রুমার দুর্গম পাঁচ গ্রামের বাস্তবতা: একটি সড়কে বদলে যেতে পারে দেড় শ পরিবারের জীবন

· Prothom Alo

সবুজ পাহাড়, ঘন জঙ্গল আর নীলাভ আকাশে ঘেরা প্রকৃতির এক অপার আশীর্বাদ রূপসী জেলা বান্দরবান। জেলা শহর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার দূরে রুমা উপজেলা শহরে পৌঁছাতে হলে পুরো পথটাই পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ি সড়ক ধরে। উঁচু-নিচু ঢাল বেয়ে সরু পথ এগিয়ে গেছে পাহাড়ের বুক চিরে। দুই পাশে ঘন জঙ্গল, বৃষ্টির স্পর্শে সে জঙ্গল আরও সবুজ হয়ে ওঠে। দূরে তাকালে মনে হয়—চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। কিন্তু এই অপার সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কষ্টের এক বাস্তবতা।

Visit mwafrika.life for more information.

রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের আলেচুপাড়া গ্রাম। যেখানে যেতে হলে বান্দরবান সদর থেকে রুমা যাওয়ার পথে নামতে হয় কক্ষংঝিরি বাজারে। সেখান থেকে বাম পাশে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। নদী পার হয়ে পাহাড়ি কাঁচা পথ ধরে হাঁটতে হয় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ, কোথাও নেই পাকা রাস্তা বা যানবাহনের ব্যবস্থা। এরপরই চোখে পড়বে ছোট্ট একটি পাহাড়ি বসতি, যেখানে প্রায় ৪০টি পরিবারের বসবাস। গ্রামটির সব বাসিন্দাই মারমা সম্প্রদায়ের। একই কাঁচা পথে আরও চারটি পাহাড়ি গ্রাম রয়েছে—তংমকপাড়া, কান্নাপাড়া, বাগানপাড়া, থোয়াইবতং পাড়া। এ গ্রামগুলোয়  মারমা এবং বম, এই দুই সম্প্রদায়ের বসতি। এই পাঁচটি পাড়ার প্রায় দেড় শরও বেশি পরিবারের মানুষের জীবন একই সমস্যায় আটকে আছে—সড়ক যোগাযোগের অভাব।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

পাহাড়ের উঁচু–নিচু পথ বেয়ে কাঁচা এ পথ দিয়েই আলেচুপাড়া ছাড়াও আশপাশের আরও পাঁচটি পাড়ার মানুষ বাজার, স্কুল বা হাসপাতালে যাতায়াত করেন। গ্রামের বাসিন্দারা সাধারণত সপ্তাহে বাজারের দিনেই (বুধবার) বেশির ভাগ সময় মূল সড়কে আসেন। প্রয়োজন না থাকলে কেউ এই কষ্টের পথও পাড়ি দিতে চান না। যেখানে স্বাভাবিক যোগাযোগের চেয়ে খানিকটা বিচ্ছিন্ন এ অঞ্চলে বসবাসরত মানুষগুলো।

আলেচুপাড়ার বাসিন্দা মংসাইআং মারমা (৪৯) একজন জুমচাষি। তার পরিবারে ছয়জন সদস্য। সংসারের সব খরচ চলে জুমের ফসল বিক্রি করে। তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রাম থেকে বাজারে যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটতে হয়। সড়ক নেই, গাড়ি চলার ব্যবস্থা নেই। জুমে চাষ করা ফসল বস্তায় ভরে কাঁধে করে বাজারে নিতে হয়। এটা খুব কষ্টের। অসুস্থ হলে হাসপাতালে যেতে আরও বড় সমস্যায় পড়তে হয়।’

৬০ বছর বয়সী জুমচাষি উমং মারমা। একজন তার জুমে এবার হলুদ, আদা, তিল, কাজুবাদাম ও বিভিন্ন ফলের বাগান রয়েছে। কিন্তু বাজারে নেওয়ার রাস্তা না থাকায় অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেক ফসল বাজারে নামানোর আগেই পচে যায়। লাভ করার বদলে ক্ষতি হয়। আগে অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বার রাস্তা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো পাকা রাস্তা হয়নি।’

শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত তরুণেরা

আলেচুপাড়া গ্রাম ঘুরে দেখা মিলেছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সহযোগিতায় একজন শিক্ষক দিয়েই চলে এ স্কুল। যদিও প্রয়োজনীয় শিক্ষাসহায়ক সামগ্রীর ঘাটতি চোখে পড়েছে। তা ছাড়া গ্রামের বাসিন্দারা মূলত জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তুলনামূলক অসচ্ছল জীবন যাপন করেন। তাই পরিবারে সন্তানদের জন্য লেখাপড়ায় ব্যয় অভিভাবকদের কাছে বাড়তি খরচের মতো।

আলেচুপাড়ার তরুণ মংহ্লা অং মারমা (১৯) একসময় পড়াশোনা করতেন। কিন্তু আর্থিক সংকট ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে তাঁকে পড়ালেখা ছাড়তে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকায় সবচেয়ে বড় সমস্যা সড়ক নেই। এই এক সমস্যার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা—সব ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে। একটি সেগুনগাছ বাজারে হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়। কিন্তু রাস্তা না থাকায় গ্রামেই ৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়।’

সড়ক না থাকায় প্রসবের সময় শিশুর মৃত্যু

দুর্গম এই যোগাযোগব্যবস্থার ভয়াবহতা সম্প্রতি আরও একবার সামনে আসে। গেল ২২ জানুয়ারি আলেচুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা সিংনু মারমা (৩০) প্রসব বেদনায় আক্রান্ত হন। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় প্রথমে গ্রামের একজন নার্সের সহায়তায় ঘরেই প্রসবের চেষ্টা করা হয়। এ সময় গর্ভে থাকা যমজ সন্তানের একজন মারা যায়।

পরে সিংনু মারমার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে কম্বলে মোড়ানো স্ট্রেচারে করে পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সিংনু মারমা বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো থাকলে হয়তো আমার সন্তানকে হারাতে হতো না। তাঁর স্বামী নুং সুই থি মারমা জানান, সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া গেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব ছিল।

স্থানীয়দের দাবি, কক্ষংঝিরি বাজার থেকে আলেচুপাড়া পর্যন্ত একটি সড়ক তৈরি হলে শুধু এই গ্রাম নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি পাহাড়ি পাড়ার মানুষের জীবন বদলে যাবে। গ্রামবাসীদের একটাই আবেদন—একটা রাস্তা করে দিন, আমাদের জীবনটা একটু সহজ হোক।

পাইন্দু ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উহ্লামং মারমা বলেন, ‘এ সড়কটির জন্য উন্নয়ন বোর্ড এবং জেলা প্রশাসনে আবেদন করেছি। ওই গ্রামগুলোয় দুটি গাড়ি চলাচলের সড়ক করা হবে বলে আমাকে আশ্বস্ত করা হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি।’

*লেখক: রবিন দাশ গুপ্তসাই সিং মং মারমা, শিক্ষার্থী: সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম

Read full story at source