হিটলার কি তাঁর ভাগনিকে খুন করেছিলেন, ৯৫ বছর পর উঠল প্রশ্ন
· Prothom Alo

ঘটনাটি ১৯৩১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বরের। জার্মানির মিউনিখ শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে এক মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি অ্যাঞ্জেলা ‘গেলি’ রাউবালের। বয়স ২৩ বছর। বুকে গুলি লেগে মারা যায় মেয়েটি। তদন্তে বলা হয়, অ্যাঞ্জেলা ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।
এই পর্যন্ত পড়ে ঘটনাটি খুবই সাধারণ মনে হতে পারে। তবে ভুক্তভোগীর নাম-পরিচয় শুনলে দ্বিতীয়বার ভাবতে হবে। অ্যাঞ্জেলা ছিলেন জার্মানির নাৎসি নেতা অ্যাডলফ হিটলারের সৎভাগনি। হিটলারের সৎবোন অ্যাঞ্জেলা ফ্রান্সিসকা জোয়ান্নার (তিনি অ্যাঞ্জেলা হিটলার বা অ্যাঞ্জেলা হামিটশে নামে পরিচিত ছিলেন) বড় মেয়ে।
Visit sportbet.rodeo for more information.
অ্যাডলফ হিটলার ও অ্যাঞ্জেলা হিটলারের বাবা একজন, মা ভিন্ন। আর সৎভাগনি অ্যাঞ্জেলা রাউবাল মামা অ্যাডলফ হিটলারের খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ভাগনিকে নিয়ন্ত্রণ করতেন হিটলার। এমনকি যে অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বুকে গুলিবিদ্ধ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেটা ছিল হিটলারের। যে পিস্তল থেকে গুলি করা হয়েছিল, সেটাও হিটলারের।
হিটলার তখন সবে জার্মানিতে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে তখনো যেতে পারেননি। রাজনীতি করছেন, ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মিউনিখ পুলিশের ভাষ্য ছিল, অ্যাঞ্জেলার মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হিটলার মিউনিখ ছেড়ে নুরেমবার্গের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
প্রায় এক শতাব্দী পরে এসে অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর ঘটনাটি নতুন মোড় নিয়েছে। সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া কিছু পুরোনো নথি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্নটি উঠেছে, অ্যাঞ্জেলা কি সত্যি আত্মহত্যা করেছিলেন? নাকি হিটলার তাঁকে খুন করেছিলেন?
সেদিন কী ঘটেছিল
প্রায় ৯৫ বছর ধরে মানুষ জানে, ১৯৩১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মিউনিখে হিটলারের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে অ্যাঞ্জেলার গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। মিউনিখ পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনেও তারিখটি ১৯ সেপ্টেম্বর লেখা রয়েছে।
পুলিশের নথিতে বলা হয়েছে, সকালে অ্যাঞ্জেলার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। ডাকাডাকির পরও দরজা খোলেননি। এরপর হিটলারের ব্যক্তিগত কর্মচারী জর্জ উইন্টার দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকেন। তখন তিনি মেঝেতে অ্যাঞ্জেলার মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন।
হিটলার তখন সবে জার্মানিতে পরিচিতি পেতে শুরু করেছেন। তবে ক্ষমতার কেন্দ্রে তখনো যেতে পারেননি। রাজনীতি করছেন, রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মিউনিখ পুলিশের ভাষ্য ছিল, অ্যাঞ্জেলার মরদেহ উদ্ধারের আগের দিন (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে হিটলার মিউনিখ ছেড়ে নুরেমবার্গের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন, ভাগনির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন হিটলার। অ্যাঞ্জেলার প্রতি হিটলারের আচরণ ক্রমেই ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক ও অধিকারবোধপূর্ণ’ হয়ে উঠেছিল বলেও মনে করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, মামা ও ভাগনির এই সম্পর্কে ‘যৌনতা’ চলে এসেছিল। যদিও এটা নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে।
