থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার

· Prothom Alo

লিখতে পারছি না। দেশের অবস্থা বদলে গেছে। ভাবা হয়েছিল অনিবার্য পরিবর্তন। কিন্তু অবস্থা ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যাবে বুঝতে পারিনি। এ অবস্থায় শান্তভাবে লেখা অসম্ভব। কলাম কিংবা পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ লেখার কাজ আমার নয়। আমি একজন অতিসাধারণ গল্পকার। গল্প-উপন্যাস লিখি।

আমার অবস্থা যে আগেও বিশেষ গোছানো ছিল, তা নয়। বরাবরই খানিক এলোমেলো। বিয়ের ছয় মাস পর থেকে ফারজানা আমার কাজে নানা রকমের বিশৃঙ্খলা আবিষ্কার করতে শুরু করল। ফারজানা আমার স্ত্রীর নাম। আড়াই বছরের মাথায় আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেল।

Visit newssport.cv for more information.

বিশ্বে নাম করেছেন এমন লেখকেরা বেশির ভাগ লিখতেন বা লেখেন ভোরবেলা। আমার লেখার সময় মধ্যরাত। ভোরের সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনা নিতান্তই কম। তবে হেমন্তকালের ব্যাপার আলাদা। এ সময়ে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠি। হেমন্তকাল আমার প্রিয়। ভোরে উঠে কুয়াশা দেখি। আর সারা রাত ধরে গাছের পাতায় আর ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির দেখি। দিনের আলো এসে শিশিরে পড়ে। ঝলমল করে ওঠে দিন।

এখন অগ্রহায়ণ মাস। ভোরে আর বিকেলবেলা বারান্দায় এসে দাঁড়াই। অনেক পুরোনো বিল্ডিংয়ের তিনতলায় দুই রুমের বাসা। বারান্দা তার সৌন্দর্য। দিন শেষে কুয়াশা নামতে থাকে। গাছের পাতায় শিশির জমা হয়। তখন মেয়েটি ফেরে। সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় দেখি—মেয়েটি যাচ্ছে। আরবি হরফ আলিফের মতো খাড়া ঋজু শরীর। ঝকঝকে আখের গুড়ের মতো গায়ের রং। পিঠ ছাপিয়ে যাওয়া ঢেউখেলানো তুমুল ঘন কালো চুলের বাড়াবাড়ি। সকালের শিশিরের মতো স্নিগ্ধ মেয়েটি হেঁটে হেঁটে আমার সামনে দিয়ে যায়। তার চলে যাওয়া পথের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। ঠিক পাশের বিল্ডিং থেকে বের হয়। সেই বিল্ডিং আরও পুরোনো।

তার নাম দিয়েছি হিম। হেমন্তকালে দেখা। শেষ বিকেলে হিম যখন ফেরে, তখন সকালের সেই ঘাসফড়িংয়ের মতো লাফিয়ে যাওয়ার ভাব থাকে না। অবসন্ন শরীর টেনে ঘরে ফেরে। চুলগুলো হাতখোঁপা করে বাঁধা।

কনফিউজড হয়ে গেছি। এখন সকাল-বিকেল বারান্দায় আসি কুয়াশা আর শিশির দেখতে নাকি হিমকে দেখতে! হিম আমার অতিপ্রিয় হেমন্তের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মনে হলো আবার লিখতে বসতে পারব। দিনের শেষে প্রশান্তি বোধ হয়। হিম যখন কাজ থেকে ফিরে সামনে দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে, তখন তার আবেশ আমার মনে থেকে যায়।

লিখতে বসি। লিখতে পারি না। দিনের পর দিন বন্ধ্যা কলম অকর্ষিত কাগজের ওপর পড়ে থাকে। শিশু ধর্ষণের মতো ঘটনা আচমকা বেড়ে গেছে। আর বেড়েছে খুন। এ অবস্থায় লেখা অসম্ভব। টানা তিন দিন শহরে লোডশেডিং। বিদ্যুৎ–ঘাটতি পৌঁছে গেছে চরমে।

পত্রিকায় আপনার লেখা দুটো গল্প পড়েছিলাম। তা–ও অনেক দিন আগে। কী প্রচণ্ড রাগী লেখা! খ্যাপাটে, একগুঁয়ে। আপনার লেখা পড়লে মনে হয় পোড়–খাওয়া ক্ষুধার্ত মানুষগুলো ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসছে। মানুষের প্রেম ভাঙাচোরা, খুব বেশি “র”, আর শরীরের ওপর চেপে বসা। অদ্ভুত গল্প।

রাত ১০টার সামান্য কিছু বেশি। দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে। শুরুতে মনে হয়েছিল ভুল শুনছি। আমার কাছে কেউ আসে না। ইলেকট্রিসিটি নেই বলে ডোরবেল বাজছে না। দ্বিতীয়বার দরজার টোকা অনেক বেশি স্পষ্ট। আমার কাছে কেউ এসেছে। অস্পষ্ট গলায় বললাম, ‘কে?’

