মিরাকল অব বার্ন: জার্মানির পুনর্জন্ম

· Prothom Alo

একটি ফুটবল ম্যাচ কি পুরো একটি দেশের ভাগ্য বদলে দিতে পারে? ইতিহাস অবশ্য সে কথাই বলে। রাজনীতি আর খেলা দূরদূরান্তের ব্যাপার হলেও মাঝেমধ্যে দুটো বিন্দু মিলে যায় এক প্রান্তে। ১৯৫৪ বিশ্বকাপের বৃষ্টিস্নাত বিকেলবেলা বদলে দিয়েছিল পুরো জার্মান জাতির ভবিষ্যৎ। ‘মিরাকল অব বার্ন’ নতুন করে স্বপ্ন দেখানো শুরু করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরাজিত জার্মান জাতিকে।

​দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৫৪ সালে ইউরোপে আবারও ফেরে বিশ্বকাপ। আগের বিশ্বকাপে অক্ষশক্তির দেশগুলোকে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ না দিলেও এবার সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে ফেলা হয়। ফলে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ মেলে জার্মানির। সবাইকে চমকে দিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালেও জায়গা করে নেয় পশ্চিম জার্মানি। আর প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরি। সেই সময়ের হাঙ্গেরিকে ধরা হতো ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ দল, তাদের ডাকা হতো ‘ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স’। মাঠে নামার আগেই ফলাফল জেনে যেত সকলে। চার বছর ধরে অপরাজিত দলের বিপক্ষে দাঁড়ানোর সামর্থ্য ছিল না কারও। এমনকি ফাইনালে মুখোমুখি হওয়া পশ্চিম জার্মানিও গ্রুপ পর্বে বিধ্বস্ত হয়েছিল ৮-৩ গোলে।

Visit amunra.qpon for more information.

ধার করা জুতায় গোল্ডেন বুট

ফাইনালটাও তাই হওয়ার কথা ছিল একপেশে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত, পেশাদার ফুটবলের অভিজ্ঞতাহীন পশ্চিম জার্মানি অন্যদিকে টানা ৩২ ম্যাচ জেতার অভিজ্ঞতা নিয়ে ফাইনালে আসা হাঙ্গেরি। অসম এক লড়াই দেখতেই সুইজারল্যান্ডের বার্নে হাজির হয়েছিলেন ৬৩ হাজার মানুষ।

ফাইনাল শুরুর আগে দুই দলের অধিনায়ক

শুরুতে হয়েছিল সেটাই। মাত্র আট মিনিটের মাথায় হাঙ্গেরি এগিয়ে গেল ২-০ গোলে। হাঙ্গেরির সমর্থকেরা উদ্‌যাপনের প্রস্তুতি নিতে থাকলেন, জার্মান ভক্তরা তো ভাবতে শুরু করলেন গ্রুপ পর্বের মতো লজ্জায় না পড়তে হয় তাঁদের! ম্যাচের আগে থেকেই মাঠ ছিল বৃষ্টিতে খেলার অনুপযুক্ত। সেই সঙ্গে আবার বৃষ্টি। সব মিলিয়ে এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। কিন্তু সেই মুষলধারে বৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে দিল ম্যাচের দৃশ্যপট।

বার্নের কর্দমাক্ত মাঠে লড়াই তখন টিকে থাকার। পিচ্ছিল মাঠে হাঙ্গেরির খেলোয়াড়েরা নিজেদের স্বাভাবিক খেলা দূরে থাক, দাঁড়িয়ে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন। অন্যদিকে জার্মানদের কোনো হেলদোলই নেই। বরং স্বাভাবিকের চেয়েও ভালো খেলছিল তারা। কারণ, জার্মান খেলোয়াড়দের বুট। জার্মানির তৎকালীন বুট সরবরাহকারী ছিল অ্যাডিডাস। তাদের মালিক অ্যাডি ড্যাসলার বিশ্বকাপের জন্য তৈরি করেছিলেন নতুন ‘স্ক্রু-ইন স্টাড’ বুট। এখন যেটাকে সবাই চেনে স্পাইক হিসেবে। হাঙ্গেরি যেখানে হোঁচটের পর হোঁচট খাচ্ছে, সেখানে জার্মানরা ১০ মিনিটের মধ্যে ফেরে সমতায়।

