খাঁটি মধু কিনছি, নাকি চিনির সিরাপ?
· Prothom Alo

গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ফেনীর এক আবাসিক হোটেলের টয়লেটে তৈরি করা হচ্ছিল ভেজাল মধু। সেখানে গ্যাসের চুলায় চিনি জ্বাল দিয়ে তার সঙ্গে আসল মধু মিশিয়ে বানানো হতো এ ভেজাল মধু।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২ কেজি আসল মধুর সঙ্গে ১০ কেজি চিনি মিশিয়ে ১২ কেজি মধু তৈরি করা হতো। এটি ‘খাঁটি মধু’ হিসেবে বাজারে বিক্রি করা হতো। এভাবে প্রায় আট বছর ধরে কাজটি করে আসছিল চক্রটি।
Visit sweetbonanza-app.com for more information.
ঘটনাটি পড়ার পর প্রথম যে প্রশ্ন মনে আসে, তা হলো, আট বছর ধরে এভাবে মধু তৈরি ও বিক্রি চলল কীভাবে? আরও বড় প্রশ্ন, বাজার থেকে এক বোতল মধু কেনার সময় একজন সাধারণ ক্রেতা কীভাবে বুঝবেন, বোতলের ভেতরে সত্যিই মধু আছে কি না?
ফেনীর ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভেজাল মধু তৈরি ও বিক্রির ঘটনায় অভিযান ও শাস্তির খবর এসেছে। কোথাও চিনিজাতীয় উপাদান মিশিয়ে তা খাঁটি মধু হিসেবে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও ভোক্তা অধিকার সংস্থার অভিযান হচ্ছে, ভেজালকারীরা ধরা পড়ছেন, জরিমানা বা শাস্তিও হচ্ছে। তারপরও একই ধরনের ঘটনা আবার সামনে আসছে।
বিষাক্ত এবং অবিষাক্ত ও ভেজাল মদে পার্থক্য কীপ্রশ্ন হলো, এ ব্যবসা বারবার ফিরে আসে কেন?
এর একটি কারণ সম্ভবত খুব সাধারণ। আসল মধুর জন্য প্রাকৃতিক উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। অন্যদিকে চিনি সহজলভ্য এবং তুলনামূলকভাবে সস্তা। ফেনীর ঘটনায়ও সেই হিসাব স্পষ্ট।
মধুর ক্ষেত্রে এই প্রতারণার প্রভাব শুধু পকেট পর্যন্ত সীমিত নয়। মানুষ মধু কেনেন একটি নির্দিষ্ট বিশ্বাস নিয়ে। প্রাকৃতিক খাবার হিসেবে মধুর আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। অনেকে চিনির বদলে মধু খান, কেউ অসুস্থতার সময় বাড়িতে মধু রাখেন, কেউ শিশুদের জন্য কিনে থাকেন। স্বাস্থ্যসচেতন অনেক মানুষও মিষ্টি খাবারের ক্ষেত্রে মধুকে তুলনামূলক ভালো বিকল্প মনে করেন।
মধুতে চিনি মেশানো হলে মধুর মোট শর্করার (সুক্রোজ/গ্লুকোজ-ফ্রুকটোজ) পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে ভোক্তার রক্তে অতিরিক্ত শর্করার মাত্রা ডায়াবেটিস, পেটের মেদ বৃদ্ধি ও স্থূলতার কারণ হতে পারে; এ ছাড়া এটি রক্তে লিপিডের মাত্রা বাড়িয়ে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন ‘ইন ভিভো’ (জীবদেহে পরিচালিত) গবেষণায় দেখা গেছে, মধুতে থাকা ভেজাল উপাদানের কারণে শরীরের যেসব অঙ্গ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার মধ্যে লিভার বা যকৃৎ অন্যতম; এরপরই রয়েছে কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্ক।
বাগানে মৌচাক বসিয়ে মধু সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মৌচাষিরা। কেশরহাট, রাজশাহী, ৭ অক্টোবরতাই মধু কেনার ক্ষেত্রে মধুটি খাঁটি কি না, সেটি যাচাইয়ে ভোক্তাদেরও সচেতন হতে হবে। মধু কেনার সময় পণ্যের লেবেল, উৎপাদনকারী, উৎস, অনুমোদন ও অন্যান্য তথ্য দেখা দরকার। সম্ভব হলে পরিচিত ও যাচাইযোগ্য উৎস থেকে পণ্য কেনা উচিত। উৎসের কোনো তথ্য নেই, খোলা অবস্থায় বিক্রি হচ্ছে বা পণ্যের পরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না—এমন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়াও স্বাভাবিক।
তবে ভোক্তাদের জন্য এখানে একটি বড় অসুবিধাও আছে। মধু আসল কি না, তা বোঝার জন্য নানা ঘরোয়া পদ্ধতির কথা আমরা শুনি। রং কেমন, গন্ধ কেমন, কতটা ঘন, পানিতে কীভাবে মেশে, ঠান্ডায় জমে কি না, এমন অনেক কিছু দেখে মধুর মান বোঝার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এসব দেখে কি সত্যিই নিশ্চিত হওয়া যায়?
