অবশেষে বৈকাল হাঁসের দেখা
· Prothom Alo

পাঁচ বছর আগের কথা। পক্ষী আলোকচিত্রী ইমরুল কায়েসকে নিয়ে নাজিরুল মাঝির নৌকায় অতি বিরল এক পরিযায়ী হাঁসের খোঁজে গিয়েছি রাজশাহীর পদ্মা নদীর শ্যামপুর চরে। কিন্তু অনেক খুঁজেও দেখা পেলাম না। পরদিন ফেসবুকে পক্ষী আলোকচিত্রী নূর-ই-সৌদ বিরল হাঁসটির ছবি পোস্ট করলেন। কিন্তু ব্যস্ততার জন্য সঙ্গে সঙ্গে যেতে পারলাম না। ১৮ দিন পর নুরু মাঝিকে নিয়ে আবারও শ্যামপুর গেলাম। অনেকক্ষণ খোঁজার পর নুরু বলল, ‘ওই যে স্যার, দেখেন?’ কিন্তু এত হাঁসের মাঝে ওকে শনাক্ত করতে পারলাম না। পরে নুরুও ওকে আর খুঁজে পেল না। এর আগে টাঙ্গুয়া ও হাকালুকি হাওর, বাইক্কা বিল, হাতিয়া, দমার চর—কোথায় না ওকে খুঁজেছি। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গুয়ায় আমাদের একজন ওর ছবি তুলতে পারলেও বাকিরা ব্যর্থ হলাম।
Visit newsbetting.bond for more information.
গত ২৪ জানুয়ারি অতি বিরল পাতি সারসের ছবি তুলে সিলেট থেকে শ্রীমঙ্গলে গেলাম। পরদিন গেলাম কমলগঞ্জের আদমপুর বনে। ২৬ জানুয়ারি সকালে মাত্র তিন ঘণ্টার জন্য বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়াশ্রমে গেলাম বিলের পাখিদের বর্তমান অবস্থা দেখতে। এখন বিলটি জনসাধারণের জন্য বন্ধ। তবে বেশ ক বছর ধরেই বাইক্কায় আগের মতো পাখি আসে না। অথচ এক যুগ আগেও এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটত। আশপাশের পুকুরগুলোও পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকত।
যদিও টাওয়ার থেকে বিলে বেশ কিছু হাঁস ও জলচর পাখি দেখলাম, কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য। তবে চকচকে দোচরা বা কালো কাঁচিচোরা দেখলাম ৩০০ থেকে ৪০০টি। ওদের ছবি তোলার তেমন আগ্রহ না থাকলেও নবীন পক্ষী আলোকচিত্রী শাহাদাত হোসেনের অনুরোধে টাওয়ার থেকে নিচে নামলাম। করচ বাগানের ভেতর দিয়ে পাঁচ মিনিট হেঁটে বিলের ধারে গিয়ে প্রায় আধ ঘণ্টা ছবি তুললাম। কিন্তু ঢাকা ফেরার তাড়া থাকায় বেশি সময় দিতে পারলাম না। তাই বিলে দেখা প্রায় সব হাঁসের ছবি তুললাম, যেন বাসায় ফিরে ছবি দেখে শনাক্ত করা যায়।
রাতে বাসায় ফিরে ক্যামেরা থেকে ছবি ল্যাপটপে নিলাম। এরপর প্রতিটি ছবি পরীক্ষা করতে লাগলাম। বিলে তোলা ৯, ১০ ও ১১ নম্বর ছবিতে এসে চোখ আটকে গেল। উড়ন্ত পিয়ং হাঁসের ঝাঁকের একেবারে পেছনে অধরা হাঁসাটি উড়ছে। মনটা আনন্দে ভরে উঠল। এরপর ১৩৭-১৩৯ নম্বর ক্লিকে পানিতে ভাসমান পাখিটিকে পেলাম। তবে আশ্চর্যের বিষয়, ছবি তোলার সময় এত হাঁসের ভিড়ে ওকে খেয়ালই করিনি। অথচ দূর থেকে হলেও স্পষ্ট ছবি পেলাম।
অনেক খোঁজার পর অজান্তে পেয়ে যাওয়া অধরা হাঁসটি এ দেশের বিরল ও তথ্য অপ্রতুল ভবঘুরে পাখি মনিরা হাঁস। অনেকে বলেন বৈকাল হাঁস। ইংরেজি নাম বৈকাল/বিমাকুলেট/স্কোয়াক ডাক বা ফরমোজা টিল। অ্যানাটিডি গোত্রের হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Sibirionetta formosa, যার অর্থ সুন্দর হাঁস। পূর্ব রাশিয়ার আবাসিক হাঁসটি শীতে সচরাচর পূর্ব এশিয়ায় পরিযায়ন করে।
এটি ছোট আকারের হাঁস। দেহের দৈর্ঘ্য ৩৯-৪৩ সেন্টিমিটার। হাঁসা ও হাঁসির ওজন যথাক্রমে ৩৬০-৫২০ ও ৪০২-৫০৫ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে আলাদা। প্রজননকালে হাঁসার মাথা ও মুখমণ্ডল বেশ নকশাদার হয়ে ওঠে। মাথার চাঁদি, ঘাড়, ঘাড়ের পেছন ও গলা কালো। মুখমণ্ডল দুটি স্পষ্ট বাদামি পট্টি। চোখ থেকে একটি সরু কালো পট্টি—এই দুটি পট্টির মাঝখান দিয়ে গলায় নেমে গেছে। চোখের পেছন থেকে আরেকটি সবুজ পট্টি মাথার পাশ দিয়ে চলে গেছে। বুকে থাকে কালো তিল। বগল ধূসর ও পেট সাদা। লেজের তলা স্লেটের মতো। অন্যদিকে স্ত্রী দেখতে অনেকটা নাইরলি হাঁসির মতো। দেহ বাদামি, মাথার চাঁদি কালচে ও ঠোঁটের গোড়ায় সাদা পট্টি। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখের মণি বাদামি, ঠোঁট গাঢ় ধূসর এবং পা ও পায়ের পাতা হলদে-ধূসর। প্রজননকাল ছাড়া বাকি সময় হাঁসার লালচে বুক ও বগল ছাড়া বাকি অংশ হাঁসির মতো। ঠোঁটের গোড়ার সাদা পট্টি ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁস দেখতে মায়ের মতো।
শীতে এদের কালে-ভদ্রে সিলেটের হাওর-বিল ও রাজশাহীর পদ্মা নদীতে দেখা যায়। একসময় ঢাকায়ও দেখা যেত। সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা হাঁসের মিশ্র ঝাঁকে বিচরণ করে। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ উদ্ভিদের পাতা, মূল ও বীজ, জলজ কীটপতঙ্গ, কেঁচো, শামুক-গুগলি ইত্যাদি খায়। ঘন ঘন ডানা চালিয়ে দ্রুত উড়ে যায়। পানি থেকে খাড়া ওপরে উঠতে পারে। প্রজননকালে হাঁসা মুরগির মতো ‘ওট-ওট-ওট...’ শব্দে ডাকে ও হাঁসি নিচু কাঁপা স্বরে সাড়া দেয়।
মে থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় মূল আবাস এলাকা অর্থাৎ সাইবেরিয়ার পানির ধারে তৃণভূমিতে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৬-৯টি। সবুজাভ-ধূসর রঙের ডিমগুলো ২৪-২৫ দিনে ফোটে। ছানারা ২৫-৪০ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল ৬-৭ বছর।
আ ন ম আমিনুর রহমান: পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়