শিশুরা কি শুধুই প্রতিশ্রুতির বাংলাদেশে বাঁচবে
· Prothom Alo

জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২২ হিসেবে বাংলাদেশে ০-১৭ বছর বয়সী প্রায় ৫ কোটি ৬৯ লাখ শিশু রয়েছে। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই শিশু। অথচ কী আশ্চর্য রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, বাজেট কিংবা রাজনৈতিক অগ্রাধিকারে শিশুদের অবস্থান এখনো প্রান্তিক।
শিশুর মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সরকারকেই আপসহীন হতে দেখিনি। ফলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ শিশু অধিকার লঙ্ঘনের এক উর্বর ভূখণ্ডে পরিণত হয়েছে।
Visit mchezo.life for more information.
বাংলাদেশে সরকার বদলায়, শাসনের ভাষা বদলায়, স্লোগান বদলায়; কিন্তু বদলায় না শিশুদের অবস্থান।
প্রতিটি রাজনৈতিক পালাবদলের পর আমরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি; অথচ সেই স্বপ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে শিশুরা থাকে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি ব্যর্থতা, প্রতিটি অব্যবস্থাপনা, প্রতিটি অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের প্রভাব গিয়ে পড়ে শিশুদের কাঁধে। অথচ ওরা তো ভোট দেয় না, ক্ষমতার লড়াই বোঝে না, প্রতিশোধের রাজনীতি জানে না। ওরা শুধু একটু নিরাপদ শৈশব চায়।
প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের স্ক্রিনে শিশু ধর্ষণ, নির্যাতনের খবর যেন এক নিয়মিত ঘটনা। একটি সংবাদের রেশ না কাটতেই হাজির হয় আরেকটি খবর। ভয়াবহতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে তিন বা চার বছরের শিশুও যৌন সহিংসতা ও ধর্ষণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না নরপিশাচরা। প্রায়ই ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। অথচ ধর্ষণের ঘটনার বিপরীতে সাজা প্রাপ্তির সংখ্যা নিতান্তই হাতে গোনা।
শিশু যৌন নির্যাতন যখন নীরব মহামারিএকটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে? প্রতিটি ঘটনার পর রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হয় সাময়িক, বিচ্ছিন্ন ও দায়সারা। শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধের প্রশ্নে এখনো কোনো সরকারের কঠোর নৈতিক অবস্থান দেখিনি, যা অপরাধীদের স্পষ্ট বার্তা দিতে পারে যে ‘শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নয়।’
এবার আসি শিশুস্বাস্থ্য প্রসঙ্গে। সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক শিশুর মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিনিয়োগ কতটা জরুরি। কে দায়ী; পতিত সরকার, অন্তর্বর্তী সরকার, নাকি বর্তমান এই বিতর্ক হয়তো নিরাপদ রাজনৈতিক অবস্থান তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু যে মা কিংবা বাবা রাষ্ট্রের ব্যর্থতার জন্য তাঁর নিষ্পাপ ছোট্ট সন্তানের লাশ বহন করছেন, তাঁর কাছে কিন্তু রাজনৈতিক এসব বয়ানের কোনো মূল্য নেই।
আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতিতে সব সময়ই চর্চিত হয়ে এসেছে বিগত সরকারের ব্যর্থতার ফিরিস্তি। তাই নবগঠিত সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই চক্র থেকে বেরিয়ে এসে শিশুদের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসুন।
আজ হয়তো বিগত কোনো সরকারের কাঁধে এই ব্যর্থতার বোঝা চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে; কিন্তু টিকার সংকট মোকাবিলায় আর দোষীদের আইনের আওতায় না আনলে কিন্তু এই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হাম কিংবা হামের উপসর্গ নিয়ে। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে শিশুদের এই মৃত্যুমিছিল একধরনের নীরব গণহত্যার শামিল।
আমার সবচেয়ে কষ্ট হয় বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া শিশুশিক্ষার্থীদের জন্য। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেন শেষই হতে চায় না। সরকার বদলালেই বদলে যায় কারিকুলাম, পাঠ্যবই, ইতিহাসের ভাষ্য। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের শেখানো হয় পরিবর্তিত নতুন ইতিহাস। রাজনৈতিক প্রত্যাশা যখন শিশুর পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নির্বাচন কিংবা রচনার অনুষঙ্গ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই শিক্ষার্থীদের চেয়ে হতভাগ্য আর কেউ নয়।
আমাদের শিশুরা বিভ্রান্ত হচ্ছে বারবার, ওরা মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিশুরা যখন বড় হয়ে বুঝতে পারে যে তাকে রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তখন তার ভেতরে ক্ষোভ জন্ম নেয়। সেই ক্ষোভ দীর্ঘ মেয়াদে সমাজের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলে। মনে রাখতে হবে, বিপথগামী তরুণেরা হঠাৎ করে তৈরি হয় না।
আমরা তাদের শৈশব গড়তে ব্যর্থ হই বলেই ওরা লক্ষ্যচ্যুত হয়, পথভ্রষ্ট হয়।
শুধু শিক্ষা নয়, শিশুদের মানসিক বিকাশের জায়গাগুলোও আমরা ধ্বংস করেছি। শিশুদের জন্য খেলার মাঠের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে শহরে খেলার মাঠ নেই, নিরাপদ পার্ক নেই, সাংস্কৃতিক চর্চার পরিবেশ নেই। শিশুরা ক্রমশ ডিজিটাল স্ক্রিনের মধ্যে বন্দী হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা গড়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা মোবাইল, টিভি বা ডিজিটাল ডিভাইসে সময় কাটায়; যা আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে আমরা হয়তো তাদের শাসন করতে পারি, কিন্তু প্রশ্ন হলো ওদের জন্য বিকল্প কিছুর কী আয়োজন করতে পেরেছি আমরা? ওরা কোথায় যাবে? কোথায় খেলবে? শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হবে কীভাবে?
বাস্তবতা হলো, প্রতিদিনই আমরা আমাদের জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে এমন এক সমাজ তৈরি করছি, যেখানে শিশুরা খুব ছোটবেলা থেকেই দেশ ছাড়ার স্বপ্ন দেখছে। রাষ্ট্র এমন কোনো বাস্তবতা তৈরি করতে পারেনি, যেখানে শিশুরা বিশ্বাস করবে; এই দেশেও স্বপ্ন দেখা যায়, এই দেশেও মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা যায়। তাদের সামনে নেই কোনো রোল মডেল।
দেশপ্রেম তো মুখস্থ করিয়ে অর্জন করার বিষয় নয়। এটি জন্ম নেয় নিরাপদ পারিপার্শ্বিকতা, ন্যায়বিচার ও অংশীদারত্বের অনুভূতি থেকে।
আমাদের দেশে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতিতে সব সময়ই চর্চিত হয়ে এসেছে বিগত সরকারের ব্যর্থতার ফিরিস্তি। তাই নবগঠিত সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে এই চক্র থেকে বেরিয়ে এসে শিশুদের প্রশ্নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে নিয়ে আসুন।
অভাবনীয় সুন্দর নির্বাচনী স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগানেই বন্দী হয়ে থাকবে, যদি ‘সবার আগে বাংলাদেশের শিশু’—এই বাস্তবতাকে স্বীকার না করা হয়। কারণ, যে দেশের শিশুরা ভালো থাকে না, সে দেশ কখনোই সত্যিকারের উন্নত হতে পারে না। আমরা এখনো বিশ্বাস করতে চাই, একদিন হয়তো আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখব, যেখানে শিশুর হাসিই হবে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অর্জন।
নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী