নিকোলাই গোগল ও মৃত আত্মার ইউরোপ

· Prothom Alo

নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগল (১৮০৯-১৮৫২) একই সঙ্গে তিনটি পরিচয় বহন করতেন—ইউক্রেনীয়, রুশ ও ইউরোপীয়। এই তিন সূত্রে উনিশ শতকের প্রথমার্ধের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে তাঁর জীবনবোধ ও শিল্পদৃষ্টি গড়ে ওঠে। সাহিত্যক্ষেত্রে অগ্রজ আলেকসান্দার পুশকিন ছিলেন গোগলের প্রেরণা। পুশকিন রুশ সাহিত্যে যে বাস্তবতার ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, গোগল ছিলেন তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি। এমনকি ১৮৪২ সালে প্রকাশিত তাঁর ডেড সোলস বা ‘মৃত আত্মা’ উপন্যাসের বিষয়বস্তুটি খোদ পুশকিন থেকে পাওয়া। গোগলের পূর্ববর্তী রচনা ইন্সপেক্টর জেনারেল প্রহসনটিও মোটামুটি সমান বিষয়ের, অর্থাৎ জার সাম্রাজ্যের আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাৎপর্যপূর্ণ সৃষ্টি। ‘মৃত আত্মা’ প্রকাশিত হলে তা শুধু রাশিয়ার নয়, ইউরোপীয় উপন্যাসেরও মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যদিও উপন্যাসটি সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়ার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতার গভীরে প্রোথিত। এর কাঠামোগত দিক তথা শিল্পরীতি, ব্যঙ্গধর্মী কৌশল এবং দার্শনিকতা একে ইউরোপীয় বাস্তবতাবাদের ক্রমবিকাশমান ধারার মধ্যে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাই বলা যায়, ‘মৃত আত্মা’ সৃষ্টিশীল সাহিত্যের এমন এক যুগল সন্ধি, যেখানে রুশ বিশেষত্বের সঙ্গে ইউরোপীয় সর্বজনীনতার মিলন ঘটে। একই সঙ্গে তৎকালীন রুশ সমাজের নৈতিক অবক্ষয় উন্মোচন করে আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গেও সম্পৃক্তি পায়। উপন্যাসটির প্রথম পর্ব রচিতও হয় গোগলের পশ্চিম ইউরোপে বসবাসকালে। সামন্ততন্ত্র তখন তিরোহিত হলেও এর প্রতিফল ইউরোপীয় আত্মাকে যে টুঁটি চেপে হত্যা করেছিল এবং প্রোটো-পুঁজিবাদী সমাজ গঠনের যুগে মানবিকতার অবক্ষয় তীব্রভাবে দানা বেঁধে উঠছিল—এমন উপলব্ধির সাহিত্যিক প্রকাশের রীতি আগে থেকে খুঁজছিলেন গোগল। যখন উপায় পেলেন, নিজেই একে বলেছেন ‘যুগান্তকারী ঘটনা’।

Visit palladian.co.za for more information.

রুশ ভাষায় ‘আত্মা’ (সোল) শব্দটির মানে ‘জন’। সেখানকার জমিদারি ব্যবস্থায় জমিদারদের তালিকাভুক্ত রায়তদের ‘আত্মা’ (সার্ফ) নামে অভিহিত করা হতো। অন্যদিকে ‘মৃত আত্মা’র অস্তিত্ব রুশ ভাষায় নেই, ধারণাও ছিল না। তাই ‘মৃত আত্মা’ গোগলের স্বকৃত শব্দবন্ধ। উপন্যাসের কাহিনিটি গড়ে উঠেছে সরকারি নথিতে তালিকাভুক্ত অথচ বাস্তবে মৃত সেসব ‘আত্মা’ বা ‘রায়ত’–এর কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে। যদিও শেষ পর্যন্ত গোগল এই মৃত আত্মাদের দার্শনিকতার মোড়কে প্রতীকী তাৎপর্য দিয়েছেন, অর্থবহ করে তুলেছেন।

