মন ভালো করার ৬টি সহজ উপায়
· Prothom Alo

মাঝেমধ্যে সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনে হয় দিনটা খুব ভালো যাবে। কিন্তু একটু পরেই সব উল্টাপাল্টা হতে শুরু করে। স্কুলে যাওয়ার সময় দেরি হয়ে যায়। পথে বৃষ্টিতেও ভিজে যেতে পারো। অথবা ক্লাসে গিয়ে হয়তো দেখলে, যে হোমওয়ার্কটা যত্ন করে করেছিলে, সেটাই বাড়িতে ফেলে এসেছ। টিফিনের সময় ব্যাগ থেকে খাবার বের করতে গিয়ে দেখলে, পানির বোতলের ঢাকনা ঠিকমতো লাগানো ছিল না, বই-খাতা সব ভিজে একাকার!
এমন দিনে একটা সময় মনে হতে পারে, আজ বুঝি আর কিছুই ঠিক হবে না। বরং আরও খারাপ কিছু ঘটার অপেক্ষা!
Visit rouesnews.click for more information.
একজন মনোবিজ্ঞানীরও এমন একটি দিন গিয়েছিল। সারা দিনের ব্যস্ততায় তিনি বাজার করতে ভুলে গেলেন। রান্নাঘরে খাবার খুঁজতে গিয়ে হাত থেকে একটা ডিম পড়ে ভেঙে গেল। তারপর তাড়াহুড়া করে ঘুরতে গিয়ে মেঝেতে ফেলে ভেঙে ফেললেন তাঁর প্রিয় একটি বাটি। বাটির টুকরা পরিষ্কার করার পরও বিপদ শেষ হলো না। একটু পরে মেঝেতে পড়ে থাকা একটি ছোট টুকরার ওপর পা ফেলে রক্তাক্ত অবস্থা।
মাত্র ১১ বছর বয়সেই গ্র্যান্ডমাস্টার লন্ডনের স্কুলছাত্রীতখন তাঁর মনে হলো, আর কী কী হতে পারে! রাতের খাবার খেতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে যেতে পারে। আবার গোসল করতে গিয়ে পিছলে পড়ে মাথায়ও আঘাত পেতে পারেন! ভাবো একবার! একটা ডিম ভাঙল, তারপর বাটি ভাঙল। এরপর মনে হতে লাগল, বুঝি গোটা পৃথিবীই তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে!
এমনটা আমাদের সবার সঙ্গেই কমবেশি ঘটে। একটা খারাপ ঘটনা ঘটলে তার রেশ অনেকক্ষণ থেকে যায়। এরপর ছোটখাটো কোনো সমস্যা হলেও মনে হয়, সবকিছু বুঝি একসঙ্গে খারাপ হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, এভাবে একের পর এক খারাপ ঘটনা নিয়ে ভাবতে থাকলে মনের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে একটা ঘটনা খারাপ হলেই পুরো দিনটা নষ্ট হয়ে যাবে। বরং কয়েকটি সহজ কাজ তোমাকে সেই অবস্থা থেকে বের হতে সাহায্য করতে পারে। কী সেই কাজগুলো? চলো, একেক করে দেখি।
১. কী হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করো
ধরো, সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তোমার সঙ্গে বন্ধুর ঝগড়া হলো। মন খারাপ করে ক্লাসে ঢুকলে। তারপর অঙ্কের খাতায় একটা ভুল করলে। এবার মনে হলো, আজ বুঝি সবকিছুতেই ভুল হবে। এরপর শিক্ষক একটা প্রশ্ন করলেন। উত্তর দিতে না পারায় তোমার মন আরও খারাপ হয়ে গেল।
খেয়াল করে দেখো, প্রথমে ঘটেছিল একটি ঘটনা। কিন্তু তারপর প্রতিটি নতুন ঘটনাকে তুমি আগের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শুরু করলে। মনে হলো, আজকের দিনটাই খারাপ।
মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ লেহির মতে, প্রথম খারাপ ঘটনাটি হয়তো তোমার হাতে ছিল না। কিন্তু এরপর মস্তিষ্কই একের পর এক ঘটনাজুড়ে প্রমাণ করতে থাকে, পুরো দিনটাই খারাপ যাচ্ছে। এমন অবস্থায় সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো একটু থামা। সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ো না যে বাকি দিনটাও খারাপ যাবে। বরং নিজেকে প্রশ্ন করো, ঠিক কী ঘটেছে?