পরিষ্কার নারীকণ্ঠে কেউ একজন বলল, ‘একবার খুলবেন দরজাটা! দরকার ছিল।’

নমনীয় মিহি গলার আওয়াজ। দরজা খুলে দিলাম। হকচকিয়ে গেছি। বিস্ময়ে আমার ভেতর অবশ ভাব চলে এসেছে। হতভম্ব চোখে দেখলাম সামনে হিম দাঁড়িয়ে আছে।

আমার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে না। লিখতে গিয়ে কোনো ভাবনায় আটকে এমন দেখছি, তা–ও নয়। পুরোটা বাস্তব। আমার সামনে হিম। বলল, ‘মোমবাতি শেষ হয়ে গেছে। আরেকটু রাত আমাকে জাগতে হবে। পাড়ার দোকানগুলোও বন্ধ দেখলাম।’

থমকে যাওয়া নদীতে আচমকা ঢেউ উঠেছে। জেগে উঠেছি। তাকে কেন আরেকটু রাত জাগতে হবে, সেই চিন্তা মাথায় স্থির হওয়ার আগে বললাম, ‘ভেতরে আসুন।’

হিম খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকল। তার ভেতর কোনো আড়ষ্টতা নেই। যেন সে অনেক দিনের পরিচিত। টেবিলের ওপর মোমবাতি জ্বলছে। হিমকে যতটা সুন্দর দেখায় মোমের আলোতে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সুন্দর লাগছে। হিম বলল, ‘দরজা দিয়ে বাতাস আসছে। মোমবাতি নিভে যেতে পারে।’

দরজার কপাট লাগিয়ে দিলাম। ঘুরে বললাম, ‘বসুন। স্টকে দেখি আপনার জন্য কয়টা মোমবাতি আছে।’

হিম আমার লেখার টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ‘প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার সময় আপনাকে বারান্দায় দেখি। মোমবাতি আনার কথা ভুলে গেছি। শেষটা ফুরিয়ে যাওয়ার পর অন্ধকারে বসেছিলাম। মনে হলো আপনার কাছে আসা যেতে পারে।’

হিম আসার পর এই প্রথম আমার ভেতর অস্বস্তি হলো। আবছা অন্ধকারে আলো আর ছায়া কেঁপে বেড়াচ্ছে। আমার ঘর এলোমেলো, অগোছালো—বই, কাগজ, নোটবুক বিছানা আর টেবিলে ছড়িয়ে আছে। ল্যাপটপ ঠিক জায়গায় নেই। টেবিলে অর্ধেকটা খাওয়া চায়ের কাপ। খোলা বই।

হিম বলল, ‘আপনি লেখেন শুনেছি। আপনার লেখা বই পড়া হয়নি। পত্রিকায় আপনার লেখা দুটো গল্প পড়েছিলাম। তা–ও অনেক দিন আগে। কী প্রচণ্ড রাগী লেখা! খ্যাপাটে, একগুঁয়ে। আপনার লেখা পড়লে মনে হয় পোড়–খাওয়া ক্ষুধার্ত মানুষগুলো ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসছে। মানুষের প্রেম ভাঙাচোরা, খুব বেশি “র”, আর শরীরের ওপর চেপে বসা। অদ্ভুত গল্প। ক্ষুধার মধ্যে যৌনতা, একাকিত্বের ভেতর দেহের উষ্ণতা। অন্যদের লেখা থেকে একদম আলাদা। আপনাকে দেখে আমার একবারও অমন একরোখা কিংবা নিষ্ঠুর মনে হয়নি। বরং যথেষ্ট মানবিক বলে মনে হয়েছে।’

ভালো লাগা আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অতল কোনো দিঘিতে ডুবে যাচ্ছি। কেউ একজন এমন গভীর মনোযোগ দিয়ে আমার লেখা গল্প পড়েছে! সেই গল্প বুঝতে পেরেছে! সে তার মতামত জানাচ্ছে! এ আমার জন্য পরম পাওয়া। বললাম, ‘আমার ভালো লাগা এক্সপ্রেস করার মতো কথা মাথায় আসছে না। তবে আপনি সময় দিলে চা বানাতে পারি। আপত্তি না থাকলে চা খাবেন। আমিও খাব।’

হিম বলল, ‘চা খাব না। তবে গল্প করতে আপত্তি নেই। অফিসের কাজ আর বাসা—এতে একঘেয়ে হয়ে গেছে লাইফ। অডিটের ঝামেলা ফেস করতে হবে আগামীকাল। কতগুলো তারিখের হিসাব মিলিয়ে রাখতে হবে। অল্প কাজ। পরেও করা যাবে।’

