চোখের জলের বিজ্ঞান

· Prothom Alo

চোখের জলের উপমায় কবি–সাহিত্যিকেরা কখনো ব্যবহার করেছেন মুক্তাকে, কখনোবা বলেছেন ভোরের টলমলে শিশিরবিন্দুর কথা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে নিঃসন্দেহে তাঁরা এই চোখের জল বা অশ্রুকে অভিহিত করবেন শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ‘জলকামান’ হিসেবে।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই কপাল কুঁচকে ভাবছেন, নিরীহ এই বস্তুর সঙ্গে এমন যুদ্ধ যুদ্ধ অভিধা কি মানায়? আসলে চোখের জলকে আমরা দুঃখ কিংবা খুশির অনুভূতির অনুষঙ্গ হিসেবেই জানি। কারণ, এই সময়েই এটি আমাদের চোখে পড়ে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে প্রতিমুহূর্তেই চোখের জল তৈরি হয়, প্রবাহিত হয় চোখের ওপর দিয়ে, সাহায্য করে চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা, সেই সঙ্গে প্রতিরক্ষামূলক কাজে।

Visit newsbetting.cv for more information.

কীভাবে? সেটি জানার আগে চলুন ঘুরে আসা যাক, চোখের জল তৈরির কারখানা থেকে। সেখান থেকে আমরা যাত্রা করব চোখের জলের চলার পথ বেয়ে, জানব এর গঠন ও কাজের গোড়ার কথা।

চোখের জলের সত্যিকারের জলীয় অংশটি তৈরি করে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি। এর অবস্থান অক্ষিকোটরের বাইরের দিকে ঠিক ভ্রুর শেষ সীমানার নিচে। এখান থেকে কয়েকটি ছোট্ট নালিকার মাধ্যমে এই চোখের জল এসে প্রবাহিত হয় চোখের ওপর দিয়ে।চোখের যে অংশটুকু আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই, তার মধ্যে সাদা অংশটুকুর কেতাবি নাম স্ক্লেরা। তার ওপরে থাকে কনজাংকটিভা নামের একটি পাতলা স্বচ্ছ আবরণ, যা চোখের পাতার প্রান্তে এসে প্রতিফলিত হয়। ফলে চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় এটি কাজ করে একটি ছোট্ট থলে হিসেবে, যেখানে সাকল্যে জায়গা হতে পারে একটিমাত্র অশ্রুবিন্দুর।

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখ জ্বলে? জানুন বাঁচার উপায়
চোখের জলের সত্যিকারের জলীয় অংশটি তৈরি করে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি। এর অবস্থান অক্ষিকোটরের বাইরের দিকে ঠিক ভ্রুর শেষ সীমানার নিচে।

চোখের জল কিন্তু এই থলেতে আটকে থাকে না; বরং প্রতিটি পলক ফেলার সঙ্গে সঙ্গে আগের জলের স্তর চোখ থেকে বেরিয়ে যায়, নতুন জলের স্তর এসে ছড়িয়ে পড়ে চোখের ওপর। কিন্তু কোথায় যায় এই জল?

চোখের দুই পাতারই ভেতরের দিকে একটু লক্ষ করলে দুটি ছোট্ট ছিদ্র দেখা যাবে। এদের বলা হয় ল্যাক্রিমাল পাংকটা। এখান থেকে শুরু হয় ল্যাক্রিমাল ড্রেনেজের ব্যবস্থা। এই পাংকটার পরের অংশটি হলো ল্যাক্রিমাল ক্যানালিকুলি বা নালিকা, যার মাধ্যমে চোখের জল গিয়ে পৌঁছায় ল্যাক্রিমাল থলেতে, যার অবস্থান চোখের একদম ভেতরের কোনায়, নাকের ঠিক বাইরের অংশে। এর শেষের প্রলম্বিত অংশ হলো ন্যাসোল্যাক্রিমাল ডাক্ট বা নেত্রনালি, যা গিয়ে শেষ হয় নাকের একদম নিচের অংশে। এই পুরো প্রণালির মাধ্যমে চোখের জল প্রবাহিত হয়ে নাকে পৌঁছায়, যা কান্না করার সময় বেশ ভালোভাবেই টের পাওয়া যায়। একই সঙ্গে নাসা গলবিল দিয়ে গলায়ও পৌঁছায়। এ কারণে কান্না করার সময় মুখেও অনুভূত হয় লবণাক্ত ভাব।

