‘ফার্মগেট আমাকে ছাড়ে না, নাকি আমি ফার্মগেট ছাড়তে পারি না’
· Prothom Alo
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার বাংলাদেশের সর্ব পশ্চিমের ইউনিয়ন মনাকষায় আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সময়টা তখন ২০১৬ সালের এপ্রিল। বয়স আমার প্রায় ১৯। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা দিয়েছি। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর মনে করেছিলাম আর লেখাপড়াই করব না। কিন্তু মা–বাবার ইচ্ছায়, অনেকটা বাধ্য হয়েই ঢাকায় আসতে হলো।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার সময় আব্বা মনে করিয়ে দিলেন—মহাত্মা গান্ধী, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং—তাঁরা সবাই আইনশাস্ত্র পড়েছিলেন। ভালো করে পড়লে আমিও একদিন তাঁদের মতো হতে পারব। যে ছেলে তখন পড়াশোনাই করতে চায় না, তার কাছে এসব কথার খুব বেশি মূল্য থাকার কথা নয়। তারপরও চুপ রইলাম।
ঢাকায় এসে ভর্তি হলাম ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইন বিভাগে। গ্রিন রোডে ক্যাম্পাস। শুরু হলো আমার ঢাকা-জীবন।
২০১৬ থেকে দেশের অনেক শহর ঘুরেছি। সামনে হয়তো দেশের বাইরেও অনেক শহর দেখা হবে। ঢাকার ফার্মগেট আমাকে এমন কিছু শিখিয়েছে, যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো শহরে মোটামুটি টিকে থাকতে পারব।
প্রথম কয়েক দিন ছিলাম শাম্মী ও আরজু খালার বাসায়। এক বিকেলে তাঁরা আমাকে পূর্ব রাজাবাজারের একটি হোস্টেলে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। এর পর থেকে এটাই আমার ঠিকানা। চারপাশের রাস্তা, দোকান, মানুষ, রুমমেট সবই অপরিচিত। হোস্টেলের নিচতলায় তিনটি রুমে আটজনের বসবাস, বাথরুম মাত্র দুটি। সিনিয়র ও প্রভাবশালী বাসিন্দাদের জন্য বড় ও পরিষ্কার বাথরুমটি নির্ধারিত, এটাই ছিল অলিখিত নিয়ম।
শুরুর দিকে পূর্ব রাজাবাজারের কবরস্থান গলি থেকে আনন্দ সিনেমা হল পর্যন্তই ছিল আমার পরিচিত পৃথিবী। বিকেল-সন্ধ্যায় সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের আসা-যাওয়া দেখতাম। প্রায়ই দেখতাম, সিনেমা হলের সামনে কয়েকজন মানুষ নানা রকম খেলা দেখাচ্ছে। কখনো দেখাচ্ছে জাদু। লোকজন গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে।
খেলা দেখানো শেষে শুরু হতো নানা রোগের ওষুধ বিক্রি, সঙ্গে সুস্থতার শতভাগ গ্যারান্টি! আবার ক্রেতাদের কেউ কেউ মাইক হাতে নিয়ে বলত, ওষুধ খেয়ে তার উপকার হয়েছে, দাম্পত্য জীবনও সুখে–শান্তিতে কাটছে।
বেচাকেনা শেষ হলে দেখতাম, কিছুক্ষণ আগের ক্রেতা-বিক্রেতাই একসঙ্গে বসে গল্প করছে, চা খাচ্ছে, লুডু খেলছে। ফার্মগেট আমাকে ধীরে ধীরে মানুষ চিনতে শেখাচ্ছিল।
আমি পূর্ব রাজাবাজারের যে হোস্টেলে উঠেছিলাম, নানা কাণ্ডকারখানার কারণে সেখানে বেশি দিন থাকা হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম তিন সেমিস্টারেই আমাকে হোস্টেল বদলাতে হয়েছিল নয়বার! সবগুলো হোস্টেলই ছিল এই ফার্মগেট এলাকায়।
২.
