ক্ষুদ্রঋণ খাত: কী এমন ভেঙে পড়েছে, যে কারণে এত পরিবর্তন
· Prothom Alo

ব্র্যাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, সাজিদা ফাউন্ডেশন, শক্তি ফাউন্ডেশনসহ শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের যৌথ লেখা
Visit catcross.biz for more information.
মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) আইন সংশোধনের প্রস্তাবগুলো এত দিন আলাদাভাবে দেখা হচ্ছিল। সব একসঙ্গে সামনে রাখলে ছবিটা ভয়ানক। শুধু এমআরএ আইনেই ৪০টি সংশোধনীর প্রস্তাব এসেছে। কে প্রধান নির্বাহী হবেন, পর্ষদ থাকবে কি না, প্রতিষ্ঠানের নাম কী হবে, সুদ কত হবে, ভেতরে কোন বিভাগ থাকবে—খাতের প্রায় প্রতিটি দিকই এখন নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
ক্ষুদ্রঋণের জন্ম হয়েছিল ব্যাংকের বিকল্প হিসেবে। জামানত ছাড়া ঋণ, দ্রুত প্রক্রিয়া, মানুষের দুয়ারে সেবা ইত্যাদি উদ্দেশ্য সামনে রেখে। এখন সেই খাতকেই ব্যাংকের মতো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এতে খাতটি ব্যাংকের মতো নিরাপদ হবে না; বরং যে গতি, উদ্ভাবন আর ঝুঁকি নেওয়ার সাহস একে দাঁড় করিয়েছে, সেগুলো হারাবে।
এর ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের সঞ্চয়ের সুদে বিগত বছরের কর দাবি করছে জরিমানাসহ। সিদ্ধান্তগুলো আসছে আলাদা জায়গা থেকে, আলাদা যুক্তিতে। কিন্তু ভার পড়ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
তাই প্রশ্ন জাগে, কী এমন ভেঙে পড়েছে, যার প্রতিকারে একযোগে এতগুলো পরিবর্তন লাগছে? আমানতকারীর টাকা মার গেছে? খেলাপির হার ব্যাংক খাতের ধারেকাছে গেছে? কোনো প্রতিষ্ঠান লাখো গ্রাহককে বিপদে ফেলে উধাও হয়েছে?
কোথাও সমস্যা নেই, তা বলছি না। এ খাত যেখানে আছে, সেখানে কঠোর তদারকি আমরা নিজেরাই চেয়েছি। ৪০টি সংশোধনীর বেশ কটিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও আছে। কিন্তু পাঁচটি বিষয় এই খাতের কাজের ধরনটাই বদলে দেবে। সেগুলোয় আসছি। প্রথমেই মনে রাখা দরকার এই খাত দেশকে কী দিয়েছে?
ক্ষুদ্রঋণ: পরিসংখ্যানের চেয়ে মানুষের গল্পটা শক্তিশালীযে কৃতিত্ব কেউ দেয় না
ক্ষুদ্রঋণের আগে গ্রামের মানুষের ঋণের একটিই পথ ছিল—মহাজন। আজ যেখানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান আছে, সেখানে দাদন টিকতে পারেনি। যেখানে আমরা পৌঁছাইনি—দুর্গম চর, হাওর, পাহাড়। সেখানে দাদন আজও রমরমা। পার্থক্য শুধু একটি শাখা আছে কি নেই।
প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ আমাদের কাছে সঞ্চয় রাখেন। মোট কৃষিঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ যায় এই খাতের মাধ্যমে। এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান নিজেই বলেছেন, আমাদের ঋণের প্রায় ৯৫ শতাংশ ফেরত আসে, যেখানে ব্যাংকে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঋণ খেলাপি। কোভিডের সময় কোটি কোটি সদস্যের সঞ্চয় আমরা কোনো আতঙ্ক ছাড়াই ফিরিয়ে দিয়েছি। এই খাত বাণিজ্যিকও নয়। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো অলাভজনক, উদ্বৃত্ত কোনো অর্থ শেয়ারহোল্ডারের পকেটে যায় না।
