প্রজাপতি কি শুঁয়োপোকার স্মৃতি মনে রাখে, উত্তর খুঁজে পেল ১০ বছরের এক শিশু

· Prothom Alo

জাপানের বেশির ভাগ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা সাধারণত অবসর সময়ে বেসবল খেলে, পোকেমন কার্ড জমায় কিংবা কমিকস পড়ে সময় কাটাতে ভালোবাসে। কিন্তু জাপানের হিয়োগো প্রিফেকচারের কোবে শহরের বাসিন্দা জো নাগাইয়ের আগ্রহটা ছিল একটু ভিন্ন ও বিচিত্র। সে তার অবসর সময়ে নিজের হাতে অতি যত্ন নিয়ে এশীয় সোয়ালোটেইল প্রজাপতি লালনপালন করত। এই প্রজাপতির বৈজ্ঞানিক নাম প্যাপিলিও জুথাস (Papilio xuthus)।

এশীয় সোয়ালোটেইল প্রজাপতির ডানার কিনারায় বেশ উজ্জ্বল কিছু ফোঁটা বা বিন্দু থাকে, যা দেখে এদের সহজেই চেনা যায়। স্থানীয় গাছপালা ও ফুলগাছের পরাগায়নেও এদের বড় ভূমিকা রয়েছে।

Visit grenadier.co.za for more information.

জো নাগাই তার অবসর সময়ে নিজের হাতে অতি যত্ন নিয়ে এশীয় সোয়ালোটেইল প্রজাপতি লালনপালন করত

একদিন জো খেয়াল করে, শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রূপ নেওয়ার পরও পতঙ্গগুলো যেন তাকে চিনতে পারছে। এরপর তার মনে প্রশ্ন জাগে, শুঁয়োপোকা অবস্থায় তৈরি হওয়া স্মৃতি কি প্রজাপতির মনে থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জো নিজেই কিছু পরীক্ষা করে ফেলে। পরে সে তার পরীক্ষার ফলাফল পেশাদার বিজ্ঞানীদের সামনে তুলে ধরে। জো নাগাইয়ের এই গবেষণা প্রাণীদের চিন্তাভাবনা ও আচরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের বহু পুরোনো ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

শুঁয়োপোকার জন্ম রহস্য
এশীয় সোয়ালোটেইল প্রজাপতির ডানার কিনারায় বেশ উজ্জ্বল কিছু ফোঁটা বা বিন্দু থাকে, যা দেখে এদের সহজেই চেনা যায়। স্থানীয় গাছপালা ও ফুলগাছের পরাগায়নেও এদের বড় ভূমিকা রয়েছে।

১০ বছরের তরুণ গবেষক জো নাগাই কে

জো নাগাই জাপানের কোবে শহরের ইবুকি ইস্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। সে সফটব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মাসায়োশি সনের পরিচালিত ‘সন মাসায়োশি ফিলানথ্রোপিক ফাউন্ডেশন’-এর বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত সারা দেশের অত্যন্ত মেধাবী ও অনন্য প্রতিভাবান তরুণদের পাশে দাঁড়ায়। ছোটবেলা থেকেই পোকামাকড়ের প্রতি জো ভীষণ আগ্রহী। জানা যায়, সে বিভিন্ন পোকামাকড়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে শত শত পৃষ্ঠা নিজের হাতে লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। প্রজাপতি নিয়ে এমন দারুণ আবিষ্কারের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও বড় হয়ে জো মূলত একজন পশুচিকিৎসক হতে চায়।

প্রজাপতির ১০ রহস্য
ছোটবেলা থেকেই পোকামাকড়ের প্রতি জো ভীষণ আগ্রহী। জানা যায়, সে বিভিন্ন পোকামাকড়ের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে শত শত পৃষ্ঠা নিজের হাতে লিখে ভরিয়ে ফেলেছে।

যে পর্যবেক্ষণ থেকে গবেষণার শুরু

জো নাগাইয়ের এই গবেষণা কোনো গবেষণাগার বা স্কুলের শ্রেণিকক্ষে শুরু হয়নি। নিজের বাড়িতে এশীয় সোয়ালোটেইল প্রজাপতি লালনপালন করার সময় খুব সাধারণ একটি ঘটনা খেয়াল করে সে। জো দেখে, বুনো প্রজাপতির কাছে মানুষ গেলে সেগুলো দ্রুত উড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু সে নিজে শুঁয়োপোকা থেকে যে প্রজাপতিগুলোকে বড় করেছে, সেগুলোকে বাইরে মুক্ত বাতাসে ছেড়ে দিলেও বারবার ফিরে এসে তার হাতের ওপর বসে।

