সিমেন্ট, বালু আর পানি দিয়ে নির্মাণ–মিশ্রণের উৎসবে মাতলেন শিক্ষার্থীরা

· Prothom Alo

ল্যাবের ভেতর একটা মৃদু যান্ত্রিক গুঞ্জন। ধাতব পাত্রে একে একে পরিমাপ করে ঢালা হচ্ছে ধূসর সিমেন্ট, দানাদার বালু আর পরিমিত পানি। সুইচটা চাপতেই চাকা ঘুরে উঠল, মিক্সচারের ব্লেডগুলো সশব্দে মেতে উঠল এক রসায়ন খেলায়। মিনিট কয়েকের মাথায় তৈরি হলো মসৃণ, সমসত্ত্ব এক মিশ্রণ—যাকে প্রকৌশলের ভাষায় বলে ‘মর্টার’। একদল তরুণ শিক্ষার্থী ঝুঁকে পড়ে দেখছেন সেই মিশ্রণের ঘনত্ব। কেউবা কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে সহপাঠীর দিকে তাকিয়ে হাসলেন, যেন নিখুঁত অনুপাত মেলাতে পারার এক গোপন তৃপ্তি! আজ শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের ল্যাবে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র।

ল্যাবের বাইরেও ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যানার ও ফেস্টুন, শিক্ষার্থীদের পদচারণে আর নানা আয়োজনের কোলাহলে দিনভর মুখর ছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। কেউ শেষ মুহূর্তে কুইজের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ গবেষণার পোস্টার টাঙাতে ব্যস্ত। আবার কোথাও ছোট ছোট দলে ভবিষ্যতের টেকসই নির্মাণসামগ্রী নিয়ে চলছে আলোচনা। সব মিলিয়ে চুয়েট যেন পরিণত হয়েছিল তরুণ পুরকৌশলীদের এক প্রাণবন্ত জ্ঞান-উৎসবে।

Visit moryak.biz for more information.

আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) চুয়েট স্টুডেন্ট চ্যাপটারের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে অংশ নেন দেশের আটটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। চুয়েট ছাড়াও অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), আহছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস (ইউআইটিএস) এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসা, কৃষি ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (আইইউবিএটি) এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপটার।

সকালের প্রথম ভাগেই কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের করিডরে ভিড় জমাতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। কুইজ ও বিজনেস কেস প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে নিবন্ধন ডেস্কের সামনে ছিল দীর্ঘ সারি। প্রতিযোগিতা শুরুর পর হলরুমজুড়ে নেমে আসে একধরনের মনোযোগী নীরবতা। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, নির্মাণ খাতের বাস্তব সমস্যার সমাধান বের করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন অংশগ্রহণকারীরা। একই সময়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তুলে ধরেন নির্মাণ খাতের বর্তমান বাস্তবতা ও টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক। বক্তব্য দেন বিএসআরএম, হোলসিম ও পিডিএলের কর্মকর্তারা।

দুপুর ১২টায় অনুষ্ঠিত হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী পর্ব। এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মাহমুদ আব্দুল মতিন ভুইয়া, চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক রিয়াজ আকতার মল্লিক, এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপটারের সম্পাদক অধ্যাপক রুপক মাতসুদ্দি ও সভাপতি তারেক উদ্দিন, এসিআই বাংলাদেশ চ্যাপটারের পরিচালক ও চুয়েট এসিআইয়ের অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম। তাঁদের আলোচনায় উঠে আসে দেশের নির্মাণশিল্পের বর্তমান বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণার গুরুত্ব।

তবে দুপুরের পর সবচেয়ে বেশি প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যায় পুরকৌশল বিভাগের ল্যাবে। শুরু হয় ‘মর্টার কার্যক্ষমতা পরীক্ষা প্রতিযোগিতা’। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট অনুপাতে সিমেন্ট, বালু ও পানি মিশিয়ে মর্টার প্রস্তুত করেন। কেউ অনুপাত নির্ধারণে ব্যস্ত, কেউ মিশ্রণের গঠন ঠিক আছে কি না, তা খুঁটিয়ে দেখছেন। বিচারকদের সামনে নিজের দলের নমুনা জমা দেওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতেও ছিল না কোনো কমতি। বাস্তব নির্মাণকাজে মর্টারের ব্যবহারিক সক্ষমতা কতটা হবে, তারই এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি যেন ফুটে উঠছিল এই প্রতিযোগিতায়।

প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজিত হয় টেকসই নির্মাণসামগ্রী নিয়ে বিশেষ সেমিনার ও প্রশ্নোত্তর পর্ব। এতে অংশ নেন বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আ ফ ম সাইফুল আমিন এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মুশতাক আহমেদ। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী, গবেষণার নতুন ক্ষেত্র এবং ভবিষ্যতের অবকাঠামো উন্নয়নের নানা দিক।

দিনের শেষভাগে অংশগ্রহণকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপটার নিজেদের কার্যক্রম, অর্জন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে। পোস্টার প্রেজেন্টেশনের সামনে ভিড় করেন শিক্ষার্থীরা একে অপরের গবেষণা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। কেউ প্রশ্ন করছেন, কেউ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, কেউবা নতুন কোনো ধারণা নিয়ে আলোচনা করছেন। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের এই পরিবেশই যেন আয়োজনটির মূল আকর্ষণ হয়ে ওঠে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চুয়েটের উপাচার্য বলেন, বাস্তব অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও শিল্প খাতের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমেই একজন দক্ষ প্রকৌশলী গড়ে ওঠেন। এমন আন্তবিশ্ববিদ্যালয় আয়োজন শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতার বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে।

চুয়েট এসিআই–এর অনুষদ উপদেষ্টা অধ্যাপক জিএম সাদিকুল ইসলাম বলেন, এই আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকদের ধন্যবাদ জানাই আমাদের পাশে থাকার জন্য। এই ধরনের আয়োজন সারা দেশজুড়ে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও হলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত প্রস্তুতি আরও সমৃদ্ধ হবে।

আয়োজন সম্পর্কে ইসলামী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী রাইসা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। পুরো আয়োজনটাই ছিল সুশৃঙ্খল। আলাদা করে সবার জন্য ব্যবস্থা ছিল, কোনো ভোগান্তি হয়নি। অনেক কিছু শিখতে পেরেছি।’

বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগেও চুয়েটে এসেছি। তবে এবার মর্টার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসে অভিজ্ঞতাটা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা সত্যিই প্রশংসনীয়।’

আয়োজকদের পক্ষ থেকে এসিআই চুয়েটের সভাপতি আসহাব লাবিব প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা যেমন একে অপরের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি বাস্তব প্রকৌশল সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হওয়ারও সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীদের গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্প খাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে হবে। এসিআই সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করে যাবে।

Read full story at source