সামন্ততন্ত্র তিরোহিত হলেও এর প্রতিফল ইউরোপীয় আত্মাকে যে টুঁটি চেপে হত্যা করেছিল এবং প্রোটো-পুঁজিবাদী সমাজ গঠনের যুগে মানবিকতার অবক্ষয় তীব্রভাবে দানা বেঁধে উঠছিল—এমন উপলব্ধির সাহিত্যিক প্রকাশের রীতি আগে থেকে খুঁজছিলেন গোগল। যখন উপায় পেলেন, নিজেই একে বলেছেন ‘যুগান্তকারী ঘটনা’।

উপন্যাসে ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে উনিশ শতকের রুশ সমাজ, সামন্ততন্ত্র, আমলাতন্ত্র ও মানুষের নৈতিক অবক্ষয় নির্মম পরিহাসের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। কাহিনিতে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় চরিত্র পাভেল ইভানোভিচ চিচিকভ একটি প্রাদেশিক শহরে এসে পৌঁছায়। আচরণে সে বিনয়ী, ভদ্র, মিতভাষী ও মার্জিত। তাই শহরের গভর্নর, পুলিশপ্রধান, বিচারক, ধনী ব্যবসায়ী—সবার সঙ্গেই সে দ্রুত সুসম্পর্ক গড়ে তোলে। লোকজন প্রথমে তাকে সম্ভ্রান্ত ও ধনী ব্যক্তি বলেই মনে করে, কিন্তু তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রহস্যঘেরা। অবশ্য চিচিকভের আসল উদ্দেশ্য ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে। সে বিভিন্ন জমিদারের কাছ থেকে মৃত সব আত্মা কিনতে চায়; কাগজে-কলমে নিজের নামে করে নিতে চায় নামমাত্র মূল্যে। কেননা বিপুলসংখ্যক ‘আত্মা’ দেখিয়ে ব্যাংকঋণসহ নিজেকে ভূস্বামী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ইচ্ছুক চিচিকভ হয়ে উঠতে চায় প্রতারণা ও অর্থনৈতিক ভ্রম নিয়ে পুঁজির অধিকারী এবং অভিজাতদের মধ্যে অভিজাত।

এমন অবস্থায় চিচিকভ একে একে বিভিন্ন জমিদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এরা হচ্ছে মানিলভ, কোরোবোচকা, নজিদ্রয়োভ, সবাকিয়েভিচ, প্ল্যুশিকন প্রমুখ। গোগল এসব চরিত্রকে রুশ সমাজের বিশেষ বিশেষ শ্রেণি বা মানসিকতার প্রতীক হিসেবে হাজির করেছেন। ফলে এদের কেউ স্বপ্নবিলাসী ও বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন; কেউ সন্দেহপ্রবণ ও বিবেকহীন; কেউ উচ্ছৃঙ্খল, মিথ্যাবাদী, জুয়াড়ি ও মাতাল; কেউ চরম কৃপণ ও মানববিচ্ছিন্ন; কেউবা আবার ভীষণ বাস্তববাদী ও স্থূলচিন্তার মানুষ। যা-ই হোক, এই জমিদারদের সঙ্গে চিচিকভের সখ্য হয়, ব্যবসা হয়; অনেক ‘মৃত আত্মা’ সে কিনেও ফেলে। একপর্যায়ে চিচিকভকে নিয়ে শহরে কানাঘুষা শুরু হয়, গুজব রটে। এমনকি প্রশাসনিক ব্যক্তিদেরও সন্দেহ হয়, সম্ভাবনা নস্যাৎ হলে নারীরাও তিরস্কৃত চোখে দেখতে থাকে। শেষ পর্যন্ত চিচিকভের নিষ্ক্রমণ ঘটে শহর থেকে।