এ সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সময়ের হিসাব সামনে এনে এত দিন ধরে বলে আসা হয়েছে, অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর সঙ্গে হিটলার জড়িত নন। সহজ করে বললে, হিটলার মিউনিখ ছেড়েছিলেন ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে। আর অ্যাঞ্জেলার মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তখন হিটলার মিউনিখেই ছিলেন না।
ঘটনায় নতুন মোড়
জার্মান ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড স্যান্ডনার এ ঘটনায় নতুন তথ্য হাজির করেছেন। মিউনিখের সরকারি মৃত্যু নিবন্ধনের দলিল ঘেঁটে তিনি বলছেন, অ্যাঞ্জেলার মৃত্যু ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে নয়; বরং একদিন আগে, ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে হয়েছে।
মিউনিখের সরকারি মৃত্যু নিবন্ধনের নথিতে সময়টি স্পষ্ট উল্লেখ আছে: ১৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১, সকাল ১০টা ১৫ মিনিট। এমনকি আর্কাইভে পাওয়া দুটি মৃত্যুসংবাদ সাক্ষ্য দিচ্ছে, তারিখটি ১৯৩১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর।
এসব নথি যদি সত্য হয়, তাহলে এত দিন মানুষ যেটা জেনে এসেছে, তারও প্রায় ২৪ ঘণ্টা আগে অ্যাঞ্জেলার মৃত্যু হয়েছে। এর অর্থ হলো, যখন অ্যাঞ্জেলা মারা যান, তখন হিটলার মিউনিখে ছিলেন। ওই অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন।
কেননা সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলের আগে হিটলার নুরেমবার্গের উদ্দেশে মিউনিখ ছাড়েননি।
বাস্তুহীন হিটলার যেভাবে জার্মানির সর্বোচ্চ নেতা হলেনপুলিশের ভূমিকায় প্রশ্ন
হ্যারল্ড স্যান্ডনারের ধারণা, এ ঘটনায় পরস্পরবিরোধী নথি ও তথ্য এটাই ইঙ্গিত দেয়, পুলিশ হয়তো ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তাঁর মতে, তদন্তে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা হয়তো নাৎসি পার্টির প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তাই হিটলারকে এ ঘটনার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
ইতিহাসবিদ স্যান্ডনারের এ অনুসন্ধান প্রথম প্রকাশ করে জার্মানির সংবাদ সাময়িকী ডের স্পিগেল। বিষয়টি নিয়ে আগামী মাসে স্যান্ডনারের একটি বই প্রকাশিত হবে। বইটির নাম, ‘দ্য ডেথ অব অ্যাঞ্জেলা “গেলি” রাউবাল: সুইসাইড অর ফাউল প্লে?’
স্যান্ডনারের এই অনুসন্ধান সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব এবারডিনের ইতিহাসের শিক্ষক টমাস ওয়েবার। নাৎসি জার্মানির ইতিহাসের এ বিশ্লেষক বলেন, ‘আমি বহু বছর স্যান্ডনারকে চিনি। তিনি খুঁজে পাওয়া এসব নথি আমাকে দেখিয়ে নিয়েছেন। এগুলো বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়।’
সম্প্রতি পাওয়া নথিগুলো অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি ঠিকই। তবে মেয়েটির মৃত্যু প্রকৃত সময় এবং হিটলারের সম্পৃক্ত থাকা না–থাকা নিয়ে প্রায় ১০০ বছর যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, সেটা আবার সবার সামনে নিয়ে এসেছে।
টমাস ওয়েবার সিএনএনকে আরও বলেন, স্যান্ডনার একজন অত্যন্ত ‘সতর্ক ও খুঁতখুঁতে’ ইতিহাসবিদ। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে সংশয় ছিল। পরে মনে হয়েছে অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর প্রচলিত সময়ের হিসাবকে নতুন নথিগুলো গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নতুন তথ্য কতটা বিশ্বাসযোগ্য
