টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন খাতে বিনিয়োগ: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
· Prothom Alo
আলোচনা
মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড
Visit newsbetting.bond for more information.
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যটন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি খাত। বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে চায়। সে ক্ষেত্রে পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। বিশ্বজুড়ে জিডিপিতে পর্যটনের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশ এখনো সেই মান থেকে অনেক পিছিয়ে। অথচ আমাদের প্রকৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, পাহাড়, সমুদ্রসৈকত, নদী, সুন্দরবনসহ নানা ধরনের পর্যটন সম্পদ রয়েছে। পুরো বাংলাদেশকেই বৈচিত্র্যময় পর্যটন–গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ আছে।
এ জন্য আমাদের পর্যটন মহাপরিকল্পনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। পর্যটনশিল্পকে সত্যিকার অর্থে শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থায়নের সংকট বড় বাধা। স্থানীয় বিনিয়োগ আরও টেকসই করতে ব্যাংকিং ও অন্যান্য খাত থেকে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পর্যটন খাতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ত্বরিত অবচয় সুবিধা রয়েছে। এসব সুবিধা সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের জানা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে আরও প্রণোদনার দাবি তোলা দরকার।
পর্যটনের উন্নয়নে পরিবেশ সুরক্ষা, নিরাপত্তা, সংযোগ ও ভূপ্রকৃতি রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগেই এ খাত এগিয়ে নিতে হবে।
মো. আব্দুর রউফ
অতিরিক্ত সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়
নীতিগত হস্তক্ষেপের দিক থেকে পর্যটনকে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পর্যটন শুধু শিল্প নয়, এটি সেবা খাতেরও অংশ। এটি শুধু বিনোদন নয়, একটি শিল্প, একটি অর্থনীতি, কূটনীতি ও সফট পাওয়ার। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে এ খাতে সর্বোচ্চ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের পর্যটনের আকর্ষণ প্রচুর। এখন এসব আকর্ষণকে পর্যটন গন্তব্যে রূপান্তর করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কানেকটিভিটি, সড়ক পরিবহন, নিরাপত্তা, আবাসন ও খাবারের মতো সমস্যা রয়েছে। একই সঙ্গে গন্তব্য ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতি আছে। কোথাও অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমাদের দায়িত্বশীল পর্যটন নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটক, উদ্যোক্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী—সবারই দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। বিশেষ করে আমাদের অধিকাংশ আকর্ষণ যেহেতু প্রকৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক, তাই এগুলো টেকসইভাবে সংরক্ষণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে। উদ্যোক্তাদেরও শুধু মুনাফার কথা না ভেবে প্রকৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় নিজেদের দায়িত্বের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
এ জন্য নীতি প্রণয়ন, কৌশল, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। পর্যটনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্ব দেওয়ার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে এবং নির্বাচনী ইশতেহারে যে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার এসেছে, তাতে আমরা আশাবাদী। খুব দ্রুত বড় ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে পর্যটনের সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অবদান আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।
ম্যাক্স টুনন
কান্ট্রি ডিরেক্টর, আইএলও বাংলাদেশ
বাংলাদেশের পর্যটন খাতে কর্মসংস্থানের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খাত বিপুল কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। পর্যটনের বিকাশ ঘটলে সেখানকার মানুষের জন্য নতুন নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই খাতের বিনিয়োগ ও উন্নয়নের সঙ্গে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গভীরভাবে যুক্ত।
এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং দেশের সংস্কৃতি, সংগীত ও ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি খাতটিকে গতিশীল করতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও সহায়ক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রবৃদ্ধি হতে হবে দায়িত্বশীল। পর্যটনের উন্নয়ন এমনভাবে করতে হবে, যাতে পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা করা যায়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ করতে দায়িত্বশীল পর্যটনের চর্চাকে শুরু থেকেই পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের অংশ করতে হবে।
বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও উন্নয়ন সহযোগী—সবারই এতে ভূমিকা রয়েছে। এই সহযোগিতা এগিয়ে নিতে বেসরকারি খাতকে নেতৃত্বদানকারী ভূমিকা নিতে হবে।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য বাংলাদেশে আসার প্রথম অভিজ্ঞতাটি ভালো হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দর্শনেই একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে হবে, যার জন্য ভিসা ব্যবস্থা ও বিমানবন্দরে প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করা প্রয়োজন।
খালিদ আহম্মেদ
সদস্য (বোর্ড প্রশাসন), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড
পর্যটনের সঙ্গে মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাচ্ছন্দ্য ও সহনশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে পর্যটন বলতে আমরা অনেক সময় শুধু হোটেলে থাকা, সমুদ্রসৈকতে যাওয়া কিংবা খাওয়াদাওয়াকেই বুঝি। কিন্তু এভাবে দেখলে পর্যটনের প্রকৃত সম্ভাবনা আমরা এখনো কাজে লাগাতে পারিনি। পর্যটন নিয়ে আমাদের আরও বিস্তৃতভাবে ভাবতে হবে।
এনবিআরের সঙ্গে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের বাজেটের আগে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। পর্যটন খাতের উদ্যোক্তা ও অপারেটরদেরও তাঁদের সমস্যাগুলো লিখিতভাবে আমাদের জানানো প্রয়োজন। আমি অনুরোধ করব, আপনারা দ্রুত এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করুন এবং একটি স্টেকহোল্ডার বৈঠকের আয়োজনের উদ্যোগ নিন। সেখানে পর্যটন খাতের নেতারা, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, এনবিআরের চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন সদস্য এবং কর, কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থাকবেন।
এ ধরনের বৈঠকের উদ্দেশ্য শুধু আলোচনা করা নয়; সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান বের করা। আপনারা আপনাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা কোথায় কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মত দিতে পারবেন। আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত ও রেজোল্যুশনও নেওয়া সম্ভব হবে। প্রয়োজনে এনবিআর চেয়ারম্যান বা অর্থমন্ত্রীর পর্যায়েও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে আপনাদের সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার সুযোগ থাকবে। আমরা বসে আপনাদের সমস্যাগুলো শুনব এবং কার্যকরভাবে সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করব।
মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার
অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর
টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বলতে আমরা এমন প্রবৃদ্ধিকে বুঝি, যা শুধু বর্তমান প্রজন্মের প্রয়োজন ও বিনোদন নিশ্চিত করবে না, পরবর্তী প্রজন্মকেও তা উপভোগের সুযোগ দেবে।
বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সেন্ট মার্টিন, পাহাড়ি এলাকা, টাঙ্গুয়ার হাওর, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনের মতো জায়গাগুলো মূলত প্রকৃতিনির্ভর। অথচ বর্তমানে আমরা অতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত পর্যটনের দিকে যাচ্ছি, যা টেকসই নয়।
সেন্ট মার্টিনে অতিরিক্ত পর্যটনের কারণে দ্বীপটির প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেয়াবেষ্টনী কেটে রিসোর্ট নির্মাণের কারণে সমুদ্রের ভাঙন বাড়ছে। টাঙ্গুয়ার হাওরেও হাউসবোটের সংখ্যা বাড়ছে। এটি রামসার সাইট ও প্রতিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা।
হাউসবোটের বর্জ্যে হাওরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবন ও কুয়াকাটাতেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। আগে পর্যটন হয়েছে, পরে তা নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই করার চিন্তা এসেছে। অথচ টেকসই পর্যটনের বিষয়টি শুরুতেই ভাবা প্রয়োজন ছিল।
এখন যে ক্ষতি হয়েছে, তা বন্ধ করে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সীমিত, তাই সেটুকু সংরক্ষণ করেই পর্যটন টিকিয়ে রাখতে হবে।
