টাঙ্গাইলে এই প্রথম সাজাপ্রাপ্ত হলেন খান পরিবারের কোনো সন্তান
· Prothom Alo

প্রায় চার দশক ধরে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে আলোচনায় ছিল টাঙ্গাইলের ‘খান পরিবার’। এসব ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মামলাও হয়। তবে এত দিন কারও সাজা হয়নি। গতকাল সোমবার ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুক হত্যা মামলায় ওই পরিবারের ছোট ছেলে সানিয়াত খানের (বাপ্পা) মৃত্যুদণ্ড হয়। ফলে প্রথমবারের মতো এই পরিবারের কোনো সন্তান সাজা পেলেন।
Visit freshyourfeel.org for more information.
টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. ফয়সাল আল মামুন গতকাল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল হত্যা মামলায় ওই রায় দেন। রায়ে সানিয়াতসহ তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও চারজনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। রফিকুল সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতিও ছিলেন।
খান পরিবারের উত্থান
দীর্ঘদিন টাঙ্গাইলে আওয়ামী রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান খান অপর অংশের নেতৃত্ব দিতেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম। ১৯৯০ সালে কাদের সিদ্দিকী ভারত থেকে দেশে ফেরার পর খান ও সিদ্দিকী পরিবারের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। চাচা শামসুর রহমানের পক্ষে তাঁর ভাতিজা আমিনুর রহমান খান (বাপ্পি), আমানুর রহমান খান (রানা) ও সহিদুর রহমান খান (মুক্তি) একটি বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁরা শহরের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ সময় তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়। তাঁদের কারাগারেও অনেকবার যেতে হয়।
২০০৩ সালের নভেম্বরে সন্ত্রাসী হামলায় আমিনুর নিহত হন। তিনি নিহত হওয়ার পর তাঁদের অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান (কাকন) ও সানিয়াত খান (বাপ্পা) যুক্ত হন ভাইদের বাহিনীতে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের সন্তানদের প্রভাব বেড়ে যায়। ২০১২ সালে খান পরিবারের ছেলে আমানুর টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১১ সালে সহিদুর টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। জাহিদুর বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব নেন। সানিয়াত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হন। পুরো জেলার ব্যবসা, রাজনীতি, ঠিকাদারি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
মামলা হলেও সাজা হয়নি
চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি-দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভিন্ন সময় মামলা হয়। আমানুরের বিরুদ্ধে অন্তত ৫টি হত্যা মামলাসহ অর্ধশতাধিক মামলা, সহিদুরের বিরুদ্ধেও ৫টি হত্যা মামলাসহ প্রায় ৪০টি মামলা, জাহিদুরের বিরুদ্ধে ৩টি হত্যা মামলা, সানিয়াতের বিরুদ্ধে ৪টি হত্যাসহ ডজনখানেক মামলা হয়। এত মামলা হলেও তাঁদের সাজা হয়নি। কখনো তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলা রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার হয়েছে, কখনো বাদীপক্ষকে চাপ দিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করেছেন। ফলে এর আগে এই পরিবারের কোনো সন্তানের সাজা হয়নি। গত বছর আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায়ও চার ভাই বেকুসুর খালাস পান।
এই প্রথম সাজা হলো
ইউপি চেয়ারম্যান রফিকুল ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রাতর্ভ্রমণে বের হন। সকাল ছয়টার দিকে শহরের বটতলা বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে। এ ঘটনার পরদিন তাঁর ভাই লাভলু মিয়া সদর থানায় মামলা করেন। তদন্ত চলাকালে ২০১৬ সালে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাজাহান, সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাঁরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে বের হয়ে আসে সানিয়াত ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাঁদের দিয়ে ওই হত্যাকাণ্ড করিয়েছেন।
রফিকুল হত্যার সঙ্গে সানিয়াতের জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয়ে আসার আগেই তিনি ২০১৪ সালে দেশ ছাড়েন। পরে আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হত্যা মামলায় চার ভাইয়ের জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয়। জাহিদুরও দেশত্যাগ করেন। ফারুক হত্যা মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর আমানুর ও সহিদুর মুক্ত হন। আমানুর ও সহিদুর আত্মগোপনে রয়েছেন।