আমার ভয়াবহ কষ্ট হচ্ছে। কষ্টে ভেতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কেন এমন লাগছে, বুঝতে পারছি না। একেবারে নতুন অনুভব। হিমের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘অভ্যাস হয়ে গেছে।’ অন্ধকারেও মনে হলো হিমের চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছে। থিরথির করে গাল কাঁপছে। তার নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে।

মোমবাতি ফুরিয়ে আসছে। নতুন আরেকটা জ্বালাতে হবে। কিচেনে যেতেই হতো। মোমবাতি আছে কিচেনের সেলফে। কিচেনে না গিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম। হিম বলল, ‘আমার ধারণা লেখকেরা খুব ইন্টারেস্টিং হন। গল্পের মতো চমৎকারভাবে কথা বলেন। কথার আকর্ষণ থেকে বেরোনো যায় না।’

কী অসম্ভব সুন্দরভাবে কথা বলছে হিম। যত শুনছি আরও বেশি মুগ্ধ হচ্ছি। মনে হচ্ছে তার কথা শুনি। আমার বলার মতো কোনো কথা নেই। হিম বলল, ‘আপনার কী মনে হয়? লেখকেরা কেমন?’

বললাম, ‘যে যেভাবে দেখে। যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায় ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি। তার কাছে আমি ভালো। যে সেভাবে দেখে না, তার কাছে এই আমিই ভীষণ খারাপ।’

হাসছে হিম। ক্ষয়ে যাওয়া মোমবাতির আলো হিমের হাসিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে হিমের হাসির সেই মায়াময় আলো। হাসতে হাসতে হিম বলল, ‘বলেছিলাম, লেখকেরা ভীষণ সুন্দরভাবে কথা বলে। দেখলেন, আমার কথা কেমন মিলে গেল! অনেক দিন আপনার কোনো লেখা দেখছি না কোথাও। নাকি বড় কোনো লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন?’

মোমবাতির আলো কাঁপছে। নিভে যাওয়ার আগে যেভাবে কেঁপে ওঠে। বললাম, ‘কেন জানি আমার আর লিখতে ভালো লাগে না। লেখার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি।’

হিম বলল, ‘আমার মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা সবাই একটু একটু করে চুপ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের এখন আর রাগ করার শক্তিও নেই।’

আমার কথা বলছে হিম। সে আমার ভেতর থেকে কথা বলে উঠেছে। হিমের কথা ধরে বললাম, ‘মানুষ যখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকে, তখন প্রতিবাদ তাদের কাছে লাক্সারি হয়ে যায়।’

মোমবাতি নিভে গেছে। ঘর যতটা অন্ধকার হয়ে যাওয়ার কথা, ততটা অন্ধকার বোধ হচ্ছে না। হিমকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মুখ, হাত, শরীর—সব। বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলাম। হিম বলল, ‘থাক। আলো জ্বালাবেন না। অন্ধকার ভালো লাগছে।’

উঠলাম না। মোমবাতি নিভে গিয়ে ধোঁয়াটুকুও বাতাসে মিলিয়ে গেছে। চুপচাপ বসে আছি। হিম বলল, ‘আাপনি কি সব সময় এমন চুপচাপ?’

আমার ভেতর প্রবল ঝড় বয়ে যাচ্ছে। কিসের ঝড় জানি না। বর্ষার উন্মত্ত নদীর পাড় ভাঙার মতো বুকের ভেতর ভাঙছে। বললাম, ‘লিখব বলে কথাগুলো রেখে দিই।’

হিম বলল, ‘অমন করে কথাগুলো জমা হলে তারপর?’

বললাম, ‘লিখতে না পারলে বুক ভারী হয়ে আসে। ভীষণ কষ্ট হয়। তখন সেই কষ্ট কাউকে বলতে ইচ্ছা করে। বলতে পারি না, বোঝাতেও পারি না।’

অন্ধকারে মুখোমুখি দুজন দাঁড়িয়ে আছি। কেউ কোনো কথা বলছি না। যেন আমাদের সব কথা শেষ হয়ে গেছে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বললাম, ‘দেশটাও এখন ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলছে। কত দিনের চেনা মানুষকে অচেনা মনে হচ্ছে।’

হিম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। সে দাঁড়িয়ে আছে আমার নিশ্বাসের দূরত্বে। মনে হলো আমার হাত ছুঁয়ে গেল তার হাত। গভীর গলায় বলল, ‘আপনি একা থাকেন তাতে কষ্ট লাগে না?’

