হাওর পেরিয়ে শিশুদের কাছে

· Prothom Alo

‘দিন শুরু হয় ফজরের নামাজ দিয়ে। তারপর ঘরের প্রয়োজনীয় কাজ করি। সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবার তৈরি করতে হয়। স্বামী-শাশুড়িকে নিয়ে নাশতা সারি। দুপুরের জন্য কিছু খাবার সঙ্গে নিই। সব কাজ গুছিয়ে সকাল সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে ঘর থেকে বের হই। প্রথমে মোটরসাইকেল, তারপর নৌকায় হাওর পাড়ি দিতে হয়। স্কুলে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। পুরো দিন কাটে স্কুলে, শিশুদের সঙ্গে। দিনের শেষে ক্লান্তি নিয়ে পাখির মতো নীড়ে ফিরি।’

Visit esporist.com for more information.

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আরিফা আক্তার আলাপের শুরুটা করেন এভাবেই। শরতের এক দুপুরে সুনামগঞ্জের হাওরপারের জরাজীর্ণ এক পাঠশালার অফিসকক্ষে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেই চাকরি, তারপর বিয়ে। তিন বছর হলো শিক্ষকতা করছেন। স্বামী হেলাল আবেদীনও শিক্ষক। তাঁদের বাড়ি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী গ্রামে। 

‘ঘর থেকে বের হয়ে স্বামীর মোটরসাইকেলে প্রথমে যাই উপজেলা সদরের নৌকাঘাটে। সেখান থেকে নৌকায় দুজনের পথ দুই দিকে। আমার স্কুল টাঙ্গুয়ার হাওরের পাড়ে মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুর্গম এলাকা। যাতায়াতের ভালো ব্যবস্থা নেই। বর্ষায় নাও আর হেমন্তে পাও...।’ এভাবেই বলছিলেন আরিফা আক্তার। 

জলে-স্থলে পথের কষ্ট

বাড়ি থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব সাত কিলোমিটার। তারপর আরও ১৫ কিলোমিটার দূরে স্কুল। সেখানে পৌঁছাতে নদী-হাওর পাড়ি দিতে হয়। বছরের আট মাস এই পথ নৌকায় পাড়ি দিতে হয়। বর্ষায় হাওরের উথাল-পাতাল ঢেউ ভেঙে চলে নৌকা। ঝড়বৃষ্টি নিত্যসঙ্গী। এমন প্রায়ই হয়: সকালে ঝলমলে রোদ, বিকেলে আকাশজুড়ে ঘন কালো মেঘ। ঝোড়ো বাতাসে ঢেউ আছড়ে পড়ছে, দুলছে নৌকা হাওরের বুকে।

একবার ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আরিফার মনে হচ্ছিল, এই বুঝি সব শেষ! তুমুল ঝড়ে নৌকায় পানি উঠছিল। বাতাসে উড়ে গিয়েছিল ছাতা। আরিফার চারপাশ ঝাপসা হয়ে উঠেছিল। একসময় ঝড় থামে। আরিফার মনে স্বস্তি আসে। সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের শিক্ষকেরা বর্ষাকালে স্কুলে যাওয়া-আসার পথে প্রায়ই এ রকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। 

আরিফা বলছিলেন, ‘এখানে যাত্রীবাহী নৌকার নিয়মিত ব্যবস্থা নেই। আমরা তিনটি স্কুলের শিক্ষকেরা মিলে একটি নৌকা ভাড়া নিয়েছি। বর্ষায় সেটাতেই স্কুলে যাওয়া-আসা করি। আসলে বেশি দুর্ভোগ হয় শুকনা মৌসুমে। তখন হাওরে পানি থাকে না; মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ার পরেও সাত কিলোমিটার হাঁটতে হয়। মাঝখানে দুই জায়গায় খেয়ানৌকায় দুটি নদী পার হতে হয়। তারপর ধুলাভরা নির্জন পথে কাঠফাটা রোদে হেঁটে যাই; সেই পথের কিছু অংশে কোনো সড়ক নেই, শুধু সরু আলপথ। জুতা পায়ে নয়, বেশির ভাগ সময় হাতে নিয়েই চলতে হয়।’

হাওরপারের শিক্ষকদের শুধু যে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যাওয়া-আসা করতে হয় তা নয়; অনেক স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশও অনুকূল থাকে না। আরিফা আক্তারের স্কুলটি নানা সমস্যায় জর্জরিত। আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে তৈরি টিন-ছাওয়া তিনটি মাত্র ঘর নিয়ে তাঁদের মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার্থী ১৯৫ জন, শিক্ষক মাত্র চারজন। স্কুলটির ঘরগুলোর দেয়ালে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। টিনের চালা জরাজীর্ণ, এখানে-সেখানে ফুটো। বৃষ্টির দিনে সেসব ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। একটি নলকূপ আছে, কিন্তু ছয় মাস ধরে সেটি বিকল। ফলে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা নেই। টয়লেট-সুবিধাও ভালো নয়। 

