শিশু কথা বলছে, কিন্তু ঠিকভাবে বলছে তো
· Prothom Alo
ছোট্ট এক শিশু যখন প্রথম কথা বলতে শেখে, তখন তার মুখে প্রতিটি নতুন শব্দই আনন্দের। ‘মা’, ‘বাবা’, ‘পানি’—একটা একটা করে শব্দ শিখতে শিখতেই বড় হতে থাকে তার কথা বলার জগৎ। কিন্তু কখনো কি খেয়াল করেছ, কোনো শিশু একটি শব্দ বারবার ভুল বলছে? কিছু শব্দের অংশ বাদ দিচ্ছে? কিংবা তার কথা অন্যরা ঠিকমতো বুঝতে পারছে না?
Visit h-doctor.club for more information.
কথা বলতে শেখার সময় শিশুরা কিছু শব্দ ভুল বলতেই পারে। এটা স্বাভাবিক। বয়স বাড়ার সঙ্গে বেশির ভাগ শিশু ধীরে ধীরে সঠিকভাবে শব্দ উচ্চারণ করতে শেখে। কিন্তু বয়স অনুযায়ী যে ধ্বনিগুলো বলার কথা, সেগুলো বলতে না পারলে কিংবা দীর্ঘদিন ধরে কথা বুঝতে অসুবিধা হলে বিষয়টি একটু খেয়াল করা দরকার।
সব ভুলই কি সমস্যা
না। কথা শেখার শুরুতে শিশুরা অনেক শব্দ ঠিকভাবে বলতে পারে না। যেমন, ‘স্কুল’ বলতে গিয়ে কেউ হয়তো ‘কুল’ বলে ফেলল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ধীরে ধীরে শব্দটির সঠিক উচ্চারণ শিখে নিতে পারে।
তাই শিশু কোনো শব্দ ভুল বললেই চিন্তিত হওয়ার দরকার নেই। দেখতে হবে, তার বয়স কত এবং সেই বয়সে সাধারণত শিশুরা কোন কোন ধ্বনি ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে। সব শিশুর কথা শেখার গতি এক রকম নয়। কারও কোনো ধ্বনি আগে আয়ত্তে আসে, কারও একটু পরে।
ক্লিনিক্যাল লিঙ্গুইস্ট ড. তানজিয়া সিদ্দিকা বলেন, ‘শিশুর বয়স, তার বেড়ে ওঠার ধাপ এবং কোন শব্দ বা ধ্বনিতে সমস্যা হচ্ছে—এসব বিষয় দেখা খুব জরুরি।’
অর্থাৎ, একটি শব্দ ভুল বলেছে বলেই শিশুর কথা বলার সমস্যা আছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং তার কথা বলার সামগ্রিক ধরন, বয়স অনুযায়ী ভাষার বিকাশ এবং অন্যরা তার কথা কতটা বুঝতে পারছে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
কিছু শিশু কেন এত চিকেন ফ্রাই পছন্দ করেআপনার শিশুর সঙ্গে দরকারে-অদরকারে কথা বলুন। মডেল: রাজেশ্বরী ও রুনা খান, ছবি: অধুনাতাহলে সমস্যা কোথায়
কিছু শিশুর কথা বলার সময় নির্দিষ্ট ধ্বনি উচ্চারণ করতে অসুবিধা হয়। কেউ কোনো ধ্বনির বদলে অন্য ধ্বনি বলে, কেউ আবার শব্দের কোনো অংশ বাদ দিয়ে দেয়। যেমন, ‘স্কুল’ বলতে গিয়ে ‘কুল’ বলা কিংবা কোনো শব্দের জটিল ধ্বনিগুচ্ছ উচ্চারণ করতে না পারা। এসব ক্ষেত্রে বয়স ও ভাষার ধরন অনুযায়ী সমস্যাটি স্বাভাবিক বিকাশের অংশ কি না, তা বুঝতে হয়।
কথা বলার সমস্যার ধরনও এক রকম নয়। কোনো শিশু হয়তো শব্দের ধ্বনি ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না। আবার কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী শব্দ শেখা, বাক্য তৈরি করা কিংবা নিজের মনের কথা প্রকাশ করতে সমস্যায় পড়ে। উচ্চারণের সমস্যা আর ভাষার বিকাশে দেরি এক বিষয় নয়। তাই সমস্যার ধরন বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এসব ক্ষেত্রে শিশুকে বারবার বকা দেওয়া কিংবা ‘ভুল বলছ’ বলে বিব্রত করা ঠিক নয়। এতে সে কথা বলতে সংকোচ বোধ করতে পারে। বরং ধৈর্য ধরে তার কথা শোনা এবং স্বাভাবিকভাবে সঠিক শব্দটি বলে দেওয়া ভালো।
‘ভুল বলছ’ না বলে কী করা যায়
ধরা যাক, একটি শিশু ‘স্পুন’ বলতে গিয়ে ‘পুন’ বলল। তখন তাকে বকাঝকা না করে বড়রা স্বাভাবিকভাবে বলতে পারেন, ‘হ্যাঁ, স্পুনটা সুন্দর!’ অর্থাৎ শিশুর কথার উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি সঠিক শব্দটিও ব্যবহার করা যায়।
প্রয়োজনে শব্দটি ধীরে ধীরে বলে শোনানো যায়। মুখ ও ঠোঁট কীভাবে নড়ছে, সেটিও দেখানো যেতে পারে। তবে শিশুকে জোর করে বারবার শব্দটি বলানোর দরকার নেই। তার বয়স ও প্রয়োজন বুঝে অনুশীলনের সুযোগ করে দেওয়াই ভালো।
ড. তানজিয়া সিদ্দিকার মতে, শিশুকে বারবার ভুল বলার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার চেয়ে সঠিক শব্দ শুনতে দেওয়া এবং কথা বলার অনুশীলনের সুযোগ তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