এই পুরো প্রণালির কোথাও বাধা থাকলে তৈরি হয় নেত্রনালির প্রদাহ (Dacryocystitis), যা একদিকে যেমন চোখের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তেমনি মস্তিষ্কের ভেতরেও ঘটাতে পারে সংক্রমণ।

অশ্রুর প্রবাহ তো বোঝা গেল, তবে কী হতো, যদি এই প্রবাহ না থাকত? সেটা জানার জন্য আরেকটু ভেঙেচুরে দেখতে হবে এর গড়ন, তবেই বোঝা যাবে এর সত্যিকারের কাজ।

চোখ কীভাবে কাজ করে
চোখের দুই পাতারই ভেতরের দিকে একটু লক্ষ করলে দুটি ছোট্ট ছিদ্র দেখা যাবে। এদের বলা হয় ল্যাক্রিমাল পাংকটা। এখান থেকে শুরু হয় ল্যাক্রিমাল ড্রেনেজের ব্যবস্থা।

চোখের জল কিন্তু কেবলই জল নয়, এখানে আছে আরও নানা রাসায়নিকের সমন্বয়। পাঠকের নিশ্চয় মনে আছে, কনজাংকটিভা কেবল স্ক্লেরার ওপর থাকে। তবে মাঝের স্বচ্ছ অংশ; অর্থাৎ কর্নিয়া, সেখানে কি পৌঁছায় না এই জলের স্পর্শ?

মোটেই নয়; বরং কর্নিয়ার ওপরই চোখের জলের স্তর সবচেয়ে সুগঠিত, যাকে বলা হয় প্রি–কর্নিয়াল টিয়ার ফিল্ম (Pre-corneal tear film)। অশ্রুর এই স্তরের সবচেয়ে ভেতরের অংশটি হলো মিউকাস স্তর, যা তৈরি করে কনজাংকটিভা আর কর্নিয়ার বিশেষায়িত গবলেট কোষ। এ স্তর কাজ করে অশ্রুর স্তরের আঠালো ভিত্তি হিসেবে। এর ওপর ছড়ানো থাকে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিতে তৈরি হওয়া জলীয় অংশটির স্তর। এই স্তরের ওপর ছড়ানো থাকে একটি তৈলাক্ত স্তর। তেল আর জল কীভাবে মেশে, তা–ই ভাবছেন তো? এ জন্য এ দুটির মাঝখানে থাকে জল–আকর্ষী কিছু প্রোটিন আর তার সঙ্গে যুক্ত ফসফোলিপিডের স্তর। চোখের পাতার বিশেষায়িত গ্রন্থিগুলোয় তৈরি এই তৈলাক্ত স্তর ঠিক ছাতার মতো ছড়িয়ে থেকে অশ্রুর জলীয় স্তরকে বাষ্পীভূত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে, ফলে বজায় থাকে এই অশ্রুস্তরের পুরুত্ব।

এত যে জটিল স্থাপত্য, তার গুরুত্ব যে কেবল নান্দনিকতায় নয়; তা নিশ্চয়ই পাঠকেরা এতক্ষণে আঁচ করতে পেরেছেন। মিউকাস স্তর পুরো কাঠামোকে স্থিতিশীলতা দেয়, তৈলাক্ত স্তর বাঁচায় উবে যাওয়ার হাত থেকে। আর এ দুটির সাহায্যে জায়গামতো বসে নিজের কাজ করে আমাদের জলকামান।

দুটি চোখ থাকার সুবিধা কী
চোখের পাতার বিশেষায়িত গ্রন্থিগুলোয় তৈরি এই তৈলাক্ত স্তর ঠিক ছাতার মতো ছড়িয়ে থেকে অশ্রুর জলীয় স্তরকে বাষ্পীভূত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে, ফলে বজায় থাকে এই অশ্রুস্তরের পুরুত্ব।

