সংসারের খরচ বাড়ছে, সঞ্চয় ধরে রাখবেন যেভাবে

· Prothom Alo

২০২১ সালে মাসে ৫০ হাজার টাকায় সংসার চলত আজহার হোসেনের (ছদ্মনাম)। এর বাইরে কিছু অর্থ হাতে থাকত, যা তিনি সঞ্চয় করতেন। কিন্তু কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা ও যাতায়াতের খরচ বেড়ে গেছে। এখন একই সংসার চালাতে মাসে ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা বেশি খরচ করতে হচ্ছে তাঁকে। বছরে বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ অন্তত ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

Visit sport-tr.bet for more information.

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আজহার হোসেন। গত পাঁচ বছরে তাঁর মাসিক ব্যয় বাড়লেও বেতন সেই হারে বাড়েনি। ফলে এখন সঞ্চয় ভেঙে চলতে হচ্ছে। কখনো কখনো বাড়তি আয়ের জন্য অতিরিক্ত কাজও করেন। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে সংসার চললেও তাঁর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে।

চার বছরের বেশি সময় ধরে দেশের সাধারণ গড় মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। ফলে আজহারের অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর পরিবারের নয়। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারকেই আগের চেয়ে বেশি খরচ করতে হচ্ছে। কিন্তু কারও আয়ই সেভাবে বাড়েনি। এতে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।

এ পরিস্থিতিতে আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো এবং সামর্থ্য অনুযায়ী সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তবে সঞ্চয়ের কৌশল ঠিক করার আগে বুঝতে হবে, কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে এবং কোথায় খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

কোন খাতে বেশি খরচ হচ্ছে

সংসারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপ হলো আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব রাখা। এ জন্য মাসের শুরুতে সম্ভাব্য খরচের তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। মাস শেষে সে তালিকার সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব মেলালে বোঝা যাবে, কোন খাতে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এতে পরবর্তী মাসের জন্য ব্যয়ের পরিকল্পনা করা সহজ হবে।

সাধারণত পরিবারের খরচ কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। নিয়মিত প্রয়োজনীয় খরচের মধ্যে রয়েছে বাসাভাড়া, খাবার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, যাতায়াত ও সন্তানের পড়াশোনা। ব্যক্তিগত প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে চিকিৎসা, পোশাক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কেনাকাটা। বাইরে খাওয়া, বিনোদন, ঘোরাঘুরি ও তাৎক্ষণিক কেনাকাটা পরিবর্তনশীল ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে সঞ্চয়, জরুরি তহবিল ও ঋণ পরিশোধের জন্যও অর্থ বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন।

প্রতিদিনের খরচ মুঠোফোনের নোট, খাতা বা স্প্রেডশিটে লিখে রাখা যায়। ছোট ছোট খরচ আলাদাভাবে খুব বেশি মনে না হলেও মাস শেষে তা বড় অঙ্কে দাঁড়াতে পারে। তাই নিয়মিত হিসাব রাখা জরুরি।

ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের সূত্র: বহুল আলোচিত একটি পদ্ধতি হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। সাবেক মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও তাঁর মেয়ে অ্যামেলিয়া ওয়ারেন তিয়াগি তাঁদের ‘অল ইয়োর ওর্থ: দ্য আলটিমেট লাইফটাইম মানি প্ল্যান’ নামে একটি বইয়ে এ পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন। তাঁরা কর-পরবর্তী আয়ের ৫০% প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০% ব্যক্তিগত পছন্দের খাতে এবং ২০% সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।

সঞ্চয়ের নিয়ম

ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় বহুল আলোচিত একটি পদ্ধতি হলো ৫০/৩০/২০ নিয়ম। সাবেক মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন ও তাঁর মেয়ে অ্যামেলিয়া ওয়ারেন তিয়াগি তাঁদের ‘অল ইয়োর ওর্থ: দ্য আলটিমেট লাইফটাইম মানি প্ল্যান’ নামে একটি বইয়ে এ পদ্ধতির কথা তুলে ধরেন।

এ নিয়মে কর-পরবর্তী আয়ের ৫০ শতাংশ প্রয়োজনীয় খরচে, ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত পছন্দের খাতে এবং ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও ঋণ পরিশোধে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরেকটি পদ্ধতি হলো ৮০/২০ সূত্র। এ ক্ষেত্রে মাসের শুরুতেই আয়ের ২০ শতাংশ সঞ্চয়ের জন্য সরিয়ে রেখে বাকি ৮০ শতাংশ দিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করা হয়। তবে আয় কম হলে এই অনুপাত পরিবর্তন করা যেতে পারে। মূল কথা হলো, মাসের শেষে যা অবশিষ্ট থাকবে, শুধু তা সঞ্চয় না করে শুরু থেকেই সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ জমাতে পরিকল্পনা করবেন।

