তিয়েনআনমেন স্কয়ারে কী ঘটেছিল, জানে না চীনের তরুণ প্রজন্ম
· Prothom Alo

সময়টা ১৯৮৯ সাল, চীন তখন উত্তাল। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনার দাবিতে রাজধানী বেইজিংয়ে চলছে তুমুল বিক্ষোভ। বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল শহরের তিয়েনআনমেন স্কয়ার। বিক্ষোভ দমাতে ৪ জুন প্রথম প্রহরে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে নিরস্ত্র ছাত্র–জনতার ওপর অস্ত্র হাতে হামলে পড়ে চীনের সামরিক বাহিনী, হত্যা করা হয় শত শত মানুষকে। তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রক্তঝরা সেই দিনের ৩৭তম বার্ষিকীতে প্রথম আলোর আজকের আয়োজন।
তিয়েনআনমেন স্কয়ার বা ট্যাংকম্যান—ইন্টারনেটে এ দুটি শব্দের যেকোনোটি লিখে সার্চ দিলেই ইতিহাসের এমন একটি পাতা সামনে চলে আসে, যা আজও রহস্যে ঘেরা।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
১৯৮৯ সালের ৪ জুন, চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে যেন নরক নেমে এসেছিল। গণতন্ত্রিক অধিকারের দাবিতে সড়কে অবস্থান নেওয়া ছাত্র–জনতার ওপর সেদিন নির্বিচার গুলি চলেছিল। আজ ৪ জুন বৃহস্পতিবার তিয়েনআনমেন স্কয়ারে রক্তক্ষয়ী সে ঘটনার ৩৭তম বার্ষিকী। সেদিন ঘটে যাওয়া দমন–পীড়ন আর নির্বিচার হত্যার প্রকৃত চিত্র আজও বিশ্ববাসীর সামনে আসতে দেয়নি চীন।
বরং চীন সরকার অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের তরুণ প্রজন্মকে কলঙ্কিত সেই অধ্যায় সম্পর্কে একেবারে অন্ধকারে রাখছে। চীনের বেশির ভাগ মানুষ, বিশেষ করে তরুণদের কাছে দিনটি এখন শুধুই ‘জুন ফোর্থ’, যেদিন শিক্ষার্থীরা তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ‘দাঙ্গা’ করেছিল।
এমনকি কেউ কেউ ‘জুন ফোর্থ’ কেন বিশেষ দিন বা সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল—সে সম্পর্কেও কিছু জানেন না। ২০১৯ সালে এবিসি নিউজ এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবিসি নিউজের প্রতিনিধিরা বেইজিংয়ে গিয়ে কয়েক চীনা শিক্ষার্থীর সঙ্গে তিয়েনআনমেন স্কয়ার নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই সেখানে ১৯৮৯ সালের ৪ জুন ঠিক কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। কেউ কেউ শুধু বলেন, সেদিন চীন সরকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভয়াবহ কিছু করেছিল। তাঁদেরকে ‘ট্যাংকম্যান’–এর ছবি দেখানো হলে বেশির ভাগই বলেন, তাঁরা ছবিটি সম্পর্কে জানেন না, কখনো দেখেননি।
নিষিদ্ধ নয়, তবু নিষিদ্ধ যে আলোচনা
এই যে চীনের তরুণ প্রজন্ম তিন দশকের বেশি সময় আগে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ঘটে যাওয়া সেই নৃশংসতা সম্পর্কে কিছুই জানে না, তার পেছনে রয়েছে রাষ্ট্রীয় সূক্ষ্ম সেন্সরশিপ। দেশটিতে পাঠ্যপুস্তকে সেদিনের ঘটনা নিয়ে একটি শব্দের উল্লেখও নেই। চীনের অনলাইন সার্চ ইঞ্জিনগুলোতে এ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। সেখানে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না।
এমন নয় যে দেশটিতে কোনো আইন করে তিয়েনআনমেন স্কয়ার নিয়ে আলোচনা নিষিদ্ধ। তবে এ বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার খেসারত হিসেবে আপনাকে চাকরি হারাতে হতে পারে, গ্রেপ্তার হতে পারেন বা একদিন স্রেফ গায়েব হয়ে যেতে পারেন।
চীনে ইন্টারনেটে বেনামেও এ নিয়ে আলোচনা সম্ভব নয়। কারণ, দেশটিতে আইন অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো প্রকৃত নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরের সঙ্গে সংযুক্ত; আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের যেকোনো ব্যক্তিগত তথ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিনিময় করতে বাধ্য থাকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তিতে তরতর করে এগিয়ে চলছে চীন। তিয়েনআনমেন স্কয়ারের স্মৃতি মুছে দিতে চীন সরকার এখন এআই প্রযুক্তির সহায়তাও নিচ্ছে।
গত বছর প্রকাশিত এবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এবিসি চীনের তৈরি এআই চ্যাটবট ‘ডিপসিক’–এর কাছে তিয়েনআনমেন হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। উত্তরে ডিপসিক বলেছিল, এ বিষয়টি আমার বর্তমান আলোচনার পরিধির বাইরে। আসুন, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলি।
তিয়েনআনমেন স্কয়ার নিয়ে কথা বলার কারণে চীনে অনেককে কারাবন্দী হতে হয়েছে। তাঁদের একজন মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা চীনা আইনজীবী চো হাং–তুং। ২০২১ সালে তাঁকে হংকং থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
চীনের নেতা দেং জিয়াওপিং (বাঁয়ে) ও হু ইয়াওবাংইতিহাসে চীনের কলঙ্কিত অধ্যায়ের শুরু যে পথে
