শিশুরা কেন মিথ্যা বলে

· Prothom Alo

অনেকেই মনে করি, শিশুরা বোধ হয় মিথ্যা বলতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা ও বিজ্ঞান বলছে একেবারে ভিন্ন কথা। শিশুরাও মিথ্যা বলতে পারে এবং এই মিথ্যা বলতে পারাটা তাদের স্বাভাবিক কগনিটিভ বিকাশেরই অংশ। সাধারণত দুই বছর বয়স থেকেই কিছু শিশু মিথ্যা বলতে শুরু করে। আর চার বছর বয়সের পর তো বেশির ভাগ শিশুই মিথ্যা বলা শিখে যায়!

Visit een-wit.pl for more information.

এটা কিন্তু মোটেই কোনো এলেবেলে ধারণা নয়। কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী কাং লি ও তাঁর সহকর্মীরা এ নিয়ে একটি পরীক্ষা করেছিলেন। একটি ঘরে কয়েকজন শিশুকে রেখে বলা হয়, ‘তোমার পেছনে একটি খেলনা রাখা আছে, তুমি কিন্তু সেদিকে তাকাবে না।’ এরপর শিশুকে ওই ঘরে একা রেখে বাইরে গিয়ে গোপন ক্যামেরায় দেখা হয়, সে উঁকি দিল কি না। পরে ঘরে ফিরে এসে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তুমি কি খেলনাটা দেখেছ?’

মজার ব্যাপার হলো, ছোট শিশুরা মিথ্যা বললেও খুব সহজেই ধরা পড়ে যায়

এই মজাদার গবেষণাতেই দেখা যায়, দুই বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩০ শতাংশ, তিন বছর বয়সীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং চার বা তার চেয়ে বেশি বয়সীদের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই মিথ্যা বলেছে! মজার ব্যাপার হলো, ছোট শিশুরা মিথ্যা বললেও খুব সহজেই ধরা পড়ে যায়। যেমন, ‘না, আমি দেখিনি’ বলেই হয়তো পরমুহূর্তে সে খেলনার নামটা বলে ফেলে কিংবা খেলনাটি দেখতে কেমন, তা অবলীলায় বর্ণনা করে দেয়! তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের মতো করে গল্প বানাতে শেখে।

পৃথিবীতে নতুন শিশু না জন্মালে মানবজাতি কতদিন টিকবে
গবেষণাতে দেখা যায়, দুই বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৩০ শতাংশ, তিন বছর বয়সীদের প্রায় ৫০ শতাংশ এবং চার বা তার চেয়ে বেশি বয়সীদের প্রায় ৮০ শতাংশ শিশুই মিথ্যা বলেছে!

মিথ্যা বলার পেছনে মস্তিষ্কের কঠিন অঙ্ক

শিশুর এই মিথ্যা বলা আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে দারুণ সব বিজ্ঞান।

সত্য বলাটা বেশ সহজ। কারণ যা ঘটেছে, তা শুধু বলে দিলেই হয়। কিন্তু মিথ্যা বলতে গেলে মস্তিষ্ককে একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ করতে হয়। বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটা রীতিমতো একটা দক্ষতার বিষয়। কারণ, কোনো শিশুকে মিথ্যা বলতে হলে প্রথমেই মনে রাখতে হয় আসল সত্যটা। শুধু মনে রাখলেই চলে না, সত্যটাকে সযত্নে চেপেও রাখতে হয়! এরপর ঘটনাটি সম্পর্কে অন্যের মন বুঝে, অন্যের অবস্থান বুঝে তবেই মিথ্যা বলতে হয়। মিথ্যা বলতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে নতুন গল্প বানানো এবং নিজের আবেগ সামলে সেই গল্প অন্যের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কোনো শিশুর জন্য মোটেও সাধারণ কাজ নয়।

দেখলেন তো, ছোট্ট একটি মিথ্যার পেছনে মস্তিষ্ককে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়! ঠিক এ কারণেই বিজ্ঞানীরা শিশুর মিথ্যা বলাকে একটি উচ্চস্তরের মানসিক দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করেন। শিশুর এই মিথ্যা বলার পেছনের প্রথম চালিকাশক্তি হলো তার জ্ঞানীয় বোধ ও চিন্তার বিকাশ। শব্দজোড়া শুনতে একটু খটমটে লাগলেও এর অর্থ কিন্তু বেশ সহজ। কগনিটিভ শব্দটি মূলত চিন্তা করা ও বোঝার সঙ্গে সম্পর্কিত।

জন্মের সময় শিশু কাঁদে কেন
মিথ্যা বলতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে নতুন গল্প বানানো এবং নিজের আবেগ সামলে সেই গল্প অন্যের সামনে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কোনো শিশুর জন্য মোটেও সাধারণ কাজ নয়।

