গ্রহলোকের সংগীত ও কেপলারের স্বপ্ন

· Prothom Alo

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বিখ্যাত গান আছে—‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ, তেমনি করে গাও গো’। গানটি শুনে মনে হতেই পারে, আকাশের আবার গান হয় নাকি? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীনকালের মানুষের বিশ্বাসে। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিশ্বাস করে আসছে, মহাবিশ্ব এক বিশাল শৃঙ্খলার নাম। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো থেকে শুরু করে জোহানেস কেপলার পর্যন্ত, সবার মতে এই মহাবিশ্ব কেবল গাণিতিক নিয়মেই চলে না; বরং এটি এক অবিনশ্বর সুরের মূর্ছনায় বাঁধা।

এই ধারণাকেই বলা হয় মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ার্স বা গ্রহলোকের সংগীত। সহজভাবে বললে, সৌরজগৎ যেন এক বিরাট অর্কেস্ট্রা, যেখানে সূর্য হলো দলের চালক আর গ্রহগুলো একেকটি বাদ্যযন্ত্র। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ জোহানেস কেপলার তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ হারমোনাইস মুন্ডিতে এই গাণিতিক তত্ত্ব তুলে ধরেন। ১৬১৯ সালে প্রকাশিত এই বইতে তিনি গ্রহগুলোর গতির সঙ্গে সংগীতের স্বরগ্রামের এক অদ্ভুত গাণিতিক সম্পর্ক দেখিয়েছিলেন।

Visit milkshakeslot.online for more information.

জোহানেস কেপলার

এখানেই যেন খুঁজে পাওয়া যায় রবি ঠাকুরের গানের সেই লাইনের প্রাসঙ্গিকতা—‘আজ যেমন করে গাইছে আকাশ’। এই গাণিতিক তত্ত্বের প্রতিধ্বনি আজও সেসব সূত্রে খুঁজে পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে ভয়েজার মিশনকে সফল করা সম্ভব হয়েছে। বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে সুরকার লরি স্পিগেল ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন রজার্স ও উইলি রাফের সহযোগিতায় একটি কম্পিউটারের মাধ্যমে কেপলারের এই ধারণাকে বাস্তবে রূপদান করা হয়েছে। এখানে প্রতিটি কম্পাঙ্ক একেকটি গ্রহকে প্রতিনিধিত্ব করে।

গ্রহের সূত্র এবং কেপলার
গ্রিক দার্শনিক প্লেটো থেকে শুরু করে জোহানেস কেপলার পর্যন্ত, সবার মতেই এই মহাবিশ্ব কেবল গাণিতিক নিয়মেই চলে না; বরং এটি এক অবিনশ্বর সুরের মূর্ছনায় বাঁধা।

চীনা দর্শনে বিশ্বাস করা হতো, মহাবিশ্বের প্রতিটি জিনিসের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বা নিয়ম আছে। একজন মানুষ যখন সঠিক সুর সৃষ্টি করে, তখন সেই সুর কেবল সাধারণ শব্দ থাকে না। সেটি একধরনের আধ্যাত্মিক সেতু তৈরি করে, যা মাটির পৃথিবীতে থাকা মানুষকে মহাজাগতিক সেই শৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। প্রাচীন চীনা গ্রন্থ ইউয়েহ-চি অনুযায়ী, সংগীত হলো মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখার একটি মাধ্যম। আমাদের মনের ভেতরে যে আবেগ থাকে, তা যখন সুরুচিপূর্ণ শব্দে রূপ পায়, তখন তা প্রকৃতিতে মিশে যায়। সেই সুর তখন প্রকৃতির নিজস্ব ছন্দের সঙ্গে এক হয়ে যায়। চীনাদের মতে, এই একীভূত হওয়ার মাধ্যমেই মানুষের আত্মা শান্তি পায় এবং সে অনুভব করে, সে এই বিশাল মহাবিশ্বেরই একটি অংশ।

বুধ গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকায় এর গতি প্রচণ্ড বেশি