‘মনে হচ্ছে, আমরা প্রায় ১০০ বছর ধরে যে ধারণা করে আসছি, অ্যাঞ্জেলা তার একদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন। আর হিটলার তখনো মিউনিখে ছিলেন,’ বলেন টমাস ওয়েবার। তিনি আরও বলেন, নতুন পাওয়া তিনটি নথিতে মৃত্যুর তারিখ ১৮ সেপ্টেম্বর উল্লেখ থাকাটা শুধু কোনো কেরানির ভুল বলে মনে হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর সময় হিটলার মিউনিখে ছিলেন, শুধু এ তথ্য থেকে নাৎসি নেতা যে নিজের সৎভাগনিকে হত্যা করেছিলেন, এমন সিদ্ধান্তে যেতে নারাজ ওয়েবার।
এই ইতিহাসবিদ বলেন, সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, নাৎসিদের পক্ষ থেকে তা গোপন করার অন্য কারণ থাকতে পারে। ওই সময় নাৎসি পার্টি মূলধারার ডানপন্থীদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছিল। আর নির্বাচনী রাজনীতিতে হিটলার নিজেকে ‘বিশ্বাসযোগ্যতা আর নৈতিকতার প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন।
ওয়েবারের ভাষ্য অনুযায়ী, যেকোনো ধরনের ‘কেলেঙ্কারি’ সেই সমর্থন ও ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারত।
হিটলার কেন গোঁফের আদল বদলে ফেলেনপ্রণয় থেকে ঈর্ষা
হিটলারের অ্যাপার্টমেন্টে পরিচারিকার কাজ করতেন তারই সৎবোন অ্যাঞ্জেলা হামিটশে। মায়ের সঙ্গে ওই বাড়িতে যাতায়াত ছিল অ্যাঞ্জেলার। সৎমামার বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল মেয়েটি। ১৯২৯ সালে তিনি হিটলারের মিউনিখের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠেন। তখন থেকে সেখানেই থাকতেন।
ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন, ভাগনির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন হিটলার। অ্যাঞ্জেলার প্রতি হিটলারের আচরণ ক্রমেই ‘অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণমূলক ও অধিকারবোধপূর্ণ’ হয়ে উঠেছিল বলেও মনে করা হয়। আবার অনেকে মনে করেন, মামা ও ভাগনির এই সম্পর্কে ‘যৌনতা’ চলে এসেছিল। যদিও এটা নিয়ে বিস্তর মতভেদ আছে।
তবে এটা প্রায় অনেকটাই নিশ্চিত, অ্যাঞ্জেলার জীবনের ওপর হিটলারের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ছিল।
রাতে নাটক, ভোরে আক্রমণ—বিশ্বকে বোকা বানাতে হিটলারের ছকে বিশ্বযুদ্ধের সূচনাএ বিষয়ে ইতিহাসবিদ ওয়েবার বলেন, ‘ধারণা করা হয়, অ্যাঞ্জেলার প্রতি হিটলারের একধরনের অস্বাস্থ্যকর আসক্তি ছিল। হিটলার মেয়েটিকে ভালোবাসতেন। রক্তের সম্পর্ক থাকায় এটা ছিল অনৈতিক।’
‘ধারণা করা হয়, অ্যাঞ্জেলা ছেড়ে যেতে চাওয়ায় ঈর্ষা থেকে হিটলার তাঁকে হত্যা করেছিলেন। কিংবা হিটলার এটা বুঝতে পেরেছিলেন, অ্যাঞ্জেলা অন্য কাউকে ভালোবাসেন,’ বলেন ওয়েবার।
সস্ত্রীক আত্মহত্যার আগে যে দুটি কাজ করেছিলেন হিটলারআলোচিত এ ঘটনা নিয়ে এমন আরও অনেক ধারণা প্রচলিত রয়েছে। একটি হলো, অ্যাঞ্জেলা মিউনিখ ছাড়তে চেয়েছিলেন। সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করতে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলে যেতে চেয়েছিলেন। এটা নিয়ে মৃত্যুর কয়েক দিন আগেও হিটলারের সঙ্গে মেয়েটির কথা–কাটাকাটি হয়।
সম্প্রতি পাওয়া নথিগুলো অ্যাঞ্জেলার মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি ঠিকই। তবে মেয়েটির মৃত্যু প্রকৃত সময় এবং হিটলারের সম্পৃক্ত থাকা না–থাকা নিয়ে প্রায় ১০০ বছর যে প্রশ্নের উত্তর মেলেনি, সেটা আবার সবার সামনে নিয়ে এসেছে।
হিটলারের স্মৃতি ঘেরা বাড়ি নিয়ে বিড়ম্বনা