এন্ডোমেট্রিওসিস চিকিৎসায় সচেতন হতে হবে
· Prothom Alo
আজ বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস। সাধারণত অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ ও প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়ানোই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। জনসচেতনতা বৃদ্ধির এই বিশেষ দিনে আমাদের নতুন কিছু আধুনিক বিষয় জানাও খুব জরুরি। গর্ভনিরোধের বাইরেও আধুনিক হরমোনভিত্তিক গর্ভনিরোধক প্রযুক্তি নারীদের বহুদিনের জটিল ও যন্ত্রণাদায়ক রোগ চিকিৎসায় নতুন সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। এর অন্যতম উদাহরণ হলো এন্ডোমেট্রিওসিস।
প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে এন্ডোমেট্রিওসিস একটি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ও কষ্টদায়ক ব্যাধি। জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে—যেমন ডিম্বাশয় বা তলপেটে বেড়ে উঠলে এই রোগ হয়। এর ফলে মাসিকের সময় তীব্র যন্ত্রণা, দীর্ঘদিনের তলপেটের ব্যথা, সহবাসে কষ্ট এবং এমনকি বন্ধ্যত্বের মতো সমস্যা হতে পারে। নারীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করা এই ব্যথাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত কার্যকর চিকিৎসার আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
Visit biznow.biz for more information.
হরমোনভিত্তিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির ব্যবহার এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিষয়টি আরও বিষদভাবে বলা যায়, জন্মনিরোধক পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা হলেও কিছু হরমোনভিত্তিক পদ্ধতি মাসিকের পরিমাণ ও হরমোনের প্রভাব কমিয়ে এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকাতেও হরমোনভিত্তিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির ব্যবহারকে এন্ডোমেট্রিওসিসের ব্যথা কমানোর ক্ষেত্রে একটি সফল চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসায় আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এখন হরমোনভিত্তিক প্রজেস্টিন ইনজেকশনকে অন্যতম সফল সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছে। এর মধ্যে একটি যুগান্তকারী সংযোজন হলো সেলফ-ইনজেকটেবল বা স্ব-প্রয়োগযোগ্য জন্মনিরোধক ইনজেকশন। সারা বিশ্বে এন্ডোমেট্রিওসিসের চিকিৎসায় এটি অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ পদ্ধতি। যাঁরা প্রতিদিন নিয়ম করে বড়ি খেতে ভুলে যান বা নিয়মিত ওষুধ খাওয়া যাঁদের জন্য কষ্টকর, তাঁদের জন্য এটি একটি সুবিধাজনক বিকল্প। নির্দিষ্ট সময় পরপর, অর্থাৎ প্রায় ১৪ সপ্তাহ পরপর, এই ইনজেকশন নেওয়া তুলনামূলক অনেক সহজ। প্রোজেস্টিন-ভিত্তিক এই ইনজেকশন ডিম্বাশয়ের হরমোনের প্রভাব কমায়।
চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত রোগী নিজেই নির্দিষ্ট নিয়মে এই ইনজেকশন নিতে পারেন। বর্তমানে দুই ধরনের ইনজেকশন রয়েছে। একটি হলো ভায়ালে প্রদত্ত মাংসপেশিতে দেওয়ার ডিএমপিএ (১৫০ মি.গ্রা./মি.লি.) এবং অন্যটি ইউনিজেক্ট ডিভাইসে প্রদত্ত ত্বকের নিচে দেওয়ার ডিএমপিএ (১০৪ মি.গ্রা./০.৬৫ মি.লি.)। ডেপো মেড্রক্সিপ্রোজেস্টেরন অ্যাসিটেট বা ডিএমপিএ ইন্ট্রামাসকুলার ইনজেকশন বহু দশক ধরে ব্যবহৃত একটি কার্যকর পদ্ধতি। তবে ইউনিজেক্ট ডিভাইসে ত্বকের নিচে ব্যবহারযোগ্য ডিএমপিএ ইনজেকশনের কিছু বিশেষ সুবিধা রয়েছে, যা সেলফ-ইনজেকটেবল হিসেবে পরিচিত। ত্বকের নিচে প্রয়োগ করায় এটি ধীরে ধীরে শোষিত হয়। এটি মাংসপেশির ইনজেকশনের (১৩ সপ্তাহ) তুলনায় দীর্ঘতর কার্যকর সুরক্ষা (১৪ সপ্তাহ পর্যন্ত) প্রদান করে।
হরমোনভিত্তিক জন্মনিরোধক পদ্ধতি এন্ডোমেট্রিওসিসকে শরীর থেকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারলেও এর হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রোগীকে যন্ত্রণামুক্ত সুন্দর জীবন যাপন করতে সাহায্য করে। আমাদের সমাজে মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা বা তলপেটের দীর্ঘমেয়াদি ব্যথাকে প্রায়ই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। নারীরা নীরবে এই কষ্ট সহ্য করেন। তাই আর অবহেলা না করে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আজ আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত, এমন ব্যথাকে স্বাভাবিক ধরে চেপে না রেখে সঠিক সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। আধুনিক সাশ্রয়ী চিকিৎসার সুযোগ গ্রহণ করার মাধ্যমেই নারীদের প্রজননস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
লেখক: গাইনি ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা।