মেয়েমানুষ নয়, মানুষ

· Prothom Alo

আজ যে শিশু জন্ম নিল, সে কি জন্মের মুহূর্তেই বুঝতে পারে, সে ছেলে না মেয়ে?

Visit betsport.cv for more information.

প্রথম কান্নার সঙ্গে কি সে জেনে যায়, এই পৃথিবীতে তাকে কোন পরিচয়ের ভার বহন করতে হবে?

না।

মানুষের গর্ভে একটি শিশু জন্ম নেয় মানুষ হয়ে। কিন্তু আমাদের সমাজ তাকে মানুষ থাকতে দেয় না। জন্মের পর থেকেই শুরু হয় বিভাজন, প্রত্যাশা আর বিচার।

প্রথমেই দৃষ্টি যায় শিশুর লিঙ্গের দিকে।

ছেলে হলে প্রশ্ন কম। মেয়ে হলে শুরু হয় মূল্যায়ন—গায়ের রং কেমন, নাক-মুখ কেমন, দেখতে কতটা সুন্দর। যেন তার মানবিক পরিচয়ের চেয়ে বাহ্যিক সৌন্দর্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ছেলের জন্য আকাশ খোলা থাকে। তাকে বলা হয়, ‘বড় হয়ে বিজ্ঞানী হবে, নেতা হবে, পৃথিবী বদলে দেবে।’ খেলার মাঠ, গল্পের বই আর কল্পনার ডানায় ভর করে সে ধীরে ধীরে বড় স্বপ্ন দেখতে শেখে। তাকে শেখানো হয় অর্জনের ভাষা, নেতৃত্বের ভাষা, আত্মবিশ্বাসের ভাষা।

অন্যদিকে মেয়েকে শেখানো হয় সুন্দর হতে, নম্র হতে, মানিয়ে নিতে। তার চারপাশে সাজিয়ে দেওয়া হয় পুতুল, ফুল আর সংসারের ক্ষুদ্র এক জগৎ। যেন তার ভবিষ্যৎ গবেষণাগারে নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নয়, বরং চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ।

পুতুল দেওয়া অন্যায় নয়। সমস্যাটা শুরু হয় তখন, যখন পুতুল খেলা হয়ে ওঠে ভবিষ্যৎ জীবনের মহড়া।

রান্না, সংসার, বিয়ে, সন্তান—একটি মেয়ের সামনে বারবার একই গল্প সাজিয়ে ধরা হয়। আর একটি ছেলে ধীরে ধীরে শিখতে থাকে বিশ্ব জয় করার প্রস্তুতি।

এ বৈষম্যের শুরু খেলনা থেকে, গল্প থেকে, ভাষা থেকে, পারিবারিক কথোপকথন থেকে। অজান্তেই আমরা একটি শিশুর স্বপ্নের সীমানা নির্ধারণ করে দিই।

চার-পাঁচ বছরের একটি মেয়ে গল্প শুনে জেনে যায়, রাজকন্যার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তার বিয়ে। গল্প শেষ হয় বিয়েতে, যেন মেয়েদের জীবনও সেখানেই পূর্ণতা পায়।

কিন্তু বাস্তব জীবন কোনো রূপকথা নয়।

বাস্তবে অধিকাংশ নারীকে নিজের যুদ্ধ নিজেকেই লড়তে হয়। কোনো স্বপ্নের রাজপুত্র এসে তাদের জীবন বদলে দেয় না। শিক্ষা, কর্ম, আত্মমর্যাদা ও সংগ্রামই তাদের পথ নির্মাণ করে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আমরা এখনো কেন মেয়েদের এমনভাবে বড় করি, যেন তাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হবে অন্য কেউ?

কেন একটি মেয়ের পরিচয় তার প্রতিভা, মেধা ও মানবিক গুণের আগে তার লিঙ্গ দিয়ে নির্ধারিত হবে?

আরও একটি প্রশ্ন আছে।

আমরা এখনো কেন ‘মেয়েমানুষ’ শব্দটি ব্যবহার করি?