বড় ঝুঁকি ক্ষুদ্রঋণকে কেটে আলাদা করা
প্রস্তাব অনুযায়ী ছয় মাসের মধ্যে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নাম বদলাতে হবে, নতুন গঠনতন্ত্র করতে হবে, পর্ষদ নিয়ন্ত্রককে দিয়ে অনুমোদন করাতে হবে, আর ক্ষুদ্রঋণের সব সম্পদ ও দায় আলাদা আইনি সত্তায় সরাতে হবে। না পারলে লাইসেন্স বাতিল। বহু প্রতিষ্ঠান আইনি পরিচয়ই হারাবে, মামলা করার অধিকারও থাকবে না। তখন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দেওয়া বন্ধ করবে ব্যাংক। পরিণতিতে গ্রামীণ ঋণের তহবিল শুকিয়ে যাবে।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি অন্যখানে হবে। ক্ষুদ্রঋণের উদ্বৃত্তের প্রায় ১৫ শতাংশ খরচ হয় উন্নয়নকাজে। অতিদরিদ্র পরিবারের কর্মসূচি, স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগে সাড়া ইত্যাদি কাজে। বাকিটা ক্ষুদ্রঋণেই পুনর্বিনিয়োগ হয়। বিদেশি সাহায্য যখন প্রায় শেষ, তখন দেশের এই টাকাই উন্নয়ন অর্থায়নের নির্ভরযোগ্য উৎস। কেটে আলাদা করলে এই প্রবাহ আইনত বন্ধ হয়ে যাবে। এসব কাজ তখন কোথা থেকে চলবে? এ প্রশ্নের জবাব নেই।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বহুমুখী কর্মসূচির প্রতিষ্ঠান এমআরএর সনদ নিয়েই সফলভাবে ক্ষুদ্রঋণ চালাচ্ছে। সেটি বহাল রেখে স্পষ্ট করা হোক, কেবল ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিই এই আইনের আওতায় পড়বে।
গরিব মানুষের সঞ্চয়ের সুদের ওপর কর
সরকার কি সত্যিই ৪ কোটি ৫০ লাখ ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীর ওপর কর বসাতে চায়, যাঁদের গড় সঞ্চয় ২০ হাজার টাকারও কম? তাঁরা গ্রামের নারী, ক্ষুদ্র কৃষক, অনানুষ্ঠানিক খাতের নিম্ন আয়ের মানুষ—যাঁরা বিপদের দিনের জন্য সপ্তাহে ৫০ বা ১০০ টাকা করে জমান। তাঁদের বেশির ভাগের আয় করমুক্ত সীমার নিচে। ফলে কেটে নেওয়া কর সমন্বয়েরও সুযোগ নেই। অথচ তাঁদের সুদেই বিগত বছরের কর চাওয়া হচ্ছে, জরিমানাসহ।
রাজস্বের অঙ্কে প্রাপ্তি সামান্য। কিন্তু বার্তাটি স্পষ্ট যে যাঁর সঞ্চয় সবচেয়ে কম, করের বোঝা তাঁর ওপরই। তা ছাড়া এই কর তহবিলের খরচ বাড়িয়ে সুদহার কমানোর পথ আটকে দেবে। আদায় স্থগিত হোক, বিগত বছরের দাবি ও জরিমানা প্রত্যাহার হোক, আর আইন সংশোধন করে বিষয়টি স্থায়ীভাবে মিটিয়ে ফেলা হোক।
সুদহারের প্রশ্নটা আসলে কী
