ডিম্বাণু সংরক্ষণের সুযোগ আছে দেশেও, তবে যে কেউ কি চাইলেই তা করতে পারেন
· Prothom Alo

একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীর ডিম্বাশয়ে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমতে থাকে। তাই মা হওয়ার সম্ভাবনাও কমে। তবে ডিম্বাণু সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তি আছে বাংলাদেশেও। চাইলেই কি যে কেউ এ প্রযুক্তির সহায়তা নিতে পারেন? স্কয়ার হাসপাতাল লিমিটেডের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের কনসালট্যান্ট ও বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রশীদ–এর সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন রাফিয়া আলম
নানা কারণে সন্তানধারণের পরিকল্পনা করতে একটু সময় নেন কেউ কেউ। তবে বয়স বাড়লে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও কমতে পারে নানা কারণে। এ ছাড়া বেশি বয়সে গর্ভধারণ করলে মা ও গর্ভের সন্তানের কিছু শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বাড়ে।
Visit raccoongame.org for more information.
কতটা দেরি হলে তা ‘দেরি’
৩০ বছর বয়সে মা হওয়ার সম্ভাবনা কমতে থাকে।
মধ্য ত্রিশে পৌঁছানোর পর এ সম্ভাবনা কমতে থাকে আরও দ্রুত।
৪৫ বছর বয়স হতে হতে স্বাভাবিক উপায়ে মা হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না বললেই চলে।
এ ছাড়া বয়স বেড়ে গেলে ডিম্বাশয়ে বাকি থাকা ডিম্বাণুগুলোয় ‘ক্রোমোজোমাল অ্যাবনরমালিটি’র ঝুঁকি বাড়ে। সহজভাবে বললে এ ধরনের ডিম্বাণু থেকে সন্তানের জন্ম হলেও তার জিনগত কারণে জন্মগত ত্রুটি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ কি সমাধান?
এ কথা ঠিক যে ডিম্বাশয়ে পর্যাপ্ত ডিম্বাণু থাকতে থাকতে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা যায়। তবে শুনে যতটা চমকপ্রদ মনে হয়, বাস্তব চিত্র ততটা আশাবাদী হতে দেয় না।
বিশ্বজুড়ে এ নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, সেসবের ভিত্তিতে একে অত্যন্ত সফল কোনো পদ্ধতি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
তবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই আছে এ প্রযুক্তি। তা থেকে অনেকে উপকৃতও হয়েছেন।
কাদের জন্য এ প্রযুক্তি?
কোনো নারী ক্যানসারে আক্রান্ত হলে সেটির চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। মূলত তাঁদেরই ডিম্বাণু সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
তবে সুস্থ নারীও যদি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে চান, তিনি বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হবেন। ওই প্রক্রিয়ায় তাঁর ঝুঁকি আছে কি না, বিশেষজ্ঞই বলে দেবেন।
প্রক্রিয়াটি কেমন?
ডিম্বাণু সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর একসঙ্গে বেশ কিছু ডিম্বাণুকে পরিণত করে তোলার জন্য হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়।
৮-১২ দিন পর নির্দিষ্ট সময়ে তাঁকে ঘুমের ইনেজকশন বা চেতনানাশক দেওয়া হয়।
গভীর ঘুমে থাকা অবস্থায় ট্রান্সভ্যাজাইনাল সনোগ্রাফি প্রোবের (টিভিএস প্রোব, অর্থাৎ যোনিপথের মাধ্যমে প্রবেশ করানো যন্ত্রাংশ) সাহায্য নিয়ে নির্দিষ্ট নিডলের (সুই) মাধ্যমে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়।
এ ডিম্বাণু ফ্রিজারে তরল নাইট্রোজেনের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়। ১০ বছর বা তার বেশি সময়ও এ ডিম্বাণু রাখা যায়।
যখন ওই নারী গর্ভধারণ করতে প্রস্তুত, তখন ‘জমাট ডিম্বাণু’ ফ্রিজারের বাইরে বের করা হয়।
ডিম্বাণুকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনা হয়। পুরুষের দেহ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করে এ ডিম্বাণুর নিষেক বা ফার্টিলাইজেশন করানো হয়।
এ নিষিক্ত ডিম্বাণু বা ভ্রুণকে জরায়ুতে স্থাপন করা হয়।
সবার জন্য আদর্শ নয় কেন?
যাঁকে ক্যানসারের এমন চিকিৎসা নিতে হচ্ছে যে তাঁর নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা ছাড়া ভবিষ্যতে মা হওয়ার অন্য উপায় নেই, তাঁর সংরক্ষিত ডিম্বাণু একটি আশার আলো হয়ে থাকবে।
কিন্তু এমন জরুরি কারণ ছাড়া সাধারণত ডিম্বাণু সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয় না। কারণ, এর সাফল্য অনেকটাই অনিশ্চিত।
সংরক্ষিত ডিম্বাণুকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় আনার সময় সেটির নিষেকের উপযোগিতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই গর্ভধারণের নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
এ ছাড়া বয়স বাড়লে নারীর অন্যান্য শারীরিক সমস্যারও সৃষ্টি হতে পারে। তাই জরায়ুতে ভ্রূণ স্থাপনের পরও গর্ভপাতের ঝুঁকি থাকতে পারে।
এই সন্তান যে জন্মগত ত্রুটিমুক্ত থাকবে, তা–ও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
চল্লিশেও কি মা হওয়া সম্ভব, জানাচ্ছেন আইভিএফ বিশেষজ্ঞডিম্বাণু সংগ্রহের প্রক্রিয়ার ঝুঁকিও আছে
প্রক্রিয়াটির ৮-১২ দিন আগে যে ইনজেকশন দেওয়া হয়, সেটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ডিম্বাশয় ফুলে যেতে পারে। শরীরে পানি জমা হতে পারে। পেটে অস্বস্তি বা চাপ লাগতে পারে। পেটব্যথা, পেট ফাঁপা, বমি বমি ভাব, বমি ও পাতলা পায়খানাও হতে পারে। একে বলা হয় ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম।
সমস্যাটি জটিল হয়ে গেলে দ্রুত ওজন বাড়া, তীব্র পেটব্যথা, অনবরত বমি, প্রস্রাব কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট বা রক্ত জমাট বাঁধার মতো সমস্যা হতে পারে।
এ ছাড়া ওই ইনজেকশনের প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বড় ও ভারী হয়ে যাওয়া ডিম্বাশয় নিজের অক্ষের ওপর মুচড়ে যেতে পারে (ওভারিয়ান টরশন)। এটিও একটি জরুরি পরিস্থিতি।
প্রক্রিয়াটিতে যোনিপথ বা ডিম্বাশয়ের রক্তনালিতে আঘাত লাগতে পারে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে মূত্রথলি, অন্ত্র বা আশপাশের রক্তনালিতে আঘাত লাগে।
তলপেট বা ডিম্বাশয়ে জীবাণু সংক্রমণের খানিকটা ঝুঁকিও থাকে।
যেমন খরচ
প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল। ফ্রিজারে ডিম্বাণু সংরক্ষণের জন্য প্রতিবছর বাড়তি খরচও গুনতে হতে পারে। কোনো কারণে আপনি ডিম্বাণু সংরক্ষণের কথা ভেবে থাকলে যে প্রতিষ্ঠানে কাজটি করাবেন, সেখানকার পুরো খরচ জেনে নিন।
জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ কোথায় ও কেন হয়, কীভাবে বুঝবেন এবং ঝুঁকি কমানোর উপায়