সরকারি বাজেট এবং ইসলামের ‘বায়তুল মাল’ ব্যবস্থা
· Prothom Alo

জাতীয় বাজেটের কেন্দ্রে একটা হিসাব-নিকাশ থাকে—রাষ্ট্র কোথা থেকে আয় করবে আর কোথায় তা ব্যয় করবে। যদিও বাজেটের দর্শন হলো সম্পদের সুষম বণ্টন এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া।
কিন্তু বর্তমান ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বাজেট অনেক সময়ই মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির স্বার্থরক্ষা এবং প্রান্তিক মানুষকে করের জালে বন্দী করার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
Visit michezonews.co.za for more information.
ঠিক এই জায়গাতেই ইসলামের রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা, যা ‘বায়তুল মাল’ (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) নামে পরিচিত, তা এক কালজয়ী বিকল্প হিসেবে হাজির হয়। যার মূলে রয়েছে খোদায়ি আমানতদারিতা ও নিখাদ মানবকল্যাণ।
বায়তুল মাল ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, এর একটি অংশ সব সময় সমাজের দরিদ্রতম মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় নিবেদিত থাকত। ফলে রাষ্ট্রের মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও প্রান্তিক মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না।
বাজেটের ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
আধুনিক কল্যাণকামী রাষ্ট্রগুলোতে বাজেটের মূল লক্ষ্য থাকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি অর্জন। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান জ্যামিতিক হারে বাড়ে।
ইসলাম এই কৃত্রিম অসমতাকে নির্দেশ করে বলেছে, ‘যাতে সম্পদ তোমাদের মধ্যকার শুধু বিত্তবানদের মধ্যেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা হাশর, আয়াত: ৭)
ইসলামি অর্থনীতির এই মূলনীতিই বায়তুল মালের ভিত্তি। সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের (ভ্যাট) বোঝা চাপানোর বদলে ইসলামে ধনীদের উদ্বৃত্ত সম্পদ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে আদায়কৃত ‘জাকাত’ ও ‘উশর’কে (ফসলের অংশ) আয়ের প্রধান উৎস বানানো হয়েছে। যেন সম্পদ ওপর থেকে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়।
সম্পদের ধারণা বদলেছে, বদলে যাক ওয়াক্ফের ধারণাওবায়তুল মালের আয়ের উৎস
ইসলামি ইতিহাসের স্বর্ণযুগে, বিশেষ করে ‘চার খলিফা’র আমলে বায়তুল মাল ছিল একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। বায়তুল মালেরও নির্দিষ্ট আয়ের খাত ছিল, যা সুশৃঙ্খলভাবে বণ্টন করা হতো।
ইমাম আবু ইউসুফ লিখেছেন, বায়তুল মালের প্রধান আয়ের উৎসগুলো ছিল জাকাত, উশর, খুমুস (খনিজ ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ), খারাজ (ভূমি রাজস্ব) ও জিজিয়া কর। এর মধ্যে জাকাতের খাতগুলো সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট এবং তা অন্য কোনো সাধারণ রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন বা প্রশাসনিক কাজে ব্যয় করার সুযোগ ছিল না। (কিতাবুল খারাজ, পৃষ্ঠা: ২১-২৪, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৭৯)
এখন যেমন ‘বাজেটঘাটতি’ মেটাতে রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ নিতে হয়, যা পরোক্ষভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটায়। কিন্তু বায়তুল মাল ব্যবস্থার সৌন্দর্য হলো, এর একটি অংশ (জাকাত ও সদকা ফান্ড) সব সময় সমাজের দরিদ্রতম মানুষের সামাজিক সুরক্ষায় নিবেদিত থাকত। ফলে রাষ্ট্রের মূল বাজেটে ঘাটতি থাকলেও প্রান্তিক মানুষ কখনো অনাহারে থাকত না।
ড. এম কবির হাসান, ইসলামি অর্থনীতিবিদউন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি অংশ জাকাত ও ওয়াক্ফ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যবহার করতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক সুরক্ষার বিশাল চাপ কমে যাবে।নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি দেখিয়েছেন, ইসলামে কর বা রাজস্ব আদায় তখনই জায়েজ, যখন তা জনগণের প্রত্যক্ষ কল্যাণে এবং বায়তুল মালের স্বাভাবিক উৎসগুলো অপর্যাপ্ত হলে সাময়িকভাবে করা হয়; অন্যথায় জনগণের ওপর জুলুমমূলক কর চাপানোর কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। (ড. এম নেজাতুল্লাহ সিদ্দিকি, রোল অব দ্য স্টেট ইন দ্য ইকোনমি: অ্যান ইসলামিক পারসপেক্টিভ, পৃষ্ঠা: ৬৮-৭০, দ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন, লেস্টার, ১৯৯৬)
খলিফা ওমরের ‘বাজেট নীতি’
রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় খলিফা উমরের (রা.) আমলটি বেশ অগ্রগামী ও দূরদর্শী ছিল। তিনিই প্রথম ইসলামের ইতিহাসে ‘দেওয়ান’ বা রাষ্ট্রীয় রেজিস্টার খাতা তৈরি করেন, যা ছিল মূলত একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট ও বণ্টন পরিকল্পনা।
তিনি বায়তুল মালের অর্থ দিয়ে প্রতিটি নাগরিকের, তাঁরা মুসলিম হোন বা অমুসলিম, ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি নবজাতক শিশুদের জন্যও বায়তুল মাল থেকে ভাতার অনুদান বরাদ্দ ছিল। (ইবনে জারির তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৪/২২০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, বৈরুত, ১৯৮৭)
একবার সিরিয়া সফরে এক বৃদ্ধ ইহুদি নাগরিককে ভিক্ষা করতে দেখে খলিফা উমর (রা.) আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমরা তোমার যুবক বয়সে তোমার থেকে জিজিয়া (কর) নিলাম, আর এখন বৃদ্ধ বয়সে তোমাকে অবহেলা করছি! এটা কখনো হতে পারে না।’
তিনি তৎক্ষণাৎ বায়তুল মালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেন যেন ওই বৃদ্ধ এবং তাঁর মতো সমস্ত অক্ষম মানুষের জন্য বায়তুল মাল থেকে স্থায়ী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। (আবু উবায়েদ আল-কাসিম ইবনে সালাম, কিতাবুল আমওয়াল, ৪৬, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)
সম্পদ যেভাবে পরিশুদ্ধ করবেনরাষ্ট্রীয় ব্যয়ে আমানতদারিতা
বাজেট পাসের পর দেখা যায়, আমলাতন্ত্রের বিলাসিতা, অহেতুক প্রকল্প এবং ভিআইপি সংস্কৃতির পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থের এক বিশাল অংশ অপচয় হয়। তবে ইসলামের বায়তুল মালের এক একটি পয়সা জনগণের আমানত, যার হিসাব শাসককে আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।
চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) পারস্যের প্রশাসক জিয়াদ ইবনে আবিহির কাছে লেখা চিঠিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সতর্ক করেন।
তিনি লেখেন, ‘আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, যদি জানতে পারি তুমি মুসলমানদের রাষ্ট্রীয় সম্পদ (বায়তুল মাল) থেকে ছোট বা বড় কোনো অংশ নিজের স্বার্থে আত্মসাৎ করেছ, তবে আমি তোমার বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেব যা তোমাকে নিঃস্ব, ভারী বোঝার নিচে পিষ্ট এবং কলঙ্কিত করে ছাড়বে।’ (শরিফ রাজি সংকলিত, নাহজুল বালাগাহ, পৃষ্ঠা: ৪২৪, দারুল কুতুবিল লুবনানি, বৈরুত, ১৯৭১)
ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ ওমর চাপরা তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। শাসক এখানে সম্পদের মালিক নন, বরং একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র। (ড. এম ওমর চাপরা, ইসলাম অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট, পৃষ্ঠা: ৪৫-৪৭, ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ইসলামাবাদ, ১৯৯৩)
ইসলামি রাষ্ট্রে বাজেট প্রণয়নের মূল ভিত্তিই হলো ‘আদল’ (ইনসাফ) ও ‘ইহসান’ (দয়া)। শাসক এখানে সম্পদের মালিক নন, বরং একজন ট্রাস্টি বা জিম্মাদার মাত্র।
বায়তুল মাল দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা
আমাদের রাষ্ট্রীয় আয়ের একটা বড় অংশ চলে যায় ঋণের সুদ পরিশোধে এবং অনুৎপাদনশীল খাতে। এই চক্র থেকে বের হতে হলে সামষ্টিক বাজেটের দর্শনে কাঠামোগত পরিবর্তন দরকার।
ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের শেখায় কীভাবে জাকাত এবং ওয়াক্ফকে (জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত সম্পদ) প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে জাতীয় বাজেটের পরিপূরক হিসেবে দাঁড় করানো যায়।
ইসলামি অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি তাদের মোট জিডিপির একটি অংশ জাকাত ও ওয়াক্ফ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সরাসরি দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যবহার করতে পারে, তবে সরকারের রাজস্ব বাজেটের ওপর থেকে সামাজিক সুরক্ষার বিশাল চাপ কমে যাবে। (ড. এম কবির হাসান, ইসলামিক ফাইন্যান্স: প্রিন্সিপালস অ্যান্ড প্র্যাকটিস, পৃষ্ঠা: ১১২-১১৫, এডওয়ার্ড এলগার পাবলিশিং, ইউকে, ২০১৩)
ইসলামের বায়তুল মাল ব্যবস্থা আমাদের মানবতা, সুশাসন এবং আস্থার এক চমৎকার ভারসাম্যপূর্ণ পথ দেখায়। বাজেট শুধু ধনীদের আরও ধনী করার আইনি দলিল হওয়া উচিত নয়; বরং এর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।
বাজেট, মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবন: ইসলাম কী বলে