ক্ষুদ্রঋণে সুদের বর্তমান সর্বোচ্চ সীমা ২৪ শতাংশ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা ২০ শতাংশে নামানোর কথা বলছে। কিন্তু ২৪ শতাংশ শুনে প্রকৃত খরচ বোঝা যায় না। এই হার ধরা হয় ক্রমহ্রাসমান স্থিতির ওপর। প্রতি সপ্তাহের কিস্তিতে বাকি ঋণ কমে, সুদ গোনা হয় কেবল বাকি অঙ্কের ওপর। ফলে ১ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে এক বছরে সাপ্তাহিক কিস্তিতে শোধ করলে মোট ফেরত দিতে হয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৪০ টাকা। বিশ্বে এটি ক্ষুদ্রঋণের সবচেয়ে কম হারগুলোর একটি। বহু দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সুদ সাধারণ ব্যাপার।
হার আরও কমুক, আমরাও চাই। কিন্তু আগে ব্যয় কমাতে হবে। ব্যাংকের কৃষিঋণে সুদ কম। কিন্তু আমাদের ঋণে জামানত নেই, অঙ্ক ছোট, টাকা পৌঁছাতে হয় গ্রাহকের বাড়িতে ও আদায় করতে হয় প্রতি সপ্তাহে। প্রকৃত ব্যয়ের নিচে সুদ বেঁধে দিলে ঋণ সস্তা হয় না, বরং সবচেয়ে দুর্গম গ্রাহকের কাছে ঋণ পৌঁছানোই বন্ধ হয়।
আর সেই শূন্যস্থানে ফিরে আসেন মহাজন। সেখানে সুদের হিসাব মাসে। মাসে ১০ শতাংশও অস্বাভাবিক নয়। একই ১ হাজার টাকা এক বছরে দাঁড়ায় ২ হাজার ২০০ টাকায়, চক্রবৃদ্ধিতে ৩ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে যায়। সঙ্গে আগাম ফসল বিক্রি, জমি বন্ধক, আর নালিশের কোনো জায়গা নেই।
তাই আসল বিতর্কটা ২৪ না ২০—এই সংখ্যা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, চর বা হাওরের যে নারী আজ ১ হাজার টাকার ঋণে বছরে ১৪০ টাকা দেন, সীমা কমলে তাঁর কাছে ঋণ আদৌ পৌঁছাবে কি না। না পৌঁছালে তাঁর প্রয়োজন ফুরাবে না। তিনি যাবেন মহাজনের কাছে। সুদের সীমা কমানোর উদ্দেশ্য গরিবের ঋণ সস্তা করা; ফল হবে উল্টো—তাঁর ঋণ কয়েক গুণ দামি হয়ে যাবে।
কৃষিতে নারী: একটি দৃশ্যমান বিপ্লব ও আগামীর চ্যালেঞ্জযে নিয়ন্ত্রণ পুরো খাতকে ফাইলে আটকে দেবে
বাকি দুটি প্রস্তাব একই সুতোয় বাঁধা। প্রধান নির্বাহী নিয়োগে এমআরএর পূর্বানুমোদন, আর এমআরএ চাইলে গোটা পর্ষদ বাতিল করে ছয় মাস থেকে এক বছরের জন্য প্রশাসক বসানোর ক্ষমতা।
প্রধান নির্বাহী বেছে নেওয়া পর্ষদের মূল দায়িত্বগুলোর একটি। এতে অনুমোদনের শর্ত বসালে জবাবদিহি ঘোলাটে হয়। নিয়োগের চূড়ান্ত ছাড়পত্র সরকারি সংস্থার হাতে গেলে তা একদিন রাজনৈতিক বিবেচনার শিকার হবেই। ক্ষুদ্রঋণ খাত আজও এই রাজনীতিকরণ থেকে মুক্ত। আর এটিই সম্ভবত এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
পর্ষদ বাতিলের প্রস্তাবটিও প্রত্যাহার করা হোক। গুরুতর অনিয়মে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নিবন্ধনকারী কর্তৃপক্ষের হাতে আগে থেকেই আছে। আর এর শর্ত—‘প্রতিষ্ঠান বা গ্রাহকদের স্বার্থের পরিপন্থী’ কাজ—এত অস্পষ্ট যে যেকোনো মতভেদই এর আওতায় পড়তে পারে। দুটি প্রস্তাব একসঙ্গে এ খাতকে আমলাতন্ত্রের দয়ার ওপর দাঁড় করায়। অথচ খাতের শক্তিই হচ্ছে গতি। কৃষক বীজ বোনার আগে ঋণ চান, ছয় মাস পরে নয়।
শেষ কথা
