সুনামগঞ্জের হাওর, ফসল হারিয়ে বেশি বিপাকে বর্গা চাষিরা

· Prothom Alo

সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আস্তমা গ্রামের বর্গা চাষি আল আমিন (৩৫)। এবার হাওরে ছয় বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে চার বিঘা জমির ফসল অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন আল আমিন পড়েছেন বিপাকে। দেনা শোধ আর বাকি বছর পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে চলবেন, এই চিন্তায় দিশাহারা তিনি।

সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল হারিয়ে একইভাবে বেশি বিপাকে পড়েছেন আল আমিনের মতো বর্গা চাষিরা। তাঁরা জমির ধান গোলায়ও তুলতে পারেননি, আবার ধারদেনা শোধ করারও এখন আর কোনো উপায় নেই। তিনি বলছিলেন, জমি আবাদের সময় প্রতিবছরই খরচ জোগাতে দেনা করতে হয়। বৈশাখে ধান তুলে সেই ধান বিক্রি করে দেনা শোধ করেন তাঁরা। এবার নিজের ঘরের খোরাকিই হচ্ছে না, দেনা শোধ করবেন কীভাবে।

Visit h-doctor.club for more information.

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সুনামগঞ্জ জেলায় কার্ডধারী কৃষক আছেন ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জনই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক।

শান্তিগঞ্জের দেখার হাওরপারের আস্তমা গ্রামের কৃষক আমজাদ মিয়া, মহিব মিয়া, আলিম উল্লাহ বলেন, হাওরে বর্গা চাষিরা জমি আবাদ থেকে শুরু করে ধান তোলা পর্যন্ত সব খরচ নিজেরা করেন। এ জন্য জমির মালিক কোনো খরচ দেন না। ধান কাটা-মাড়াই ও শুকানোর পর অর্ধেক দিয়ে দিতে হয় মালিককে। আবার আরেকভাবে হাওরে জমি আবাদ করেন তাঁরা। সেটিকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘রংজমা’। এ প্রক্রিয়ায় জমি আবাদের আগেই প্রতি বিঘার জন্য এক বছরের চুক্তিতে মালিককে কিছু টাকা দিতে হয়। এরপর আর মালিককে কোনো ধান দিতে হয় না। এবার হাওর এলাকায় এই রংজমায় প্রতি বিঘা জমির জন্য ছয় থেকে সাত হাজার টাকা দিতে হয়েছে। জমির ধান কোনো কারণে নষ্ট বা ক্ষতি হলে এতে মালিকের কোনো কিছু যায়–আসে না। সব ক্ষতি হয় চাষির।

কৃষক মহিব মিয়া (৫০) বলেন, তিনি এবার ৯ বিঘা জমির আবাদ করেছেন। এর মধ্যে পাঁচ বিঘা রংজমায়। বাকিটা বর্গায়। এই পাঁচ বিঘার জন্য মালিককে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এবার জমি আবাদ করতে গিয়ে তিনি ৩০ হাজার টাকার মতো ঋণ করেছেন। মহিব বলেন, ‘সব চিন্তা তো আমরার মতো ছোট কৃষকের। বড়রা তো কোনো লাগান চলতে পারেন। তাঁদের নানা ব্যবস্থা থাকে। আমরার ত এই জমির ধানই সব।’

সদর উপজেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওরপারের নিয়ামতপুর গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া (৪৫) বলেন, হাওরে ধান গেলে ছোট–বড় সব কৃষকই কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়েন। তিনি বছরে ধান পান ২৫০ থেকে ৩০০ মণ। এবার আবাদ করেছিলেন ২১ বিঘা জমি। এর মধ্যে ১২ বিঘাই রংজমায় করা ছিল। কিন্তু অর্ধেক জমির ধানই পানিতে তলিয়ে গেছে। রফিক জানান, তিনি জমির ধান থেকে ঘরের বছরের খরচ বাদে ২০০ থেকে ২৫০ মণ ধান বিক্রি করেন। এবার চরমভাবে হতাশ এই কৃষক। রফিক মিয়া বলেন, ‘আমরা বর্গা চাষিরা বেশি বিপদে পড়ছি। বছরের খানির টানাটানির সঙ্গে দেনার চিন্তায় এখন রাইতে ঠিকমতো ঘুম অয় না।’