ধরো, তুমি বললে, ‘আজ আমার দিনটাই খারাপ।’ কথাটা শুনতে সাধারণ মনে হলেও এর মধ্যে একটা বড় সিদ্ধান্ত লুকিয়ে আছে। তুমি ধরে নিচ্ছ, আজ আর কিছু ভালো হতে পারে না। এর বদলে বলো, ‘সকালে আমার সঙ্গে একটা খারাপ ঘটনা ঘটেছে। তাই এখন মন খারাপ লাগছে।’
দুটো কথার মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথম কথাটিতে মনে হচ্ছে পুরো দিনটাই তোমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দ্বিতীয় কথাটিতে তুমি বুঝতে পারছ, একটি ঘটনা ঘটেছে এবং সেটার কারণে তোমার মন খারাপ হয়েছে। কিন্তু দিনটির বাকি অংশ এখনো বাকি। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, নিজের চিন্তা ও অনুভূতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া খুব কাজে দেয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় দেখা গেছে, নিজের চিন্তা ও অনুভূতিকে শুধু মনের মধ্যে আসা-যাওয়া করা ঘটনা হিসেবে দেখতে না পারার সঙ্গে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার সম্পর্ক রয়েছে।
মানে, মনে কোনো চিন্তা এলেই সেটাকে সত্যি বলে ধরে নেওয়ার দরকার নেই। ধরো, পরীক্ষার আগে তোমার মনে হলো, ‘আমি কিছুই পারব না’। কিন্তু এই চিন্তাটা এলেই তো তুমি সত্যিই কিছু পারো না, এমন নয়! একটু শান্ত হয়ে প্রশ্নগুলো পড়লে হয়তো অনেক উত্তরই মনে পড়ে যাবে।
তাই মন খারাপ হলে নিজেকে দোষ দিয়ো না। আবার সঙ্গে সঙ্গে মন ভালো করার জন্যও জোর কোরো না। প্রথমে শুধু বোঝার চেষ্টা করো, তোমার মনের মধ্যে কী চলছে।
শহরের খালে আটকে পড়া হাঙর দেখতে ছুটল ছয় লাখ মানুষ২. মনের কথা লিখে রাখো বা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসো
মনে অনেক চিন্তা একসঙ্গে ঘুরতে থাকলে কোনটা যে আসল সমস্যা, তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। তখন একটা কাজ করতে পারো। মনের কথাগুলো লিখে রাখতে পারো।
ধরো, আজ স্কুলে তোমার প্রিয় বন্ধুটি তোমার সঙ্গে কথা বলেনি। তুমি ভাবতে শুরু করলে, সে হয়তো তোমার ওপর রাগ করেছে। হয়তো আর তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে চায় না। এভাবে ভাবতে ভাবতে তোমার মন খারাপ হয়ে গেল। এবার কাগজে লিখে ফেলো, কী ঘটেছে আর তুমি কী ভাবছ।
ঘটনা: আজ আমার বন্ধু আমার সঙ্গে কথা বলেনি।
আমার মনে হচ্ছে: সে হয়তো আমার ওপর রাগ করেছে।
কিন্তু অন্য কারণও থাকতে পারে। হয়তো তার মন খারাপ। হয়তো সে কোনো কাজে ব্যস্ত ছিল। অথবা সে নিজেই কোনো সমস্যায় পড়েছে। দেখলে তো? একই ঘটনা নিয়ে ভাবার আরও অনেক উপায় আছে। মনের কথা লিখে রাখলে সেই অন্য সম্ভাবনাগুলোও চোখে পড়ে।
এ জন্যই নিজের অনুভূতিগুলো চিনতে শেখা জরুরি। তুমি বলতে পারো, ‘আমার খুব রাগ হচ্ছে।’ কিংবা, ‘আজ আমি একটু হতাশ।’ এতে অনুভূতিটা স্পষ্ট হয়। কিন্তু ‘আমি খারাপ’ বা ‘আমার দ্বারা কিছু হবে না’ বললে নিজের সম্পর্কে অকারণেই বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলো।
সচেতন মনোযোগের চর্চাও কাজে আসতে পারে। মানে এই মুহূর্তে তুমি কী ভাবছ, কী অনুভব করছ, শরীরে কী হচ্ছে, সেদিকে মনোযোগ দাও। নিজের চিন্তাকে জোর করে থামানোর দরকার নেই। শুধু খেয়াল করো, কী চিন্তা আসছে। এ জন্য ধ্যান করতে পারো। আবার চুপচাপ বসে নিজের শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার দিকেও মনোযোগ দিতে পারো। চাইলে কয়েক মিনিট সময় নিয়ে ডায়েরিতে লিখতে পারো মনের কথাও।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নার্সিংয়ের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে পাঁচ দিন, প্রতিদিন ৩০ মিনিট করে মাইন্ডফুলনেসের চর্চা করার পর তাঁদের শরীরে কর্টিসল নামে একটি হরমোনের মাত্রা এবং নিজেদের অনুভব করা মানসিক চাপ কমেছিল। কর্টিসল শরীরের চাপ মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত একটি হরমোন।
আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, শুধু ছুটি কাটানোর তুলনায় নিয়ম মেনে মাইন্ডফুলনেসের চর্চা করলে কর্টিসল ও প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত কিছু উপাদানের মাত্রা আরও বেশি কমেছিল। অবশ্য সবার ক্ষেত্রে ফল এক রকম হবে না। আর এক দিন ধ্যান করলেই সব দুশ্চিন্তা উধাও হয়ে যাবে, এমনও নয়। তবে নিয়মিত চর্চা নিজের চিন্তা ও অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করতে পারে।
১০০ বছর পর পেঙ্গুইনের নতুন প্রজাতির সন্ধান পেলেন বিজ্ঞানীরা৩. একটু বাইরে বেরিয়ে এসো
মাঝেমধ্যে একই জায়গায় বসে থাকতে থাকতে বিরক্তি আরও বেড়ে যায়। ধরো, পড়তে বসেছ। কিন্তু একটা অঙ্ক কিছুতেই মিলছে না। বারবার চেষ্টা করছ। খাতায় কাটাকুটি বেড়েই চলেছে। একসময় মনে হলো, এই অঙ্কের জন্যই বুঝি তোমার জীবন দুর্বিষহ!
এবার বই বন্ধ করে একটু উঠে দাঁড়াও। অন্য ঘরে যাও। বারান্দায় দাঁড়াও। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাও। সম্ভব হলে কিছুক্ষণ হাঁটতে বেরিয়ে পড়ো। কারণ, পরিবেশ বদলালে খারাপ মুহূর্তটিকে পেছনে ফেলে আসা সহজ হতে পারে। একই ঘরে বসে থাকলে সমস্যাটাই বারবার চোখে পড়ে। কিন্তু অন্য জায়গায় গেলে মনোযোগ সরানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এ জন্য খুব দূরে যেতে হবে না। ঘরের এক কোণ থেকে অন্য কোণে গেলেও চলবে। চাইলে একটু হাঁটতে পারো বা বাইরে গিয়ে গান শুনতে পারো। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় ১০০ জন মানুষকে ৩০ মিনিট হাঁটতে বলা হয়েছিল। তাঁদের এক দল প্রকৃতির মধ্যে হেঁটেছিলেন। অন্য দল হেঁটেছিলেন শহরের পরিবেশে। হাঁটার পর দুই দলেরই মেজাজ ভালো হয়েছিল। মন খারাপের অনুভূতিও কমেছিল। দুই দলের ফলাফলে তেমন কোনো আহামরি পার্থক্য ছিল না।
এ থেকে বোঝা যায়, মন ভালো করার জন্য সব সময় পাহাড়ে বা বনে যাওয়ার দরকার নেই। শহরের রাস্তায় একটু হাঁটলেও উপকার হতে পারে। অবশ্য রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকো না। তাহলে মন ভালো করার বদলে অন্য কোনো বিপদ ডেকে আনতে পারো! জায়গা বদলানোর আসল সুবিধা হলো, তুমি একই চিন্তার মধ্যে আটকে না থেকে নতুন কিছু দেখার সুযোগ পাও। আর মাঝেমধ্যে সেটুকুই যথেষ্ট।
বিলুপ্তির মুখে থাকা কুমিরকে বাঁচাতে কম্বোডিয়া যা করছে৪. শরীরটা একটু নড়াচড়া করাও
মন খারাপ হলে বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। কারও সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগে না। কিছু করতেও ইচ্ছা করে না। কিন্তু কখনো কখনো একটু নড়াচড়া করলেই মনের অবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে।