জরুরি তহবিল কেন প্রয়োজন

নিয়মিত খরচের বাইরে হঠাৎ চিকিৎসা, চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া বা অন্য কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যে দেশের অর্থনীতির ৮০ শতাংশের বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের, সেখানে মানুষের জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা বেশি। জরুরি সময়ে সঞ্চয় না থাকলে ধার করতে হয় কিংবা ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে ভবিষ্যতের আয়ের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হয়।

এ জন্য ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনায় জরুরি তহবিল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত পরামর্শ হলো, পরিবারের অপরিহার্য ব্যয়ের তিন থেকে ছয় মাসের সমপরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখা। তবে এটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নিয়ম নয়। আয় অনিয়মিত হলে বা পরিবারে নির্ভরশীল সদস্য বেশি থাকলে আরও বড় তহবিল প্রয়োজন হতে পারে।

ঋণের খরচ সম্পর্কেও সচেতন থাকা দরকার। ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া, উচ্চ সুদের ব্যক্তিগত ঋণ কিংবা কিস্তিতে কেনাকাটার দায় ভবিষ্যতের আয়ের ওপর বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্য ও মোট সুদের পরিমাণ হিসাব করে দেখা উচিত।

ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের আরেকটি সূত্র: আরেকটি পদ্ধতি হলো ৮০/২০ সূত্র। এ ক্ষেত্রে মাসের শুরুতেই আয়ের ২০% সঞ্চয়ের জন্য সরিয়ে রেখে বাকি ৮০% দিয়ে সংসার চালানোর চেষ্টা করতে বলা হয়। তবে আয় কম হলে এই অনুপাত পরিবর্তন করা যেতে পারে। অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ জমানোর পরিকল্পনা করুন।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই বাস্তবতায় পরিবার কী করতে পারে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বলেন, ব্যয় বেড়েছে ঠিক, কিন্তু সঞ্চয় যেন একেবারে বন্ধ হয়ে না যায়। কিছু টাকা হলেও নিয়মিত সঞ্চয় করতে হবে। জরুরি নয়, এমন কিছু খাতে ব্যয় কমানো সম্ভব। যেমন প্রতি সপ্তাহে বাইরে খেতে না গিয়ে মাসে একবার বা দুবার যাওয়া। বাসার জন্য মাল্টা না কিনে দেশীয় ফল আমড়া কেনা। প্রোটিনের ক্ষেত্রেও বেশি দামের মাছের পরিবর্তে কম দামের মাছ কেনা যেতে পারে। এতে পুষ্টিমানের বিশেষ তারতম্য হবে না। জীবনমানের ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়া যায়।

সায়েমা হক আরও বলেন, ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। ভোগের জন্য ঋণ না নেওয়াই ভালো। সেই সঙ্গে আগের ঋণের বোঝাও বেশি দিন টেনে নেওয়া উচিত নয়।

স্বল্প আয়েও আর্থিক নিরাপত্তা

স্বল্প আয়ে সঞ্চয়ের উদাহরণ হিসেবে ভারতের বেঙ্গালুরুর এক ব্যক্তির জীবনযাপনের গল্প আলোচনায় এসেছে। দ্য ইকোনমিক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি পেশায় প্রুফরিডার। ২০০০ সালে মাত্র ৫ হাজার রুপি নিয়ে গ্রাম থেকে বেঙ্গালুরুতে আসেন তিনি। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। মাসে ৪ হাজার ২০০ রুপি বেতনে কর্মজীবন শুরু করা ওই ব্যক্তির বেতন ২০২৫ সালে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার রুপি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ের ফলে তাঁর ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ১ লাখ রুপি। বিনিয়োগ থেকে তাঁর মাসিক আয় ৬০ হাজার রুপি। তাঁর কোনো ঋণ নেই। ঋণ নেওয়া ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার এড়িয়ে চলা এবং নিজের খরচ সীমিত রাখার মাধ্যমে তিনি মিতব্যয়ী জীবন যাপন করেছেন।

আর্থিক স্বাধীনতা মানেই বিপুল সম্পদ নয়

সীমিত আয়ের মানুষের কাছে আর্থিক স্বাধীনতা মানে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া নয়; বরং ঋণগ্রস্ত না হওয়া, জরুরি পরিস্থিতি সামলানো এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ জমাতে পারাও বড় অর্জন।

তবে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের শৃঙ্খলাই সব সমস্যার সমাধান নয়। আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের স্থিতিশীলতা ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। একজন মানুষ কতটা সঞ্চয় করতে পারবেন, তা শুধু তাঁর খরচের অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে না; বরং আয় ও পারিবারিক দায়িত্বের বাস্তবতার ওপরও নির্ভর করে।

Read full story at source