সংগীতের মূল ভিত্তি হলো কম্পন। একটি তার যত দ্রুত কাঁপে, তার সুর তত তীক্ষ্ণ বা উঁচুর দিকে যায়। কেপলার ঠিক এই একই নিয়ম গ্রহদের কক্ষপথের গতির ওপর প্রয়োগ করেছিলেন। বুধ গ্রহ সূর্যের সবচেয়ে কাছে থাকায় এর গতি প্রচণ্ড বেশি। তাই বুধের সুর অত্যন্ত তীক্ষ্ণ বা উঁচু, ঠিক যেন একটি ভায়োলিনের সর্বোচ্চ স্বরের মতো। অন্যদিকে বৃহস্পতি ও শনির মতো বিশাল গ্রহগুলো অনেক ধীরগতিতে চলে। তাই এদের সুর বেশ গম্ভীর ও নিচু খাদের, যা অনেকটা বড় ড্রামের শব্দের মতো শোনায়।

পৃথিবী কেন কক্ষপথ থেকে পড়ে যায় না?
সংগীতের মূল ভিত্তি হলো কম্পন। একটি তার যত দ্রুত কাঁপে, তার সুর তত তীক্ষ্ণ বা উঁচুর দিকে যায়। কেপলার ঠিক এই একই নিয়ম গ্রহদের কক্ষপথের গতির ওপর প্রয়োগ করেছিলেন।

কেপলার লক্ষ করেছিলেন, গ্রহগুলো তাদের কক্ষপথে চলার সময় সর্বদা একই গতিতে চলে না। যখন তারা সূর্যের কাছে আসে, তখন গতি বাড়ে আর দূরে গেলে গতি কমে যায়। গ্রহের গতির এই পরিবর্তনকে তিনি সংগীতের স্বরের ওঠানামার সঙ্গে তুলনা করেছেন। যেমন পৃথিবীর গতির পরিবর্তন খুবই সামান্য। কেপলারের মতে, পৃথিবী মাত্র দুটি স্বরের মধ্যে তার গান সীমাবদ্ধ রাখে—মি-ফা-মি। এটি শুনতে অনেকটা দীর্ঘশ্বাসের বা ব্যথার করুণ সুরের মতো শোনায়।

শুক্রের কক্ষপথ প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার, তাই এর গতিতে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নেই। ফলে শুক্র প্রায় একটি স্থির স্বরের মতো বেজে চলে। অন্যান্য গ্রহ, যাদের কক্ষপথ বেশি উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার, তাদের গতিতে দ্রুত ওঠানামা থাকে। ফলে তাদের সুর যেন সংগীতের স্কেল বেয়ে ওঠানামা করে, যেমন—সা-রে-গা-মা-পা।

শুক্রের কক্ষপথ প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকার, তাই এর গতিতে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নেই

সংগীতের এই মহাজাগতিক সুরকে সঙ্গী করে ছুটে চলা মহাকাশযানগুলো কি আদৌ কখনো কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধান পাবে? যদি পায়, তবে তারা কি বুঝতে পারবে পৃথিবীর বার্তা বহন করে আনা এই যানের পেছনের ইতিহাস? জানতে পারবে, ঠিক কতটা বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রামের সর্পিল পথ বেয়ে মানুষ আজ মহাকাশ অভিযানের এই পর্যায়ে পৌঁছেছে? কী আশ্চর্য! ইউক্লিডীয় নিখুঁত বৃত্তের ধারণা ভেঙে উপবৃত্তাকার কক্ষপথের ধারণায় পৌঁছাতে মানুষের সাধারণ জীবনযাপন পর্যন্ত প্রভাবিত হয়েছিল। অথচ ঠিক এর মধ্যেই নিহিত ছিল গ্রহ-গতিবিদ্যার আসল রহস্য। এই রহস্য উন্মোচনের পথ ধরে জোহানেস কেপলারকে পার করতে হয়েছিল ২০টি অত্যন্ত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বছর। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারই আজ মহাকাশযানগুলোকে গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে পৌঁছে দিচ্ছে।

মহাবিশ্বের প্রতিধ্বনি: আমাদের চেতনার কোয়ান্টাম রহস্য
অন্যান্য গ্রহ, যাদের কক্ষপথ বেশি উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার, তাদের গতিতে দ্রুত ওঠানামা থাকে। ফলে তাদের সুর যেন সংগীতের স্কেল বেয়ে ওঠানামা করে, যেমন—সা-রে-গা-মা-পা।