পর্যটন কিছুটা ব্যয়বহুল হতে হবে এবং পরিবেশের খরচ পর্যটককে দিতে হবে। প্রতিটি এলাকায় আচরণবিধি থাকতে হবে—কী করা যাবে, কী যাবে না।
জিয়াউল হক হাওলাদার
মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন
পর্যটন সেবা খাত। এখানে বিনিয়োগ না হলে আমরা পিছিয়ে যাব। পর্যটনে বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময় সেবা তৈরি করতে হয়। শুধু একটি হোটেল, মোটেল বা রিসোর্ট তৈরি করলেই হয় না; এর জন্য ধারাবাহিক ও সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যে খণ্ডিত বিনিয়োগ হয়েছে, তা যথেষ্ট ফল দেয়নি। আমাদের প্রয়োজন বড় প্রকল্প ও বড় বিনিয়োগ। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজারসহ সারা দেশে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের ৪০০ একরের বেশি খালি জমি রয়েছে। এসব জমিতে পিপিপি ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হোটেল শৈবাল, কক্সবাজারে পিপিপির আওতায় আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন সুবিধাদি নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য বর্তমানে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নিয়মকানুন ও দীর্ঘ প্রক্রিয়াও চ্যালেঞ্জ। তাই একক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে দ্রুত সেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুন্দরবনের আশপাশে কমিউনিটি–ভিত্তিক পর্যটন ও কক্সবাজারে প্রশিক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণের কাজও চলছে।
তবে বিনিয়োগ বাড়াতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো প্রণোদনা ও কর অবকাশের অভাব। পাঁচ বছরের জন্য কর প্রণোদনা বা কর অবকাশ দেওয়া গেলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং পর্যটন খাতের চেহারা বদলে যাবে।
জাবেদ আহমেদ
প্রকল্প সমন্বয়কারী, প্রগ্রেস প্রকল্প ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড
আমাদের দেশে আধুনিক আবাসন, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় দেশীয় পর্যটক বাড়ছে। বিদেশি পর্যটকও আসছেন। প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা ও পর্যটন সুবিধার আরও উন্নয়ন করা গেলে বিদেশি পর্যটক আনা সম্ভব। একই সঙ্গে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন এ দুটি ক্ষেত্রেই বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা ব্যাপক। সুন্দরবন, টাঙ্গুয়ার হাওর, পাহাড়, সমুদ্রসৈকত, নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো আমাদের অমূল্য সম্পদ। টেকসই পর্যটনের জন্য বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও পর্যটন আকর্ষণ সংরক্ষণ করতে হবে। পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল—এই তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে।
এ জন্য সড়ক, গণপরিবহন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সংযোগের উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর ও শুল্কসুবিধা এবং এক ছাদের নিচে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়িয়ে পর্যটনকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।
গুঞ্জন ডালাকোটি
হেড অব প্রোগ্রাম, আইএলও বাংলাদেশ
বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে পর্যটন খাত নিজস্ব গতিতেই বিকশিত হচ্ছে। এ দেশে আতিথেয়তা কেবল বিলাসিতা নয়, এটি প্রয়োজনীয় বিষয়। তবে টেকসই পর্যটনের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন সময় এসেছে পর্যটন পরিকল্পনাকে আরও বহুমুখী করার।
বাণিজ্যিক পর্যটন ও কমিউনিটিভিত্তিক ইকোট্যুরিজমের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এতে স্থানীয় জনগণ সরাসরি উপকৃত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হবে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই বিষয় বিবেচনা করা দরকার।
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, বৈচিত্র্যময় খাবার, সংগীত ও ঐতিহ্য পর্যটনের বড় শক্তি। পর্যটন ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকলে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক বিকাশও নিশ্চিত করা সম্ভব।
কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনে স্থানীয় পর্যায়ে রেগুলেশন, ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী যাতে অর্থবহভাবে এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে এবং তাদের জন্য সঠিক বাজারসংযোগ তৈরি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে। এ জন্য পর্যটনের সম্প্রসারণের পাশাপাশি উপযুক্ত নীতিমালা, তদারকি ব্যবস্থা ও রেগুলেশন প্রয়োজন। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য এসব ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