আমার চেনাজানা বাড়তে লাগল। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, প্রজাপতি গুহা, হাতিরঝিল, ধানমন্ডি, সংসদ ভবন চিনতে শিখলাম। ফার্মগেট পেরিয়ে ঢাকার মানচিত্রটা একটু একটু করে বড় হতে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কোচিংয়ের সময় দেখতাম কয়েক মাসের জন্য ফার্মগেটের হোস্টেলের ভাড়া বেড়ে যেত। রাস্তায় রাস্তায় পোস্টার সাঁটানো, ‘ভাই, হোস্টেলে সিট লাগবে?’ আমাদের হোস্টেলে থাকা এক বড় ভাইয়ের কাজই ছিল নতুন ছাত্র খুঁজে আনা; বিনিময়ে তাঁর থাকা-খাওয়া ফ্রি। এক বিকেলে তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে দেখলাম, একজন ছাত্রকে হোস্টেলে থাকতে রাজি করাতে কত কিছুই না বলতে হয়। তবে ভর্তি পরীক্ষা শেষের পর আবার ভাড়া কমে যেত।
আমি পূর্ব রাজাবাজারের যে হোস্টেলে উঠেছিলাম, নানা কাণ্ডকারখানার কারণে সেখানে বেশি দিন থাকা হলো না। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম তিন সেমিস্টারেই আমাকে হোস্টেল বদলাতে হয়েছিল নয়বার! সবগুলো হোস্টেলই ছিল এই ফার্মগেট এলাকায়।
একটি হোস্টেলে আমাদের জন্য রান্না করতেন আম্বিয়া খালা। একবার তাঁকে বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হলো। খুশি হয়ে আম্বিয়া খালা নিজে থেকে আমাদের জন্য পোলাও-মাংস রান্না করলেন। সপ্তাহে তিন-চার দিন নিজের জন্য রান্না করা তরকারি আমার জন্য নিয়ে আসতেন। নিষেধ করলেও শুনতেন না। প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, ‘মামা, শরীলডা ভালা?’
কুনিপাড়া থেকে গ্রিন রোডে যাই। মনে মনে ভাবলাম—ফার্মগেট আমাকে ছাড়ে না, নাকি আমি ফার্মগেট ছাড়তে পারি না!
৩.
ক্লাস, পরীক্ষা, উপস্থাপনা ও অ্যাসাইনমেন্ট করতে করতে ২০২২ সালের প্রথমার্ধে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ হলো।
গুলশান-২-এর একটি আইন চেম্বার থেকে কাজের প্রস্তাব পেয়েছিলাম। কিন্তু ফার্মগেট থেকে দূরে বলে সেটি গ্রহণ করলাম না। পরে পুলিশ প্লাজার কাছে একটি চেম্বারে জুনিয়র হিসেবে যোগ দিলাম, ফার্মগেট থেকে হাতিরঝিল হয়ে সহজেই যাওয়া যেত বলে।
কয়েক মাস পর মনে হলো, যাতায়াতেই সময় নষ্ট হচ্ছে বেশি। তেজগাঁওয়ের কুনিপাড়ায় বাসা নিলাম। নতুন বাসায় ওঠার মাত্র ছয় দিন পর যে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়েছি, সেখানে আইন ও মানবাধিকার বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ হলো। কুনিপাড়া থেকে গ্রিন রোডে যাই। মনে মনে ভাবলাম—ফার্মগেট আমাকে ছাড়ে না, নাকি আমি ফার্মগেট ছাড়তে পারি না!
৪.
বিয়ের পর বাসা নিলাম গ্রিন রোড এলাকায়। আমার সহধর্মিণী এখানকার জ্যাম দেখে কান্নাকাটি করলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে যান। সম্প্রতি ফার্মগেট ছেড়ে আমরা আগারগাঁও চলে এসেছি। এখন আবার তিনি বলেন, গ্রিন রোডই ভালো ছিল! পুত্রও মাঝে মাঝে ভাঙা ভাঙা গলায় বলে ‘ফামগেট’, ‘বাবা অফিস’। শুনতে ভালো লাগে।
২০১৬ থেকে দেশের অনেক শহর ঘুরেছি। সামনে হয়তো দেশের বাইরেও অনেক শহর দেখা হবে। ঢাকার ফার্মগেট আমাকে এমন কিছু শিখিয়েছে, যা দিয়ে পৃথিবীর যেকোনো শহরে মোটামুটি টিকে থাকতে পারব।