খলিল রহমান, নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, সুনামগঞ্জ

‘শিক্ষক হব’

আরিফা আক্তার নিজের স্কুলজীবনের স্মৃতিচারণা করছিলেন। বললেন, ‘আমার স্কুলজীবন সুন্দর ছিল। পাখির মতো স্বাধীন ছিলাম তখন। এখন জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। সংসার হয়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে। যৌথ পরিবার। সবাইকে নিয়ে চলতে হয়, সবার ভালোমন্দ দেখতে হয়। জীবনটা যে একটা নির্দিষ্ট রুটিনের মধ্যে বাঁধা পড়ে গেছে।...

 ‘শিক্ষক হব, ইচ্ছাটা স্কুল থেকে মনে গাঁথা। মনে পড়ে প্রিয় শিক্ষক মতিউর রহমান স্যারের কথা। ২০০৮ সাল, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন স্যার ক্লাসে জানতে চেয়েছিলেন, আমরা কে কী হতে চাই। বুঝে কিংবা না বুঝে আমি বলেছিলাম, শিক্ষক হব। শিক্ষক হয়েছি। অন্য কোনো চাকরির জন্য চেষ্টাই করিনি। আমি আমার এই পেশা নিয়ে গর্ব করি। বাচ্চাদের সঙ্গে সারা দিন থাকি, স্কুল বন্ধ থাকলে ভালো লাগে না। স্কুলের পথে রওনা হলেই মনে হয়, ছোট বাচ্চাগুলো আমার জন্য অপেক্ষা করছে, আমি কখন পৌঁছাব ওদের কাছে! আমি ক্লাসে ঢুকতেই ওরা আনন্দে চিৎকার করে উঠবে, কেউ কেউ ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে। এ এক অন্য রকম মায়া। বিশ্বাস করুন, এই মায়াই পথের সব ঝামেলা, কষ্ট, ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।

‘গ্রামের অনেক পরিবার অসচ্ছল; তাদের বাচ্চাদের পোশাকপরিচ্ছদ, স্বাস্থ্য, চেহারা দেখে কিছুটা অনুমান করা যায়। আমি ভাবি, ওদের মা-বাবার হয়তো ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো দেখাশোনা করার সুযোগ থাকে না; অনেক মা-বাবা হয়তো বাড়িতে বাচ্চাদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারেন না। তাই আমি স্কুলে ওদের ভালোভাবে শেখানো-পড়ানোর চেষ্টা করি; যেন ওরা বাড়িতে না পড়লেও চলে। আমি ভাবি, এই বাচ্চাগুলো যদি পড়াশোনা করে ভালো কিছু করতে পারে, নিজেদের জন্য সুন্দর একটি জীবন গড়ে তুলতে পারে, তাহলেই শিক্ষক হিসেবে আমার জীবন সার্থক হবে।’

টানাপোড়েন আছে, হতাশা নেই

আলাপের এক পর্যায়ে আরিফা আক্তার বললেন, তাঁদের সংসারের আর্থিক টানাপোড়েন আছে, কিন্তু সে জন্য তিনি হতাশা বোধ করেন না। শিক্ষকদের জীবনে প্রাচুর্য আসে না, এই সত্য জেনেই তিনি শিক্ষকতার পেশা বেছে নিয়েছেন। 

কিন্তু তাই বলে রাষ্ট্র বা সরকারের কাছে তাঁর কিছুই চাওয়ার নেই, এমনও নয়। তিনি বললেন, ‘হাওর অঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের জন্য হাওর ভাতার কথা শুনেছিলাম, সেটার বাস্তবায়ন কোথায়?’ 

নতুন পে-স্কেল ঘোষণার পর নৌকার মাঝি ছেলেটা বলল, ‘আপামণি, আপনারার বেতন বাড়ছে শুনছি, নৌকার ভাড়া বাড়াইতে অইব।’ অবশ্য আরিফা এ বিষয়ে বেশি কথা না বলে বিদ্যালয়ের শিশুশিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গেই ফিরলেন। বললেন, ‘আমি সব সময় এই বাচ্চাগুলোর কথা ভাবি। ওদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার শুরুটা যদি একটু ভালো করে দিতে পারি, সেটাই হবে আমার জন্য পরম আনন্দের বিষয়।’

  • খলিল রহমান

    নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রথম আলো, সুনামগঞ্জ

Read full story at source