তাপস চন্দ্র বোস
উপপরিচালক, পিপিপি বিভাগ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ
পর্যটন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের মূল লক্ষ্য হলো—এ খাত লাভজনক হবে, স্থানীয় মানুষ সম্পৃক্ত হবে এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এগোবে। এ জন্য আমরা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলকে গুরুত্ব দিচ্ছি। এখানে সরকার ফ্যাসিলিটেটর হিসেবে প্রয়োজন অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা, ইউটিলিটি বা অন্যান্য সুবিধা দেবে, আর বেসরকারি অংশীদার প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থায়ন করবে।
পিপিপিতে আমরা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়, প্রক্ষেপণ নিয়ে কাজ করি। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে অনিশ্চয়তা থাকবেই। তাই দৃঢ় অংশীদারত্বের মাধ্যমে ঝুঁকি ভাগ করে নিতে হবে। তবে সব প্রকল্প পিপিপির জন্য উপযুক্ত নয়। প্রথমে বাস্তবসম্মত ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করতে হবে।
কোনো প্রকল্প আর্থিকভাবে কম লাভজনক হলেও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারে। একই সঙ্গে কোন ঝুঁকি বেসরকারি অংশীদার নিতে পারবে এবং কোনটি সরকার নেবে, সেটিও যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
এম কে হাসান মোরশেদ
সিনিয়র সহকারী সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়
পর্যটন খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন হলে খাসজমি, চরাঞ্চল বা সিলেটের চা-বাগান এলাকায় ভূমি দিতে ভূমি মন্ত্রণালয় প্রস্তুত আছে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান বিধিবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমাদের প্রধান শর্ত হলো, যে ভূমি দেওয়া হবে, তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং পরিবেশের ক্ষতি করা যাবে না।
পর্যটনের জন্য ভূমি দেওয়ার পর যদি পাহাড় কেটে বা অন্য কোনোভাবে পরিবেশ নষ্ট করা হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। যাঁরা পর্যটন নিয়ে কাজ করছেন বা ট্যুর অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। তাঁরা যদি পরিবেশের বিষয়টি ঠিকভাবে বজায় রাখতে পারেন, তাহলে ভূমি মন্ত্রণালয় এ খাতে জমি দিতে কোনো দ্বিধা করবে না।
বর্তমানে সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সরকার বলছে, প্রয়োজনীয় ভূমি দিতে আমরা প্রস্তুত; তবে এর ব্যবহার সঠিক হতে হবে। পর্যটনের ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য।
পেদ্রো জুনিয়র বেলেন
প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা, প্রগ্রেস প্রকল্প, আইএলও বাংলাদেশ
বাংলাদেশের পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত কাঠামোর আওতায় এবং এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন-পরবর্তী প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করা এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা একটি বড় অগ্রাধিকার। এই চ্যালেঞ্জ ও জাতীয় অগ্রাধিকারগুলো মোকাবিলায় পর্যটন খাত একটি অনন্য ভূমিকা পালন করতে পারে।
পর্যটন কেবল একটি খাতের রাজস্ব আয়ের উৎসই নয়; বরং এটি গ্রামীণ সম্প্রদায়, উপকূলীয় অঞ্চল ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর গভীরে পৌঁছে নতুন গন্তব্য তৈরি করছে এবং নারী, তরুণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে।
পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করার অর্থ হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বিনিয়োগ করা। মানসম্মত সেবা প্রদান এবং প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য শুধু পর্যটন অবকাঠামোতে বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, সহায়ক নীতি ও প্রবিধান এবং কারিগরি শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ করা আবশ্যক। একটি টেকসই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশই পর্যটন খাতের উন্নতির প্রধান অনুষঙ্গ।
আফসিয়া জান্নাত সালেহ
সহসভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)
