সন্তানদের পড়াশোনার ভালো খবর ছাড়া আমার জীবনে আনন্দ বলে কিছু নাই

· Prothom Alo

‘মায়ের অভাব বাবা কোনো দিন বুঝতে দেননি। আমরা বড় হয়েছি, নিজের কাজ নিজে করতে শিখেছি। এখন বাবাকে বিয়ে করতে বলি, রাজি হন না। আমাদের খুব ভালোবাসেন। বাবা হয়তো একটু আগে খেতে বসেছেন, আমি গিয়ে বাবার প্লেটেই বসে পড়ি। সবার বাবাই হিরো, কিন্তু আমার বাবা সুপারহিরো,’ বলছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আখি মনি। দুবেলা দিনমজুরি করে মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন আখির বাবা আলেক মোল্লা।

বাড়ি রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ফুলবাড়ী। ১৭ জুন সেখানে গিয়েছিলাম। টিনে ঘেরা ছোট্ট একটা খুপরি। চারদেয়ালের ঘর বলতে গেলে একটাই, ভেতরে দুইটা বিছানা। আরেকটা বিছানা আছে গোয়ালঘরের সঙ্গে। আখিরা দুই ভাই–বোন, বাবা, দাদা-দাদি, ফুফু, ফুফাতো ভাই মিলে সাতজনের বাস এই বাড়িতে। আঁখির বাবা একাই রোজগেরে। দুবেলা মজুর খাটেন। সকাল থেকে বেলা একটা পর্যন্ত কাজ করলে ৪০০-৫০০ টাকা পান। বেলা তিনটা থেকে কাজ করলে আসে ২৫০-৩০০। চাহিদার ওপর মজুরি নির্ভর করে। আলেক মোল্লা দুই বেলায়ই খাটেন।

Visit casino-promo.biz for more information.

প্রায় এক ইঞ্চি লম্বা মাছের কাঁটা বিঁধেছিল বাবার গলায়, বের করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হলো আমাদের

মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করতে গিয়ে ঋণ নিতে হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে ১ হাজার ১০০ টাকা কিস্তি টানেন। তবু হাসিমুখে বললেন, ‘সন্তানদের পড়াশোনার ভালো খবর ছাড়া আমার জীবনে আনন্দ বলে কিছু নাই।’

৪৫ বছর বয়সী আলেক মোল্লার যখন বিবাহবিচ্ছেদ হয়, মেয়ে তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। তারপর আর বিয়ে করেননি। আলেক বলেন, ‘জীবনের তিন ভাগের দুই ভাগ চলে গেছে, আর এক ভাগ বাকি। এইটুকু দিয়ে ছেলে-মেয়ের একটা উন্নত জীবন গড়ে যেতে চাই। অনেকে তো অষ্টম শ্রেণির পর মেয়েকে আর পড়ালেখা করায় না, বিয়ে দিয়ে দেয়। কিন্তু আমার কখনো এমন চিন্তা মাথায় আসেনি। পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে। তখন ভালো বিয়ে দিতে পারব। মেয়েও জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে।’

টিনে ঘেরা ছোট্ট একটা খুপরি এই পরিবারটির ঠিকানা

সম্বল বলতে আছে কেবল একটুকরা ভিটে। কৃষিজমি নেই। আলেক মোল্লা নিজে খুব বেশি পড়ালেখা করেননি। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে গিয়েছেন। এরপর ২–৩ বছর পড়েছেন বাড়িতেই। পাশাপাশি বাবার সঙ্গে কাজ করতেন তিনি।

আঁখির ইচ্ছা ছিল চিকিৎসক হবেন। অল্পের জন্য মেডিক্যালে সুযোগ হয়নি। শেষ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি বিভাগে। ক্লাস এখনো শুরু হয়নি। আঁখির ছোট ভাই রাব্বি রায়হান পড়ে ফুলবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে।

দুই ভাই–বোনেরই পড়াশোনার যাত্রাটা সহজ ছিল না। এত দূর আসার পথে কেউ কেউ বিনা পয়সায় পড়িয়েছেন, স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা খোঁজখবর রেখেছেন, সহায়তা করেছেন আত্মীয়রাও। সবার প্রতি বাবা-মেয়ে অশেষ কৃতজ্ঞ।

বাবা–মেয়ে কখনো কখনো এক প্লেটেই খেতে বসেন

আঁখি বলেন, ‘আমি চাই, বাবার জামাকাপড় ধুয়ে দেব; কিন্তু বাবা সুযোগই দেন না। নিজের কাজ নিজেই করেন। বাবার যত্নের কারণে মা ছাড়া থেকে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তা ছাড়া দাদি (মালেকা বেগম) মায়ের মতোই স্নেহ করেন।’

বাবাসহ পুরো পরিবারকে একটি সচ্ছল জীবন উপহার দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এখন পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন আঁখি মনি। কথা বলার সময় বাবার দিকে যখন তাকাচ্ছিলেন, চাহনিই বলে দিচ্ছিল, এই ‘বটগাছের ছায়া’ই তাঁর শক্তি।

আলাপের শেষে আলেক মোল্লা বলেন, ‘ওরা যখন ছোট ছিল, সারা দিন মাঠে কাজ করে এসে নিজেই ওদের পড়াতে বসেছি। খিদে পেলে ওরা যখন কিছু খেতে চেয়েছে, একটা বিস্কুটও দিতে পারি নাই, শুধু মুখে পানি দিয়ে রেখেছি। তখন খুব কষ্ট হতো। এই কষ্ট ভুলতে পারি না।’

২৭ বছর বয়সে এসে প্রথমবার বাবাকে ‘বাবা’ বলে ডাকলাম

Read full story at source