লাইনে গ্যাস নেই, এলপিজিতে ঝুঁকছে নগরবাসী
· Prothom Alo
ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠেছেন চন্দনা চৌধুরী। রান্না করার জন্যই এত আগে ঘুম থেকে উঠেছেন তিনি। এ সময়ে চুলায় গ্যাসের চাপ থাকে। সে সুযোগেই দিনের রান্না সেরে ফেলা যায়।
আজ শুক্রবার সকালে কথা হয় চট্টগ্রাম নগরের জামালখান এলাকার বাসিন্দা চন্দনা চৌধুরীর সঙ্গে। ভোরে ওঠার এ বিবরণ দিয়ে তিনি জানান, সকাল আটটার পর থেকে গ্যাস নেই তাঁর বাসায়। চন্দনা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাসের এমন সংকটে আগে পড়িনি। কখন গ্যাস আসবে—সেই হিসাব করে চলতে হচ্ছে। ঘুম, খাওয়াদাওয়া—সব এলোমেলো হয়ে গেছে।’
Visit newsbetsport.bond for more information.
বেলা ১১টার দিকে কথা হয় হালিশহরের বাসিন্দা আমেনা বেগমের সঙ্গে। তখন আমেনার চুলায় গ্যাসের চাপ এত কম যে রান্নার কোনো কাজই করা যাচ্ছিল না।
মোহাম্মদ রাসেল হোসাইন, বাসিন্দা, আগ্রাবাদ।সকাল হলেই গ্যাস চলে যায়। তখন বাচ্চাদের স্কুল, আমাদের অফিস—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। কিছুদিন পরপরই চট্টগ্রামে এমন সংকট হয়। তাই বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনলাম।নগরের কাজীর দেউড়ির বিভিন্ন বাসায় গৃহপরিচারিকার কাজ করেন কোহিনূর বেগম। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকায় তাঁর কাজের সময়ও পাল্টে গেছে। সকালে যে বাসায় কাজ করার কথা, সেখানে গ্যাস না থাকলে যেতে হচ্ছে বিকেলে। গ্যাসের চাপ বাড়লেই ফোন আসছে—এখন আসেন। কোহিনূর বলেন, ‘গ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। বিকেলে গ্যাস এলে সবাই তখন কাজে যেতে বলছেন। এতে কাজও জমে যাচ্ছে, পরিশ্রমও বেড়েছে।’
চট্টগ্রামে এলপিজি ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত এক সপ্তাহে সিলিন্ডারের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতি বলছে, স্বাভাবিক সময়ে নগরে দিনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি হলেও এখন তা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।
চট্টগ্রামে টানা গ্যাস-সংকট এভাবেই বদলে দিয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন। কেউ ভোরে উঠে রান্না করছেন। কেউ দিনের কাজ পিছিয়ে দিচ্ছেন। আবার যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা পাইপলাইনের গ্যাসের অপেক্ষা ছেড়ে কিনছেন এলপিজি সিলিন্ডার ও চুলা।
চট্টগ্রামে এলপিজি ব্যবসায়ীদের হিসাবে, গত এক সপ্তাহে সিলিন্ডারের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতি বলছে, স্বাভাবিক সময়ে নগরে দিনে ৪০ থেকে ৫০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রি হলেও এখন তা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।
সমিতির সভাপতি খোরশেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহ আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহে সমস্যা হলেই এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামে। এবার সংকট দীর্ঘ হওয়ায় মানুষের ধৈর্যও ফুরিয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে এলপিজি সিলিন্ডারে ঝুঁকছেন। দোকানে বিক্রি বেড়েছে।’
ছয় হাজার টাকা বাড়তি খরচ
আগ্রাবাদের বাসিন্দা মোহাম্মদ রাসেল হোসাইনের বাসায় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের সংকট। দিনের বেলায় বেশির ভাগ সময় গ্যাস থাকে না। বিশেষ করে সকালে গ্যাস চলে যাওয়ায় সন্তানদের স্কুলে পাঠানো ও নিজেদের অফিসে যাওয়ার সময়ে রান্না নিয়ে বিপাকে পড়ছিলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত দুই দিন আগে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন রাসেল। সঙ্গে কিনতে হয়েছে চুলাও। সব মিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ছয় হাজার টাকা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাসেল বলেন, ‘সকাল হলেই গ্যাস চলে যায়। তখন বাচ্চাদের স্কুল, আমাদের অফিস—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। কিছুদিন পরপরই চট্টগ্রামে এমন সংকট হয়। তাই বাধ্য হয়ে সিলিন্ডার কিনলাম।’
কিন্তু সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন চাপ। রাসেল বলেন, ‘স্বল্প বেতনে চাকরি করি। হঠাৎ ছয় হাজার টাকা বাড়তি খরচ করতে হলো। মাসের শেষে পকেটে টান পড়বে।’
মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ নূরনবীও সম্প্রতি এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছেন। জানালেন, দিনের পর দিন গ্যাসের জন্য অপেক্ষার ঝামেলা থেকে বাঁচতে গতকাল এলপিজি সিলিন্ডার কেনেন তিনি। নূরনবী বলেন, বাড়তি এই খরচ তাঁর খরচে চাপ তৈরি করেছে। কিন্তু নিয়মিত রান্নার জন্য আর কোনো উপায় দেখছিলেন না।
যাঁরা সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না, তাঁদের কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে মাটির চুলায় রান্না করছেন। আবার কোনো কোনো পরিবারকে খাবার কিনতে হচ্ছে হোটেল থেকে।
গাড়ি থেকে এলপিজি সিলিন্ডার নামানো হচ্ছে। নগরের ষোলশহর এলাকায়। গত বুধবার বিকেলেবেড়েছে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি
আতুরার ডিপো এলাকার জানে আলমের দোকানে স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৫০ থেকে ৭০টি এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হতো। গত ১১ আগস্ট বিক্রি হয়েছে ৯০টি। ১২ আগস্ট ৮৬টি এবং ১৩ আগস্ট ৯২টি। স্বাভাবিক সময়ের সর্বোচ্চ ৭০টি বিক্রির সঙ্গে তুলনা করলে গত তিন দিনে তাঁর দোকানে গড়ে বিক্রি বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।
জানে আলম বলেন, নতুন অনেক গ্রাহক এলপিজি কিনছেন। তাঁদের অনেকের বাসায় আগে পাইপলাইনের গ্যাসের চুলা ছিল। ফলে শুধু সিলিন্ডার কিনলেই হচ্ছে না; সঙ্গে এলপিজির উপযোগী চুলাও কিনছেন তাঁরা। এ কারণে চুলার বিক্রিও বেড়েছে।
সিলিন্ডার সরবরাহে সংকট নেই বলে জানালেন নগরের টেকনিক্যাল এলাকার মেসার্স মোহাম্মদিয়া ট্রেডিংয়ের মালিক মুহাম্মদ আলী আজম। ষোলশহরের সোহেল এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার মোহাম্মদ সোহেলও একই কথা জানিয়ে বলেন, চাহিদা বাড়লেও তাঁরা সরকার নির্ধারিত দামেই সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
৩৫ কোটির চাহিদা, মিলছে ১৫ কোটি
মানুষের এই দুর্ভোগের পেছনে রয়েছে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহের বড় ঘাটতি। কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) আজ শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পেয়েছে মাত্র ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অথচ চট্টগ্রামে ন্যূনতম দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের বিপরীতে মিলছে মাত্র ৪৩ শতাংশ গ্যাস। দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ কোটি ঘনফুটে।
গত ২১ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে সরবরাহ ক্রমাগত কমেছে। ওই সময় দৈনিক প্রায় ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল। এরপর তা কখনো ২৩ কোটি, কখনো ২০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। এখন সরবরাহ ঠেকেছে ১৫ কোটি ঘনফুটে। ২১ জুলাইয়ের তুলনায় দৈনিক সরবরাহ কমেছে প্রায় ১৩ কোটি ঘনফুট।
এত কম গ্যাস দিয়ে সব খাতের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে আবাসিকের পাশাপাশি শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও সরবরাহ ও চাপ কমেছে।
কেন সংকট
আমদানি করা এলএনজি রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট এবং সামিটের ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বাসাবাড়ি, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সিএনজি ফিলিং স্টেশনে। এক্সিলারেটের দুটি বয়লারের প্রতিটির সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে অক্ষত বয়লারটি মেরামত শেষে ৬ আগস্ট চালু করা হয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য বয়লারটি চালুর কাজ চলছে।
এর মধ্যে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে সামিটের টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে। গত সোমবার এলএনজিবাহী একটি জাহাজ বঙ্গোপসাগরে এলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেখান থেকে টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তর করা যায়নি। ফলে সোমবার সন্ধ্যা সাতটার পর পেট্রোবাংলার নির্দেশে সামিট গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালুর আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য টার্মিনালটির গ্যাস সরবরাহ টানা ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হবে। তবে সেই কাজ কবে শুরু হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা সূত্র।