‘ধুরন্ধর’ কি বলিউডের পুরোনো জাদু ফেরাবে
· Prothom Alo

একটা সময় ছিল, ভারতের সিনেমা হলে ঢুকলেই যেন অন্য এক জগৎ। নায়ক পর্দায় প্রবেশ করতেই শিস, তালি, উল্লাসে ভরে উঠত হল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ‘ম্যাজিক’ যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান, বড় বাজেটের ছবির ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে সিনেমা হলের ভিড় কমছিল চোখে পড়ার মতো।
ঠিক তখনই আসে এক ছবি—আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’। মাস কয়েকের মধ্যেই আসে সেটির সিকুয়েল ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’। দুটি সিনেমাই যেন সেই হারিয়ে যাওয়া উত্তেজনাকে ফিরিয়ে আনে নতুন করে।
হলভর্তি দর্শক, রাতভর শো
২০২৫ সালের শেষে মুক্তি পাওয়া ‘ধুরন্ধর’ শুধু বক্স অফিসে সফলই হয়নি; বরং একপ্রকার ‘গেম চেঞ্জার’ হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে এটি বলিউডের সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় হিটে পরিণত হয়।
Visit moryak.biz for more information.
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে হলগুলোতে। ভারতের বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইন পিভিআর আইনক্সের দর্শকসংখ্যা বেড়ে যায় উল্লেখযোগ্যভাবে। আর সিকুয়েল ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ মুক্তির পর সেই উন্মাদনা যেন আরও কয়েক গুণ বাড়ে। এ ছবির সাফল্যের জেরে তাদের দর্শকসংখ্যা প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে এবং মোট আয়ে এসেছে ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি। আর সিকুয়েল মুক্তির পর সেই উন্মাদনা আরও বেড়েছে—অগ্রিম টিকিট বিক্রি হয়েছে ১৫ লাখের বেশি! মুক্তির আগেই ১৫ লাখের বেশি টিকিট বিক্রি, যা আজকের দিনে বিরল ঘটনা।
‘ধুরন্ধর ২’ সিনেমার ট্রেলারে রণবীর। এক্স থেকেচার ঘণ্টার ‘জাদু’
প্রায় চার ঘণ্টার এ ছবি শুধু দৈর্ঘ্যে নয়, নির্মাণেও বিশাল। দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় সারাক্ষণই চলছে শো। একাধিক সিনেমা হলে দিনে ৩০টির বেশি প্রদর্শনী, যা বলিউডে এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। ছবিতে প্রধান চরিত্রে আছেন রণবীর সিং—একজন ভারতীয় গুপ্তচর, যিনি পাকিস্তানের করাচিতে বিপজ্জনক মিশনে নেমেছেন। সঙ্গে আরও আছেন আর মাধবন, অর্জুন রামপাল, সঞ্জয় দত্তর মতো তারকারা। মুক্তির পর সিনেমাটির প্রশংসা করেছেন বলিউড ও দক্ষিণি তারকারাও। ‘পুষ্পা’ তারকা আল্লু অর্জুন একে বলেছেন, ‘দেশপ্রেম আর স্টাইলের মিশেল।’ অভিনেত্রী প্রীতি জিনতার মতে, ‘দুর্দান্ত, মন ভরিয়ে দেওয়া সিনেমা।’
আর অনুপম খের এটিকে আখ্যা দিয়েছেন ‘দেশকে গর্বিত করার মতো সিনেমা’ বলে।
তবে সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। অনেকেই বলছেন, ছবিটি চমক আর উচ্চ স্বরে দেশপ্রেম দেখাতে গিয়ে গল্পের গভীরতা হারিয়েছে।
গল্পে রাজনীতি, পর্দায় বিতর্ক
ছবিটি কেবল অ্যাকশন-থ্রিলার নয়, এর ভেতরে জড়িয়ে আছে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান, এমনকি বাস্তব ঘটনার ছায়াও। যেমন পাকিস্তানের ‘অপারেশন লিয়ারি’ কিংবা ভারতের ‘নোটবন্দী’ প্রসঙ্গ—এসবই গল্পে ঢুকে পড়েছে নাটকীয়ভাবে। এখানেই শুরু বিতর্ক। অনেক সমালোচকের মতে, ছবিটি ‘জাতীয়তাবাদী আবেগ’কে অতিরিক্ত জোর দিয়ে দেখিয়েছে। কেউ কেউ একে সরাসরি ‘প্রোপাগান্ডা’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন। অনেক দর্শক মনে করেন, এটি সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে, বিশেষ করে ভারতের ২০১৬ সালের নোট বাতিলের প্রসঙ্গ তুলে ধরার মাধ্যমে। অনেকে অভিযোগ তুলেছেন, এটি বাস্তব জটিল ভূরাজনীতিকে সরলীকরণ করেছে।
দর্শকের উচ্ছ্বাস বনাম সমালোচকের প্রশ্ন
হল থেকে বেরিয়ে অনেক দর্শক বলছেন ‘পয়সা উশুল’, অর্থাৎ টিকিটের পুরো দাম উশুল। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, ছবিটি ভিজ্যুয়াল ও নির্মাণে চমকপ্রদ হলেও গল্পের গভীরতা কিছুটা কম।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একই চিত্র—প্রশংসা যেমন আছে, তেমনি আছে ‘হাইপ’ নিয়ে প্রশ্ন।
বলিউডে ‘ব্লকবাস্টার’ যুগের প্রত্যাবর্তন?
চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ‘ধুরন্ধর’ বলিউডে বড় পর্দার ‘ইভেন্ট সিনেমা’র প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেকেই তুলনা করছেন ১৯৭৫ সালের কালজয়ী ছবি ‘শোলে’র সঙ্গে, যে ছবি বছরের পর বছর প্রেক্ষাগৃহে চলেছিল। চলচ্চিত্র বিশ্লেষক তরণ আদর্শ বলেন, ‘এই সিনেমা প্রমাণ করেছে, দর্শক এখনো হলে ফিরতে চায়, যদি কনটেন্ট যথেষ্ট বড় ও আকর্ষণীয় হয়।’
বিনোদন ছাড়িয়ে ‘সাংস্কৃতিক ঘটনা’
এ ছবির প্রভাব শুধু সিনেমা হলেই সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এর আলোচনা ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব কিংবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর কথায়ও উঠে এসেছে এ ছবির নাম।