গত শতকের আশির দশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের বদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল চীন। দেশটিতে বেসরকারি খাতে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমতি দিয়েছিল ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। বিদেশি বিনিয়োগও আসা শুরু করেছিল। চীনের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সেই সময়ে দেশটির নেতা দেং জিয়াওপিং।
অর্থনীতির বিকাশে সরকারের এই তৎপরতা ঘিরে দুর্নীতির উৎসবও শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলের অনেকেই মনে করতেন, অর্থনীতির এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হওয়া উচিত। অনেকে আবার কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন। এমন এক পরিস্থিতিতে আশির দশকের মাঝামাঝি চীনে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে।
ছাত্রদের ক্ষোভের কারণ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, তার বাস্তবায়নে ধীরগতি ও দুর্নীতি। ১৯৮৯ সালের শুরুতে আন্দোলন জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
ছাত্রদের বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে কমিউনিস্ট পার্টির উদারপন্থী নেতা হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যু। ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান। হু ইয়াওবাং দেশে অর্থনৈতিক বিকাশের পক্ষে ছিলেন।
১৯৮৬-৮৭ সালে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে চীনে ছাত্রদের নেতৃত্বে যে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, হু ইয়াওবাং সেই আন্দোলন দমনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার জেরে ১৯৮৭ সালের শুরুতে হু ইয়াওবাংকে কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইয়াওবাংয়ের মৃত্যু বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতাকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল।
হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুর পরদিন চীনের কয়েকটি শহরে ছাত্ররা শোক প্রকাশ করতে জড়ো হন। শোকসভাগুলো দ্রুতই বিক্ষোভ-সমাবেশে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ জানাতে চীনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জড়ো হতে শুরু করেন।
১৩ মে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অনশনে বসেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল— কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের আলোচনায় বসতে রাজি করানো। শিক্ষার্থীরা যে সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন, তাতে সমর্থন জানিয়ে সে সময় সারা দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বেইজিংয়ে জড়ো হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
১৯ মে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। সেদিন সন্ধ্যায় অনশন শেষ করেন শিক্ষার্থীরা; কিন্তু পরদিনই অবস্থান বদল করে সরকার, কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করতে বেইজিংয়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠেন বিক্ষোভকারীরা।
তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সেনাবাহিনীর একটি সাঁজোয়া যান উল্টে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরারাজধানীসহ সারা দেশের রাজপথে নামেন লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। এদিকে সামরিক আইন কার্যকর করতে রাজধানী ঘিরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার সেনা জড়ো করা হয়।
২ জুন চীনের পিপলস আর্মির সঙ্গে প্রথমবার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ান বিক্ষোভকারীরা। খালি হাতে সশস্ত্র সেনাদের অগ্রগতি ঠেকিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা।
৩ জুন রাতে চীন সরকার ‘যেকোনো উপায়ে’ বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ার খালি করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয় বলে জানা যায়। ওই নির্দেশে বলা হয়, ৪ জুন ভোর ছয়টার মধ্যে তিয়েনআনমেন স্কয়ার খালি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে সেনাদের ‘গুলি ব্যবহার করার অনুমতি’ দেওয়া হয়।
রাতের আঁধারে চীনের সেনাবাহিনী ট্যাংক, মেশিনগান, লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেনারা নির্বিচার গুলি চালান। সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানগুলো যখন তিয়েনআনমেন স্কয়ারে পৌঁছায়, বিক্ষোভে ক্লান্ত ছাত্ররা তখন ছিলেন ঘুমিয়ে।
নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা
৪ জুন ভোররাত থেকে তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হন বলে সে সময় জানিয়েছিল চীন সরকার। তাঁদের মধ্যে শতাধিক সেনাসদস্য ছিলেন বলেও দাবি করেছিল তারা।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন নিহত ব্যক্তির সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে।
