নদীর তলায় রয়ে যাওয়া কয়েন
· Prothom Alo

প্রাচীন আচার এবং মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতি
নদীর জলে একটি কয়েন পড়ে। তারপর আরেকটি। তারপর আরও একটি। একটি পথশিশু জাহাজের প্রত্যেক মানুষের নামে মঙ্গল কামনা করে একে একে সেগুলো নদীতে নিক্ষেপ করছে। ‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রের এই দৃশ্য যতটা আবেগময়, তার চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন রেখে যায়। মানুষ কেন হাজার বছর ধরে নদী, হ্রদ কিংবা ঝরনার জলে মূল্যবান কিছু নিক্ষেপ করে এসেছে?
Visit sportbet.rodeo for more information.
মানুষ নদীর তীরে স্থায়ী বসতি গড়ার বহু আগেই বুঝেছিল, জল শুধু জীবন দেয় না, জীবন কেড়েও নিতে পারে। তাই নদী তার কাছে কখনো নিছক ভূগোল ছিল না; ছিল ভয়, ভরসা, যাত্রা ও প্রত্যাবর্তনের প্রতীক।
সম্ভবত এ কারণেই পৃথিবীর নানা সভ্যতায় মানুষ জলকে উদ্দেশ করে কিছু না কিছু অর্পণ করেছে। কখনো অস্ত্র, অলংকার, কখনো খাদ্য, আবার কখনো একটি ছোট্ট ধাতব মুদ্রা।
আজও পৃথিবীর অসংখ্য নদী, ঝরনা, কূপ কিংবা ফোয়ারার জলে মানুষ কয়েন নিক্ষেপ করে। কেউ নিরাপদ যাত্রা কামনা করে, কেউ প্রিয়জনের সুস্থতা, কেউ ভবিষ্যতের প্রতি নীরব আস্থা জানায়। এত পরিচিত এই দৃশ্যের ইতিহাস নিয়েই কৌতূহল শুরু। সেই কৌতূহল ফিরিয়ে নিয়ে যায় মোহাম্মদ নূরুজ্জামানের ‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে।
নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা একটি তেলবাহী ট্যাংকার। জাহাজের বৃদ্ধ পাচক মকবুল একে একে প্রতিটি ক্রু সদস্যের নামে নদীতে কয়েন নিক্ষেপ করেন। দৃশ্যটি ক্ষণস্থায়ী। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো সংলাপও নয়। অথচ প্রশ্ন জাগে, এটি কি কেবল একটি লোকাচার, নাকি বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক স্মৃতির প্রতিধ্বনি?
এই প্রশ্ন চলচ্চিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে নিয়ে যায় প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও মানুষের দীর্ঘ স্মৃতির দিকে।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, জলাশয়ে মূল্যবান বস্তু অর্পণের ইতিহাস মুদ্রারও বহু আগের। ইউরোপের নদী, হ্রদ ও জলাভূমির তলদেশ থেকে উদ্ধার হয়েছে ব্রোঞ্জ যুগের অস্ত্র, কুঠার, তরবারি ও অলংকার। গবেষকদের মতে, এসব বস্তুর সবগুলোই কেবল দুর্ঘটনাবশত হারিয়ে যায়নি; নিরাপদ যাত্রা, বিজয়, উর্বরতা কিংবা অদৃশ্য শক্তির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সচেতনভাবে জলে নিবেদন করা হয়েছে।
মুদ্রা তখনো প্রচলিত হয়নি; কিন্তু জলকে নিবেদন করার আচার ছিল।
গ্রিক সভ্যতায় এই আচার নতুন অর্থ পায়। ঝরনা, প্রস্রবণ ও নদীকে ঘিরে গড়ে ওঠে পবিত্র স্থান। বিশ্বাস ছিল, প্রতিটি জলধারার নিজস্ব রক্ষক আত্মা বা নিম্ফ রয়েছেন। তাঁদের উদ্দেশে ছোট ধাতব নিবেদন করলে যাত্রা শুভ হয়, অসুস্থতা দূর হয় কিংবা দেবতার আশীর্বাদ লাভ করা যায়।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। ছবিতে নূরা জাহাজের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে।‘মাস্তুল’ তার দর্শন নিয়ে কখনো উচ্চকণ্ঠ হয় না। কোনো নৈতিক ভাষণ দেয় না, কোনো মতবাদও প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। কয়েকটি চরিত্র, কিছু আচরণ এবং দীর্ঘ নীরবতার ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে তার নিজস্ব জগৎ নির্মাণ করে। সেই জগতের কেন্দ্রে আছেন বৃদ্ধ পাচক মকবুল। তিনি রান্না করেন, অপমান সহ্য করেন, অন্যায় দেখেন। তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিক্রিয়ায় নয়, সংযমে। মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা ভেঙে পড়ে না।