৪০টি সংশোধনী মানে কেবল কাগজের কাজ নয়। এক বছরের মধ্যে আইনি পরিচয় পাল্টাতে হবে, গঠনতন্ত্র নতুন করে লিখতে হবে, নতুন বিভাগ ও কাঠামো গড়তে হবে, জরিমানাসহ বিগত বছরের কর দিতে হবে—প্রতিটি ধাপেই খরচ। আর ঠিক তখনই সুদের সীমা কমিয়ে আয় কমানো হচ্ছে, সঞ্চয়ে কর বসিয়ে তহবিলের খরচ বাড়ানো হচ্ছে।
অথচ ঠিক এই সময়ে সরকার এই খাতের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি চাইছে। বৃক্ষরোপণ থেকে কর্মসংস্থান, জলবায়ু অভিযোজন থেকে ক্ষুদ্র পেনশন আর ক্ষুদ্রবিমার বিস্তার। একদিকে এই খাতকে জাতীয় অর্থনীতির আরও বড় অংশীদার করতে চাওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে এমন নিয়ম আনা হচ্ছে, যা সেই সামর্থ্যই কেড়ে নেবে। দায়িত্ব বাড়ানো আর হাত বেঁধে দেওয়া একসঙ্গে চলে না।
আর এসব ঘটছে অর্থনীতির এক কঠিন সময়ে, যখন দারিদ্র্য আবার বাড়ছে। আয় কমিয়ে, ব্যয় বাড়িয়ে, প্রধান নির্বাহী নিয়োগ ফাইল আটকে আর পর্ষদ বাতিলের খড়্গ ঝুলিয়ে রেখে একটি খাত কীভাবে গাছ লাগাবে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে, পেনশন আর বিমা ছড়িয়ে দেবে? যে প্রতিষ্ঠান অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত, সে নতুন কিছু গড়ে না।
আমরা নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে নই। আমরা এমন নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে, যা সমস্যার জবাব না খুঁজে কাঠামোটাই বদলে দিতে চায়। এখন দরকার এমআরএ, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরকে এক টেবিলে বসিয়ে একটি আলোচনা করা। কারণ, আলাদা টেবিলে বসে কেউই পুরো ছবিটা দেখতে পাচ্ছে না।
ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গবেষণা আর মাঠের বাস্তবতা দুটি আলাদা জিনিস। কাগজে যে নিয়ম নিখুঁত মনে হয়, চরের একটি শাখায় গিয়ে তা কীভাবে দাঁড়ায়, সেটি না দেখে আইন লেখা বিপজ্জনক। এ দেশের ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের প্রায় ৭২ শতাংশেরই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোনো হিসাব নেই। আনুষ্ঠানিক অর্থব্যবস্থার সঙ্গে তাঁদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ এই খাত। সেই সংযোগ দুর্বল করে দেওয়া মানে কেবল কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি নয়, গোটা অর্থনীতির জন্যই একটি আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
ভুল হলে এর মূল্য আমরা দেব না। দেবেন সেই নারী, যাঁর বীজ বোনার আগে ২০ হাজার টাকা দরকার ছিল, আর যিনি গিয়ে দেখলেন—যে কার্যালয়টি তাঁকে ঋণ দিত, বিপদে পাশে দাঁড়াত, সেটি আর নেই। মূল্য দেবেন তাঁর মতোই সেই ৭২ শতাংশ মানুষ, যাঁদের কাছে আজও ব্যাংকিং সেবা পৌঁছায়নি।
ব্র্যাক, আশা, ব্যুরো বাংলাদেশ, সাজিদা ফাউন্ডেশন, শক্তি ফাউন্ডেশনসহ শীর্ষস্থানীয় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের যৌথ লেখা।