তাই শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় ধৈর্য ধরতে হবে। সে কী বলতে চাইছে, তা মন দিয়ে শুনতে হবে। কোনো শব্দ ভুল বললেও তার কথার অর্থ বুঝে উত্তর দাও। এতে সে নিজের ভাবনা প্রকাশ করতে উৎসাহ পাবে।
কথা শেখার জন্য শুধু শোনা যথেষ্ট নয়
শিশু শুধু বড়দের কথা শুনেই ভাষা শেখে না, ভাষা ব্যবহার করার সুযোগ থেকেও শেখে। তাকে প্রশ্ন করা, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, গল্প বলা কিংবা চারপাশের কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করা—এসবের মাধ্যমে সে নতুন শব্দ শেখে এবং বাক্য তৈরি করতে অভ্যস্ত হয়।
মোবাইল বা ট্যাবলেটে ভিডিও দেখলে শিশু অনেক শব্দ শুনতে পারে। কিন্তু ভিডিও দেখা আর মানুষের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এক নয়। সরাসরি কথোপকথনে শিশু অন্যের মুখভঙ্গি দেখতে পারে, নিজের কথার উত্তর পায় এবং কথার আদান-প্রদানে অংশ নিতে শেখে।
তাই শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় শুধু মোবাইলের দিকে তাকিয়ে না থেকে তার দিকে তাকিয়ে কথা বলা ভালো। সে কী বলছে, তা মন দিয়ে শোনো। গল্পের বই পড়ে শোনাতে পারো, ছবি দেখিয়ে নানা প্রশ্ন করতে পারো কিংবা একসঙ্গে দৈনন্দিন কাজ করতে করতে জিনিসপত্রের নাম শেখাতে পারো। এসব ছোট ছোট অভ্যাস ভাষা শেখার পরিবেশ তৈরি করে।
২০ বছর বয়সের মেসির সঙ্গে কে সেই ছোট্ট শিশুছয় মাস বয়স থেকেই শিশুর কথা বলা শুরু হয়ে যায় সাধারনতমা–বাবার পাশাপাশি শিক্ষকেরাও খেয়াল রাখবেন
শিশুর কথা বলার সমস্যা শুধু মা–বাবার চোখেই ধরা পড়বে, এমন নয়। স্কুলের শিক্ষক, পরিবারের অন্য সদস্য কিংবা কাছের মানুষেরাও বিষয়টি প্রথমে খেয়াল করতে পারেন।
যদি কোনো শিশু দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের উচ্চারণের সমস্যায় ভোগে, অন্যরা তার কথা বুঝতে বারবার অসুবিধায় পড়ে কিংবা বয়স অনুযায়ী তার ভাষার বিকাশে দেরি দেখা যায়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। শিশুর কথা বলার পাশাপাশি সে ঠিকমতো শুনতে পাচ্ছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা জরুরি।
তবে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনে বাক্ ও ভাষা বিশেষজ্ঞ বা স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া যায়। তিনি শিশুর বয়স, কথা বলার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়ন করে পরবর্তী করণীয় জানাতে পারবেন। দরকার হলে শ্রবণশক্তিও পরীক্ষা করা হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, যত তাড়াতাড়ি সমস্যার ধরন বোঝা যায়, তত তাড়াতাড়ি শিশুকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর প্রতিটি শিশুর জন্য একই ধরনের সহায়তা প্রয়োজন হয় না।
শিশুর কথা বলার সময় সবচেয়ে জরুরি কী
সবচেয়ে জরুরি হলো শিশুকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া। তার সঙ্গে গল্প করা, প্রশ্ন করা, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং মন দিয়ে তার কথা শোনা। সে ভুল বললে রাগ না করে সঠিক শব্দটি স্বাভাবিকভাবে বলে দেওয়া। আর নিজের কথা প্রকাশ করার জন্য তাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া।
কারণ, কথা বলা শুধু শব্দ উচ্চারণের বিষয় নয়। কথা বলার মাধ্যমেই শিশু নিজের ভাবনা, অনুভূতি ও প্রয়োজন অন্যকে জানাতে শেখে। অন্যের কথা বুঝতে, প্রশ্ন করতে এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও ভাষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ড. তানজিয়া সিদ্দিকা বলেন, ‘শিশুর শৈশব থেকেই তার সঙ্গে অর্থপূর্ণ কথোপকথন করা গুরুত্বপূর্ণ।’
তাই শিশুর মুখে প্রথম শব্দ আসার দিন থেকেই তার কথাগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আজ হয়তো সে কোনো শব্দ ভুল বলছে, কাল হয়তো নতুন কোনো শব্দ শিখবে। বড়দের ধৈর্য, ভালোবাসা আর কথা বলার সুযোগ তার ভাষা শেখার পথকে সহজ করে তুলতে পারে। আর কোনো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে থাকলে সেটিকে অবহেলা না করে সঠিক পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
শিশু-কিশোরদের দিগন্ত বড় হোক