একটু সচেতন হলে নুডলসও হতে পারে স্বাস্থ্যসম্মত
· Prothom Alo

পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ আর ডিম দিয়ে কড়াইতে ভাজা এক বাটি ধোঁয়া ওঠা নুডলস—বাঙালির আড্ডায় বা বিকেলের নাশতায় এর চেয়ে লোভনীয় আর কী হতে পারে! আবার হঠাৎ পাওয়া ক্ষুধার চটজলদি সমাধান হিসেবে গরম পানিতে মসলা দিয়ে দুই মিনিটে তৈরি ইনস্ট্যান্ট নুডলসের কদরও কম নয়। কিন্তু এই মুখরোচক খাবার খেতে গিয়ে স্বাস্থ্যসচেতনদের মনে প্রায়ই খচখচ করে। অনেকেই মনে করেন, নুডলস খাওয়া মানেই জেনেবুঝে নিজের ক্ষতি হচ্ছে না তো? ওজন বেড়ে যাওয়া বা পুষ্টিগুণের অভাবের ভয়ে অনেকেই প্রিয় খাবারটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তবে পুষ্টিবিদেরা বলছেন ভিন্ন কথা। একটু সচেতনতা, সঠিক নুডলস বাছাই এবং রান্নার কৌশলে সামান্য পরিবর্তন আনলেই এই নুডলস হয়ে উঠতে পারে দারুণ এক পুষ্টিকর খাবার।
Visit moryak.biz for more information.
বৈচিত্র্যময় নুডলসের দুনিয়া
নুডলস মানেই কেবল রিফাইন করা সাদা ময়দা আর ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ—এমন ধারণা এখন পুরোনো। বিশ্বায়নের এই যুগে নুডলসের দুনিয়াটা বেশ বড় ও বৈচিত্র্যময়। সুপারশপগুলোর তাকে এখন ময়দার পাশাপাশি আটা, ওটস, ব্রাউন রাইস ও চালের তৈরি নুডলস সহজেই পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ এখন এসব বিকল্পের দিকেই ঝুঁকছেন। এ ছাড়া বিশ্বে আরও নানা স্বাস্থ্যকর নুডলসের চল রয়েছে। যেমন জাপানে অত্যন্ত জনপ্রিয় বাকহুইট দিয়ে তৈরি ‘সোবা’ নুডলস এবং জিরো-ক্যালরি হিসেবে খ্যাত ‘শিরাতাকি’ নুডলস। এগুলো ফাইবার ও পুষ্টিতে ভরপুর।
দীর্ঘায়ু ও প্রাচ্যের খাদ্যাভ্যাস
দক্ষিণ এশিয়ায় নুডলস মূলত বিকেলের নাশতা বা টিফিন হিসেবে খাওয়া হলেও পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি প্রধান খাদ্য। চীন, জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই নুডলস। মজার ব্যাপার হলো, জাপানের মতো দেশে শতায়ু ও সুস্থ মানুষের সংখ্যা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি। তাদের এই দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের পেছনে নুডলসের বড় অবদান রয়েছে বলে মনে করা হয়। এর মূল কারণ তাদের রান্নার ধরন। তারা আমাদের মতো অতিরিক্ত তেল ও কড়া মসলায় নুডলস ভাজে না; বরং সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ‘ব্রথ’ বা ক্লিয়ার স্যুপে সেদ্ধ করা নুডলসের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ, মাংস, মাশরুম ও মৌসুমি শাকসবজি মিশিয়ে খায়। এতে কার্বোহাইড্রেটের পাশাপাশি প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলসের চমৎকার ভারসাম্য তৈরি হয়।
বিজ্ঞান কী বলছে?
নুডলস খেলে রক্তে শর্করা হু হু করে বাড়ে—এমন ধারণার বিপরীতে গবেষণার ইতিবাচক ফলও রয়েছে। ২০২১ সালে পুষ্টিবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী নিউট্রিয়েন্টস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এশীয় প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হোলগ্রেইন স্প্যাগেটি বা আস্ত শস্যের পাস্তা খেলে খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা সাধারণ ভাতের তুলনায় বেশ কম বাড়ে। গবেষণায় দেখা যায়, হোলগ্রেইন স্প্যাগেটির গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৫৪, যা স্বাস্থ্যকর সীমার মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে সাধারণ গমের নুডলসের জিআই ৭৪ এবং ভাতের জিআই ৮০। অর্থাৎ সঠিক শস্যের নুডলস বেছে নিলে তা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।
স্বাস্থ্যকর উপায়ে রান্নার কৌশল
নুডলসকে স্বাস্থ্যকর করতে রান্নার ধরন ও উপাদান বাছাই সবচেয়ে জরুরি। সব নুডলসের রান্নার প্রক্রিয়া এক নয়। রামেন বা চালের নুডলস বেশিক্ষণ সেদ্ধ করলে গলে জগাখিচুড়ি হয়ে যায়, তাই এগুলো হালকা গরম পানিতে ভিজিয়ে বা ঝটপট ব্রথে দিয়ে নামাতে হয়। অন্যদিকে আটা বা হোল হুইটের নুডলস সেদ্ধ হতে একটু বেশি সময় নেয়। সাদা ময়দার নুডলস এড়িয়ে আটা, ওটস বা লাল চালের নুডলস বেছে নিতে হবে। নুডলসের পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে সেখানে প্রচুর মৌসুমি শাকসবজি দিতে হবে। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে যোগ করুন ডিম, সেদ্ধ মুরগির মাংসের টুকরা কিংবা টফু। প্যাকেটের ভেতরে থাকা উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত ক্ষতিকর মসলা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে ঘরে থাকা ধনেপাতা, কাঁচা মরিচ, গোলমরিচের গুঁড়া এবং সামান্য লেবুর রস ব্যবহার করলে স্বাদ ও পুষ্টি—দুই-ই বাড়বে। এ ছাড়া ডুবোতেলে না ভেজে সামান্য শর্ষে বা জলপাই তেলে হালকা স্যঁতে করে নেওয়া যেতে পারে।
একটু সচেতন হয়ে রান্নার পদ্ধতিতে এই ছোট পরিবর্তনগুলো আনলেই চটজলদি নুডলস হয়ে উঠতে পারে আপনার কর্মব্যস্ত জীবনের অন্যতম পুষ্টিকর, ভারসাম্যপূর্ণ ও সুস্বাদু এক আহার।