রোমানরা এই প্রথাকে আরও বিস্তৃত করে। সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তের পবিত্র কূপ, ঝরনা ও নদীতে মুদ্রা নিক্ষেপের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আজও সেই বিশ্বাসের সাক্ষ্য বহন করে। রোমের ট্রেভি ফাউন্টেনে কয়েন নিক্ষেপের আধুনিক রীতির শিকড়ও এই প্রাচীন জল-নিবেদনের ঐতিহ্যে পৌঁছে যায়।
ভারতীয় উপমহাদেশে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আরও নিবিড়। গঙ্গা, যমুনা, নর্মদা কিংবা অসংখ্য আঞ্চলিক নদী শুধু ভৌগোলিক সত্তা নয়; তারা আচার, বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও ধারক। নদীতে ধাতব মুদ্রা অর্পণের রীতি বহু অঞ্চলে আজও টিকে আছে। এর পেছনে যেমন ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করেছে, তেমনি দীর্ঘদিনের লোকসংস্কৃতিও।
বৌদ্ধ সমাজেও একই ধরনের সাংস্কৃতিক অভিযোজন দেখা যায়। বুদ্ধের মূল শিক্ষায় নদী বা জলাধারে কয়েন নিক্ষেপের কোনো বিধান নেই। কিন্তু শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, চীন ও জাপানের বহু বৌদ্ধমন্দিরে পুকুর বা জলাধারে মুদ্রা অর্পণের লোকাচার আজও প্রচলিত। এটি বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্বের নির্দেশ নয়; বরং প্রাচীন জল-নিবেদনের আচার, যা বৌদ্ধ সংস্কৃতির ভেতরে মঙ্গল কামনা ও পুণ্যের প্রতীক হিসেবে নতুন অর্থ পেয়েছে।
এই ইতিহাসগুলো প্রথমে বিচ্ছিন্ন বলে মনে হতে পারে; কিন্তু নদী ও সমুদ্রবন্দরকে সামনে আনলেই ছবিটি বদলে যায়।
মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক বিনিময় ঘটেছে নদী ও সমুদ্রপথে। একটি জাহাজ শুধু পণ্য বহন করে না; বহন করে ভাষা, বিশ্বাস, আচার, খাদ্যাভ্যাস ও প্রতীক। আবার অন্য বন্দরে পৌঁছে দেয় স্থানীয় সংস্কৃতিরও কিছু অংশ। তাই কোনো প্রথার একক জন্মস্থান খোঁজার চেয়ে তার দীর্ঘ যাত্রাপথ বোঝা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
নদীতে কয়েন নিক্ষেপের রীতিটিও সম্ভবত তেমনই এক ভ্রমণকারী সংস্কৃতি।
হাজার বছরের যাত্রায় এটি নানা ভূগোল, ধর্ম ও ভাষায় নতুন নতুন অর্থ ধারণ করেছে। কোথাও দেবতার উদ্দেশে নিবেদন, কোথাও শুভযাত্রার প্রার্থনা, কোথাও প্রিয়জনের মঙ্গল কামনা। আচার বদলেছে, ব্যাখ্যা বদলেছে; কিন্তু মানুষের শুভবোধের আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি।
এ কারণেই ‘মাস্তুল’–এর সেই ক্ষণিক দৃশ্যটি আমার কাছে আর শুধু একটি চলচ্চিত্রের দৃশ্য থাকে না।
এটি মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক নীরব প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে।
মকবুলের নীরবতা: করুণার চলচ্চিত্রভাষা
‘মাস্তুল’ তার দর্শন নিয়ে কখনো উচ্চকণ্ঠ হয় না। কোনো নৈতিক ভাষণ দেয় না, কোনো মতবাদও প্রতিষ্ঠা করতে চায় না। কয়েকটি চরিত্র, কিছু আচরণ এবং দীর্ঘ নীরবতার ভেতর দিয়েই ধীরে ধীরে তার নিজস্ব জগৎ নির্মাণ করে।
সেই জগতের কেন্দ্রে আছেন বৃদ্ধ পাচক মকবুল।
তিনি রান্না করেন, অপমান সহ্য করেন, অন্যায় দেখেন। তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রতিক্রিয়ায় নয়, সংযমে। মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা ভেঙে পড়ে না।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে জাহাজে ক্রুদের কথোপকথনের একটি দৃশ্য।অন্যায়ভাবে নূরাকে তীরে রেখে জাহাজ চলে যায়। একটি শিশুর জন্য অভিমান বা প্রতিশোধ স্বাভাবিক। কিন্তু পরিচালক তাকে সেই সহজ আবেগের পথে নিয়ে যান না। তার হাতে থাকে মকবুলের দেওয়া কাপড়ের ছোট্ট পুঁটলি। ভেতরে কয়েন। সে একে একে সেই কয়েনগুলো নদীতে নিক্ষেপ করে। জাহাজের প্রত্যেক মানুষের জন্য। যারা তাকে ফেলে চলে গেছে, তাদের জন্যও।
সুকানির সন্দেহ, মকবুল জাহাজের মালিকের আস্থাভাজন। সেই সন্দেহ থেকেই জন্ম নেয় বিরূপতা। ক্ষমতার ক্ষুদ্র রাজনীতিতে মকবুল নীরব লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। অথচ তিনি প্রতিশোধের ভাষায় সাড়া দেন না।
এই নীরবতা কেবল ব্যক্তিগত স্বভাব নয়; যেন এক নৈতিক অবস্থান।
বৌদ্ধ দর্শনে করুণা (karuṇā) মানে শুধু দয়া নয়; অন্যের দুঃখ উপলব্ধি করে তা লাঘবের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা। আর মেত্তা (mettā) হলো এমন এক সর্বজনীন মৈত্রী বা শুভবোধ, যা বন্ধু ও শত্রুর মধ্যে কোনো বিভাজন করে না। করণীয় মেত্তা সূত্র (Karaṇīya Mettā Sutta) সব প্রাণীর প্রতি সমান মঙ্গলকামনার আহ্বান জানায়।
এই আলোয় মকবুলকে পড়লে তাঁর নীরবতা নতুন অর্থ পায়। তিনি প্রতিবাদ করেন না বলে নীরব নন; ঘৃণাকে নিজের ভেতরে আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেন বলেই নীরব। তাঁর সংযম আত্মসমর্পণের নয়, আত্মনিয়ন্ত্রণের।
চলচ্চিত্রের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্যটি আসে যখন তিনি জাহাজের প্রতিটি মানুষের নামে নদীতে কয়েন নিক্ষেপ করেন। সেখানে কোনো বাছবিচার নেই। যিনি তাঁকে সম্মান করেছেন, তিনিও আছেন; যিনি অপমান করেছেন, তিনিও। শুভকামনা তাঁর কাছে কোনো পুরস্কার নয়, কোনো বিনিময়ও নয়; এটি তাঁর নৈতিক বোধের প্রকাশ।
এই একটি দৃশ্যেই নদীতে কয়েন নিক্ষেপের প্রাচীন আচার নতুন অর্থ লাভ করে। এটি আর শুধু সৌভাগ্য কামনার লোকাচার নয়; হয়ে ওঠে মানুষের প্রতি মানুষের শুভবোধের দৃশ্যমান প্রকাশ।
এ উত্তরাধিকারই পৌঁছে যায় নূরার কাছে।
প্রথমে সে বন্দরের এক পথশিশু। কিন্তু ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্ক সীমা অতিক্রম করে। আমরা তাদের নানা-নাতির মতো দেখি, অথচ চলচ্চিত্রটি আরও গভীর এক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়। একজন মানুষ নীরবে নিজের জীবনদর্শন, আরেকজন মানুষের হাতে তুলে দিচ্ছেন।
এই জায়গায় এসে গৌতম বুদ্ধ ও আনন্দের সম্পর্কের কথা মনে পড়ে। আনন্দ শুধু বুদ্ধের বাণী শোনেননি; তাঁর জীবনযাপন প্রত্যক্ষ করেছিলেন। শিক্ষা তাঁর কাছে তত্ত্ব নয়, অনুশীলন ছিল।
মকবুল ও নূরার সম্পর্কেও সেই অনুরণন অনুভব করি। এটি প্রতিরূপ নয়, প্রতিধ্বনি।
মকবুল বুদ্ধ নন, নূরাও আনন্দ নয়। কিন্তু একজন মানুষের নৈতিক অবস্থান কীভাবে আরেকজন মানুষের জীবনে নীরবে সঞ্চারিত হয়, সেই প্রবাহকে এই সম্পর্ক স্মরণ করিয়ে দেয়।
চলচ্চিত্রের শেষাংশে সেই উত্তরাধিকার দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
অন্যায়ভাবে নূরাকে তীরে রেখে জাহাজ চলে যায়। একটি শিশুর জন্য অভিমান বা প্রতিশোধ স্বাভাবিক। কিন্তু পরিচালক তাকে সেই সহজ আবেগের পথে নিয়ে যান না।
তার হাতে থাকে মকবুলের দেওয়া কাপড়ের ছোট্ট পুঁটলি।
ভেতরে কয়েন।
সে একে একে সেই কয়েনগুলো নদীতে নিক্ষেপ করে। জাহাজের প্রত্যেক মানুষের জন্য। যারা তাকে ফেলে চলে গেছে, তাদের জন্যও।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে জাহাজে মকবুল ও নূরার কথোপকথনের একটি দৃশ্য।বাস্তব তেলবাহী জাহাজে শুটিং এবং প্রকৃত খালাসিদের অংশগ্রহণ এই জগৎকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। শরীরী ভাষা, কাজের ছন্দ এবং স্থান ব্যবহারে এমন স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে, যা অভিনয় দিয়ে সহজে নির্মাণ করা যায় না। এ কারণেই ‘মাস্তুল’ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি জাহাজের গল্প নয়; এটি একটি সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
এই মুহূর্তে নূরা আর শুধু একটি চরিত্র নয়; সে হয়ে ওঠে এক উত্তরাধিকার বহনকারী মানুষ। মকবুল তাকে সম্পদ দিয়ে যাননি; দিয়ে গেছেন মানুষের প্রতি শুভবোধের একটি অভ্যাস।
