ময়না কীভাবে মানুষের গলায় কথা বলে

· Prothom Alo

ময়না মানুষের কথা নকল করতে পারে। গ্রামবাংলার উঠান থেকে শহরের বারান্দা, অনেক বাড়িতেই এমন ময়না ছিল, যেটা মানুষের কথা শুনে শুনে আবার বলত। কখনো ‘কে রে?’। কখনো ‘কেমন আছো?’। শুনলে মনে হতো পাখিটি বুঝি সত্যিই মানুষের ভাষা বোঝে। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ায় বন্য প্রাণীর গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষ এখন জানে। বনের পাখিকে তাই আইন করে খাঁচায় আটকে রাখা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কোনোভাবেই এখন ময়নাকে খাঁচায় আটকে রাখা যাবে না। কথা শেখানোর চেষ্টা করা যাবে না। কেউ যদি করে, তবে বন্য প্রাণী সুরক্ষা বিভাগকে জানাতে হবে।

কিন্তু ময়নাকে আগে মানুষ কথা শেখাত। এই পাল্লায় পড়ে এখন ময়নাকে আর প্রকৃতিতে সচরাচর দেখা যায় না। প্রশ্ন হলো, ময়না মানুষের গলায় কথা শিখত কীভাবে?

Visit asg-reflektory.pl for more information.

উত্তরটা লুকিয়ে আছে ওর শরীরের ভেতর। ওর আছে বিশেষ একটি শব্দ তৈরির অঙ্গ। আছে আলাদা ধরনের শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা। আর আছে শব্দ শুনে তা শেখার মতো মস্তিষ্ক।

মানুষের কথা বলার সময় শব্দ তৈরি হয় ল্যারিংক্স বা স্বরযন্ত্রে। ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস স্বরতন্ত্রীকে কাঁপায়। পরে মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট সেই শব্দ বদলে দেয়। পাখির শরীরেও ল্যারিংক্স আছে। তবে শব্দ তৈরির প্রধান কাজটি করে না। পাখির আসল শব্দযন্ত্রের নাম সিরিংক্স।

হাতি কিংবা ড্রিল মেশিনের চেয়েও জোরে শব্দ করতে পারে যে পাখি

সিরিংক্স থাকে শ্বাসনালির একেবারে নিচে। সেখানে শ্বাসনালি দুই ভাগ হয়ে দুই ফুসফুসের দিকে গেছে। এর দুই পাশে থাকে সূক্ষ্ম পর্দা। বাতাস গেলে সেগুলো কাঁপে। ছোট পেশি পর্দার টান বদলে দেয়। ফলে শব্দের উচ্চতা ও ধরনও বদলে যায়।

সিরিংক্সের দুই পাশ অনেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কাজ করতে পারে। এক পাশ থেকে একধরনের শব্দ আসতে পারে। অন্য পাশ থেকে আরেকটি। একই সময়ে দুটি শব্দ তৈরিও সম্ভব। মানুষের কণ্ঠযন্ত্রে এমন ক্ষমতা নেই। ময়নার জটিল শব্দ তৈরিতে এটি বড় সুবিধা।

মানুষের কণ্ঠস্বরও একটি মাত্র কম্পাঙ্কের শব্দ নয়। অনেক কম্পাঙ্ক মিলে আমাদের কণ্ঠ তৈরি হয়। মুখ ও গলার গঠন সেই শব্দকে ছেঁকে দেয়। এর ফলে তৈরি হয় ফরম্যান্ট। কোন শব্দটি ‘আ’ আর কোনটি ‘ই’ তা চেনার ক্ষেত্রে এগুলোর ভূমিকা আছে। ময়না সিরিংক্স দিয়ে জটিল শব্দ তৈরি করে। মুখগহ্বর, জিহ্বা ও ঠোঁটের অবস্থান বদলে সেই শব্দকে আরও পাল্টায়। ফলে তার তৈরি শব্দ মানুষের কথার কাছাকাছি চলে আসে।