এ জন্য জিমে গিয়ে কঠিন ব্যায়াম করতে হবে না। দ্রুত হাঁটতে পারো। হাত-পা টানটান করে কিছুক্ষণ স্ট্রেচিং করতে পারো। পছন্দের গানের সঙ্গে একটু নাচতেও পারো। শরীরের ওপর মানসিক চাপের প্রভাব পড়ে। কোনো কিছু নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা হলে বুক ধড়ফড় করতে পারে। পেশি শক্ত হয়ে যেতে পারে। শরীর যেন বিপদের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে। এমন অবস্থায় একটু হাঁটাহাঁটি করলে সেই চাপ সামলাতে সাহায্য হতে পারে। মনোবিজ্ঞানী ম্যাথিউ লেহি বলেন, শরীর নড়াচড়া করলে মানসিক চাপের সময় তৈরি হওয়া শক্তিকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে মনও সমস্যাটি থেকে কিছুক্ষণের জন্য অন্যদিকে সরতে পারে।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় ৮৩ জন তরুণকে ট্রেডমিলে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করতে বলা হয়েছিল। তাঁদের ব্যায়ামের তীব্রতা ছিল ভিন্ন ভিন্ন। এরপর তাঁদের একটি চাপের পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হয়। দেখা যায়, যাঁরা বেশি তীব্র ব্যায়াম করেছিলেন, তাঁদের শরীর তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছিল। জোরে ব্যায়াম করা দলের ক্ষেত্রে সময় লেগেছিল প্রায় ৮১ মিনিট। হালকা ব্যায়াম করা দলের লেগেছিল প্রায় ৯১ মিনিট।
অবশ্য এর মানে এই নয় যে মন খারাপ হলেই তোমাকে জোরে ব্যায়াম করতে হবে। হালকা হাঁটাহাঁটিও ভালো শুরু হতে পারে। তোমার ঘর যদি এলোমেলো হয়ে থাকে, তাহলে কিছুক্ষণ গুছিয়ে দেখতে পারো। এতে শরীরেরও নড়াচড়া হবে, কাজও এগোবে। তবে মন খারাপের দিনে পুরো ঘর পরিষ্কার করার বিশাল প্রকল্প হাতে না নেওয়াই ভালো!
তবে হ্যাঁ, শরীরচর্চা সব সমস্যার সমাধান নয়। কিন্তু মনের মধ্যে একই চিন্তা বারবার ঘুরতে থাকলে একটু নড়াচড়া সেই চক্র ভাঙতে সাহায্য করতে পারে।
কমছে মানুষের চিন্তার ক্ষমতা, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারে নতুন সতর্কতা৫. একটু প্রকৃতির কাছে যাও
আকাশের দিকে তাকিয়ে কখনো কি তোমার মন ভালো হয়েছে? গাছের পাতার নড়াচড়া দেখতে দেখতে কি কখনো দুশ্চিন্তার কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছ?
এমন হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো আমাদের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে সাহায্য করতে পারে। চারপাশের গাছপালা, আকাশ, বাতাস বা পাখির ডাকের দিকে মন দিলে নিজের সমস্যাটি থেকে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়। প্রকৃতির কাছে যেতে হলে বনের মধ্যে থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। চারপাশের সৌন্দর্য খেয়াল করলেও ভালো ফল পেতে পারো।
ধরো, তোমার পড়ার টেবিলে বসে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। একই লাইন পাঁচবার পড়েও কিছু বুঝতে পারছ না। এবার একটু বাইরে গিয়ে দাঁড়াও। আকাশ দেখো। গাছের পাতার দিকে তাকাও। বাতাস অনুভব করো। হয়তো সমস্যার সমাধান সঙ্গে সঙ্গে পাবে না। কিন্তু ফিরে এসে আবার চেষ্টা করার মতো একটু স্বস্তি পেতে পারো।
বাইরে সময় কাটানোর আরও কিছু সুবিধা আছে। দিনের আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণের ছন্দ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং শরীরচর্চাও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। শুধু রোদে দাঁড়ালেই মস্তিষ্কের সব রাসায়নিক উপাদান ঠিক হয়ে যাবে, এমন নয়। মন ভালো থাকার পেছনে অনেক বিষয় কাজ করে। প্রকৃতির কাছে যাওয়া তার মধ্যে একটি সহায়ক উপায়।
রিভিউতে ১ স্টার দেওয়া কি অভদ্রতা৬. ধীরে শ্বাস নাও
মন খুব খারাপ হলে বা ভয় পেলে শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয়ে যায়। বুক ধড়ফড় করে। শরীর টানটান হয়ে থাকে। তখন নিজেকে শান্ত করাও কঠিন মনে হতে পারে।