আমার ভয়াবহ কষ্ট হচ্ছে। কষ্টে ভেতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে। কেন এমন লাগছে, বুঝতে পারছি না। একেবারে নতুন অনুভব। হিমের চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘অভ্যাস হয়ে গেছে।’

অন্ধকারেও মনে হলো হিমের চোখের ভাষা বদলে যাচ্ছে। থিরথির করে গাল কাঁপছে। তার নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। সে নিশ্বাস নিচ্ছে দ্রুত এবং ঘন ঘন। বললাম, ‘চলুন বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। অন্ধকারে কুয়াশা আর শিশির জমা দেখি।’

আমরা বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। অন্ধকারে মুখোমুখি দুজন দাঁড়িয়ে আছি। কেউ কোনো কথা বলছি না। যেন আমাদের সব কথা শেষ হয়ে গেছে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে বললাম, ‘দেশটাও এখন ধীরে ধীরে একা হয়ে যাচ্ছে। মানুষ মানুষকে এড়িয়ে চলছে। কত দিনের চেনা মানুষকে অচেনা মনে হচ্ছে।’

হিমের ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল। তার গলায় কাতরতা। বলল, ‘আমি মানুষ নিয়ে কথা বলছি, আপনি দেশ নিয়ে।’

বললাম, ‘একই কথা। দেশের হার্ট তো মানুষ!’

হিম বলল, ‘অন্ধকারে গাছের পাতায় শিশির জমতে দেখবেন বলেছিলেন।’

বুকের ভেতর থেকে বাতাস নিয়ে এসে ছড়িয়ে দিয়ে বললাম, ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল; পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন।’

আমাকে অবাক করে দিয়ে হিম বলল, ‘তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল; সব পাখি ঘরে আসে—সব নদী—ফুরায় এ–জীবনের সব লেনদেন; থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’

বললাম, ‘জীবনানন্দ দাশকে আমার ভীষণ দুঃখী একজন মানুষ মনে হয়। নিঃসঙ্গ, একা, বিচ্ছিন্ন শূন্য একজন মানুষ।’

হিম বলল, ‘আপনার মতো!’

আবারও অবাক হয়েছি। বিস্মিত গলায় বললাম, ‘বুঝলেন কেমন করে!’

হিম হেঁয়ালি করে বলল, ‘যেমন করে আপনি আমাকে বোঝেন। সব সময় শক্ত হয়ে থাকতে থাকতে বড্ড ক্লান্ত লাগে।’

এবার হিমের গলা কেঁপে উঠেছে। সে আবার আমার নিশ্বাসের দূরত্বে চলে এসেছে। আমি পিছিয়ে গেলাম না। তাকে বুকের কাছাকাছি থাকতে দিলাম। হিমের চুল থেকে অপূর্ব সুন্দর গন্ধ আসছে। ধূপের গন্ধের মতো। নেশা ধরায়। আমার ভেতর নেশা ধরাচ্ছে।

বুকের গভীরে হিমের চুলের সেই মাতাল গন্ধ টেনে নিয়ে বললাম, ‘এই সময়টা মানুষকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। আমরা সবাই কাউকে খুঁজছি। কিন্তু কাউকে ভরসা করতে পারছি না।’

হিম বলল, ‘কখনো কখনো খুব ইচ্ছা করে কারও ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে। এক রাতের জন্য হলেও।’

চুপ করে আছি। হিম আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তাকিয়ে আছি হিমের চোখের দিকে। তার চোখে পানি। হিম বলল, ‘ভোর হয়ে আসছে। এতটা সময় কখন চলে গেছে বুঝতে পারিনি। পুরো একটা রাত আমরা কোনো কথা না বলে চুপচাপ অন্ধকারে কাটিয়ে দিলাম। আপনার লেখা গল্পে যদি কখনো একজন মেয়ে থাকে আমার মতো, একা একা লড়াই করতে করতে যে ভীষণভাবে ক্লান্ত হয়ে গেছে, তাকে একটু ঘুমুতে দেবেন। শুধু এক রাত। প্রশান্তির ঘুম।’

হিম চলে গেল। হেঁটে হেঁটে কুয়াশা মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ, একা একজন মানুষ। ভোরের মতো একা। তার মাথার অগোছালো চুলে ভোরের টুপটাপ শিশির জমছে।

এই প্রথম ভোরে লিখতে বসলাম। মেয়েটির নাম জানা হয়নি। আমি কখনো তার গল্প লিখব না। সে আমার একান্তের অনুভব হয়ে থাক। আজ হিমের গল্প লিখব। সেই গল্পে হেমন্তের খোলা হাওয়ায় হিমের মাথার দিঘল কালো বেখেয়ালি কোঁকড়ানো চুলগুলো বড্ড বেয়াড়া আর বেপরোয়া হয়ে উঠবে।

Read full story at source