আদপে এই চিচিকভ এক হঠকারী; দরিদ্র পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই ছিল স্বার্থপর, অর্থলোভী ও হিসাবি। তরুণ বয়সে সরকারি চাকরি বাগিয়ে নিয়ে দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে প্রচুর আয়-উন্নতি করেছে। নৈতিকতা বলতে তার কিছু নেই, আর্থিক লাভালাভই জীবনের আসল উদ্দেশ্য। পড়ন্ত বয়সে এসে সে মৃত আত্মা দিয়ে অভিজাত ও প্রতাপশালী হতে চায়। গোগল এই চরিত্র সৃষ্টি করে দেখাতে চেয়েছেন, চিচিকভ রুশ সমাজে অচেনা কেউ নয়, সে অবক্ষয়ী সামন্ততান্ত্রিক সমাজেরই একজন প্রতিনিধি—জল্পনামূলক পুঁজিবাদের বাহক। আসলে তার মাধ্যমে পুরো রুশ সমাজের প্রতিফলন দেখিয়েছেন লেখক। তাই চিচিকভ একটি প্রতীকী চরিত্র, সে জীবিত অথচ নৈতিকভাবে মৃত মানুষের প্রতীক। সমানভাবে বিভিন্ন জমিদারের চারিত্রিক উপাদানের সংশ্লেষে গোগল যেমন তাদের অলস, ফাঁকা রোমান্টিক, সংকীর্ণ, অজ্ঞ, নৈতিকভাবে অধঃপতিত, বস্তুবাদী, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও মানবিক অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করেছেন। দেখিয়েছেন, এসব জমিদারের বাস্তবে শরীরী অস্তিত্ব থাকলেও এরা একেকটি মৃত আত্মা।

রাশিয়ার প্রদেশজুড়ে ভ্রমণ করে মৃত রায়তদের আইনগত স্বত্ব কিনে বেড়ানো তার পেশা। ভঙ্গুর আমলাতান্ত্রিক ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন তার নেশা। তাই উপন্যাসের ভ্রমণধর্মী কাঠামোটি পূর্ববর্তী ইউরোপীয় মডেলের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত স্প্যানিশ ও ফরাসি ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত।

উপন্যাসের কাহিনিও প্রতীকী তাৎপর্যে ভরপুর। মৃত আত্মা যে কেবল মৃত রায়ত, তা নয়; জমিদারদের অবক্ষয়ী রূপ যে শুধু জমিদারদের অবক্ষয়, তা–ও নয় কিংবা সরকারি অফিস-আদালতে যে তদবিরব্যবস্থা, ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াত—এসবই রুশ সমাজের অসুস্থতার প্রতীক; আত্মিক শূন্যতা, শঠতা ও ভণ্ডামির প্রতীক। ব্যঙ্গ, করুণা ও গভীর নৈতিক প্রশ্নের মিশ্রণে গোগল দেখিয়েছেন, ব্যক্তি, সমাজ ও ব্যবস্থা কীভাবে দেউলিয়া হয়ে উঠেছিল আর মানুষ কেমন করে নিজের আত্মাকে বিক্রি করে দিয়েছে।

গঠনগত দিক থেকে ‘মৃত আত্মা’ ইউরোপীয় পিকারেস্ক ধারায় রচিত। এখানেও নৈতিকভাবে দ্ব্যর্থক নায়কের বিচ্ছিন্ন ও পর্বভিত্তিক অভিযাত্রা অনুসরণ করা হয়েছে। গোগলের নায়ক পাভেল ইভানোভিচ চিচিকভও একজন প্রতিনায়ক। রাশিয়ার প্রদেশজুড়ে ভ্রমণ করে মৃত রায়তদের আইনগত স্বত্ব কিনে বেড়ানো তার পেশা। ভঙ্গুর আমলাতান্ত্রিক ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জন তার নেশা। তাই উপন্যাসের ভ্রমণধর্মী কাঠামোটি পূর্ববর্তী ইউরোপীয় মডেলের সঙ্গে যুক্ত, বিশেষত স্প্যানিশ ও ফরাসি ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত। ‘চিচিকভের অ্যাডভেঞ্চার বৃত্তান্ত ও মৃত আত্মা’—উপন্যাসের এই প্রাথমিক শিরোনাম স্প্যানিশ মিগেল দে সারবেন্তেসের ‘লা মানচা’র উদ্ভাবনপটু দন কিহোতেকে মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য গোগল এই রীতিকে সামাজিক ব্যঙ্গের শক্তিশালী মাধ্যমে রূপান্তরিত করেছেন। অনারে দ্য বালজাক কিংবা চার্লস ডিকেন্সের রচনার মতোই তিনি অঙ্কিত চরিত্র দিয়ে সমাজের সামগ্রিক রূপ নির্মাণ করেছেন। ফলে উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্র একেকটি নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধরনের প্রতিনিধিত্ব করে লেখকের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছে।

ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেস লন্ডন–এর ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত সংস্করণের প্রচ্ছদ

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রুশ তথা বৃহত্তর ইউরোপীয় জীবনে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছিল, তখন সামন্ততন্ত্রের অর্থব্যবস্থা ভেঙে প্রোটো-পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা গড়ে ওঠার কাল। একই সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের বিস্তারের ফলে আমলাতন্ত্র জটিল হয়ে উঠছিল। সামাজিক শ্রেণিদূরত্ব ও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্তশ্রেণির উল্লম্ফন মানবিকতা–হ্রাস ও বিকৃতিকে ত্বরান্বিত করে। বিশেষ করে নেপোলিয়ন-পরবর্তী ইউরোপে মূল্যবোধের গভীর সংকট দেখা দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের শিল্পচৈতন্য রোমান্টিসিজম থেকে বাস্তববাদে রূপান্তরিত হয়। লেখকেরা আদর্শায়িত নায়কের পরিবর্তে সাধারণ জীবন, সামাজিক কাঠামো এবং বস্তুগত বাস্তবতা চিত্রিত করতে শুরু করেন। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও হয়ে ওঠে সমালোচনামূলক—ব্যঙ্গধর্মী, শ্লেষাত্মক ও আক্রমণাত্মক। ইউরোপীয় বাস্তববাদী ধারার অনুসারী হিসেবে গোগল ‘মৃত আত্মা’য় স্থানীয় বৈশিষ্ট্য, যেমন রুশ রায়তপ্রথা ও আমলাতন্ত্র এবং সর্বজনীন ইউরোপীয় উদ্বেগ, যেমন শ্রেণি, পুঁজিবাদ ও নৈতিকতাকে একত্র করেছিলেন। সমানভাবে তাঁর চিন্তাচেতনা ছিল রুশ সমাজে প্রকৃত নৈতিক উদ্দেশ্য হারিয়ে যাওয়া নিয়ে ইউরোপীয় সাহিত্যের বৃহত্তর উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত। সাহিত্যের আয়নায় সমাজকে প্রতিফলিত করে ‘মৃত আত্মা’ তাই সমালোচনামূলক ও প্রতিরোধের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাই সমাজ ও মানুষের এমন অবক্ষয়ী রূপের আধার হিসেবে উপন্যাসটির কাহিনি ও চরিত্র ‘ভদ্র’ রুশ সমাজের জন্য মোটেও সহ্যের কারণ ছিল না। অন্যদিকে ‘মৃত আত্মা’র ধারণা যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি উপন্যাসের সামগ্রিক বিষয় জনমনের জন্য বিভীষিকাপূর্ণও। প্রকাশের আগে বিষয়টি সেন্সর বোর্ডে প্রশ্নও তৈরি করেছিল, ‘আত্মা তো অমর!’ আসল বিষয় ছিল সমাজরাষ্ট্র নিয়ে কঠোর রঙ্গব্যঙ্গ, পরিহাস ও নিষ্ঠুর সমালোচনা। নিজ সমাজে গোগল সমালোচনার পাত্রও হয়ে উঠেছিলেন। অথচ পুশকিনের দৃষ্টিতে ‘মৃত আত্মা’য় রাশিয়া মর্মান্তিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মন্তব্যটি ছিল, ‘গোগল নতুন কিছু বলেননি, তা সাধারণ একটা সত্য, ভয়ংকরও।’

আবার ইউরোপের সঙ্গে গোগলের সম্পর্ক কেবল গ্রহণ বা প্রভাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল তীব্র-তীক্ষ্ণ সমালোচনারও। উনিশ শতকে রাশিয়ার বুদ্ধিজীবীরা ‘পশ্চিমপন্থী’ ও ‘স্লাভোফিল’—দ্বিবিধ ধারায় বিভক্ত ছিলেন। পশ্চিমপন্থীরা ছিলেন ইউরোপীয় ধাঁচে আধুনিকায়নের পক্ষ আর স্লাভোফিলরা স্থানীয় স্বতন্ত্র আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে মান্যতা দিতেন। এই বিতর্কে ‘মৃত আত্মা’ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ হস্তক্ষেপও। কেননা উপন্যাসটি একদিকে ইউরোপীয় রূপ–রীতিকে গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে বিষয়ের দিক থেকে ক্রমবর্ধমান বস্তুবাদ, আমলাতান্ত্রিক যুক্তিবাদ এবং সামাজিক শঠতায় চালিত ঐতিহ্যের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গোগলের চিত্রিত বিকৃত স্বভাবের জমিদারেরা তাই রুশ সমাজের প্রতিকৃতিই নয়; বরং আধুনিক ইউরোপীয় জীবনে গোগল যে আধ্যাত্মিক রুগ্ণতা ও শূন্যতায় অস্তিত্বের সংকট অনুভব করেছিলেন, তারও প্রতীক।

