কুমিল্লায় পুরোনো কিশোর গ্যাং সক্রিয়, জড়াচ্ছে সচ্ছল পরিবারের সন্তানও
· Prothom Alo
চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ এপ্রিল রাতে কুমিল্লায় ফিরছিলেন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। পথে ওঠেন সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশায়। র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, চালক ও যাত্রীর ছদ্মবেশে সেখানে ছিলেন ছিনতাইকারীরা। তাঁকে আঘাত করে মুঠোফোন, টাকা ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর চলন্ত অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে কোটবাড়ির আইরিশ হিল হোটেলসংলগ্ন মহাসড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর মরদেহ।
Visit biznow.biz for more information.
এই হত্যায় অভিযুক্ত একজনকে প্রায় দুই মাস আগেও রেললাইন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। র্যাবের পরিবর্তে গঠিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) একটি সূত্র বলছে, ওই ব্যক্তি যে ছিনতাইকারী চক্রে ছিলেন, সেটি এলাকায় কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত। আগে গ্রেপ্তার, জামিনে মুক্তির পর আবার অপরাধের অভিযোগ-কুমিল্লায় এমন আরও ঘটনা পাওয়া গেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট দলবদ্ধ অপরাধের ৩২টি ঘটনা ও অভিযানের তথ্য পর্যালোচনা করেছে প্রথম আলো। এতে পুরোনো দলগুলোর নাম বারবার এসেছে সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া ও হামলায়। সম্প্রতি প্রকাশিত ভিডিওতে রতন গ্রুপের প্রধানকে দেখা গেছে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে মহড়া দিতে। অন্যদিকে সন্তান কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ায় অসহায় হয়ে পড়ছে কিছু পরিবার।
২০২৩ সালের ৭ মার্চ থেকে চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এসব ঘটনায় ও অভিযানে আটক ও গ্রেপ্তারের প্রকাশিত সংখ্যা যোগ করলে হয় ৮৮১। কয়েকজনের পূর্বাপর তৎপরতা বুঝতে এর আগের তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে একই এলাকা ও একই দলের নাম বারবার আসার পাশাপাশি পুরোনো অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ও সংশ্লিষ্ট দলবদ্ধ অপরাধের ৩২টি ঘটনা ও অভিযানের তথ্য পর্যালোচনা করেছে প্রথম আলো। এতে পুরোনো দলগুলোর নাম বারবার এসেছে সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া ও হামলায়।
আগে গ্রেপ্তার, পরে নতুন অভিযোগ
বিবিরবাজার স্থলবন্দরের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা বুলেট হত্যায় তাঁর মা নীলিমা বৈরাগী সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেন। র্যাব পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। এসআরবির ওই সূত্রের ভাষ্য, তাঁদের একজন আগের ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়ান।
২০২৫ সালের ৩ জুন টমছম ব্রিজ এলাকায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে রাকিবুল হাসান রিয়াদ, সোহাগ মোল্লা ও খায়রুল হাসানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদ ও সোহাগ সেদিন সন্ধ্যায় এবং খায়রুল প্রায় এক মাস আগে জামিনে বেরিয়েছিলেন।
কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতায় আলোচিত নয়ন হোসেন ওরফে নয়ন বন্ডের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কোতোয়ালি ও সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাতটি মামলা ছিল। তিনি তখন কারাগারে। ওই সময় বিসিক শিল্পনগরী থেকে অস্ত্র, ককটেল, মাদকসহ গ্রেপ্তার চারজন ছিলেন তাঁর অনুসারী।
২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে অশোকতলা রেলগেট এলাকায় সজীব হোসেন ওরফে বাবুকে বাসা থেকে ডেকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনায় নয়ন, চয়ন ও তাঁদের সহযোগীদের নাম আসে। পুলিশ ঘটনার নেপথ্যে কিশোর গ্যাং ও মাদক ব্যবসাসংক্রান্ত বিরোধের কথা জানায়।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, নয়ন এখন এলাকায় আছেন। একটি স্থানীয় সূত্রের দাবি, তিনি এখনো গ্যাংয়ের নেতৃত্ব দেন। ২০২৩ সালে গ্রেপ্তার পয়েন্ট রাব্বিও বর্তমানে এলাকায় আছেন বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
‘আমার স্বামীর সঙ্গে কী ঘটেছিল, একটিবার জানতে চাই’মহড়ার ভিডিওতে রতন, নেতৃত্বে ছাত্রদল নেতা
কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে দেয়াললিখন। কুমিল্লার টাউন হল মাঠসংলগ্ন এলাকায়২০২৫ সালের এপ্রিলে গ্রেপ্তার রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতন বর্তমানে জামিনে আছেন বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কয়েকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। সেখানে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে দিয়ে মহড়া দিতে দেখা যায় রতনসহ একটি দলকে। নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. মহসিন।