এই অদ্ভুত আচরণ দেখে জো নাগাইয়ের মনে প্রশ্ন জাগে, শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার পর শরীর ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুরোপুরি বদলে গেলেও এরা কি আগের অবস্থার স্মৃতি মনে রাখতে পারে? এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সে কয়েক বছর ধরে প্রজাপতিদের আচরণ নিয়মিত ডায়েরিতে লিখে রাখে। জো একের পর এক পরীক্ষা চালিয়ে যায়।

প্রজাপতির রূপান্তর ১. লার্ভা ২. পিউপা ৩. গুটি ৪. পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে জো অনলাইনে নানা বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র পড়তে শুরু করে। এভাবেই সে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত কীটবিজ্ঞানী মার্থা ওয়াইসের গবেষণা সম্পর্কে জানতে পারে। কীটবিজ্ঞানী মার্থা ওয়াইস আগে মাদার স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ২০০৮ সালে মার্থা ওয়াইস মথের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, শুঁয়োপোকা দশার স্মৃতি মথের মনে থাকে।

সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি জানান, জো মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁকে চার পৃষ্ঠার একটি চিঠি লিখে পাঠায়। চিঠিতে জো জানতে চায়, তার করা সেই পরীক্ষাটি প্রজাপতির ওপর প্রয়োগ করার সঠিক উপায় কী হতে পারে। এত ছোট একটি শিশুর গভীর কৌতূহল দেখে মুগ্ধ হয়ে মার্থা ওয়াইসও চিঠির জবাব দেন।

প্রজাপতি যা দেখে, আমরা তা দেখি না
কীটবিজ্ঞানী মার্থা ওয়াইস আগে মাদার স্মৃতি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ২০০৮ সালে মার্থা ওয়াইস মথের ওপর গবেষণা করে দেখিয়েছিলেন, শুঁয়োপোকা দশার স্মৃতি মথের মনে থাকে।

জো নাগাইয়ের পরীক্ষা থেকে কী জানা গেল

নিজের ধারণাটি সত্যি কি না, তা যাচাই করতে জো একটি মজার পরীক্ষা করে। সে সোয়ালোটেইল প্রজাপতির শুঁয়োপোকাগুলোর সামনে ল্যাভেন্ডারের সুগন্ধ ছড়িয়ে দেয়। ঠিক একই সময়ে মাসল-থেরাপি যন্ত্র দিয়ে হালকা বৈদ্যুতিক শক দেয়। ফলে শুঁয়োপোকাগুলোর মাথায় গেঁথে যায় যে ল্যাভেন্ডারের গন্ধ পাওয়া মানেই অস্বস্তিকর ঝাঁকুনি হওয়া।

শুঁয়োপোকাগুলো বড় হয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে পরিণত হওয়ার পর জো একটি ‘Y’ আকৃতির নল দিয়ে আবার পরীক্ষা চালায়। দেখা যায়, প্রজাপতি হওয়ার পরও প্রায় ৭০ শতাংশ প্রজাপতি ল্যাভেন্ডারের গন্ধ পেয়ে সেটি এড়িয়ে চলে এবং নলের অন্য পাশ দিয়ে উড়ে যায়।

এত দিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, গুটি দশা বা রূপান্তরের সময় পোকামাকড়ের স্নায়ুতন্ত্র পুরোপুরি বদলে যায় এবং আগের সব স্মৃতি মুছে যায়। কিন্তু জো নাগাইয়ের এই পরীক্ষা দেখাল, এত বড় পরিবর্তনের পরও প্রজাপতির আগের স্মৃতি মনে থাকে।

প্রজাপতির স্মৃতি কি তবে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়ায়

জো নাগাইয়ের গবেষণার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকটি ছিল এর পরের ঘটনা। সে ওই প্রজাপতিগুলোর পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও গবেষণা চালায়। অদ্ভুত বিষয় হলো, নতুন প্রজন্মের প্রজাপতিগুলোকে কখনো সেই বৈদ্যুতিক আঘাত দেওয়া হয়নি। তবুও এরা ল্যাভেন্ডারের সুবাস এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

জো মনে করে, এটি এপিজেনেটিকসের মাধ্যমে ঘটতে পারে। এটি মূলত এমন একটি জৈবিক প্রক্রিয়া, যেখানে মূল ডিএনএ পরিবর্তন না হয়েও চারপাশের পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ছাপ পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এই তথ্যটি বেশ কৌতূহলজাগানিয়া হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে আরও গবেষণার প্রয়োজন।