এরপর ক্যামেরা নেমে যায় নদীর জলের নিচে।
এতক্ষণ সে ছিল মানুষের সঙ্গে; এখন অনুসরণ করছে কয়েনকে। একে একে তারা জলের গভীরে তলিয়ে যায়। কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটে না, তবু দৃশ্যটি বাস্তবতার সীমানা ছাড়িয়ে এক অন্তর্মুখী অনুভূতির জন্ম দেয়। নদীর তলায় ডুবে যাওয়া সেই কয়েনগুলো তখন আর ধাতব মুদ্রা থাকে না।
তারা হয়ে ওঠে মানুষের নৈতিক স্মৃতির দৃশ্যমান রূপ।
জাহাজ যখন একটি সমাজ
‘মাস্তুল’–এর ঘটনাস্থল একটি তেলবাহী ট্যাংকার। কিন্তু চলচ্চিত্রটি জাহাজকে কেবল কর্মস্থল হিসেবে দেখে না। ধীরে ধীরে এটি এমন এক ক্ষুদ্র সমাজে পরিণত হয়, যেখানে ক্ষমতা, শ্রম, আনুগত্য, ভয়, নীরবতা ও মানবিকতা পাশাপাশি বাস করে। এর নির্মাণের শক্তি হলো, কোনো চরিত্রই একমাত্রিক নয়। মাস্টার, সুকানি, মকবুল কিংবা নূরা, প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই জগতের অর্থ নির্মাণ করে।
জাহাজের সর্বোচ্চ দায়িত্বে আছেন মাস্টার। কিন্তু চলচ্চিত্রটি সূক্ষ্মভাবে দেখায়, প্রশাসনিক ক্ষমতা আর নৈতিক নেতৃত্ব সব সময় এক নয়। তিনি অন্যায় বোঝেন, কিন্তু সব সময় হস্তক্ষেপ করেন না। ক্ষমতার এই নীরবতা আমাদের সমাজেও পরিচিত।
অন্যদিকে সুকানির হাতে প্রতিদিনের দৃশ্যমান কর্তৃত্ব। সে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আবার নিজের অনিরাপত্তাও আড়াল করতে চায়। ধর্মীয় অনুশীলনে আন্তরিক হলেও তার আচরণে সেই নৈতিকতার পূর্ণ প্রতিফলন দেখা যায় না। চলচ্চিত্রটি ধর্মের সমালোচনা করে না; বরং ধর্মীয় আচরণ ও নৈতিক চরিত্রের পার্থক্যটি সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে।
এ কারণেই মকবুল সুকানির বিপরীত মেরু। তিনি বিশ্বাস নিয়ে কোনো ঘোষণা দেন না; তাঁর নৈতিকতা প্রকাশ পায় আচরণে। একজন কর্তৃত্বের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, অন্যজন আত্মসংযমের মাধ্যমে। এ দ্বন্দ্বই চলচ্চিত্রটির নৈতিক কেন্দ্র নির্মাণ করে।
নূরা এই ক্ষুদ্র সমাজের প্রান্তিক সাক্ষী। তার চোখ দিয়ে দর্শক যেমন ক্ষমতার ব্যবহার দেখেন, তেমনি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মমতার সম্ভাবনাও আবিষ্কার করেন। শেষ পর্যন্ত তার পরিবর্তনই প্রমাণ করে, মানুষের মূল্যবোধ বক্তৃতায় নয়; অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই জন্ম নেয়।
বাস্তব তেলবাহী জাহাজে শুটিং এবং প্রকৃত খালাসিদের অংশগ্রহণ এই জগৎকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। শরীরী ভাষা, কাজের ছন্দ এবং স্থান ব্যবহারে এমন স্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে, যা অভিনয় দিয়ে সহজে নির্মাণ করা যায় না।
এ কারণেই ‘মাস্তুল’ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি জাহাজের গল্প নয়; এটি একটি সমাজের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে জাহাজে মকবুল ও নূরার কথোপকথনের একটি দৃশ্য।সব মিলিয়ে ‘মাস্তুল’–এর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত তার আত্মসংযম। ক্যামেরা, আলো, রং কিংবা শব্দ—কোনোটিই নিজেদের আলাদা করে প্রকাশ করতে চায় না। সবকিছু মিলিয়ে তারা এমন এক অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে, যেখানে চলচ্চিত্রের কারিগরি নয়; তার অনুভূতিই দর্শকের সঙ্গে থেকে যায়।
চলচ্চিত্রের ভাষা: যখন নির্মাণ নিজেকে আড়াল করে
চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নির্মাতা আছেন, যাঁরা দৃশ্যকে কখনো শুধু তথ্য বহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেননি। আন্দ্রেই তারকোভস্কির কাছে জল ছিল সময় ও স্মৃতির বাহক। আব্বাস কিয়ারোস্তামির কাছে একটি সাধারণ দৃশ্যও মানুষের অন্তর্জগতের দিকে জানালা খুলে দিতে পারত। ‘মাস্তুল’ তাঁদের অনুসরণ করে না; কিন্তু একই ধরনের এক চলচ্চিত্রিক সংযমের ওপর তার আস্থা আছে। দৃশ্যকে ব্যাখ্যা না করে, তার ভেতরে অর্থের জন্য জায়গা রেখে দেয়। এই সংযমই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
মোহাম্মদ আরিফুজ্জামানের ক্যামেরা নদীকে কখনো দর্শনীয় দৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করে না। সংকীর্ণ করিডর, ইঞ্জিনরুম কিংবা ডেকের সীমিত পরিসর মানুষের আবদ্ধতাকে যেমন অনুভব করায়, তেমনি নদীর বিস্তৃত ফ্রেম সেই আবদ্ধতার বিপরীতে একধরনের অস্তিত্বগত শূন্যতা তৈরি করে। বাস্তব তেলবাহী ট্যাংকারে শুটিং এই দৃশ্যভাষাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করেছে।
রঙের ব্যবহারেও একই সংযম। আবদুল্লাহ রাকিবের কালার গ্রেডিং কখনো নিজের উপস্থিতি জানান দেয় না। নদীর ধূসরতা, মরিচা ধরা লোহা, তেলের কালচে আবহ কিংবা বিবর্ণ আলো মিলিয়ে এমন এক দৃশ্যজগৎ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি চরিত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহচর।
শব্দের ব্যবহার চলচ্চিত্রটির আরেকটি বড় শক্তি। ইঞ্জিনের গর্জন, বাতাস, ঢেউ, দূরের হর্ন, আজান, মাজারের গান কিংবা বন্দরের কোলাহল মিলিয়ে এমন এক শ্রুতিজগৎ নির্মিত হয়েছে, যেখানে সংলাপের চেয়েও পরিবেশ অনেক সময় বেশি অর্থ বহন করে। শব্দের স্থানিক বিন্যাসও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; ক্যামেরার সঙ্গে সঙ্গে শব্দও স্থান বদলায়, ফলে দর্শক শুধু দৃশ্য নয়, স্থানকেও অনুভব করতে পারেন।
সম্পাদনা একইভাবে সংযত। একরৈখিক চিত্রনাট্য হয়েও চলচ্চিত্রটি কোথাও স্থবির হয় না। সময়কে অনুভব করানোর জন্যই যেন সম্পাদনা কাজ করে।
ফজলুর রহমান বাবুর সংলাপহীন অভিনয় এই নীরব চলচ্চিত্রভাষার সঙ্গে অসাধারণভাবে মিশে গেছে। অন্যদিকে সুকানি চরিত্রে দীপক সুমনের অভিনয়ের কয়েকটি মুহূর্ত তুলনামূলকভাবে বেশি থিয়েট্রিক্যাল মনে হয়েছে। বিশেষ করে শরীরী অভিব্যক্তির বিস্তার চলচ্চিত্রটির সামগ্রিক বাস্তববাদী অভিনয়ভাষার সঙ্গে সামান্য অসামঞ্জস্য তৈরি করে। তবে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের সীমিত বাজেট ও প্রযুক্তিগত বাস্তবতাও এই মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য।
সব মিলিয়ে ‘মাস্তুল’–এর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত তার আত্মসংযম। ক্যামেরা, আলো, রং কিংবা শব্দ—কোনোটিই নিজেদের আলাদা করে প্রকাশ করতে চায় না। সবকিছু মিলিয়ে তারা এমন এক অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে, যেখানে চলচ্চিত্রের কারিগরি নয়; তার অনুভূতিই দর্শকের সঙ্গে থেকে যায়।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে জাহাজের মাস্টার, লস্কর ও সুকানি। সুকানির জাহাজ পরিচালনার একটি দৃশ্য।বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ আমাদের চলচ্চিত্রে নদীকে প্রায়ই দৃশ্যপট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘মাস্তুল’ সেই বিরল চলচ্চিত্রগুলোর একটি, যেখানে নদী কেবল পটভূমি নয়; একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর। এখানে নদী চরিত্রদের শুধু বহন করে না, তাদের পরীক্ষা নেয়, আলাদা করে, আবার অদৃশ্য এক বন্ধনেও যুক্ত করে। সম্ভবত এ কারণেই চলচ্চিত্রটি শেষ হওয়ার পর গল্পের চেয়ে নদীই বেশি মনে থাকে। আর সেই নদীর বুকজুড়ে ভেসে থাকে কয়েকটি ছোট্ট কয়েন। যাদের মূল্য ধাতুতে নয়, মানুষের স্মৃতিতে।
একটি দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাণ
একটি চলচ্চিত্র শেষ হওয়ার পর দর্শকের মনে কী থেকে যায়?
