পোড়া রোগী গুরুতর হলেই ছুটতে হয় ঢাকায়

· Prothom Alo

চট্টগ্রামে আগুনে পোড়া ও দগ্ধ রোগীদের জন্য একমাত্র ভরসা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। তবে ৬০ শয্যার এই ইউনিটে নিজস্ব নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) না থাকায় গুরুতর দগ্ধ রোগী পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকায়।

বর্তমানে আইসিইউ প্রয়োজন হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেশিয়া ও আইসিইউ বিভাগের ওপর নির্ভর করতে হয় বার্ন ইউনিটকে। তবে সেখানে আইসিইউ শয্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে রোগীদের ঢাকায় পাঠানো ছাড়া বিকল্প থাকে না।

Visit fish-roadgame.com for more information.

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে বর্তমানে বার্ন ইউনিটের কার্যক্রম চলছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, আইসিইউ না থাকা, রোগীর চাপ ও সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে গুরুতর দগ্ধ রোগীদের এখানে পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। বড় দুর্ঘটনার সময় রোগী ও স্বজনদের চাপও বেড়ে যায়।

গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় বিস্ফোরণ ও বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গুরুতর দগ্ধ প্রায় সব রোগীকেই উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠাতে হয়েছে। সড়কপথে রোগী স্থানান্তরে সময় লাগায় অনেকের অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। স্বজনদের অভিযোগ, পথেই কেউ কেউ মারা যান। দ্রুত চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র বার্ন ইনস্টিটিউট চালু হলে এই ভোগান্তি কমবে।

২০২২ সালের জুনে সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র বার্ন ইউনিট স্থাপনের দাবি নতুন করে জোরালো হয়। এর পর ২০২৩ সালে সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় সীমা অক্সিজেন লিমিটেড কারখানায় বিস্ফোরণের ঘটনায় বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ওই বছরই বার্ন ইউনিট স্থাপনের চুক্তি হলেও বাস্তব কাজ শুরু হতে আরও এক বছর লেগে যায়।

রোগীদের যেতে হয় ঢাকায়

গত সোমবার ভোরে নগরের হালিশহর এইচ ব্লকের হালিমা মঞ্জিলের তৃতীয় তলার একটি বাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় ৯ জন দগ্ধ হন। তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে নেওয়া হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সবাইকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।

এর আগে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী চরপাড়া এলাকায় একটি গ্যাস সিলিন্ডারের গুদামে আগুন লাগে। এতে দগ্ধ ১০ জনকেও ঢাকায় পাঠাতে হয়। ওই ঘটনায় চার শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বার্ন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে ভর্তি ছিলেন ১ হাজার ৪৪২ জন রোগী। তাঁদের মধ্যে ১২৩ জনের মৃত্যু হয়। গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয় ৫৮ জনকে। বহির্বিভাগে সেবা নেন ৩ হাজার ৫৭০ জন। ঢাকায় পাঠানো রোগীদের শরীরের ৪০ থেকে ১০০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তাঁদের বেশির ভাগই বাঁচেননি। এ ছাড়া চলতি বছরের দুই মাসে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে ১৩ জনকে। এর মধ্যে ৫ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

এক বছরে চট্টগ্রামের নতুন বার্ন ইউনিটের নির্মাণকাজ দোতলা পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে। গতকাল বেলা ১১টায় নগরের গোঁয়াছি বাগান এলাকায়

হালিশহরের বিস্ফোরণে আহত শাখাওয়াত হোসেনের ব্যবসায়িক অংশীদার ও ওই ভবনের সাবেক বাসিন্দা মনসুর আলী বলেন, ঢাকায় নেওয়ার পথে শাখাওয়াত হোসেনের স্ত্রী নুরজাহান বেগম মারা যান। চট্টগ্রামে সেবা থাকলে ঢাকায় নিতে হতো না। যাত্রাপথে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে। ঢাকায় গিয়ে পুলিশি জটিলতাও পোহাতে হয়। চট্টগ্রামের রোগীদের জন্য এখানেই পূর্ণাঙ্গ সেবা থাকা উচিত।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান মোহাম্মদ এস খালেদ বলেন, একসঙ্গে অনেক রোগী এলে আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। মাঝেমধ্যে অ্যানেসথেশিয়া বিভাগ থেকে একটি বা দুটি আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়। নতুন ভবনটি চালু হলে সেখানে ১০টি আইসিইউ থাকবে। তখন ঢাকায় রোগী পাঠানোর প্রবণতা কমবে।

আরও দেড় বছরের অপেক্ষা

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নির্মাণাধীন ১৫০ শয্যার বার্ন ইউনিট চালু হতে আরও দেড় বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। হাসপাতালের পেছনে গোঁয়াছি বাগান এলাকায় ‘চায়না এইড প্রজেক্ট অব বার্ন ইউনিট অব চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হসপিটাল ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় গত বছরের শুরুতে। এখন পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে ২৬ শতাংশ।

২০২৩ সালের ১৩ মার্চ বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের চুক্তি হয়। তবে জায়গা দখল, অবৈধ বসতি উচ্ছেদ ও প্রশাসনিক জটিলতায় দেরিতে শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ১০ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে কাজ শুরু হলে প্রকল্পের গতি বাড়ে।

২৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে চীন সরকার দিচ্ছে ১৭৯ কোটি টাকা। বাকি ১০৫ কোটি টাকা ব্যয় করবে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পের আওতায় ছয়তলা ভবনে ১৫০ শয্যার হাসপাতাল ইউনিটের পাশাপাশি ১০ শয্যার আইসিইউ, ২৫ শয্যার এইচডিইউ, তিনটি আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে গোঁয়াছি বাগান এলাকায় গিয়ে শ্রমিকদের কর্মযজ্ঞ দেখা যায়। সেখানে দুই তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে। চীনা প্রকৌশলীরা কাজের সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন। ভবনের পাশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য গর্ত খোঁড়া হয়েছে। শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, দ্রুত কাজ শেষ করতে সর্বোচ্চ কাজ করা হচ্ছে। স্থান নির্বাচনে সময় বিলম্ব হওয়ায় সময় বেশি লেগেছে।

প্রকল্প পরিচালক ও বার্ন ইউনিটের সহযোগী অধ্যাপক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, চলতি বছরের জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। মেয়াদ বাড়াতে আবেদন করা হয়েছে। নতুন ভবন চালু না হওয়া পর্যন্ত গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। তবে যতটুকু সম্ভব, রোগীদের এখানেই সেবা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

স্ত্রী-ছেলের পর মারা গেলেন দগ্ধ ব্যবসায়ী, মৃত্যু বেড়ে ৫

Read full story at source