বাংলাদেশি দুই বিজ্ঞানীর নতুন মথ আবিষ্কার
অনেকেই জোয়ের চেষ্টা ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। তবে পরীক্ষার জন্য শুঁয়োপোকাদের বৈদ্যুতিক আঘাত দেওয়ার বিষয়টি প্রাণীদের জন্য কতটুকু নৈতিক, তা নিয়ে ইন্টারনেটে কিছুটা বিতর্কও তৈরি হয়।

বিজ্ঞানীরা কীভাবে দেখছেন জো নাগাইয়ের এই গবেষণা

রূপান্তরের পরও পোকামাকড়ের স্মৃতি কীভাবে টিকে থাকে, বিজ্ঞানের এই নতুন বিষয়টি নিয়ে জো নাগাইয়ের গবেষণা দারুণ আলোড়ন তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব এন্টোমোলজি বা আন্তর্জাতিক কীটতত্ত্ব সম্মেলনে জো তার এই গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করে। এই সম্মেলনে প্রবীণ বিজ্ঞানীরা তার এই কাজ খুঁটিয়ে দেখেছেন।

যদিও তার গবেষণাটি এখনো কোনো স্বীকৃত বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়নি, তবুও বিশেষজ্ঞরা ১০ বছর বয়সী একটি শিশুর এমন চমৎকার উদ্ভাবনী চেষ্টার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন। তবে এটি চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সত্য কি না, তা নিশ্চিত হতে অন্য বিজ্ঞানীদের দিয়ে পরীক্ষাটি আবার করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।

বিশেষজ্ঞরা ১০ বছর বয়সী জো নাগাইয়ের এমন চমৎকার উদ্ভাবনী চেষ্টার ব্যাপক প্রশংসা করেছেন

কেন জো নাগাইয়ের গল্প বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলল

জো নাগাইয়ের এই গবেষণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার মূল কারণ, সে নিজের শৈশবের কৌতূহলকে সত্যি সত্যি বিজ্ঞানচর্চায় রূপ দিয়েছে। মাত্র ১০ বছর বয়সে ৩৩ পৃষ্ঠার একটি বড় গবেষণাপত্র তৈরি করে প্রবীণ বিজ্ঞানীদের সামনে তা উপস্থাপন করার বিষয়টি সবাইকে অবাক করেছে।

অনলাইনে লাখ লাখ মানুষ তার ভিডিও ও গবেষণার তথ্য দেখেছেন। অনেকেই তার এই চেষ্টা ও ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন। তবে পরীক্ষার জন্য শুঁয়োপোকাদের বৈদ্যুতিক আঘাত দেওয়ার বিষয়টি প্রাণীদের জন্য কতটুকু নৈতিক, তা নিয়ে ইন্টারনেটে কিছুটা বিতর্কও তৈরি হয়।

অবশ্য অনেকেরই অভিমত, পোকাদের কোনো ক্ষতি করার জন্য নয়; বরং এদের আচরণ বোঝার জন্যই এই পরীক্ষাটি করা হয়েছিল।

মিষ্টি প্রজাপতি
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব এন্টোমোলজি বা আন্তর্জাতিক কীটতত্ত্ব সম্মেলনে জো তার গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করে।

এই আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব কতটা

ভবিষ্যতে অন্য বিজ্ঞানীরা জো নাগাইয়ের এই কথাগুলোর সত্যতা খুঁজে পেলে পোকামাকড়ের স্নায়ুবিজ্ঞান নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধারণা বদলে যাবে। তখন স্মৃতি ধরে রাখা ও বংশপরম্পরায় আচরণ বদলানোর মতো বিষয়গুলো নতুন করে ভাবা হবে।

বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে জো নাগাইয়ের গল্পটি চমৎকার উদাহরণ। বড় বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন তোলার জন্য বয়সের কোনো ধরাবাঁধা সীমা লাগে না। প্রবল কৌতূহল ও নিখুঁত পর্যবেক্ষণই বড় আবিষ্কারের পথ দেখিয়ে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানান, জো নাগাইয়ের এই সাফল্য বিশ্বজুড়ে কিশোর-কিশোরীদের কৌতূহলী করে তুলবে এবং নতুন নতুন পরীক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানকে জানতে ও শিখতে উৎসাহিত করবে।

লেখক: প্রদায়ক, বিজ্ঞানচিন্তাসূত্র: ইয়াহু নিউজ, মাই মডার্ন মেট, টাইমস অব ইন্ডিয়া।বিগপিকচার ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার বাছাইকৃত কিছু ছবি

Read full story at source