মেট্রোরেলে একজন নজীবুর রহমানের মৃত্যু যে প্রশ্ন রেখে গেল

· Prothom Alo

মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড়ে এক বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক মারা গেলেন। সংবাদমাধ্যমে এ প্রতিবেদন দেখে কিছুটা ধাক্কা খেলাম। সেইসঙ্গে কিছু প্রশ্নও খোঁচা দিল মনে।

Visit chickenroad-game.rodeo for more information.

‘জন্মিলেই মরিতে হবে’ কথাটা শ্বাশতকাল ধরেই সত্য। তারপরও মানুষ বাঁচতে চায়, মানুষ মানুষকে বাঁচাতে চায়। ঘরের কেউ অসুস্থ হলে আমরা গাড়িতে, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে নিয়ে যাই চিকিৎসার জন্য। গ্রামের একজন বৃদ্ধ ন্যুব্জ পিঠে তাঁর অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে দূরের হাসপাতালে যাচ্ছেন, সেই ছবিও আমরা দেখেছি। ডাক্তাররা চিকিৎসা করেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপারেশন করে রোগীকে ভালো করে তোলেন। প্রতিবেশীরা এসে বিপদে–আপদে অন্যদের সাহায্য করেন।

এই পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে এসব নিয়মনীতি চলে আসছে। এই নিয়মগুলোর ব্যতিক্রম হলে কী হতে পারে?

আমাদের দেশে যাঁরা খবরের কাগজ পড়েন বা দেশের অকারণ মৃত্যুর সংখ্যাগুলো মাঝেমধ্যে গণনা করেন, তাঁরা কি বলবেন আমাদের দেশে আমরা সবাই ওপরের সাধারণ নীতিগুলো মানছি? অকারণে বা অপমৃত্যুর ঘটনা আমরা অনেক দেখি কিংবা আমরা পড়ি কিংবা আমরা শুনি, কিন্তু আমাদের মনকে বা বিবেককে কি এগুলো তেমন নাড়া দেয়? নাকি আমাদের মনে হয় এই মৃত্যুগুলোয় আমাদের তো করার কিছুই ছিল না! আমরা শুধু লাশ গুনব এবং ভাবব, এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?

‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’—মুখের বুলি হয়েই থাকবে?

কিছু ঘটনা, আমাদের সবারই জানা, এগুলো ঘটেছে আমাদের কারও আঙিনায়, কিছুতে জড়িত ছিলেন হয়তো আমাদের স্বজনেরা কিংবা আমাদের প্রতিবেশী, হয়তোবা আমাদেরই শহরবাসী কিংবা গ্রামবাসী। কিছুতেই আমরা যেন এই ঘটনাগুলো থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পারব না।

মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ৬৪ বছর বয়সী শিক্ষক নজীবুর রহমানের কথাই ধরুন। পরিবার সূত্রে জানা যাচ্ছে, তিনি অসুস্থ বোধ করছিলেন, সবাইকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে একটু বসতে জায়গা দেওয়ার জন্য। অর্থ নয়, ভিক্ষা নয়, আয়েশ নয়—নজীবুর রহমান চেয়েছিলেন শুধু একটু বসতে, নিজের অসুস্থ শরীরটাকে একটু বিশ্রাম দিতে। সবাই তাঁর অনুরোধ অগ্রাহ্য করেছেন, কেউ তাঁকে একটু বসতে দেননি।

ভারসাম্য রাখতে না পেরে মেট্রোরেলের মেঝেতে পড়ে যান নজীবুর রহমান। খুঁজে নিলেন নিজের জন্য পরকালের বিশ্রাম। হয়তো বসার জায়গা পেলেও তিনি বাঁচতেন না, তবে হয়তো বাঁচার চেষ্টা করতে পারতেন—আরও নির্বিঘ্নে একটু নিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পেলেন না।

নজীবুর রহমান ২৪ অক্টোবর বিকেলে মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে মারা যান  

সেই কামরায় আমার আপনার মতো শিক্ষিত লোক ছিলেন—বিএ পাস, এমএ পাসও ছিলেন, ছিলেন হয়তো তার চেয়েও কম শিক্ষিত লোক। যুবক ছিলেন, তরুণ ছিলেন, ছিলেন হয় তো অনেক বলিষ্ঠ লোক! সেই ট্রেনের কামরাটা ছিল হয়তো একটা ছোট্ট বাংলাদেশ। কিন্তু সেই দেশের কেউ নজীবুর রহমানকে একটা আসন ছেড়ে দেননি।
আবার, এটিও বলতে হয়—আমাদের সমাজ এতটাই নির্মম নয় যে, রাস্তাঘাটে কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে কেউ ছুটে আসে না। এটা আমাদের খুবই চেনা দৃশ্য।