রঙ্গ-পরিহাসের অন্তরালে গোগল প্রয়োগ করেছেন একটা করুণ দৃষ্টিভঙ্গি। যে মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে ‘মৃত’, বাস্তবে সে অর্থনৈতিক একক বা সামাজিক মুখোশমাত্র। ‘মৃত আত্মা’ নামটিও আমলাতান্ত্রিক অর্থ ছাড়িয়ে আরও গভীর তাৎপর্য তৈরি করে, যা জাতীয় সীমানা অতিক্রমকারী এক অধিবিদ্যক অবস্থারও ইঙ্গিত দেয়।

এ ছাড়া পশ্চিম ইউরোপে নিকোলাই গোগলের দীর্ঘদিনের অবস্থান তাঁর শিল্পচৈতন্যকেও প্রভাবিত করেছিল। এখানকার ধ্রুপদি শিল্প ও ক্যাথলিক আধ্যাত্মিকতার মধ্যে নিমগ্ন হয়ে তিনি নান্দনিক সৌন্দর্য ও নৈতিক অবক্ষয়ের বৈপরীত্য সম্পর্কে তীক্ষ্ণ সংবেদনশীলতা অর্জন করেছিলেন। এমন দ্বান্দ্বিকতা ‘মৃত আত্মা’র কেন্দ্রীয় বিষয়। উপন্যাসের রঙ্গ-পরিহাসের অন্তরালে গোগল প্রয়োগ করেছেন একটা করুণ দৃষ্টিভঙ্গি। দেখিয়েছেন, মানুষ আধ্যাত্মিকভাবে ‘মৃত’, বাস্তবে সে অর্থনৈতিক একক বা সামাজিক মুখোশমাত্র। ‘মৃত আত্মা’ নামটিও আমলাতান্ত্রিক অর্থ ছাড়িয়ে আরও গভীর তাৎপর্য তৈরি করে, যা জাতীয় সীমানা অতিক্রমকারী এক অধিবিদ্যক অবস্থারও ইঙ্গিত দেয়। এই অর্থে, গোগলের সমালোচনা শুধু রাশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা পুরো ইউরোপকে অন্তর্ভুক্ত করে আধুনিক সভ্যতার বিস্তৃত মূল্যবোধের সংকটকে নির্দেশ দেয়।

তত্ত্বগত দিক থেকে ‘মৃত আত্মা’ ইউরোপীয় বাস্তববাদ ও আধুনিকতাবাদের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশগুলোর বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছিল। গোগলের বয়ানধর্মিতায় যে ব্যঙ্গবিদ্রূপ, কাব্যময়তা ও দার্শনিকতার ক্রমপরিবর্তনীয় রীতি, তা এর লক্ষণীয় দিক। এই রীতিপদ্ধতি প্রচলিত বাস্তবতাবাদকে ভেঙে দিয়ে উপন্যাসকে নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়। উপন্যাসের এসব প্রভাব পরবর্তী রুশ ও ইউরোপীয় লেখকদের রচনায় সুস্পষ্ট। বিশেষ করে রুশ সাহিত্যিক ফিওদর দস্তয়েভস্কি ও লিও তলস্তয়ের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এ দুই কথাকার উপন্যাসে জীবনের গূঢ় রহস্য, মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক মাত্রাকে আরও গভীরভাবে সন্ধান করেছেন। দস্তয়েভস্কি তো গোগলকে এ ধরনের জীবনদৃষ্টি ও রীতিপদ্ধতির মৌলিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করেছিলেন। তিনি কোনো প্রকার রাখঢাক ছাড়া মন্তব্য করেন যে আধুনিক রুশ সাহিত্য গোগলের ‘ওভারকোট’ থেকে আবির্ভূত হয়েছে।