বিদেশি পর্যটক ও মাইস পর্যটন আনতে ভিসাপ্রক্রিয়া সহজ করা জরুরি। একই সঙ্গে হোটেল, পরিবহন ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। বিমানবন্দর একজন বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশ সম্পর্কে প্রথম ধারণা তৈরি করে। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাস্টমার সার্ভিস, ইতিবাচক আচরণ ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।
সরকারি অফিসগুলোতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’-এর ব্র্যান্ডিং করা এবং স্থানীয় মানুষকে বিদেশি পর্যটকদের স্বাগত জানানোর বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। নিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সি ও ট্যুর অপারেটরদের ইনবাউন্ড প্যাকেজ তৈরি ও বিদেশি অতিথি আনার কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু অর্থ নয়, সচেতনতা ও সৃজনশীলতাও প্রয়োজন।
আমাদের দেশে কর ও ভ্যাট বেশি হওয়ায় পর্যটন প্যাকেজের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক থাকে না। কর ও ভ্যাট পর্যালোচনা করে কমানো প্রয়োজন। কোনো নীতিমালা তৈরির আগে বেসরকারি খাতের অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের মতামত বাস্তবায়ন করতে হবে।
অনুপ কুমার সরকার
প্রধান সমন্বয়ক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড অ্যাট্র্যাকশন
কোভিডের আগে অ্যামিউজমেন্ট পার্ক খাতকে পর্যটনশিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। অথচ এ খাতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে এবং দেশে প্রায় ৩০০টি অ্যামিউজমেন্ট পার্ক আছে। আমরা সরকারের কাছে অর্থ চাই না, কিছু সুবিধা চাই। আমরা এই খাত নিয়ে আশাবাদী। একটি অ্যামিউজমেন্ট পার্কের সঙ্গে হোটেলসহ নানা সুবিধা গড়ে ওঠে, ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তাই পর্যটনকে অগ্রাধিকার খাত করা জরুরি। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।
পর্যটন পুলিশকে আরও বড় পরিসরে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সম্পৃক্ত করা দরকার। এরপর প্রয়োজন উন্নত সড়ক ও পরিবহন যোগাযোগ। বছরের পর বছর অবকাঠামোর কাজ ঝুলে থাকলে ব্যবসা ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শিল্পের আওতাভুক্ত হলেও আমরা কোনো সুবিধা পাচ্ছি না। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও ট্যুরিজম বোর্ডের সভার সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে বিনিয়োগ বাড়বে এবং পর্যটনশিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
মাসুদ হোসেন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেঙ্গল ট্যুরস লিমিটেড
আমরা এত বছর ধরে পর্যটনকে শিল্প বলছি, কিন্তু শিল্প হিসেবে যে সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা, তা কি পাচ্ছি? শিল্প মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। অথচ ইনবাউন্ড ট্যুরিজমই বাংলাদেশের একমাত্র সত্যিকারের শিল্প। আমি নিজে বাংলাদেশে হাজার হাজার, লাখ লাখ ডলার এনেছি। কিন্তু শিল্পের সুবিধা তো দূরের কথা, সঠিকভাবে নিবন্ধিত ট্যুর অপারেটরের সুবিধাটুকুও আমরা পাচ্ছি না।
হোলি আর্টিজানের ঘটনার পর বিদেশি পর্যটকদের আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ কেউ এসে জানতে চায়নি, কেন পর্যটক আসছে না।
আমাদের পর্যটন পণ্য নেপাল বা শ্রীলঙ্কার চেয়ে পিছিয়ে নেই। সমস্যা হচ্ছে, আমরা বাংলাদেশকে কীভাবে প্রচার করছি। সরকারি সংস্থা ও শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ স্লোগানের বাস্তব উপস্থিতিও আমরা দেখি না। নীতিগত সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এ খাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। ইনবাউন্ড ট্যুরিজমই বিশ্ব পর্যটনের মূল ভিত্তি; তাই এ খাতে আমাদের জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান
অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পর্যটন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কিছু আর্থিক সুবিধা বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমত, বিনিয়োগকারীদের জন্য ট্যাক্স হলিডে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো যদি পর্যটন খাতকে বিশেষ খাত হিসেবে বিবেচনা করে কম সুদের হারে অর্থায়নের সুযোগ দেয়, তাহলে এ খাতের বিনিয়োগ আরও সহজ হবে। আমরা যেমন কৃষি খাতকে বিশেষ খাত হিসেবে বিবেচনা করে কম সুদের হারে অর্থায়ন করি, পর্যটনকেও সে ধরনের সুযোগের আওতায় আনা যেতে পারে।
পর্যটন খাতে ভ্যাট কমানো যেতে পারে। কারণ, এই খাতের ব্যবসা অনেকটা মৌসুমি। একেক মৌসুমে ব্যবসা বেশি থাকে, আবার অন্য সময়ে কম থাকে।