শব্দটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হতে পারে। কিন্তু ভাষা কখনো নিরীহ নয়। ভাষা সমাজের মানসিকতার আয়না। ‘মানুষ’ শব্দের আগে যখন ‘মেয়ে’ বসিয়ে আলাদা একটি শ্রেণি তৈরি করা হয়, তখন অজান্তেই বোঝানো হয়, সে যেন পূর্ণ মানুষ নয়, মানুষ থেকে আলাদা কিছু।

ফলে ‘মানুষ’ যেখানে সমতার পরিচয়, সেখানে ‘মেয়েমানুষ’ শব্দটি বহু ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে সীমারেখা টেনে দেওয়ার হাতিয়ার।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

আমাদের সমাজে নারীর জন্য আলাদা নিয়ম আছে, আলাদা বিচার আছে, আলাদা নৈতিকতার মানদণ্ড আছে। রাতের রাস্তায় তার স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, পোশাক নিয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হয়, সাফল্য অর্জন করলে তার যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত পরিচয় বেশি আলোচিত হয়।

সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, নারীকে বারবার বোঝানো হয় যে সে দুর্বল।

ফলে অনেক নারীও একসময় তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। আত্মরক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিরোধের শিক্ষা না দিয়ে আমরা তাকে শেখাই ভয়। শেখাই নির্ভরতা। শেখাই সহ্য করতে।

অথচ প্রয়োজন ছিল উল্টো শিক্ষা; অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার শিক্ষা, নিজের অধিকার জানার শিক্ষা, শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার শিক্ষা।

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রেও আমরা প্রায়ই অপরাধীর বদলে ভুক্তভোগীকেই প্রশ্ন করি। তার পোশাক, চলাফেরা, সময়—সবকিছুর ব্যাখ্যা চাই। অথচ অপরাধীর মানসিকতা, তার বিকৃতি, তার অপরাধকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে ব্যর্থ হই।

আরও নির্মম হলো, যে মানুষ ধর্ষণের শিকার হয়, সমাজ তাকে একটি পরিচয়ে বেঁধে দেয়। যেন অপরাধের দায়ও তার কাঁধেই। কিন্তু অপরাধীকে ঘিরে একই সামাজিক ঘৃণা ও বর্জন খুব কমই দেখা যায়।

এভাবে কোনো সভ্য সমাজ গড়ে ওঠে না।

নারীকে দুর্বল ভেবে নয়, সক্ষম ভেবে বড় করতে হবে। তাকে রক্ষা করার নামে বন্দী নয়, স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। কারণ, নিরাপত্তা আসে না কেবল পাহারায়; নিরাপত্তা আসে শিক্ষা, সচেতনতা, আত্মবিশ্বাস ও ন্যায়বিচার থেকে।

চুড়ি, ফিতা, মালা কিংবা পোশাক সমাজকে বদলায় না। সমাজকে বদলায় দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে। কারণ, বৈষম্যের জন্ম পোশাকে নয়, চিন্তায়। সহিংসতার জন্ম নারীর উপস্থিতিতে নয়, বিকৃত মানসিকতায়।

তাই পরিবর্তনের শুরু হোক গোড়া থেকে।

আমরা আমাদের সন্তানদের শেখাই—কেউ নারী বলে ছোট নয়, কেউ পুরুষ বলে বড় নয়। একজন মানুষের মূল্য তার লিঙ্গে নয়, তার কর্মে; তার পরিচয়ে নয়, তার চরিত্রে; তার শরীরে নয়, তার মানবিকতায়।

কেউ অসাধারণ কোনো কাজ করলে আমরা যেন বলতে পারি—

‘একজন মানুষ কাজটি করেছেন।’

এটাই যথেষ্ট।

আগামী প্রজন্মের কাছে আমাদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হোক এই শিক্ষা—

মানুষের আগে কোনো পরিচয় নয়।

কারণ, পৃথিবীর সব মানুষের রক্তের রং এক।

তাই বলছি—

মেয়েমানুষ নয়, মানুষ।

এই পৃথিবীতে আমাদের সবার পরিচয় একটাই হোক—

হোক একটাই,

মেয়েমানুষ বা ছেলেমানুষ নয় ‘সকলেই মানুষ’

‘আমরা মানুষ’।

লেখক: আইনজীবী

Read full story at source