বহুমাত্রিকতার জন্য ‘মৃত আত্মা’ ইউরোপীয় সাহিত্যে এক বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিল। এটি ছিল গোগলের সচেতন প্রয়াস এবং সাহিত্যজীবনের ২৩ বছরের মধ্যে প্রায় ১৭ বছর এর পেছনে ব্যয়ও করেছিলেন। মহাকাব্যিক বিস্তার ও আন্তর্জাতীয় সমালোচনা একে যেমন স্বতন্ত্রতা দিয়েছে, তেমনি রুশ সমাজের বিশেষ বাস্তবতার পটভূমিতে আধুনিকতার সর্বজনীন সংকটগুলোর মোকাবিলাও উপন্যাসটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। উপন্যাসজুড়ে ব্যঙ্গ ছিল গোগলের অস্ত্র আর ভাষাকে তিনি প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। এ দুইয়ের মাধ্যমে মৃত আত্মাকে একদিকে করেছেন হাস্যকর, অন্যদিকে করেছেন ক্রূর ও ভয়াল। গোগল অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখান যে আধুনিক ইউরোপীয় মানুষ কোনো না কোনোভাবে একেকজন চিচিকভ। চরিত্রটির মাধ্যমে আরও দেখান, ব্যক্তি ও সমাজ কীভাবে একে অপরকে মৃত আত্মায় পরিণত করেছে।

অস্তিত্ব ও নৈতিকতার প্রশ্নেও গোগলের জিজ্ঞাসা ছিল এমন যে ‘মানুষ কি বেঁচে থেকেও আত্মাকে মেরে ফেলতে পারে?’ ‘মৃত আত্মা’য় সে উত্তরও আছে, ‘হ্যাঁ, বিলকুল পারে।’ এর পরিপ্রেক্ষিতে উপন্যাসে মানুষের আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা, অধিকার ও অস্তিত্বের অর্থহীনতার অনুভূতিও নানাভাবে উন্মোচিত হয়েছে। অস্তিত্ববাদী দর্শনে মানুষের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতাকে দার্শনিক প্রতিপাদ্যে দেখানো হয়। এতে মানুষ তার নিজস্ব পছন্দ, কর্ম ও দায়িত্বের মাধ্যমে অর্থ তৈরি করে; সমাজ বা প্রথা তাকে বাধ্য করতে পারে না। কিন্তু গোগল দেখান যে চিচিকভ ও তার চারপাশের মানুষেরা জীবিত হলেও তাদের আত্মা মৃত; কারণ, তারা নিজস্ব অর্থ, দায়িত্ব বা স্বাধীনতা তৈরি করতে অক্ষম। চিচিকভ নিজেকে স্বকীয় ব্যক্তি ভাবলেও মূলত সে সমাজ-উদ্ভূত এক সুযোগসন্ধানী সত্তা। তার কর্ম হচ্ছে মৃত আত্মা কিনে সম্পদশালী হওয়া। এটি হয়তো নিজের অস্তিত্বকে জানান দেওয়ার চেষ্টা, বাস্তবে তা সত্যিকারের অর্থ বা স্বাধীনতা নয়। অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে চিচিকভ সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় জীবনের অর্থ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই সে অস্তিত্বের অসত্য ও প্রতারণার জালিয়াতিতে নিজেকে যুক্ত করে। মৃত রায়তদের নিয়ে ব্যবসা মূলত তার অমানবিকতা ও নৈতিক শূন্যতাকে প্রকাশ করে। উপন্যাসে চিত্রিত প্রত্যেক জমিদারও জীবিত অবস্থায়ই নিজস্ব নৈতিক বোধহীনতার কারণে অস্তিত্বহীন। তাই মৃত আত্মা কেবল শারীরিকভাবে মৃত নয়; বরং মানসিক, নৈতিক ও অস্তিত্বগতভাবেও মৃত। গোগল আরও প্রশ্ন তোলেন যে মানুষ যদি শুধু প্রথা, স্বার্থ ও সুবিধার জন্য বাঁচে, তাহলে তার অস্তিত্ব কি সত্যিই আছে? অস্তিত্ববাদী দার্শনিকদের বড় প্রশ্নও ছিল তা–ই।

