সালামির স্মৃতি, চোখে জল—তামান্নার এবারের ঈদ শুধু বেদনার

· Prothom Alo

চারপাশে ঈদের আনন্দ-উৎসবের জোয়ার। ঈদের খুশিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট-বড় সবাই। মেতে আছে হই-হুল্লোড়, আড্ডা-গল্প, আলাপে। তবে উচ্ছ্বাসের এই রং স্পর্শ করেনি কলেজপড়ুয়া তাসমিম তামান্না ও তার পরিবারকে। বরং পরিবারটি ডুবে আছে চরম বিষাদে। ঈদের দিনে তাদের ঘরের সদস্যদের সঙ্গী নিঃশব্দ কান্না আর কষ্ট।

তাসমিম তামান্নাদের ঈদের খুশি কেড়ে নিয়েছে এখন থেকে বহুদূরের এক যুদ্ধ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে প্রাণ গেছে তাসমিমের বাবা বাহরাইনপ্রবাসী আবুল মহসিন তারেকের (৪৮)। মৃত্যুর ২০ দিন পার হলেও এখনো বাবার মরদেহ বুঝে পায়নি তাসমিম তামান্না। বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় প্রবাসী তারেকের লাশ পড়ে আছে বাহরাইনের হাসপাতালের মর্গে।

Visit casino-promo.biz for more information.

নিহত তারেকের বাড়ি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের আজিমপুর ইউনিয়নে। ২৭ বছর আগে বাহরাইনে যান তিনি। দেশে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিম তামান্না। তামান্না নগরের বেপজা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামার আরসি ড্রাইডক নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তারেক। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ১ মার্চ রাতে বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে চালানো তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হন তিনি।

বাহরাইনে নিহত আবুল মহসিন তারেক

সালামির স্মৃতি, চোখে জল তামান্নার

পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন আজ শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরে তারেকের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে ঈদের আনন্দ, রঙিন পোশাক আর শুভেচ্ছার ভিড়। কিন্তু সেই আনন্দ যেন ছুঁয়ে যায় না এই পরিবারকে। বাসার ভেতরটায় এখন শুধু শোকের ভার। আত্মীয়স্বজন আসছেন, সান্ত্বনা দিচ্ছেন—তবু শূন্যতা কাটছে না।

তাসমিম তামান্নাদের এবারের ঈদের গল্প এমন করুণ হওয়ার কথা ছিল না। ২৭ বছর ধরে প্রবাসে থাকা এস এম তারেকের গত ১৫ বছরে দেশে ঈদ করা হয়নি। তাই এবার দেশেই পবিত্র ঈদুল ফিতর ও পবিত্র ঈদুল আজহা পালনের পরিকল্পনা করেছিলেন। স্ত্রী রোকেয়া বেগম ও মেয়ে তাসমিমসহ ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করে রেখেছিলেন। জানিয়েছিলেন, ছুটি পেলেই রোজার মধ্যে দেশে আসবেন। তবে যুদ্ধ একদিকে তারেকের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে, তেমনি দেশে থাকা পরিবারের সব স্বপ্ন-সাধ রুদ্ধ করেছে।

ঈদের দিন ঘুরেফিরে বাবার স্মৃতি মনে পড়ছে তাসমিমের। এসব স্মৃতির কথা স্মরণ করতে গিয়ে কখনো নীরবে, কখনো আর্তনাদ ফুটে উঠছিল এই তরুণীর।

ঈদের সময় বাবাকে কাছে না পাওয়ার একটি চাপা কষ্ট সব সময় ছিল তাসমিমের। মেয়ের এমন দুঃখের কথা জানতেন বাবা এস এম তারেক। তাই চাঁদরাত থেকে শুরু করে ঈদের দিন, পরদিন—মেয়ের সঙ্গে দফায় দফায় ভিডিও কলে কথা বলতেন। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের অনুরোধ করে মেয়ের কাছে নিয়ে আসতেন। মেয়ের ঈদের আনন্দে যাতে কোনো ভাটা না পড়ে, সে জন্য আগেই স্ত্রীর কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। তা দিয়ে কেনা হতো নতুন জামা–জুতা। একই সঙ্গে ঈদের সালামিও দিতে ভুলতেন না।

সে কথা স্মরণ করে তাসমিম বলে, ‘ঈদের সময় তো বাবাকে কাছে পেতাম না। তারপরও আমার যাতে মন খারাপ না হয়, কোনো ইচ্ছা অপূর্ণ না থাকে তার সব ব্যবস্থা করতেন। বারবার ভিডিও কল দিতেন। ভিডিও কলে বাবাকে সালাম করতাম। এরপর বাবার পাঠানো টাকা আমাকে সালামি হিসেবে দিত মা।’