গল্প, চরিত্র, নাকি কয়েকটি দৃশ্য?
অনেক সময় এগুলোরও গভীরে থেকে যায় একটি দৃষ্টিভঙ্গি।
‘মাস্তুল’ নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় অর্জন তার কাহিনিতে নয়; তার দেখার ভঙ্গিতে।
এই ভঙ্গির কেন্দ্রে আছেন নির্মাতা মোহাম্মদ নূরুজ্জামান। চলচ্চিত্রটির কাহিনি, চিত্রনাট্য, পরিচালনা, সম্পাদনা, সাউন্ড ডিজাইন ও প্রযোজনায় তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা প্রথমে বিস্মিত করে। কিন্তু স্বাধীন চলচ্চিত্রের বাস্তবতা প্রায়ই এমনই। অনেক সময় একটি চলচ্চিত্র কোনো প্রতিষ্ঠানের নয়, একজন মানুষের দীর্ঘ একাগ্রতার ফল।
এ কারণেই ‘মাস্তুল’–এ বিচ্ছিন্ন কারিগরি দক্ষতার চেয়ে একটি সংহত শিল্পদৃষ্টি বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চিত্রনাট্য, দৃশ্য, শব্দ, সম্পাদনা কিংবা নীরবতা—সবকিছু যেন একই অভিপ্রায়ের দিকে অগ্রসর হয়েছে। কোথাও দক্ষতার প্রদর্শন নয়; বরং একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নির্মাণের চেষ্টা।
চলচ্চিত্রতত্ত্বে ‘ওতেঁর থিওরি’ এমন পরিচালকের কথাই বলে, যার ব্যক্তিগত শিল্পদৃষ্টি চলচ্চিত্রের প্রতিটি স্তরে অনুভব করা যায়। ‘মাস্তুল’ সেই অর্থে একজন নির্মাতার ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র।
তবে সংযম মানেই নিখুঁত নয়।
জাহাজে মালিকের আগমনের পর কয়েকটি দৃশ্যে সংলাপ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। এর আগে যে অনুভূতিগুলো দৃশ্য, শব্দ ও নীরবতার মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেখানে ভাষা কিছুটা ব্যাখ্যাকারীর ভূমিকা নিতে শুরু করে। আমার মনে হয়েছে, চলচ্চিত্রটি যদি নিজের নীরবতার ওপর আরও আস্থা রাখত, তবে সেই অংশ আরও শক্তিশালী হতে পারত।
তবে এই পর্যবেক্ষণ চলচ্চিত্রটির অর্জনকে খাটো করে না; বরং তার উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই স্পষ্ট করে। ‘মাস্তুল’ সহজ নাটকীয়তার পথ নেয়নি। এটি দর্শকের ধৈর্যের ওপর আস্থা রেখেছে, দৃশ্যকে সময় দিয়েছে, চরিত্রকে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, নীরবতাকেও অর্থ বহন করতে দিয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই। সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা ব্যক্তিগত চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণের চেষ্টা করে। সব প্রচেষ্টা সমান সফল হয় না; কিন্তু এই অনুসন্ধানই একটি দেশের চলচ্চিত্রকে স্বতন্ত্র পরিচয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। অথচ আমাদের চলচ্চিত্রে নদীকে প্রায়ই দৃশ্যপট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ‘মাস্তুল’ সেই বিরল চলচ্চিত্রগুলোর একটি, যেখানে নদী কেবল পটভূমি নয়; একটি নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর। এখানে নদী চরিত্রদের শুধু বহন করে না, তাদের পরীক্ষা নেয়, আলাদা করে, আবার অদৃশ্য এক বন্ধনেও যুক্ত করে।