উপন্যাসের শিল্পদর্শন নিয়ে নিজের ধারণার সঙ্গে যে গোগলের জীবনসত্য ও জীবনানুসন্ধান সম্পর্কিত ছিল, তারও পরিচয় পাওয়া যায় ‘মৃত আত্মা’য়। তাই শিল্পী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব সম্পর্কে উপন্যাসে কথক সেজে লিখেছেন, ‘আমার ওপরে যে আশ্চর্য ক্ষমতা ন্যস্ত হয়েছে, তার বলে আরও বেশ কিছুকাল আমাকে আমার এই অদ্ভুত অদ্ভুত সব চরিত্রের সঙ্গে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতে হবে, তাদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে জীবনের উচ্ছ্বসিত বিপুল প্রবাহ ও তার গতিবিধি লক্ষ করে যেতে হবে—লক্ষ করতে হবে হাস্যরসের মাধ্যমে, যা দুনিয়ার সবার কাছে দৃষ্টিগোচর, কিন্তু যার অন্তরালে আছে চোখের জল, যা অচেনা, অদেখা।’ গোগলের মতে, এটাই প্রকৃত ঔপন্যাসিকের কর্তব্য—শিল্পেরও দায়িত্ব। মানবচরিত্রের উচ্চ মূল্যবোধের মূর্ত প্রকাশের পরিবর্তে জীবনের যেসব তুচ্ছ বস্তু আর সেসবের যত বিভীষিকাময় বীভৎস রূপ জীবনকে জটিল করে তোলে, ঔপন্যাসিকের দায়িত্ব হচ্ছে নির্মম হাতে ছেনি দিয়ে গড়ে তুলে তার সুস্পষ্ট রূপ জনসমক্ষে উপস্থিত করা। তবে এ ধরনের শিল্পকর্ম নির্মাণ একদিকে যেমন কঠিন, অন্যদিকে ভারি তিক্ত আর নিঃসঙ্গতার অভিজ্ঞতার কারণও হতে পারে। এমন শিল্পীর ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গোগলের শঙ্কা ছিল যে ভণ্ডামিপূর্ণ, নির্মম সেই বিচারে তাঁর এত দিনের সযত্নে লালিত সৃষ্টি অতি নগণ্য ও নিম্নমানের বলে আখ্যাত হবে, মানবজাতির অবমাননাকারী ঘৃণিত লেখকদের মধ্যে কোনো এক কোনায় তাঁর ঠাঁই হবে। তিনি তাঁর রচনায় যেসব চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, তাদেরই যাবতীয় বৈশিষ্ট্য তাঁর ওপর আরোপিত হবে, তাঁর কাছ থেকে তাঁর হৃদয়, তাঁর মন, তাঁর প্রতিভার স্বর্গীয় বহ্নিশিখা ছিনিয়ে নেওয়া হবে। তা সত্ত্বেও গোগল নিজের শিল্পদর্শনে অবিচল থেকে অনুসন্ধান করেছেন জীবনের উপরিকাঠামোর অন্তরালে সামাজিক অসুস্থতা, নৈতিক শূন্যতা ও অস্তিত্বের সংকট, যা একদিকে হাস্যকর, অন্যদিকে করুণ। সব মিলিয়ে বাস্তবতা, ব্যঙ্গ ও নৈতিক অনুসন্ধানের বিরল সমন্বয়ের মাধ্যমে গোগল কেবল সমকালীন অন্তর্দ্বন্দ্বকে উন্মোচিত করেননি; বরং ইউরোপের বৌদ্ধিক ও শিল্পচৈতন্যেও এক যুগপৎ অবদান রেখে গেছেন। নিকোলাই গোগলের এই জীবন অনুসন্ধান, জীবনদৃষ্টি ও শিল্পরীতি পরবর্তীকালের উপন্যাস সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর প্রেরণায় নিজ দেশ রাশিয়ায় দস্তয়েভস্কি ছাড়াও ইউরোপীয় অপরাপর ঔপন্যাসিক, যেমন আলব্যের কামু, জেমস জয়েস প্রমুখ উপন্যাসে যুক্ত করেন নতুন নতুন মাত্রা।

Read full story at source