মধু আসলে বেশ জটিল একটি খাদ্যপণ্য। কোন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়েছে, কোথা থেকে এসেছে এবং কীভাবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করা হয়েছে, তার ওপর এর রং, গন্ধ, স্বাদ ও ঘনত্ব বদলাতে পারে। আবার ভেজালও এক ধরনের নয়। ফলে দেখতে সুন্দর, গন্ধ ভালো বা স্বাদে মিষ্টি হলেই একটি মধুকে খাঁটি বলে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
বাজারে মধুর মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব উৎপাদক ও বিক্রেতার যেমন, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থারও। নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ উৎস ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজর রাখা এবং ভেজাল ধরা পড়লে শুধু বিক্রেতাকে জরিমানা না করে পণ্যটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে বাজারে ঢুকেছে, সেসবও খতিয়ে দেখা দরকার।
এই অনিশ্চয়তাকে খাদ্যপণ্যের সামগ্রিক মানের প্রশ্ন থেকেও আলাদা করে দেখা যায় না। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরীক্ষা করা ১ হাজার ৭১৩টি খাদ্য নমুনার মধ্যে ৫৭১টিতে, অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশে ভেজাল, দূষণ বা পুষ্টিমান-সংক্রান্ত সমস্যা পাওয়া গেছে। এসব খাদ্যপণ্যের মধ্যে মধুও ছিল।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরীক্ষার ক্ষেত্রেও মধুর মান যাচাইয়ে একাধিক বিষয় বিবেচনা করা হয়। মধুর আর্দ্রতা, বিভিন্ন ধরনের চিনির পরিমাণ ও অনুপাত, হাইড্রক্সিমিথাইল ফুরফুরাল বা এইচএমএফ, পরাগরেণুসহ নানা বৈশিষ্ট্য পরীক্ষার আওতায় আসে। অর্থাৎ মধুর মান নির্ধারণের বিষয়টি শুধু চোখে দেখে বা স্বাদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো সহজ নয়।
মধু আসল কি না, তা যাচাইয়ে বিশ্বজুড়ে রাসায়নিক বিশ্লেষণ, বর্ণালিবীক্ষণ (স্পেকট্রোস্কপি), সমস্থানিক বিশ্লেষণ (আইসোটপিক অ্যানালাইসিস), ক্রোমাটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মধুর রাসায়নিক গঠন ও উপাদান বিশ্লেষণ করে এমন ভেজালও শনাক্ত করা সম্ভব, যা চোখে দেখা বা স্বাদ নেওয়ার মাধ্যমে বোঝা কঠিন।
ফেনীর একটি হোটেলের টয়লেটে চুলা বসিয়ে চিনি জ্বাল দিয়ে তৈরি হচ্ছিল ‘খাঁটি মধু’বাংলাদেশে মধুর গুণাগুণ বিশ্লেষণের অনেক গবেষণা হয়েছে। বিশেষ করে মধুর অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কার্যকারিতার বিষয়ে অনেকেই জানেন। তবে উদ্ভিজ্জ শর্করার পরিমাণ, যা চিনি মেশালে পাওয়া যায়, একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড। এওএসি ৯৯৮ দশমিক ১২-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, বিশুদ্ধ মধুতে উদ্ভিজ্জ শর্করা (সি৪ সুগার) গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৭ শতাংশের কম (সাধারণত ০ থেকে ৭ শতাংশ)।
মধুর বিশুদ্ধতা ও ভেজালসংক্রান্ত বাংলাদেশি মধুর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত নমুনাগুলোর মধ্যে প্রায় ১৮ শতাংশে সি৪ উদ্ভিজ্জ শর্করার ভেজাল পাওয়া গেছে, যেখানে সি৪ শর্করার পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৯০ থেকে ৮৬ দশমিক ৬১ শতাংশের মধ্যে।
তবে বাজারে মধুর মান নিশ্চিত করার দায়িত্ব উৎপাদক ও বিক্রেতার যেমন, তেমনি নিয়ন্ত্রক সংস্থারও। নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ উৎস ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নজর রাখা এবং ভেজাল ধরা পড়লে শুধু বিক্রেতাকে জরিমানা না করে পণ্যটি কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে বাজারে ঢুকেছে, সেসবও খতিয়ে দেখা দরকার।
পরিশেষে মধুর মতো পরিচিত একটি খাবার নিয়েও যখন এমন প্রশ্ন ওঠে, তখন আলোচনাটি শুধু একটি পণ্যের ভেজাল নিয়ে নয়; খাবারের নামে যা কিনছি, তার সঙ্গে ভেতরের উপাদানের মিল থাকাটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে মৌলিক বিষয়। সে জায়গায় ফাঁক থাকলে শুধু অভিযান বা শাস্তি দিয়ে সমস্যার সমাধান করা কঠিন।
ড. আফিফা খাতুন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন
ই–মেইল: [email protected]
মতামত লেখকের নিজস্ব