একটি শিশু কীভাবে ভাবে, মনে রাখে, নতুন কিছু শেখে, সমস্যার সমাধান করে, ভাষা ব্যবহার করে এবং অন্যের মনের ভাব বোঝে; এই পুরো প্রক্রিয়ার ধীরে ধীরে উন্নত হওয়াকেই বলা হয় কগনিটিভ ডেভেলপমেন্ট। সহজ কথায় বললে, শিশুর মস্তিষ্ক হলো একটি কম্পিউটার। জন্মের সময় যন্ত্রটি ঠিকই থাকে, কিন্তু ভেতরের সফটওয়্যারগুলো থাকে খুবই সাধারণ। এরপর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাতে নতুন নতুন ‘অ্যাপ’ ইনস্টল হতে থাকে। যেমন স্মৃতি, ভাষা, যুক্তি কিংবা অন্যের মন বোঝার ক্ষমতা। শিশুর মিথ্যা বলার ক্ষমতা মূলত এই অ্যাপগুলোর একসঙ্গে কাজ করতে পারারই একটি প্রমাণ।

শিশুর মস্তিষ্ক হলো একটি কম্পিউটার

আমাদের কপালের ঠিক পেছনের অংশ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, সেটি মস্তিষ্কের প্রধান ‘ম্যানেজার’ হিসেবে কাজ করে। এই ম্যানেজারের কাজ হলো এক্সিকিউটিভ ফাংশন পরিচালনা করা। সাধারণত তিন থেকে ছয় বছরের মধ্যে শিশুদের এই এক্সিকিউটিভ ফাংশনের দক্ষতা বেশ দ্রুত বিকশিত হয়। ঠিক এই বয়সেই তাদের মিথ্যা বলার হার ও ক্ষমতাও বাড়তে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর এক্সিকিউটিভ ফাংশন যত ভালো, তারা মিথ্যা বলাতেও তত বেশি পটু।

জন্মের সময় শিশুদের দাঁত থাকে না কেন
আমাদের কপালের ঠিক পেছনের অংশ, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স, সেটি মস্তিষ্কের প্রধান ম্যানেজার হিসেবে কাজ করে। এই অংশের কাজ হলো এক্সিকিউটিভ ফাংশন পরিচালনা করা।

আবার মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসনের মতে, তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের মনের মূল দ্বন্দ্ব উদ্যোগ ও অপরাধবোধ নিয়ে। এই বয়সে একটি শিশু নিজে থেকে অনেক কিছু করতে চায়, বড়দের মাঝে নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু কোন কাজটা ঠিক আর কোনটা ভুল, তা সে পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না। যেমন, সে হয়তো নিজে জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালতে চায় কিংবা শখ করে দেয়ালে ছবি আঁকতে যায়। কিন্তু পানি পড়ে ঘর ভাসলে কিংবা দেয়ালে আঁকার জন্য বড়দের বকা খেলে সে বুঝতে পারে যে কাজটা ভুল হয়ে গেছে। এতে সে দারুণ লজ্জা ও অপরাধবোধে ভোগে। তখন সে মিথ্যাকে একটি ঢাল হিসেবে দাঁড় করায়, যেন বকুনি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে। অর্থাৎ আমরা যাকে সাধারণ মিথ্যা ভাবছি, তা আসলে শিশুর এক্সিকিউটিভ ফাংশনেরই একধরনের অনুশীলন! এই মিথ্যা বলতে গিয়ে শিশুটি নিজের অজান্তেই তার চিন্তাশক্তি, কর্তব্যবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা করে ফেলে।

বাচ্চারা মূলত তাদের এই কল্পনার জগৎটাকেই চরম সত্য বলে মনে করে

অন্যদিকে, সুইস মনোবিজ্ঞানী জঁ পিয়াজের মতে, শিশুর চিন্তাশক্তি কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ পেরিয়ে বিকশিত হয়। ২ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে তিনি বলেছেন প্রি-অপারেশনাল স্টেজ। এই বয়সের মিথ্যার সঙ্গে মূলত তিনটি বিষয় জড়িয়ে থাকে। প্রথমত, শক্তিশালী কল্পনাশক্তি। একটি শিশু তার এই কল্পনাশক্তির জোরে সত্যিই ভাবতে পারে যে তার বালিশের নিচে কোনো পরি লুকিয়ে আছে কিংবা মেঘের দেশে পরীদের একটা রঙিন দুনিয়া আছে! বাচ্চারা মূলত তাদের এই কল্পনার জগৎটাকেই চরম সত্য বলে মনে করে। তাই বড়দের কাছে যেটা নির্জলা মিথ্যা, শিশুর কাছে হয়তো সেটাই তার নিজের তৈরি করা চমৎকার এক কল্পনার জগৎ।

কল্পবিজ্ঞানে ভবিষ্যতের শিশু
সুইস মনোবিজ্ঞানী জঁ পিয়াজের মতে, শিশুর চিন্তাশক্তি কয়েকটি নির্দিষ্ট ধাপ পেরিয়ে বিকশিত হয়। ২ থেকে ৭ বছর বয়স পর্যন্ত সময়টাকে তিনি বলেছেন প্রি-অপারেশনাল স্টেজ।

দ্বিতীয়ত, মানবশিশুর জন্মের পর থেকে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। তাই একটু বড় হওয়ার পর সে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকেই সবকিছু দেখতে শুরু করে। একে বলা হয় ইগোসেন্ট্রিজম। শিশুরা তখন ভাবতে শুরু করে, সে যা জানে অন্য সবাইও বুঝি তা-ই জানে! আবার কখনো উল্টোটাও ভাবে। যেমন, অনেক শিশুই মনে করে, সে নিজে চোখ বন্ধ করে রাখলে বাইরের কেউ আর তাকে দেখতে পাবে না!