সম্ভবত এ কারণেই চলচ্চিত্রটি শেষ হওয়ার পর গল্পের চেয়ে নদীই বেশি মনে থাকে। আর সেই নদীর বুকজুড়ে ভেসে থাকে কয়েকটি ছোট্ট কয়েন। যাদের মূল্য ধাতুতে নয়, মানুষের স্মৃতিতে।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রের জাহাজটি।সম্ভবত ভালো চলচ্চিত্রেরও কাজ এটাই। পর্দা ছেড়ে মানুষের স্মৃতিতে আশ্রয় নেওয়া। ‘মাস্তুল’ দেখার পর যদি নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, কোনো ক্ষুদ্র আচারও হাজার বছরের ইতিহাস বহন করতে পারে; যদি মনে হয় মানুষের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্পদ নয়, বরং অন্যের মঙ্গল কামনা করার ক্ষমতা, তবে চলচ্চিত্রটি তার কাজ সম্পন্ন করেছে।
নদীর তলায় রয়ে যাওয়া কয়েন
একটি চলচ্চিত্র শেষ হলে পর্দা অন্ধকার হয়ে যায়।
কিন্তু সব চলচ্চিত্র একইভাবে শেষ হয় না।
কিছু চলচ্চিত্র শেষ দৃশ্যের পরও দর্শকের ভেতরে নীরবে চলতে থাকে।
‘মাস্তুল’ তেমনই একটি অভিজ্ঞতা দেয় আমাদের।
এর কারণ গল্প নয়; বরং একটি দৃশ্য।
নদীর জলে একে একে ডুবে যাচ্ছে কয়েন।
প্রথম দর্শনে এটি একটি সাধারণ লোকাচার।
আরও মনোযোগ দিয়ে দেখলে এটি একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি মানুষের এক প্রাচীন আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। নিজের জন্য নয়, অন্যের মঙ্গল কামনা করার আকাঙ্ক্ষা।
সম্ভবত এ কারণেই ব্রোঞ্জ যুগের জল-নিবেদন, গ্রিকদের পবিত্র প্রস্রবণ, রোমানদের মুদ্রা অর্পণ, ভারতীয় নদীপারের আচার কিংবা বৌদ্ধ সংস্কৃতির কিছু লোকবিশ্বাস এক অদৃশ্য সুতোয় গাঁথা বলে মনে হয়। তাদের উৎস এক নয়, ব্যাখ্যাও এক নয়। তবু তাদের ভেতরে একটি অভিন্ন মানবিক প্রবণতা কাজ করে। মানুষ নিজের চেয়ে বড় কোনো কিছুর কাছে শুভকামনা সমর্পণ করতে চেয়েছে।
‘মাস্তুল’ এই ইতিহাস ব্যাখ্যা করে না। তার প্রয়োজনও নেই।
শিল্পের কাজ তথ্যের পুনরাবৃত্তি নয়; অনুভূতির জন্ম দেওয়া।
মকবুল শেষ পর্যন্ত কোনো ধর্মীয় প্রতীক নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের মানবিকতা অক্ষুণ্ন রাখেন। নূরাও কেবল একটি পথশিশু নয়; সে সেই মানবিকতার উত্তরাধিকার বহন করে। এই উত্তরাধিকার রক্তের নয়, আচরণের।
সম্ভবত মানুষের সভ্যতাও এভাবে টিকে থাকে। আমরা শুধু ভাষা, ধর্ম বা সংস্কৃতি উত্তরাধিকার হিসেবে পাই না; পাই কিছু ছোট ছোট মানবিক আচরণ। কাউকে বিদায় জানানো, অতিথিকে জল এগিয়ে দেওয়া, মৃতের স্মরণে নীরব হওয়া, কিংবা নদীর জলে একটি কয়েন নিক্ষেপ করা। এই আপাত ক্ষুদ্র আচরণগুলোর মধ্যেই মানুষের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতি বেঁচে থাকে।
এ কারণেই নূরার হাতে ধরা কাপড়ের ছোট্ট পুঁটলিটি আমার কাছে শুধু কয়েনের থলে নয়; মানুষের শুভবোধের এক নীরব উত্তরাধিকার।
ক্যামেরা যখন নদীর জলের নিচে নেমে যায়, তখন বাস্তবতা ও প্রতীকের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম সেতু তৈরি হয়। কয়েনগুলো তলিয়ে যায়; কিন্তু তাদের অর্থ তলিয়ে যায় না। তারা থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে।