একই এলাকার কৃষক মোস্তফা মিয়ার (৬০) অবস্থাও একই রকম বলে জানান। খলায় ভেজা ধান শুকাতে শুকাতে গত সোমবার দুপুরে এই কৃষক বলছিলেন, ‘আমরার ত ইবার জমিত ও খলাত দুইখানোই ধান গেল। আমরা এখন কিলা চলতাম এই চিন্তায় আছি।’

রোদে স্বস্তি, চলছে ধান কাটা

সুনামগঞ্জের হাওরে অতিবৃষ্টি শুরু হওয়ার পর গতকাল মঙ্গলবারের রোদ ছিল কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বেশি স্বস্তির। সকাল থেকেই কড়া রোদ ওঠে সুনামগঞ্জের আকাশে। কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ধান কাটা ও শুকানোতে। সোমবারও রোদ ছিল। এ দুই দিন সুনামগঞ্জের হাওরে ছিল বৈশাখের চিরচেনা রূপ। কৃষক পরিবারের সব বয়সী মানুষ ব্যস্ত ছিলেন হাওরে। হাওরের খলায় কেউ ধান রোদে নাড়ছিলেন। কেউবা বাতাসে ধান উড়িয়ে চিটা ছাড়ানোতে ব্যস্ত ছিলেন। শুকানো ধান ট্রাক্টর, কেউবা ঠেলাগাড়িতে করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। একই সঙ্গে পাশেই হাওরের একেবারে তীরে জমি থেকে ধান কেটে এনে স্তূপ করে রাখছিলেন কৃষকেরা। সেখানেই মেশিন দিয়ে মাড়াই করা হচ্ছিল। হাওরে এই বৈশাখী ব্যস্ততার সবই সম্ভব হয়েছে রোদ থাকায়। এই রোদ স্বস্তি দিয়েছে দুর্ভোগ-দুর্যোগে পড়া কৃষকদের।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, এ দুদিন রোদ থাকায় কৃষকদের বেশ উপকার হয়েছে। আগামী দুদিন হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পূর্বাভাস আছে। এরপর আবার ভারী বৃষ্টি হতে পারে। সুনামগঞ্জে সুরমা নদীসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি স্থিতিশীল আছে। তবে বৃষ্টি হলে নদী ও হাওরে পানি বাড়বে। তিনি জানান, এবার সুনামগঞ্জের হাওরে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে।

ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে ক্ষোভ

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার জেলার ১৩৭টি হাওরে বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। আবাদ হওয়া জমির মধ্যে হাওরে (নিচু অংশে) জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর, হাওরের বাইরে (উঁচু অংশে) ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। সোমবার পর্যন্ত হাওরে ধান কাটা হয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমির এবং হাওরের বাইরে ২২ হাজার ৮২২ হেক্টর জমির। গড়ে এ পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ধান কাটা হয়েছে ৬৯ শতাংশ। অতিবৃষ্টি ও ঢলে জমির ক্ষতির পরিমাণ ১৬ হাজার ৩৯৫ হেক্টর।

গতকাল দুপুরে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে সরকারের দুজন মন্ত্রীর উপস্থিতিতে হওয়া হাওর পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত আলোচনায় এই হিসাব তুলে ধরেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। তখন সভায় থাকা সুনামগঞ্জের তিনজন সংসদ সদস্য ও একাধিক বক্তা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাঁরা কৃষি বিভাগের এই ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি বলে দাবি করেন।

সভায় জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মোহাম্মদ আকবর আলী ও মো. শেরেনূর আলী প্রথমেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু তাঁর বক্তব্যে কৃষি বিভাগকে সব সময় জনগণের সামনে সঠিক তুলে ধরার নির্দেশনা দেন। সভায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Read full story at source