এমন অবস্থায় শ্বাস নেওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে পারো। ধীরে শ্বাস নাও। তারপর আরও ধীরে শ্বাস ছাড়ো। শ্বাস ছাড়ার সময়টা শ্বাস নেওয়ার চেয়ে দীর্ঘ রাখার চেষ্টা করো। আরাম বোধ করলে এভাবে এক মিনিট চর্চা করতে পারো। ধীরে শ্বাস নিলে শরীরের চাপের প্রতিক্রিয়া শান্ত হয়। এতে স্নায়ুতন্ত্রের সেই অংশ সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায়, যা শরীরকে বিশ্রাম নিতে ও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করে।
২০২৩ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ১১১ জন মানুষকে নিয়ে একটি গবেষণা করেন। তাঁরা এক মাস ধরে প্রতিদিন পাঁচ মিনিট করে শ্বাসের বিভিন্ন কৌশল চর্চা করেছিলেন। একটি কৌশলে শ্বাস নেওয়ার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে শ্বাস ছাড়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। গবেষকেরা দেখেন, এই দলের মানুষেরা দিনের অন্য সময়েও তুলনামূলক ধীরে শ্বাস নিচ্ছিলেন। তবে শ্বাসের ব্যায়াম করার সময় অস্বস্তি লাগলে জোর কোরো না। স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নাও। মাথা ঘুরলে বা শ্বাসকষ্ট হলে চর্চা বন্ধ করো।
এই ছয়টি উপায়ের সব কটিই যে প্রতিবার কাজ করবে, এমন নয়। তোমার জন্য কোনটি ভালো কাজ করে, তা বুঝতে একটু সময় লাগতে পারে। তবে মন খারাপের সময় এগুলো চেষ্টা করে দেখতে পারো।
সবচেয়ে জরুরি কাজ কোনটি
সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো, দিনটা খারাপ যাচ্ছে বুঝতে পারার পরই পুরো দিন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া। নিজের মনের অবস্থা খেয়াল করা দরকার। আবেগের মধ্যে থাকা অবস্থায় পুরো দিনকে বিচার না করাই ভালো। ‘আজকের দিনটা ভয়াবহ’ বলার বদলে বলতে পারো, ‘গত ২০ মিনিট খুব খারাপ কেটেছে।’
কথাটা শুনতে সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু এতে একটা বড় পার্থক্য আছে। তুমি খারাপ সময়টাকে স্বীকার করছ। তবে সেটাকে গোটা দিনের পরিচয় বানিয়ে ফেলছ না। ২০২২ সালে প্রকাশিত ৯৯টি গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চাপের পরিস্থিতিকে নতুনভাবে দেখার চেষ্টা করা মানুষেরা সাধারণত বেশি সুখী হন। তাঁদের উদ্বেগ ও বিষণ্নতার অনুভূতিও তুলনামূলক কম থাকে। এখানে নতুনভাবে দেখার অর্থ হলো, সমস্যাটিকে সবচেয়ে ভয়ংকরভাবে ব্যাখ্যা না করে অন্য সম্ভাবনাগুলোও বিবেচনা করা।
ধরো, তুমি পরীক্ষায় প্রত্যাশার চেয়ে কম নম্বর পেয়েছ। তখন মনে হতে পারে, তুমি কোনো দিনই ভালো করতে পারবে না। কিন্তু আরেকভাবে দেখো। হয়তো প্রস্তুতি কম ছিল। হয়তো প্রশ্নের ধরন বুঝতে পারোনি। হয়তো কিছু অধ্যায় আবার পড়া দরকার। এবার তুমি জানো, পরের পরীক্ষার আগে কোন জায়গাগুলোতে জোর করতে হবে।
এতে সমস্যা উধাও হয়নি। কিন্তু তুমি সমস্যাটিকে দেখার একটা নতুন পথ পেয়েছ।
ফিলিস্তিনের শিশুরা নিজেদের স্বপ্নের কথা জানাচ্ছে ছবি এঁকেমন ভালো করার জন্য বেশি তাড়াহুড়া কোরো না
এবার একটা উল্টো কথা বলি। মন খারাপ হলে খুব দ্রুত মন ভালো করার চেষ্টা করাও কখনো কখনো চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। ধরো, তোমার খুব মন খারাপ। তুমি নিজেকে বলছ, ‘এখনই ভালো হয়ে যেতে হবে। এতক্ষণ ধরে মন খারাপ করে আছি কেন? অন্যরা তো এমন করে না!’
