‘সেদিন কোনো কারণ ছাড়াই জড়িয়ে ধরেছিল, সেই শিশুটিই ফিরে আসেনি’

· Prothom Alo

এক বছর আগে আজকের এই দিনে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও কর্মচারীসহ বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রথম বার্ষিকীতে আজ মঙ্গলবার শোক, শ্রদ্ধা, স্মৃতিচারণ ও দোয়ার মধ্য দিয়ে নিহতদের স্মরণ করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।

Visit newsbetting.cv for more information.

সকালে কলেজের হায়দার আলী ভবনের সামনে স্থাপিত অস্থায়ী স্মৃতিবেদিতে ফুল দিয়ে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ কর্নেল (অব.) নুরন্নবী বলেন, ‘আজ আমরা গভীর শোকের সঙ্গে আমাদের নিহত শিক্ষক, ছোট ছোট শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করছি।’

সকালে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একটি কর্মসূচি থাকায় অনেক অভিভাবক সেখানে অংশ নিয়েছেন। বিকেলে অভিভাবকদের নিয়ে আরেকটি স্মরণানুষ্ঠান রয়েছে বলে তিনি জানান।

স্মৃতিবেদির দুই পাশে নিহতদের ছবি সংবলিত দুটি ব্যানার টানানো হয়। সেখানে নিহতদের সহপাঠী, শিক্ষক ও স্বজনেরা স্মৃতিচারণমূলক বিভিন্ন বার্তা লিখে শ্রদ্ধা জানান। দিবসটি উপলক্ষে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব শাখায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মোল্লা বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পর একের পর এক বিস্ফোরণ হচ্ছিল। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট উঁচু পর্যন্ত আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। চারদিকে শিশুদের আর্তচিৎকার শুনে তিনি তাদের উদ্ধারে ছুটে যান। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কিছুটা পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের স্মরণে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। এতে বিএনসিসি, গার্লস গাইড, স্কাউটের সদস্য এবং শিক্ষক-শিক্ষিকারা অংশ নেন। রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস

তিনি বলেন, ভবনের ফটকের কাছে এসে তিনি কয়েকজন শিশুর মরদেহ দেখতে পান। সেখানে একজন অভিভাবকের মরদেহও পড়ে ছিল। এ সময় নিজের মেয়েকে খুঁজতে গিয়ে তিনি শিক্ষক মাহেরীন চৌধুরীকে কয়েকজন শিশুকে ঠেলে নিরাপদ স্থানে পাঠাতে দেখেন। তখন মাহেরীন চৌধুরীর শরীরে আগুন জ্বলছিল।

মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ম্যাডাম তখন কথা বলতেও পারছিলেন না। পাশে থাকা এক আয়ার নীল ওড়না দিয়ে তাঁর শরীরের আগুন নেভানোর চেষ্টা করি। কিন্তু আগুনের তাপ এত বেশি ছিল যে আমার হাত পুড়ে যায়। ঠিক তখনই পাশে পড়ে থাকা বিমানের লেজের অংশেও বিস্ফোরণ ঘটে। আমি, আমার স্ত্রী ও মেয়ে মাত্র ৩০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই বিস্ফোরণ থেকে প্রাণে বেঁচে যাই।’

দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বিমানের শব্দ এখনো তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে বলে জানান শিক্ষক মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তান দীর্ঘদিন বিমানের শব্দ শুনে ঘুমাতে পারত না। আমিও দীর্ঘদিন আতঙ্কে ছিলাম। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠনের উদ্যোগে ধীরে ধীরে সেই মানসিক আঘাত কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে।’

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিহত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস

স্কুলের শিক্ষিক ফারজানা কাবেরী বলেন, নিহত শিশুরা তাঁদের কাছে নিজেদের সন্তানের মতোই ছিল। তিনি বলেন, ‘ওদের সঙ্গে অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছোট ছোট বাচ্চারা খুব সহজেই মানুষের মনে জায়গা করে নেয়।’ দুর্ঘটনায় নিহত এক শিশুর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সেদিন সকালে কোনো কারণ ছাড়াই সে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কিছু বলবে? সে শুধু বলেছিল, এমনিই। পরে সেই শিশুটিই আর ফিরে আসেনি।’

সেদিনের বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা স্মরণ করে ফারজানা কাবেরী বলেন, ‘আমি শুধু কালিমা পড়ছিলাম। বাচ্চারা বলছিল, ‘মিস, কিছু করেন, আমাদের বাঁচান। কিন্তু চারদিকে আগুনে ঘেরা ছিল। আমি তাদের বলেছিলাম, যেকোনো একদিকে দৌড়াতে। কিন্তু যেদিকেই তাকিয়েছি, আগুনের দেয়াল ছাড়া কিছুই ছিল না।’

বন্ধুদের স্মৃতিতে লেখা। রাজধানীর দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাস

গত বছরের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ২৮ শিক্ষার্থী, ৩ জন শিক্ষক, ৩ জন অভিভাবক, ১ জন আয়াসহ মোট ৩৫ জন নিহত হন। এ ছাড়া যুদ্ধবিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও প্রাণ হারান। দুর্ঘটনার পর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ৮০ জন। বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলেন ৫৭ জন।

দুর্ঘটনার পর গত বছরের ২৭ জুলাই ৯ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার।তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুর্ঘটনার মূল কারণ পাইলটের উড্ডয়নত্রুটি। মাইলস্টোন স্কুলের ভবনটি রাজউকের বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত হয়নি। বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ওই ভবনে ন্যূনতম তিনটি সিঁড়ি থাকার কথা ছিল। কিন্তু ছিল মাত্র একটি। তিনটি থাকলে হতাহত আরও কমত। কমিটির প্রধান সুপারিশ ছিল জননিরাপত্তার স্বার্থে বিমানবাহিনীর সব প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ঢাকার বাইরে পরিচালনা করা।

‘সন্তানের মৃত্যুর কোনো ক্ষতিপূরণ হয় না, আমরা ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই’

Read full story at source