সম্ভবত ভালো চলচ্চিত্রেরও কাজ এটাই। পর্দা ছেড়ে মানুষের স্মৃতিতে আশ্রয় নেওয়া।
‘মাস্তুল’ দেখার পর যদি নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হয়, কোনো ক্ষুদ্র আচারও হাজার বছরের ইতিহাস বহন করতে পারে; যদি মনে হয় মানুষের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সম্পদ নয়, বরং অন্যের মঙ্গল কামনা করার ক্ষমতা, তবে চলচ্চিত্রটি তার কাজ সম্পন্ন করেছে।
‘মাস্তুল’ চলচ্চিত্রে নূরা নদীতে একে একে কয়েন নিক্ষেপের দৃশ্য।নদীর তলায় ডুবে যায় কয়েন; মানুষের স্মৃতিতে ভেসে থাকে তাদের অর্থ। সম্ভবত শিল্পেরও দীর্ঘতম জীবন সেখানেই।
শেষ পর্যন্ত নদীর জলে নিক্ষিপ্ত কয়েনের প্রকৃত গন্তব্য কোনো দেবতা নয়, মানুষের স্মৃতি।
আর সে কারণেই ‘মাস্তুল’ শেষ হওয়ার পরও নদীটি বয়ে চলতে থাকে। তার জলের গভীরে ডুবে থাকে কয়েন। আর মানুষের ভেতরে ভেসে থাকে তাদের অর্থ।
নদীর তলায় ডুবে যায় কয়েন; মানুষের স্মৃতিতে ভেসে থাকে তাদের অর্থ। সম্ভবত শিল্পেরও দীর্ঘতম জীবন সেখানেই।
খন্দকার সুমন: লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
লেখকের নোট: এই প্রবন্ধে নদীতে কয়েন নিক্ষেপের ইতিহাস, গ্রিক ও ভারতীয় জলসংস্কৃতি, বৌদ্ধ মেত্তা ভাবনা এবং চলচ্চিত্রতত্ত্ব-সংক্রান্ত তথ্য প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা, পালি সূত্র ও স্বীকৃত একাডেমিক গ্রন্থের ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
১. ব্র্যাডলি, রিচার্ড। দ্য প্যাসেজ অব আর্মস: অ্যান আর্কিওলজিক্যাল অ্যানালাইসিস অব প্রিহিস্টোরিক হোর্ডস অ্যান্ড ভোটিভ ডিপোজিটস। কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০।
(ব্রোঞ্জ যুগে নদী ও জলাভূমিতে অস্ত্র ও মূল্যবান বস্তু নিবেদন সম্পর্কে।)
২. বুর্কার্ট, ওয়াল্টার। গ্রিক রিলিজিয়ন। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৫।
(গ্রিক ধর্ম, পবিত্র প্রস্রবণ, নদী ও আচার সম্পর্কে।)
৩. এক, ডায়ানা এল। ইন্ডিয়া: আ সেক্রেড জিওগ্রাফি। হারমনি বুকস, ২০১২। (ভারতীয় নদী, তীর্থ ও পবিত্র ভূগোল সম্পর্কে।)
৪. করণীয় মেত্তা সুত্ত (সুত্ত নিপাত ১.৮; খুদ্দকপাঠ ৯)। (মেত্তা বা সর্বজনীন শুভকামনা বিষয়ে বুদ্ধের উপদেশ।)
৫. ধম্মপদ (বাংলা বা ইংরেজি স্বীকৃত অনুবাদ)।
(নৈতিকতা, সংযম ও করুণা সম্পর্কিত বৌদ্ধ শিক্ষা।)
৬. বাজাঁ, আঁদ্রে। হোয়াট ইজ সিনেমা? খণ্ড ১। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস, ১৯৬৭। (চলচ্চিত্রে রিয়েলিজম ও দৃশ্যভাষা।)
৭. বোর্ডওয়েল, ডেভিড ও থম্পসন, ক্রিস্টিন। ফিল্ম আর্ট: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন। ম্যাকগ্রা-হিল। (চলচ্চিত্র বিশ্লেষণের মৌলিক তত্ত্ব।)
৮. স্যারিস, অ্যান্ড্রু। দ্য আমেরিকান সিনেমা: ডিরেক্টর্স অ্যান্ড ডিরেকশনস, ১৯২৯–১৯৬৮। নিউ ইয়র্ক: ই. পি. ডাটন, ১৯৬৮। (ওতেঁর থিওরি নিয়ে প্রভাবশালী আলোচনা।)
৯. চলচ্চিত্র: মাস্তুল (২০২৬)। রচনা, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা: মোহাম্মদ নূরুজ্জামান