অশ্রুর স্তর স্বচ্ছ কর্নিয়াকে আলোর প্রতিসরণের জন্য আরও বেশি মসৃণ ও উপযোগী করে তোলে। কর্নিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য এতে কোনো রক্তনালির সরবরাহ নেই। এর পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের একটা অংশ সরবরাহ করে এই চোখের জলের স্তর। তবে এখানেই শেষ নয়; বরং কেবল শুরু। চোখের জলের মধ্যে থাকে কিছু বিশেষায়িত প্রোটিন, যার মধ্যে আছে লাইসোজাইম, ল্যাকটোফেরিন ও IgA অ্যান্টিবডি। লাইসোজাইম ক্ষতিকর অণুজীবদের সরাসরি ধ্বংস করে, ল্যাকটোফেরিন অণুজীবের বিস্তারে বাধা দেয় আর অ্যান্টিবডি ক্ষতিকর অণুজীব ও পদার্থকে নিষ্ক্রিয় করে।

আমাদের এই জলকামান শত্রুদের ধ্বংস করার পাশাপাশি নিজের রক্ষণাবেক্ষণের কাজও করে ভীষণ দক্ষতার সঙ্গে। চোখ থেকে ক্ষতিকর পদার্থ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সেই সঙ্গে চোখে কোনো রকম ক্ষত হলে, সেটা সারিয়ে তুলতেও এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে। ল্যাক্রিমাল গ্রন্থিতে তৈরি হওয়া গ্রোথ ফ্যাক্টর বয়ে নিয়ে আসে এটি, যা তাড়াতাড়ি চোখের ক্ষয়পূরণে সাহায্য করে। ঠিক এ কারণেই চোখে কোনো রকম আঘাত লাগলে অশ্রুক্ষরণ বেড়ে যেতে পারে কয়েক শ গুণ পর্যন্ত।

কিন্তু কী হবে, যদি এই জলকামান ঠিকমতো কাজ না করে? সেই অবস্থারই নাম ‘ড্রাই আই’ (Dry eye)।

কাঁদলে চোখ লাল হয় কেন
ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার চোখের শুষ্কতা তৈরির পেছনে অনেকটাই দায়ী। চোখের এই শুষ্কতা কেবল অস্বস্তিকরই নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর হলে এটি নানা রকম জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।

চোখ বিভিন্ন কারণে শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। মোটাদাগে দেখলে দুটি ভাগ দেখা যায়, চোখের জল কম তৈরি হওয়া কিংবা স্বাভাবিক পরিমাণে তৈরি হওয়া জল অস্বাভাবিকভাবে তাড়াতাড়ি বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়া। কারখানায় গোলযোগ নানা কারণে হতে পারে, তার মধ্যে আছে বিভিন্ন অটোইমিউন রোগ, ইনফেকশন থেকে শুরু করে জিনগত নানা কারণ। আর তাড়াতাড়ি বাষ্পীভূত হওয়ার পেছনে রয়েছে তৈলাক্ত ছাতাটার কার্যক্রমে ব্যাঘাত। চোখের পাতায় তৈরি হওয়া এই তৈলাক্ত স্তর চোখে যথাযথভাবে ছড়িয়ে পড়ার পেছনে চোখের পলক ফেলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পলক ফেলার হার কমে গেলে এই স্তরের পুরুত্বও কমতে থাকে, অবস্থা চরমে পৌঁছালে এটি একেবারে অনুপস্থিতও থাকতে পারে। ফলে তখন জলীয় স্তরের বাষ্পীভবনে বাধা দেওয়ার আর কোনো উপায় থাকে না। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার এভাবে চোখের শুষ্কতা তৈরির পেছনে অনেকটাই দায়ী। চোখের এই শুষ্কতা কেবল অস্বস্তিকরই নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর হলে এটি নানা রকম জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে; যার মধ্যে রয়েছে কর্নিয়ার প্রদাহ থেকে শুরু করে কর্নিয়ায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি পর্যন্ত দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেওয়ার মতো সমস্যা। এ থেকে বাঁচতে হলে নির্দিষ্ট সময় পরপর চোখের পলক ফেলাটা খুবই জরুরি। এ ছাড়া ব্যবহার করা যেতে পারে ‘২০–২০–২০’ নিয়ম; অর্থাৎ ২০ মিনিট স্ক্রিনটাইমের পরে ২০ মিটার দূরে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা, তারপর আবার কাজে ফেরত যাওয়া।

এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, পৃথিবীকে পরিষ্কারভাবে দেখার জন্য মাঝেমধ্যে একটু চোখের পাতা ফেলাও দরকার, যেন সেই পলকের তালে তালে আমাদের এই জলকামান ঠিকভাবে তার কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিতপেঁয়াজ কাটলে চোখ জ্বালা করে কেন

Read full story at source