অথচ যে মানুষটি নিজের স্বপ্ন আর যুক্তি দিয়ে চাঁদ থেকে পৃথিবীকে দেখার কল্পনা করেছিলেন, যাঁর চোখে পৃথিবীর পরিচয় ছিল এক ‘নীলাভ সাদা’ গ্রহ হিসেবে, সেই গ্রহ-গতিবিদ্যার জনক কেপলারকে গণিতের রাজকীয় পদ ত্যাগ করতে হয়েছিল।

ডাইনি অপবাদে লোহার গারদে বন্দী নিজের বৃদ্ধ মাকে বাঁচাতে এবং আরও প্রায় ৪০০ নারীকে এমন অন্ধ কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্ত করতে লড়াই করতেই কেটে গিয়েছিল তাঁর জীবনের অনেকটা সময়। এখানেই শেষ নয়, তৎকালীন ইউরোপের বিধ্বংসী ‘ত্রিশ বছরের যুদ্ধ’ থেকে বাঁচতে গিয়ে যাত্রাপথে তিনি হারিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃস্ব ও একাকী অবস্থায় পথেই মরে পড়ে ছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর সমাধিরও কোনো চিহ্ন আজ অবশিষ্ট নেই। মানুষের জীবনটা আসলেই বড় অদ্ভুত—নিজেকে বুঝতে লাগিয়ে দেয় কতটা সময়!

জীবনের শেষ দিনগুলোতে নিঃস্ব ও একাকী অবস্থায় পথেই মরে পড়ে ছিলেন কেপলার

কেপলারের এই ৫০০ বছরের পুরোনো গাণিতিক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান, যাকে বলা হয় ‘সনিফিকেশন’। এটি কোনো সাধারণ গান নয়, বরং গ্রহদের গতির উপাত্ত বা ডেটাকে কম্পিউটারের মাধ্যমে শব্দে রূপান্তর করার একটি প্রক্রিয়া। বেল টেলিফোন ল্যাবরেটরিতে সুরকার লরি স্পিগেল এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন রজার্স ও উইলি রাফ কম্পিউটারের সাহায্যে কেপলারের এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। মহাকাশযান ‘ভয়েজার’-এর গোল্ডেন রেকর্ডের শুরুতে যে ঘূর্ণমান সুরটি শোনা যায়, তা আসলে প্রায় ১০০ বছর ধরে আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর ঘূর্ণন গতির একটি গাণিতিক সুর-সংক্ষেপ।

হৃৎস্পন্দনে এক মহাজাগতিক প্রেমগাথা ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড
ডাইনি অপবাদে গারদে বন্দী নিজের বৃদ্ধ মাকে বাঁচাতে এবং আরও প্রায় ৪০০ নারীকে এমন অন্ধ কুসংস্কারের হাত থেকে মুক্ত করতে লড়াই করতেই কেটে গিয়েছিল কেপলারের জীবনের অনেকটা সময়।

মহাকাশযানে এই সুর পাঠানোর উদ্দেশ্য হলো গণিত মহাবিশ্বের একটি সর্বজনীন ভাষা। যদি সুদূর মহাকাশে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী এই রেকর্ড খুঁজে পায় এবং তারা যদি গণিত বোঝে, তবে এই সুরগুলো শুনেই তারা আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলোর গতির অনুপাত বুঝে ফেলবে। পরিশেষে বলা যায়, মিউজিক অব দ্য স্ফিয়ার্স কেবল কল্পনা নয়, এটি বিজ্ঞান ও শিল্পের এক অপূর্ব মিলনস্থল। কেপলার বিশ্বাস করতেন যে আমাদের কান হয়তো এই শব্দ সরাসরি শুনতে পায় না, কিন্তু আমাদের মন এই মহাজাগতিক গাণিতিক ছন্দ ঠিকই অনুভব করতে পারে। এই সুরগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা এক সুশৃঙ্খল ও সুরেলা মহাবিশ্বের অংশ।

লেখক: বিজ্ঞানবক্তা; সম্পাদক, মহাবৃত্তমানবজাতির শেষ ভরসা কি মহাকাশ অভিযান

Read full story at source