বিশ্বকাপের উদ্ধারকর্তা কুকুর

​ম্যাচের ৮৪ মিনিটে লিড পেল জার্মানি। কর্নার থেকে ক্লিয়ার হওয়া বল ডি-বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে জালে জড়িয়ে দিলেন হেলমুট রান। পুরো বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পিছিয়ে পড়ল হাঙ্গেরি। আর সেই পিছিয়ে পড়ই হলো কাল। সেখান থেকে আর ফিরে আসা হলো না ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্সের।

হেলমুট রানের সেই বিখ্যাত গোল

যদিও ২ মিনিটের মধ্যেই সেই গোল ফেরত দেন পুসকাস। কিন্তু তা মানতে নারাজ ছিলেন রেফারি; বরং লাইন্সম্যানের সঙ্গে আলোচনা করে অফসাইড ট্যাগ দিয়ে বাতিল করেন সে গোল। রেফারি হয়তো ভুলেই গিয়েছিলেন টিভি পর্দায় সরাসরি দেখানো হচ্ছে এ ম্যাচ। নিশ্চিত গোলকে অফসাইড বলে বাতিল করায় তখনই সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় রেফারির ওপর দিয়ে। ম্যাচে বাকি ৪ মিনিটে আর কিছুই করতে পারেনি হাঙ্গেরি।

৩-২ ব্যবধানে জিতে ইতিহাস গড়ল পশ্চিম জার্মানি। পুসকাসদের হাঙ্গেরি চার বছরের মধ্যে প্রথম হার দেখল বিশ্বকাপের ফাইনালে। অপরাজেয় তকমা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের নাম লেখাল পশ্চিম জার্মানি।

আলজেরিয়াকে হারাতে দুই ইউরোপিয়ান দলের পাতানো ম্যাচ

বার্নে সেদিন শুধু রেফারি নন, অনেক কিছুই ছিল হাঙ্গেরির বিপক্ষে। ম্যাচের আগে বৃষ্টিতে মাঠ হয়ে পড়েছিল খেলার অনুপযুক্ত। হাঙ্গেরি খেলতে না চাইলেও জোর করে ফাইনালে তাদের মাঠে নামায় ফিফা। এমনকি দাবি উঠেছিল, ম্যাচের হাফটাইমে শরীরে অতিরিক্ত ‘ভিটামিন সি’ পুশ করেছিল জার্মান দল, যা ছিল সে সময়কার নিষিদ্ধ ড্রাগ। যত দিনে প্রমাণ পাওয়া গেছে, তত দিনে দুই দেশের ফুটবল মোড় নিয়েছে দুই দিকে।

‘মিরাকল অব বার্ন’ বদলে দিয়েছিল পুরো ফুটবলের গতিপথ। এই জয় জার্মানির জন্য ফুটবলের চেয়েও বেশি ছিল রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গ্লানি আর পরাজয়ের হতাশায় ডুবে থাকা জার্মানরা এই জয়ের মাধ্যমেই প্রথমবার নিজেদের ‘জার্মান’ হিসেবে গর্ব করতে শুরু করেন।

বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ফ্রিটজ ওয়ালটার (মাঝে) ও কোচ সেপ হারবার্গার (বামে)। ছবি: এক্স

ফুটবলকে সঙ্গী করে শুরু হয় জাতি গঠন। অন্যদিকে অপরাজেয় হাঙ্গেরি রীতিমতো চুপসে যায় এই হারের পর। ফুটবল বিশ্বে নিজেদের নাম–যশ–প্রভাব সবই হারিয়ে ফেলতে থাকে ধীরে ধীরে। অন্যদিকে জার্মানি হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য। নিজেদের লিগ গড়ে তোলে, সেখান থেকে আজ তারা ফুটবল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দল।

পেলের ‘জুতা কাহিনি’

Read full story at source