সে সময়ে চীনে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত অ্যালেন ডোনাল্ড গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলে যে খবর পাঠিয়েছিলেন, তাতে ১৯৮৯ সালের ৩ ও ৪ জুন চীনে অন্তত ১০ হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। ২০১৭ সালে গোপন ওই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
৪ জুন থেকেই গণহারে ধরপাকড় চালায় চীন সরকার, ১ হাজার ৬০০ জনের বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়, ২৭ জনকে দেওয়া হয় ফাঁসি।
বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেওয়া ছবি ‘ট্যাংকম্যান’
বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ৪ জুন ঠিক কী ঘটছে, বিশ্ববাসী তখনো জানতে পারেনি। পরদিন ৫ জুন কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে তিয়েনআনমেন স্কয়ারের কয়েকটি ছবি প্রকাশ পায়।
ছবিগুলোতে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা একজনকে সড়কের চলন্ত ট্যাংকবহরের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর দুই হাতে দুটি শপিং ব্যাগ, যেন সবে বাজার করে বাড়ি ফিরছেন। ছবিতে থাকা ওই ব্যক্তির পরিচয় আজও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সারা বিশ্ব তাঁকে ‘ট্যাংকম্যান’ নামে মনে রেখেছে।
তিয়েনআনমেন স্কয়ারের কাছে সেদিন যে কয়েকজন আলোকচিত্রী ইতিহাসের ওই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছিলেন, তাঁদের একজন জেফ উইডনার। তিনি বেইজিংয়ের একটি হোটেলের কক্ষ থেকে ছবিটি তুলেছিলেন। আরেক আলোকচিত্রী স্টুয়ার্ট ফ্রাঙ্কলিনের তোলা ‘ট্যাংকম্যান’ ছবি টাইম সাময়িকীতে ছাপা হয়। তিনি ছবি তুলেছিলেন বেইজিং হোটেলের ব্যালকনি থেকে।
পরে এক সাক্ষাৎকারে স্টুয়ার্ট ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, এ ছবির মধ্য দিয়ে লোকটির অসাধারণ সাহস ফুটে উঠেছে। সমাজে ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে যেন তৈরি ছিলেন তিনি।
জলপাই সবুজ রঙের বিশাল আকারের ভয়ালদর্শন ট্যাংকগুলো একে একে স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে খুব সাধারণ ঘরানার এক ব্যক্তি সড়কের মাঝখানে ট্যাংকবহরের গতিপথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়েন। ৫ জুন, ১৯৮৯কর্তৃত্ববাদী শাসকের অপ্রতিরোধ্য শক্তির বিরুদ্ধে শুধু ব্যক্তিগত সাহসে ভর করে রুখে দাঁড়াবার প্রতীক হয়ে আছেন তিনি। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির সামনে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছিল শাসকের দুর্নিবার অস্ত্র, থেমে যেতে বাধ্য হয়েছিল ট্যাংকের চাকা।
আলোকচিত্রীরা ওই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ৪ জুন ট্যাংকের একটি বড় বহর তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দিকে যাচ্ছিল।
জলপাই সবুজ রঙের বিশাল আকারের ভয়ালদর্শন ট্যাংকগুলো একে একে স্কয়ারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখতে খুব সাধারণ ঘরানার এক ব্যক্তি সড়কের মাঝখানে ট্যাংকবহরের গতিপথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়েন।
চলন্ত ট্যাংকের বিশাল বহরটি এই ব্যক্তিকে ভয় দেখাতে পারেনি। তিনি অবিচল দাঁড়িয়ে আছেন, প্রথম ট্যাংকটি তাঁর একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি হাত নেড়ে সেগুলোকে ফিরে যেতে ইশারা করেন। সামনের ট্যাংকটি তাঁকে এড়িয়ে যেতে এদিক-ওদিক ঘুরে সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। তিনিও ঘুরে ঘুরে ট্যাংকের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। একপর্যায়ে তাঁকে একটি ট্যাংকের ওপর উঠে যেতে দেখা যায়, সেই ছবিও রয়েছে।
পরে অজ্ঞাতনামা দুই ব্যক্তি তাঁকে সেখান থেকে টেনে সরিয়ে নেন। সব মিলিয়ে মাত্র মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এত সব ঘটনা ঘটে যায় বলে পরে নানা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত আলোকচিত্রীরা।
এরপর তাঁর কী হয়েছিল জানা যায়নি। কেউ কেউ তাঁকে ‘ওয়াং উইলিন’ বলে সন্দেহ করলেও চূড়ান্তভাবে কেউ তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবির ছোট্ট তালিকা করা হলেও সেখানে নিশ্চিতভাবেই জায়গা করে নেবে ‘ট্যাংকম্যান’। বিশ্বজুড়ে এখনো ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ’–এর প্রতীক হিসেবে গণ্য হয় এই ছবি।
চীন সরকার যতই তিয়েনআনমেন স্কয়ারে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করুক, বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসকারী চীনারা এখনো প্রতিবছর ৪ জুন শ্রদ্ধাভরে দেশের তরে প্রাণ বিলিয়ে দেওয়া অকুতোভয় বীরদের স্মরণ করেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নির্মম নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এই নীরব প্রতিরোধ পৃথিবীর ইতিহাসে চিরকাল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অবিনশ্বর প্রতীক হয়ে থাকবে।