শুধু কি এসব স্মৃতি ঘিরে ধরেছে তাসমিম তামান্নাকে! মুঠোফোনের স্মৃতি বক্সে জমা বাবার সঙ্গে নানা ধরনের ছবি দেখাতে থাকে। এসবের ফাঁকে বাবা যেমন তার ঈদকে রাঙিয়ে দেওয়ার জন্য নানা চেষ্টা করতেন, তেমনি তারও চেষ্টার কমতি ছিল না বাবার ঈদকে বর্ণিল করার জন্য।

‘বাবা সব সময় আমাকে হাতখরচের টাকা দিতেন। নানা উসিলায় বাবার কাছ থেকে টাকা নিতাম। এসব টাকা প্রয়োজন ছাড়া খরচ রাখতাম না। কিছু টাকা জমিয়ে রাখতাম। এই জমানো টাকা দিয়ে প্রতিবছর বাবার জন্য ঈদের সময় পাঞ্জাবি কিনতাম। তা বাবার কাছে পাঠিয়ে দিতাম। গত বছরও দিয়েছিলাম। আমার কেনা পাঞ্জাবি পরে বাবা ঈদের নামাজ পড়েছিলেন। কিন্তু এবার তো আরও বড় স্বপ্ন ছিল, বাবা দেশে আসবেন। একসঙ্গে মার্কেটে গিয়ে বাবাকে পছন্দের পাঞ্জাবি কিনে দেব। কিন্তু যুদ্ধ তো আমার বাবাকে কেড়ে নিল, আমার ঈদের আনন্দও কেড়ে নিয়েছে।’

বাবা নেই, এখন ছবিই স্মৃতি আবুল মহসিন তারেকের মেয়ে তাসমিম তামান্নার। সেই ছবি নিয়েই এবার কাটছে তার ঈদ। আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম নগরের বউবাজার কেতুরা মসজিদ গলি এলাকায়

‘এমন হতাশার ঈদ কখনো আসেনি’

বোন রোকেয়া বেগম ও ভাগনি তাসমিমকে সান্ত্বনা দিতে ঈদের আগের রাতে চলে আসেন তারেকের শ্যালক রিয়াজ উদ্দিন সোহরাব। ভগ্নিপতির এমন করুণ মৃত্যু এখনো অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তাঁর। ঘরজুড়ে ভগ্নিপতির নানা স্মৃতিস্মারক ঘুরে ঘুরে দেখান তিনি।

রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘আগে কত আনন্দ হতো আমাদের। ঈদের সময় দুলাভাই (ভগ্নিপতি) ভিডিও কলে আমাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতেন। দেশে আসতে পারেন না, এ জন্য আমাদের ঈদের আগেই তাঁর বাসায় চলে আসতে বলতেন। এবার তো তাঁকে (তারেক) বলতে হয়নি। আমরা এসেছি। চারপাশে ঈদের আনন্দ। কিন্তু আমাদের তার কিছুই নেই। এমন হতাশার ঈদ কখনো আসেনি।’

প্রবাসী এস এম তারেককে জীবিত ফিরে পাবেন না—এমন বাস্তবতা মেনে নিয়েছে তাঁর আত্মীয়স্বজন। কিন্তু স্বামীর মৃত্যু এখনো মেনে নিতে পারছেন না তারেকের স্ত্রী রোকেয়া বেগম। দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কার্যত নীরব হয়ে গেছেন তিনি। নিজের কক্ষে প্রায় সময় চুপচাপ থাকেন। চারপাশে আছেন আত্মীয়স্বজন। কিন্তু চাপা কান্নাই তাঁর একমাত্র সঙ্গী।

ইরানের হামলায় এবার বাহরাইনে এক বাংলাদেশি নিহত

বাবার মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষা

জীবিত বাবাকে পাবে না, কিন্তু মৃত বাবার মরদেহ যেন দ্রুত দেশে নিয়ে আসে—সরকারের প্রতি সে অনুরোধ জানাল তাসমিম তামান্না। অন্তত যাতে বাবার শেষ স্পর্শটুকু নিতে পারে সে।

তামান্নার ঈদ এখন আর ঈদ নয়। নতুন জামা থাকলেও তা পরার ইচ্ছা নেই। তার কথা, ‘আমার বাবাকে তো আর ফিরে পাব না, কিন্তু যেন আর কোনো মেয়েকে এভাবে বাবাকে হারাতে না হয়।’

একটি পরিবারের ঈদ আজ থমকে গেছে যুদ্ধের নির্মমতায়। যে ঈদ হওয়ার কথা ছিল পুনর্মিলনের, তা হয়ে উঠেছে চিরবিদায়ের স্মৃতি। ঈদের আনন্দের মধ্যেও এই ঘরের নীরবতা অন্য সবাইকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—যুদ্ধ কি কখনো কোনো পরিবারের সুখ বয়ে আনে?

Read full story at source