আরেকটি বিষয় বিবেচনায় আনা যেতে পারে, সেটি হলো পুঁজিবাজার থেকে অর্থায়ন। শেয়ার বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে যদি বিনিয়োগকারীরা অর্থ সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে পর্যটন খাতের অর্থায়ন অনেকটা সহজ হবে।
আরিফুর রহমান
পরিচালক, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশন
বিদেশি হোটেল চেইনগুলো বাংলাদেশে কেন আসছে না, তা ভাবতে গেলে আমি মূলত কয়েকটি সমস্যার কথা দেখি। আমি হবিগঞ্জে হোটেল ব্যবসা করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের স্থানীয় অতিথিই বেশি।
বিদেশি চেইন আসতে হলে তাদের অনেক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বয়ের অভাব। এখানে ২৭টি কর্তৃপক্ষ কাজ করে। এতগুলো কর্তৃপক্ষ যখন একটি খাতে কাজ করে, তখন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ কমে যায়।
এগুলো বিদেশি হোটেল চেইনের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। বাংলাদেশে যারা চেইন হোটেল নিয়ে কাজ করছে, তারাও এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়। ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন আসবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শুধু বিদেশি চেইন আনার কথা বললেই হবে না; তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এ জায়গাতেই আমাদের বড় ঘাটতি রয়েছে।
মোহাম্মদ হানিফ
সভাপতি, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
পর্যটন বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তিশালী চালিকা শক্তি হতে পারে, যদি আমরা সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি। আমাদের অনেক তরুণ কর্মসংস্থানের সুযোগ খুঁজছে। একজন তরুণ পর্যটন খাতে দক্ষ হয়ে চাকরি পেলে বা উদ্যোক্তা হলে একটি পরিবার ঘুরে দাঁড়ায়। এমন হাজারো পরিবার ঘুরে দাঁড়ালে বদলে যায় দেশ।
পর্যটনে বিনিয়োগ মানে শুধু হোটেল বা রিসোর্ট নির্মাণ নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, কর্মসংস্থান ও বাংলাদেশের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। আমাদের সামনে অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, সেবার মান, প্রচার, সমন্বয় ও বিনিয়োগের পরিবেশের চ্যালেঞ্জ আছে। তবে চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করাই নেতৃত্বের কাজ।
আমি এমন পর্যটনশিল্প চাই, যেখানে তরুণেরা শুধু চাকরির অপেক্ষায় থাকবে না, নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং প্রান্তিক অঞ্চলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও পর্যটনের সুফল পাবেন। টোয়াব সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
তৌফিকুজ্জামান চৌধুরী
হেড অব এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল গভর্ন্যান্স, বাংলালিংক ডিজিটাল
আমাদের পর্যটন খাত এখনো জিডিপির ৪ শতাংশের নিচে, যেখানে বৈশ্বিক মানদণ্ড ১০ শতাংশ। অথচ আমাদের পাহাড়, সমুদ্রসহ অনেক কিছুই আছে। তাই এই খাতের উন্নতির সুযোগ অনেক। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ জন্য সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ প্রচারণার ইতিবাচক প্রভাব আমি নিজে দেখেছি। মালয়েশিয়ায় কাজ করার সময় বিভিন্ন বৈঠকে বাংলাদেশের ভিডিও দেখিয়েছি। এসব দেখে অনেকে বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী হয়েছেন এবং তাঁদের সুন্দরবনে নিয়ে যেতে হয়েছে।
তাই আরও ভালো কনটেন্ট তৈরি করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার করা দরকার। এখন একজন পর্যটক ভ্রমণের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে জায়গা ও ভ্রমণ পরিকল্পনা ঠিক করেন। আমাদের পর্যটনকেন্দ্রগুলো অনলাইনে সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে।
সাবিরা মেহরিন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, ওয়ান্ডার ওম্যান
একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আমার সবচেয়ে বড় বাধা অর্থায়ন। পর্যটন খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন। অথচ অর্থায়ন ছাড়া এগোনো সম্ভব নয়। বিদেশি বিনিয়োগের আগে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
নারীদের ক্ষমতায়নেও পর্যটনের বড় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তার দিক থেকে আমি নিজেও বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় একা স্বচ্ছন্দে ঘুরতে পারি না।
ট্যুরিস্ট পুলিশের কার্যকারিতা নিয়েও পুরোপুরি আশ্বস্ত নই। বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে ভিসা ফি, দক্ষ ট্যুর গাইড, সহজ টিকেটিং ও পর্যটনসেবার উন্নতি প্রয়োজন। পানাম সিটির মতো ঐতিহাসিক স্থানে সহজে গাইড পাওয়া বা অনলাইনে টিকিট কাটার ব্যবস্থা থাকা উচিত।