তৃতীয় ও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, শিশুরা তাদের কাজের বা কথার ভবিষ্যৎ ফলাফল পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারে না। ‘মিথ্যা বললে পরে যদি ধরা পড়ে যাই’—এই সুদূরপ্রসারী চিন্তার চেয়ে ‘এখনকার বকুনিটা থেকে কীভাবে বাঁচা যায়’; এটাই তার কাছে বেশি জরুরি মনে হয়। অর্থাৎ ছোট শিশুদের অনেক ‘মিথ্যা’ আসলে তাদের কল্পনা, বাস্তব-কল্পনার এক অদ্ভুত মিশেল অথবা অস্বস্তিকর কোনো পরিস্থিতি এড়ানোর তাৎক্ষণিক কৌশল মাত্র।

শিশুরা সহজে মাতৃভাষা শিখতে পারে কেন
শিশুর জন্মের পর থেকে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়। তাই একটু বড় হওয়ার পর সে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকেই সবকিছু দেখতে শুরু করে। একে বলা হয় ইগোসেন্ট্রিজম।

কল্পনার মিথ্যা কিংবা শাস্তি এড়ানোর মিথ্যার বাইরেও শিশুর মিথ্যার আরও কয়েকটি চেহারা আছে। অনেক শিশুই বড়দের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য মিথ্যা বলে। আবার নিজেকে অন্যদের সামনে জাহির করার জন্যও তারা মিথ্যা বলে। যেমন, ‘জানিস, দৌড়ে আমি সবার আগে এসেছি!’ কিংবা ‘আমার বাসায় একটা বাঘ আর ভালুক আছে!’ ইত্যাদি। অনেক শিশু আবার মা-বাবার দেখাদেখি ‘হোয়াইট লাই’ বলতে শেখে।

অনেক শিশুই বড়দের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য মিথ্যা বলে

হয়তো জন্মদিনে পাওয়া উপহারটি তার একটুও পছন্দ হয়নি, কিন্তু ভদ্রতা দেখিয়ে ঠিকই মুখে বলে দিচ্ছে, ‘উপহারটা খুব সুন্দর হয়েছে!’ তবে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তখনই, যখন কোনো শিশু অভ্যাসবশত বিনা কারণে বারবার মিথ্যা বলতে শুরু করে। এমনটি হলে শিশুর আচরণের প্রতি মা-বাবার বিশেষ মনোযোগ দেওয়া দরকার।

স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্ক কতটা ঝুঁকিতে
অনেক শিশু আবার মা-বাবার দেখাদেখি হোয়াইট লাই বলতে শেখে। হয়তো জন্মদিনে পাওয়া উপহারটি তার একটুও পছন্দ হয়নি, কিন্তু ভদ্রতা দেখিয়ে ঠিকই মুখে বলে দিচ্ছে, উপহারটা খুব সুন্দর হয়েছে!

শিশুরা স্বভাবতই সব সময় নিরাপত্তা খোঁজে। তাই সত্য বলাটা তার কাছে নিরাপদ মনে হলে সে অনায়াসে সত্যই বলে। আর সত্য বলে বড়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারলে কিংবা প্রশংসা পেলে শিশুরা সত্য বলার অভ্যাসটাই চালিয়ে যায়। অন্যদিকে, কড়া শাস্তি কিংবা অতিরিক্ত শাসন শিশুর মিথ্যা বলা মোটেই কমায় না; বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা শিশুকে নিজের দোষ আরও ভালোভাবে লুকাতে শেখায়। কারণ, ভয় পেলে মস্তিষ্কের কগনিটিভ দিক শাস্তি এড়ানোর চাহিদাকে আরও জোরালো করে তোলে। তখন শিশু নিজেকে বাঁচাতে আরও নিখুঁত সব মিথ্যার আশ্রয় নেয়। তাই মিথ্যা বলা কমাতে চাইলে প্রত্যেক শিশুর জন্যই সত্য বলার পরিবেশটাকে সবার আগে নিরাপদ ও সম্মানজনক করে তোলা উচিত।

লেখক: শিক্ষার্থী, শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগসূত্র: ১. Piaget, J. (1952). The Origins of Intelligence in Children; Piaget, J. (1932). The Moral Judgment of the Child.২. Talwar, V., & Lee, K. (2002). Development of lying to conceal a transgression. International Journal of Behavioral Development, 26(5), 436–444.৩. Talwar, V., & Lee, K. (2008). Little liars: Origins of verbal deception in children. In Origins of the Social Mind. Guilford Press.শিশুরা কীভাবে বেশি স্মার্ট হয়

Read full story at source