গত শতকের সত্তরের দশকে মার্কিন গবেষকেরা পাহাড়ি ময়নার ডাক বিশ্লেষণ করেছিলেন। সেখানে মানুষের কথার সঙ্গে তুলনীয় বিভিন্ন কম্পাঙ্ক-গুচ্ছ পাওয়া যায়। এতে ময়নার শব্দ তৈরিতে সিরিংক্সের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়।

এই পাখি মাটিতে না নেমে টানা ১০ মাস উড়তে পারে

শুধু সিরিংক্স থাকলেই অবশ্য ময়না মানুষের কথা নকল করতে পারত না। পাখির শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। ফুসফুসের সঙ্গে যুক্ত বায়ুথলি শরীরে বাতাসের প্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে শব্দ তৈরির সময় তুলনামূলক স্থির বায়ুপ্রবাহ পাওয়া যায়। এ কারণে ময়না একটানা বেশ কিছু শব্দ বা বাক্য বলে যেতে পারে।

এরপর আসে শেখার বিষয়টি। ময়না ভোকাল লার্নার। অর্থাৎ অন্যের তৈরি শব্দ শুনে তা শেখার ক্ষমতা ওর আছে। পাখিদের মধ্যে এই ক্ষমতা খুব বেশি দেখা যায় না।

ময়না কোনো শব্দ শুনলে সেটি মনে রাখে। পরে নিজের তৈরি শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। ঠিক না হলে আবার চেষ্টা করে। এভাবে ধীরে ধীরে শব্দটি নিজের কণ্ঠে আয়ত্ত করে। মানুষের শিশুর ভাষা শেখার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়াটিকে এক করা ঠিক হবে না। তবে শুনে শেখা ও অনুশীলনের জায়গায় মিল আছে।

ময়না কী শুনছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের কাছ থেকে শেখা এর জন্য বেশি কার্যকর। কারণ, ময়না সামাজিক পাখি। বনে তাকে দলের অন্য পাখির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। খাঁচায় সেই পরিবেশ ময়না পায় না। বাধ্য হয়ে বাড়ির মানুষকেই তার দেখতে হয়। তখন মানুষের গলাও তার শেখার বিষয় হয়ে যায়।

তবে ময়না যখন ‘ভাত খাইছ?’ বলে, তখন সে যে বাক্যটির অর্থ মানুষের মতো বুঝছে—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। কোনো শব্দের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। কিন্তু মানুষের ভাষার মতো বিমূর্ত অর্থ বা ব্যাকরণ বোঝার প্রমাণ আলাদা বিষয়। তাই ময়না মানুষের ভাষা বলে না। সে মানুষের ভাষার শব্দ নকল করে।

দোয়েল কীভাবে বাংলাদেশের জাতীয় পাখি হলোগাছের শীর্ষে পাঁচটি বুনো ময়না

পাহাড়ি ময়না একসময় মানুষের কাছে জনপ্রিয় পোষা পাখি হিসেবে বিবেচিত হতো। এই জনপ্রিয়তার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বন্য পরিবেশ থেকে ছানা সংগ্রহ করা হয়েছে। অথচ ময়না সামাজিক পাখি। ছোট খাঁচায় একা রাখলে তার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।

মানুষের কথা নকল করার ক্ষমতাই তাকে আকর্ষণীয় করে তোলে। আবার সেই আকর্ষণই কখনো তাকে বন্দী করে রাখার কারণ হয়। তাই ময়নার কথা বলার পেছনে যেমন বিস্ময় আছে, তেমনই আছে বন্য পাখিকে পোষ মানানোর প্রশ্ন।

একটি ছোট পাখির শরীরে কাজ করে জটিল একটি শব্দযন্ত্র। সিরিংক্স শব্দ তৈরি করে। মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট সেটিকে বদলে দেয়। ফুসফুস ও বায়ুথলি বাতাসের প্রবাহ চালিয়ে যায়। মস্তিষ্ক শোনা শব্দ মনে রাখে এবং আবার তৈরি করতে শেখে। এভাবে ময়না আমাদের কথা শোনায় নিজের শরীরের শব্দযন্ত্র দিয়ে।

তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্টরাজকীয় পাখি ‘লেডি আর্মহার্স্টস ফেজেন্ট’

Read full story at source