মহসিন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের একটি অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলার দায়িত্ব ছিল ছাত্রদলের। তিনি অনুসারীদের নিয়ে সেখানে যাচ্ছিলেন। মিছিলে অনেকেই ছিলেন। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা কীভাবে এসেছেন, জানেন না। তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
কুমিল্লা মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি মো. নাহিদুজ্জামান রানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা সব সময় কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী আন্দোলন করছেন। ভিডিওটি দেখেই ওই সহসভাপতির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে জানতেন না বলে জানিয়েছেন। এরপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেবেন।
কুমিল্লায় টিকটক ভিডিও ঘিরে বড় হচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’, অস্ত্র নিয়ে মহড়াপুরোনো দলের সদস্য, নতুন গ্যাংয়ের চেষ্টা
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে হত্যা করা হয়। গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ দুই কিশোর ‘আরজেড-৩৬’ নামক গ্যাংয়ের সদস্য ছিল বলে জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। সম্প্রতি কোটবাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তুহিন নিজস্ব গ্যাং তৈরির চেষ্টা করছিল বলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই দুই কিশোর মোটরসাইকেলে মহড়া দিয়ে আতঙ্ক তৈরিসহ বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত। পুলিশের ভাষ্য, আইফোন ছিনিয়ে নিতে অপ্রতিমকে নির্জন স্থানে নেওয়া হয়েছিল। তাকে টিকটকে ভিডিও তৈরির প্রলোভনও দেখানো হয়।
অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব’একই দল, বারবার সহিংসতা
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন৩২টি ঘটনা পর্যালোচনা করে ১২টি কিশোর গ্যাং দল ও উপদলের নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো রতন বা র স্কোয়াড, ঈগল, সিবিকে, সিবিকে ডেঞ্জার জোন, সিবিকে জুনিয়র, সিবিকে স্পেশাল, আরডিএক্স, আরজেড-৩৬, সিডিএক্স, কিং স্কোয়াড, রেড ৯৯৯ ও বিজিএম। সিবিকে ও তার তিনটি উল্লিখিত উপদলকে একটি নেটওয়ার্ক হিসেবে ধরলে ৯টি দলের নাম আসছে। এদের সঙ্গে বিভিন্ন ঘটনায় পয়েন্ট রাব্বি, তাজুল ইসলাম সুমন ও নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে চলা দলের তথ্যও পাওয়া গেছে।
রতন ও ঈগলের নাম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির সংঘর্ষ এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারির মহড়ায় আসে। ওই বছরের এপ্রিলেও বিভিন্ন দল অস্ত্র নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে। ২৫ এপ্রিল রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়ায় মহড়ার পর পুলিশ প্রথমে পাঁচজন, পরে নয়জনকে গ্রেপ্তার করে। তখন সেনাবাহিনী-র্যাবের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হন পৃথক নয়জন। মোট সংখ্যা ২৩।
একই বছরের অক্টোবরে ভিক্টোরিয়া কলেজে সংঘর্ষের পর পুলিশ ১৬ এবং তৎকালীন র্যাব আটজনকে গ্রেপ্তার করে। দুই ঘটনাকে ঘিরে গ্রেপ্তারের সংখ্যা ৪৭। উভয় ক্ষেত্রেই বড় অভিযানের আগে প্রকাশ্য সহিংসতা বা অস্ত্রের মহড়া হয়েছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে হাউজিংয়ের কেটিসিসি মাঠ থেকে কিং স্কোয়াডের ২১ জনকে আটকের সময় পুলিশ জানায়, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে মহড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। একই মাসে আরডিএক্স ও সিডিএক্সের ২৭ জনও মহড়ার প্রস্তুতির অভিযোগে আটক হন।
নামে ‘কিশোর’ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক নন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে যৌথ অভিযানে আটক নয়জনের প্রকাশিত বয়স ছিল ১৯ থেকে ৪৭ বছর। একজনকে র্যাব অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
দেয়ালে কিশোর গ্যাংয়ের নাম, কুমিল্লায় অভিযানেও থামছে না অপরাধপাঁচ হত্যা, হামলার শিকার অন্যরাও
কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মো. সিয়ামপর্যালোচনায় অপ্রতিম, বুলেট, হৃদয়, বাঁধন ও সজীব ওরফে বাবু—এই পাঁচটি হত্যার ঘটনা রয়েছে। চৌদ্দগ্রামের হৃদয় হত্যায় বিরোধের কারণ নিয়ে স্থানীয়দের বর্ণনা ও পুলিশের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। দাউদকান্দিতে ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল নিহত বরখাস্ত পুলিশ কনস্টেবল বাঁধনকে স্থানীয় লোকজন গ্যাংয়ের নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ওই মামলায় পরে তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়।
আবার বিরোধে জড়িত না থেকেও মানুষ হামলার শিকার হচ্ছেন। ধর্মসাগরপাড়ে স্ত্রীকে অশালীন মন্তব্যের প্রতিবাদ করায় পুলিশ সদস্য কাজী আবদুল্লাহ মো. জোবায়েরের ওপর হামলা করেন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। কাঁটাবিলে মাদকসংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয় স্কুলছাত্র ইথান আহমেদ। পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার এবং পিস্তল-গুলি উদ্ধারের কথা জানায়।