আমরা ৬৪ জেলায় নারীদের ভ্রমণের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছি, কিন্তু নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর আবাসনব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ইমরানুল আলম
সভাপতি, ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইটাব)
বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার আগে বাংলাদেশে ইতিমধ্যে যেসব বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলোর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত, সেটি ভাবা জরুরি। আমি নিজেও একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে এর ভুক্তভোগী।
টাঙ্গুয়ার হাওর, সেন্ট মার্টিন, সাজেক, শ্রীমঙ্গল ও বান্দরবানের দূরবর্তী এলাকায় তরুণ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করেছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। এসব বিনিয়োগের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানও জড়িত। কিন্তু এসব বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
সেন্ট মার্টিন নিয়ে প্রতিবছর যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা আমরা দেখছি। এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে পর্যটনকে যথেষ্ট অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। অথচ বাংলাদেশে সমুদ্র, পাহাড়, নদীসহ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অসাধারণ মেলবন্ধন রয়েছে। এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটন খাত কেন এগোচ্ছে না এবং জিডিপিতে এর অবদান কেন মাত্র ৪ শতাংশ, সেটি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার।
সুপারিশ
• পর্যটনকে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
• এ খাতে বিদ্যমান বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
• পর্যটন বিনিয়োগে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা, বিশেষ প্রণোদনা ও সুবিধা এবং কর ও ভ্যাট যৌক্তিক পর্যায়ে কমানো।
• সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আরও কার্যকর করা জরুরি।
• দক্ষ জনবল তৈরিতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন।
• পর্যটনকেন্দ্রে নিরাপত্তা ও পর্যটন পুলিশের কার্যক্রম বাড়াতে হবে।
• বিদেশি পর্যটকদের জন্য ভিসা ও অন্যান্য সেবা সহজ করতে হবে।
• পর্যটকবান্ধব মনোভাব ও আচরণগত পরিবর্তন আনতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করা
অংশগ্রহণকারী:
মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড।
মো. আব্দুর রউফ, অতিরিক্ত সচিব, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
ম্যাক্স টুনন, কান্ট্রি ডিরেক্টর, আইএলও বাংলাদেশ।
খালিদ আহম্মেদ, সদস্য (বোর্ড প্রশাসন), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার, অতিরিক্ত মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর।
জিয়াউল হক হাওলাদার, মহাব্যবস্থাপক, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন।
জাবেদ আহমেদ, প্রকল্প সমন্বয়কারী, প্রগ্রেস প্রকল্প ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড।
গুঞ্জন ডালাকোটি, হেড অব প্রোগ্রাম, আইএলও বাংলাদেশ।
তাপস চন্দ্র বোস, উপপরিচালক, পিপিপি বিভাগ, ইনভেস্ট বাংলাদেশ।
এম কে হাসান মোরশেদ, সিনিয়র সহকারী সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়।
পেদ্রো জুনিয়র বেলেন, প্রধান কারিগরি উপদেষ্টা, প্রগ্রেস প্রকল্প, আইএলও বাংলাদেশ।
আফসিয়া জান্নাত সালেহ, সহসভাপতি, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)।
অনুপ কুমার সরকার, প্রধান সমন্বয়ক, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যামিউজমেন্ট পার্ক অ্যান্ড অ্যাট্র্যাকশন।
মাসুদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বেঙ্গল ট্যুরস লিমিটেড।
মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন খান, অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আরিফুর রহমান, পরিচালক, বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল হোটেল অ্যাসোসিয়েশন। মোহাম্মদ হানিফ, সভাপতি, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।
তৌফিকুজ্জামান চৌধুরী, হেড অব এনভায়রনমেন্টাল সোশ্যাল গভর্ন্যান্স, বাংলালিংক ডিজিটাল।
সাবিরা মেহরিন, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, ওয়ান্ডার ওম্যান। ইমরানুল আলম, সভাপতি, ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইটাব)।
সঞ্চালনা: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।