কিন্তু নজীবুর রহমানের ক্ষেত্রে কেন এমনটি ঘটল আমরা জানি না। সেদিন কি খুব বেশি ভীড় ছিল মেট্রোতে? যাত্রীরা তাঁর অনুরোধ বুঝতে পারেননি? নাকি দিনের ব্যস্ততা শেষে নাগরিক ক্লান্তিতে ডুবে থাকা ঘরফেরত মানুষ বুঝতে পারেননি একজন সহযাত্রীর এমন পরিস্থিতি হবে?  

আমরা চাই না, আর কোনো নজীবুর রহমান এমন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ুক। বাসে, ট্রেনে ও মেট্রোরেলে একজন বয়স্ক যাত্রী দেখলে কিংবা একজন নারী কিংবা একজন শিশু, তাদের প্রতি আমরা আরও সদয় হব—এ ক্ষেত্রে যারা কম বয়সী, তাদেরই দায়িত্ব বেশি।

উন্নয়নের শহরে সস্তা মৃত্যু ও আমাদের ‘লোকদেখানো’ শোক

আমাদের দেশে মানুষের অনেক মৃত্যু হয় অসুখে, চিকিৎসার অভাবে, দুর্ঘটনায় কিংবা অপঘাতে। এসব নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত লড়ছি। সরকারকে দোষারোপ করছি, কেন পর্যাপ্ত হাসপাতাল নেই কিংবা হাসপাতালে ডাক্তার–ওষুধ নেই! সরকার এ বিষয়গুলো যত তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পারবে, ততই আমাদের দেশে মৃত্যুহার কমবে।

কিন্তু কিছু অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু কি আমরা নিজেরাই রোধ করতে পারি না? নিচে দেওয়া সংবাদপত্রের নিত্যসংবাদের কয়টা যদি আমরা একটু ভেবে দেখি, আমাদের কি মনে হবে না যে আমরা আমাদের দেশের অনেক অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু এড়াতে পারি? এত এত অকারণ মৃত্যুর লাশ আমরা রাখব কোথায়?
১. ছাগলে শিমগাছ খাওয়া নিয়ে ঝগড়া, ভাতের মাড় দিয়ে গৃহবধূর শরীর ঝলসে দেওয়ার অভিযোগ।
২. চট্টগ্রামে কলা চুরি নিয়ে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া, একজনের লাশ উদ্ধার।
৩. গাজীপুরে প্রতিবেশীর ঝগড়া থামাতে গিয়ে ছুরিকাঘাতে নারী খুন।
৪. ভোলায় শিমখেতের বেড়া ভাঙা নিয়ে দুই প্রতিবেশীর ঝগড়ার ফলে এক প্রতিবেশী খুন।

সামাজিক পরিসরে সহনশীলতার অভাব কিসের ইঙ্গিত দেয়

এগুলো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, নয় কোনো ক্ষমতাধরের উন্মাদনা কিংবা নয় কোনো মব করে হত্যা। সামান্য বিষয়ে সাধারণ মানুষেরা নিজেদের মেজাজ হারিয়ে কীভাবে যে অন্যদের ক্ষতি করছেন এবং নিজেদের ও পরিবারের সদস্যদের আইনগত শাস্তির আওতায় ঠেলে দিচ্ছেন, তা ভাবতেই অবাক লাগে!

আপনাকে আপনার প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে এবং একে অন্যের ত্রুটিগুলোকে আলাপ–আলোচনা করে মীমাংসা করতে হবে। আমরা যদি ছোটখাটো বিবাদ নিয়ে প্রতিবেশীর লাশ দাবি করি, তাহলে এত লাশ জমা হবে যে এগুলো আমরা রাখব কোথায়?

আমরা বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী হারাচ্ছি জীর্ণ–তুচ্ছ কারণে কিংবা মনের বিকারে। আমরা যদি প্রতিবেশীবিহীন হয়ে পড়ি, তাহলে আমাদের বাড়িতে যখন আগুন লাগবে, কে আসবে দৌড়ে সেই আগুন নেভাতে?

আমরা কি এ অকারণ মৃত্যুগুলো নিয়ে আরেকবার ভেবে দেখতে পারি না—এত লাশ আমরা রাখব কোথায়, এত সমাধি আমরা কোথায় পাব?  

  • সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
     ই-মেইল: [email protected]

    মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source