু ফলের জন্য বিখ্যাত, পাশাপাশি এখানে আধুনিক শিল্পায়ন ও টেক্সটাইল কারখানা গড়ে উঠেছে।
হাং ইয়েন নিটিং অ্যান্ড ডাইং কোম্পানি লিমিটেড (যা সাধারণত হাং ইয়েন কে অ্যান্ড ডি নামে পরিচিত)। এটি ভিয়েতনামের একটি বিখ্যাত টেক্সটাইল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। সাঁতারের পোশাক, খেলাধুলার পোশাক ও অন্তর্বাসের কাপড়ের জন্য বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠান ইতালির বিখ্যাত কারভিকো গ্রুপের একটি অংশ।
অবস্থান: এটি ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরত্বে অবস্থিত।
উন্নত নিটিং সেকশন: এখানে অত্যাধুনিক ইতালিয়ান প্রযুক্তির ওয়ার্প নিটিং মেশিনারিজ ব্যবহার করা হয়।
আধুনিক ডাইং ল্যাব ও প্ল্যান্ট: কাপড়ের রঙের স্থায়িত্ব ও নিখুঁত শেড নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
ডিজিটাল প্রিন্টিং ইউনিট: পরিবেশবান্ধব ও হাই–ডেফিনিশন ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাপড়ের ওপর নকশা করা হয়।
গ্রিন টেকনোলজি ও রিসাইক্লিং: সমুদ্রের বর্জ্য ও রিসাইকেলড নাইলন থেকে বিশ্বমানের ইকো–ফেব্রিক তৈরির প্রক্রিয়া এখানে দেখা যায়।
হাং ইয়েন শহরে আপনি দেখতে পারেন—
১. ফো হিয়েন ঐতিহাসিক বন্দর
সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে ফো হিয়েন ছিল ভিয়েতনামের অন্যতম প্রধান ও ব্যস্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্দর। সেই সময়ে রাজধানী হ্যানয়ের পরই এর অবস্থান ছিল। এই প্রাচীন বাণিজ্যিক শহরের গৌরবময় ইতিহাস এবং জাপানি, চীনা ও ইউরোপীয় বণিকদের সংস্কৃতির মিশ্রণ হাং ইয়েনকে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]
২. হাং ইয়েন লংগান
হাং ইয়েনকে ভিয়েতনামের ‘লংগান ফলের রাজধানী’ বলা হয়। এখানকার লংগান ফল (কাঠলিচুর মতো একধরনের ফল) অত্যন্ত সুমিষ্ট, সুগন্ধযুক্ত, পাতলা চামড়া ও ঘন শাঁসের জন্য বিখ্যাত। প্রাচীনকালে এই ফল ভিয়েতনামের রাজপরিবারের রাজাদের উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। তাই একে ‘রাজকীয় ফল’ বলা হয়।
৩. প্রাচীন মন্দির ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি
শহরটিতে ভিয়েতনামের প্রাচীন স্থাপত্যের বেশ কিছু অনন্য নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
• বেল টেম্পল: এটি তার শান্ত পরিবেশ ও প্রাচীন স্থাপত্যের জন্য পরিচিত।
• ম্যাও টেম্পল: লোককাহিনির দেবী মায়ের প্রতি উৎসর্গীকৃত একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান।
• ফুক লাম প্যাগোডা: এটি সম্পূর্ণ সোনালি রঙের এক অসাধারণ আধুনিক ও ঐতিহ্যবাহী বৌদ্ধমন্দির, যা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
৪. ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন গ্রাম
হাং ইয়েন প্রদেশের ‘নম প্রাচীন গ্রাম’ ভিয়েতনামের ২০০ বছরের বেশি পুরোনো গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত রূপ। এখানকার পুরোনো ইটের রাস্তা, প্রাচীন ঘরবাড়ি, ঐতিহ্যবাহী পুকুর ও পুরোনো পাথরের ব্রিজ পর্যটকদের আদি ভিয়েতনামের গ্রামীণ পরিবেশের আমেজ দেয়। হ্যানয় থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হওয়ায় শান্ত ও ঐতিহ্যবাহী পরিবেশের খোঁজে বহু পর্যটক হাং ইয়েন শহরে ঘুরতে আসেন।
চলবে...
জিবুতি ভ্রমণ: আফ্রিকার বুকে ছোট ফ্রান্সের অনুভূতি