এবার মন খারাপের সঙ্গে যোগ হলো আরেকটি চিন্তা। নিজের মন খারাপ নিয়েই তুমি বিরক্ত হয়ে পড়লে। কখনো কখনো কয়েকটি কঠিন মুহূর্ত মেনে নেওয়াই ভালো। সব সময় নিজেকে ভালো অনুভব করাতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। মন খারাপ হলে সেটা কিছুক্ষণ থাকতেই পারে।
অনুভূতিকে জোর করে দূর করতে গেলে স্বাভাবিকভাবে তা সামলে ওঠার সুযোগ কমে যেতে পারে। তাই নিজেকে বলতে পারো, ‘আজ আমার মন খারাপ। একটু সময় লাগতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।’ এটা হাল ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের প্রতি একটু সদয় হওয়া।
তোমার বন্ধু মন খারাপ করে বসে থাকলে কি তুমি তাকে বলবে, ‘এতক্ষণ ধরে মন খারাপ করে আছ কেন? এখনই হাসো!’ সম্ভবত বলবে না। তাহলে নিজের সঙ্গেও একটু বন্ধুর মতো আচরণ করো।
দিনের কখন হিসাব বন্ধ করে দেওয়া ভালো
কখনো কখনো সব চেষ্টা করার পরও দিনটা ভালো যায় না। তখন আর জোর করে দিনটাকে বাঁচানোর চেষ্টা না করলেও চলে। ধরো, সারা দিন পড়াশোনা বা কাজের চাপ গেছে। তার ওপর কয়েকটি ঝামেলাও হয়েছে। এখন রাত হয়ে গেছে। তুমি ক্লান্ত। কিন্তু বিছানায় শুয়েও ভাবছ, সকালে কেন এমন হলো, দুপুরে কেন ওই কাজটা করলে, বিকেলে কেন বন্ধুকে ওই কথাটা বললে। একই ঘটনা বারবার মনে পড়ছে।
এমন সময়ে নিজেকে একটু ছাড় দাও। আজ সব সমস্যার সমাধান করতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। এমন সন্ধ্যায় দিনের বাকি সময়টুকু সহজভাবে কাটানো যায়। বই পড়তে পারো। পছন্দের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারো। গোসল করে নিতে পারো। পরিচিত কোনো কাজ করতে পারো। দরকার হলে একটু আগেই ঘুমিয়ে পড়ো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘুমানোর আগে সারা দিনের ভুলগুলো নিয়ে নিজেকে বারবার দোষ না দেওয়া। আসলে নিজের সঙ্গে আমরা কীভাবে কথা বলি, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একই কথা বারবার শুনলে আমরা অনেক সময় সেটাকেই বিশ্বাস করতে শুরু করি। তাই নিজেকে দোষ দেওয়ার আগে একটা প্রশ্ন করো, ‘আমার কোনো কাছের বন্ধু এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আমি কি তাকে এই কথাগুলোই বলতাম?’
যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে নিজের সঙ্গেও একটু নরমভাবে কথা বলো। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে। রাত সাড়ে ১১টায় শুয়ে আজকের সব সমস্যার সমাধান করে ফেলতেই হবে, এমন নয়। কিছু সমস্যার সমাধান আগামীকাল করলেও চলবে। সত্যি বলতে, রাত জেগে একই ঘটনা দশবার ভাবলে ঘটনাটি বদলায় না। শুধু তোমার ঘুম কমে যায়!
দিনটা খারাপ গেছে মানেই তোমার জীবন খারাপ যাচ্ছে, এমন নয়। একটা কঠিন দিন আর একটা কঠিন জীবন এক জিনিস নয়। আজকের দিনটা তোমার পছন্দ হয়নি, সেটা মেনে নেওয়া যায়। আগামীকাল আবার নতুন করে শুরু করার সুযোগ থাকবে।
তাই দিনটা বাঁচানোর জন্য নিজের ওপর বেশি চাপ দিয়ো না। একটু থামো। নিজের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করো। হাঁটতে বেরিয়ে পড়ো, শ্বাসের দিকে মনোযোগ দাও কিংবা সময়মতো ঘুমিয়ে পড়ো। সব দিন সমান ভালো যাবে না। কিন্তু একটা খারাপ মুহূর্তকে পুরো দিনের গল্প বানিয়ে ফেলতে হবে, এমন কোনো কথাও নেই।
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্টস্মার্টফোন ব্যবহারে শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ে, নতুন গবেষণা