সন্তানকে নিয়ে অসহায় পরিবার
কিশোর গ্যাংয়ে সাধারণত বস্তিতে বসবাসকারী ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানেরাই জড়ায়—এমন একটি ধারণা প্রচলিত আছে। কুমিল্লায় এসব পরিবারের সন্তানদের জড়ানোর ঘটনা থাকলেও গ্যাংয়ের তৎপরতা তাদের মধ্যেই সীমিত নেই। সরকারি চাকরিজীবীসহ সামাজিকভাবে পরিচিত পরিবারের সন্তানদেরও এসব দলের সঙ্গে যোগাযোগ ও জড়িয়ে পড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
দেবীদ্বারের ভূমি প্রশাসনে কর্মরত এক সরকারি কর্মকর্তার সন্তান গ্যাংয়ে জড়িয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় তাকে নিরাময় কেন্দ্রে দিতে হয়েছে। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, সন্তানের আচরণে পরিবার সামাজিকভাবে হেয় হতে থাকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপে জড়িয়ে আমার সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে ধ্বংসের পথে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, গ্রামাঞ্চলেও এখন কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধী তৎপরতা ছড়িয়েছে।
দেবীদ্বারে গত ২০ মে ‘রেড ৯৯৯’ ও ‘বিজিএম’ নামক দুই গ্যাংয়ের বিরোধে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া ও হামলার অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ২০ জনকে আটক করে যাচাই-বাছাই শেষে ১২ জনকে ছাড়ে; আটজনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পরদিন আদালতে পাঠায়। অনুসন্ধানে ওই কর্মকর্তার সন্তানের এসব দলের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, সম্প্রতি মোটরসাইকেলে দলবদ্ধ চলাফেরা করা কয়েকজনকে আটকের পর অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের মধ্যে একজন আইনজীবীসহ স্থানীয়ভাবে পরিচিত পরিবারের কয়েকজন অভিভাবক ছিলেন। বেশির ভাগই সন্তানের অবস্থান বলতে পারেননি। একজন বাবা জানান, ছেলে কোথায় জানেন না; মা জানতে পারেন।
এসআরবি-১১-এর সিপিসি-২ কুমিল্লার উপপরিচালক ও কোম্পানি অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ধারাবাহিক অভিযানে অনেক গ্যাং সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। তবে কিশোর অপরাধ দমনে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে জরুরি। অভিভাবকেরা যত্নশীল হলে এবং সন্তান কোথায় আছে, কার সঙ্গে মিশছে, খেয়াল রাখলে সমাধান সহজ হয়।
আটক, মামলা ও নজরদারি
২৩ সেপ্টেম্বর জেলার ১৮ থানায় একযোগে পুলিশের অভিযানে আটক হন ৬২৪ জন। পরদিনের হিসাবে ৪৫১ জনকে মুচলেকায় অভিভাবকদের জিম্মায় ছাড়া হয়; ১৭৩ জনকে আদালতে পাঠানো হয়। অর্থাৎ প্রায় ৭২ শতাংশকে মুচলেকায় ছাড়া হয়েছে।
২০২৪ সালের মে মাসে নগরে আটক ৩৯ জনকেও অভিভাবকদের মুচলেকায় ছাড়া হয়েছিল। দেবীদ্বারে গত মে মাসে ছাড়া পান ১২ জন। তিন অভিযানে ছেড়ে দেওয়ার সংখ্যা মোট ৫০২। পুলিশ জানায়, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার স্থান চিহ্নিত করে অভিযান হয়। অতীত অপরাধের তথ্য যাচাই করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, অন্যদের অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়।
জামিনে মুক্ত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি থাকে বলে দাবি করেছেন বাহিনীগুলোর অন্তত পাঁচ কর্মকর্তা। তবে মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কতজন জামিন পেয়েছেন, এখন কী অবস্থায় আছেন বা নতুন অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে কি না—পূর্ণাঙ্গ তথ্য পুলিশের কাছে পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কিশোর গ্যাং–সংক্রান্ত নির্দিষ্ট আইন নেই। অভিযুক্ত কিশোর বা অন্য যে-ই হোক, অপরাধের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা হচ্ছে।
এজাহারে সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হচ্ছে দাবি করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, পুলিশের অবহেলা নেই। ‘জামিন দেওয়া একান্তই বিজ্ঞ আদালতের বিষয়।’
কুমিল্লা জেলার সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) কাইমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখা এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি। সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হলে গ্রেপ্তারের পর বিচার নিশ্চিত করা সহজ হয়। সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) কুমিল্লা শাখার সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় বলেন, সঠিক পরিচর্যার অভাবে সন্তানের গ্যাংয়ে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে। পরে এরাই বড় অপরাধে জড়ায়। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় বাইরে কার সঙ্গে মিশছে, সন্ধ্যার পরও কেন ফিরছে না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী করছে—অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। তাঁর মতে, এই ঘাটতিতে শিক্ষিত পরিবারের সন্তানও অপরাধে জড়াচ্ছে। উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।